স্বাধীনতার জন্য বীর বাঙালি গর্জে ওঠা
মা ন জু ম উ মা য়ে র
আজ ঐতিহাসিক অগ্নিঝরা মার্চের প্রথম দিন। বাংলাদেশের ইতিহাসে অসংখ্য ঘটনার উজ্জ্বল সাক্ষী ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চ। ১৯৭০ সালের গণপরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় দলটির তৎকালীন পাকিস্তানে সরকার গঠনের কথা কিন্তু তা হয়নি।
কারণ নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোটে নির্বাচিত দলের সঙ্গে নানা কূটচাল শুরু হয়। এর ১৬ দিন আগে একাত্তরের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করা হয়েছিল- ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে। কিন্তু ১ মার্চে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান হঠাৎ সেই অধিবেশন স্থগিত করেন। তার এ ঘোষণার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে উঠে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা।
এ ঘোষণার আগে ১৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ৩ মার্চের জাতীয় অধিবেশন বয়কটের আগাম ঘোষণা দিয়েছিলেন। ফলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার সঙ্গে তাল মেলাতেই যে অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন তা আর বুঝতে কারও বাকি থাকে না। জাতীয় পরিষদের ৩ মার্চের নির্ধারিত অধিবেশন বাতিলের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ফুঁসে উঠে বাংলাদেশ। বিক্ষোভে উত্তাল হয় রাজপথ। সেইসাথে পহেলা মার্চ দুপুর থেকেই পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে কার্যত সর্বাত্মক অসহযোগ শুরু হয়ে যায়।
এখানে উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘যদি আমরা নিজেদের প্রথমত বাঙালি, পাঞ্জাবি ও সিন্ধি ভাবতে শুরু করি এবং শুধুই ঘটনাচক্রে নিজেদের মুসলমান ও পাকিস্তানি ভাবি, সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়া অনিবার্য।’ ২৩ বছর পর জিন্নাহর সেই আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়; পাকিস্তান ভেঙে ১৯৭১ সালে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হলেও চূড়ান্ত আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১ মার্চ। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেডিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এদিন বেতার ভাষণে ৩ মার্চের গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। এ সময় ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) পাকিস্তান বনাম বিশ্ব একাদশের ক্রিকেট খেলা চলছিল। ইয়াহিয়া খানের ওই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দর্শক খেলা ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
ততক্ষণে হাজারো মানুষ পল্টন-গুলিস্তানে বিক্ষোভ শুরু করে দিয়েছে। সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। সেদিন মতিঝিল-দিলকুশা এলাকার পূর্বাণী হোটেলে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। ক্ষুব্ধ ছাত্ররা সেখানে গিয়ে প্রথমবারের মতো স্লোগান দেয়, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ ‘তোমার-আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা।’ বস্তুত মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ঢাকাসহ সারাদেশের স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, কল-কারখানা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অচল হয়ে পড়ে দেশ। স্তব্ধ হয়ে পড়ে প্রশাসন। সেইসাথে বাঙালির মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বাত্মক অগ্নিঝরা আন্দোলন অরও তীব্র হয়ে উঠে। একাত্তরের এই মার্চের মতো এমন অগ্নিঝরা, ঘটনাবহুল সমুজ্জ্বল কোনো মাস বাঙালি জাতির জীবনে আর আসেনি। তাই প্রতি বছর অগ্নিঝরা-রক্তঝরা আন্দোলন-সংগ্রাম আর প্রেরণার মাস মার্চ এলেই বাঙালির রক্তে জাগে শিহরণ।
শুধু একাত্তরের মার্চই নয়, মার্চ মাস আরও নানা কারণে অগ্নিঝরা, উত্তাল ও বাঙালির জাতীয় জীবনে ওতপ্রেতভাবে জড়িয়ে আছে। যে মহান ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন দানা বাঁধে- এরও সূত্রপাত এ মার্চে। মাতৃভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলা ভাষা দিবস উদযাপন করা হয়।
মূলত এর মধ্য দিয়ে বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলন ও সংগ্রাম শুরু হয়। সেই সংগ্রামের প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয় ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের মাধ্যমে। ভাষার অধিকার আদায়ের সফল আন্দোলনের মাধ্যমেই রচিত হয় স্বাধিকার আদায়ের পরবর্তী সব মাইলফলক। এরপর সব রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাঙালি ছিনিয়ে আনে বিজয়, লাল-সবুজের গর্বিত পতাকা। তাই এ মার্চ একদিকে কেবল কষ্ট আর স্বজন হারানোরই নয়, সংগ্রাম আর গর্বেরও।
বাঙালির শৌর্যবীর্যের ইতিহাস হাজার বছরের। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে মীরজাফরের ষড়যন্ত্র আর বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। পরাজয়ের গ্লানির ২১৪ বছর পর সেই সূর্যের রক্তিম আভা পুনরায় উদ্ভাসিত হয়েছিল এ মার্চেই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে। ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সভ্যতা, শিক্ষা, সামাজিকতা এবং মন-মানসিকতায় বাঙালি তথা পূর্বপাকিস্তানের মানুষ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ১৪০০ মাইল দূরের ভিন্ন সংস্কৃৃতির মানুষদের কর্তৃত্ব বাঙালি কোনো দিনই মেনে নিতে পারেনি।
তাই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর হিন্দু-মুসলমান দ্বিজাতি তত্ত্বের উদ্ভট চিন্তা প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান নামক দেশের যাত্রালগ্ন থেকেই শুরু হয় বাংলা ভাষার মর্যাদার লড়াই এবং বাঙালির স্বাধিকারের সংগ্রাম। ১৯৪৮ সালে তিনি যখন ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা করেছিলেন, তখন বাংলার দামাল ছেলেরা তার মুখের ওপরই ‘নো’, ‘নো’ বলে জানিয়ে দিয়েছিল। আর বুঝিয়ে দেয়, আমাদের তোমরা ‘দাবায়ে’ রাখতে পারবা না। সেই বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের বিনিময়ে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেই বাঙালি জাতি খুঁজে পায় তাদের হারানো হাজার বছরের স্বপ্নসাধ স্বাধীনতা উদ্ধারের মূলমন্ত্র।
চুয়ান্নর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের ভরাডুবি, ছাপ্পান্নতে এসে সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়, বাষট্টিতে শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ছিষট্টিতে লাহোরে ছয় দফার স্বাধিকার আদায়ের প্রস্তাব, আটষট্টিতে বঙ্গবন্ধুসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান- সবকিছুই অবদান রাখে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ধারাবাহিক সংগ্রামে।
প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তুলে নিতে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাধ্য হয়। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির পর রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে তৎকালীন ছাত্রনেতা ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদের প্রস্তাবে জনতার মুহুর্মুহু করতালির মধ্য দিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ওই জনসভা থেকে বঙ্গবন্ধু দেশের নাম ‘বাংলাদেশ’ ও জাতীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’র ঘোষণা দেন।
এভাবেই বাঙালির পথ এগোতে থাকে মুক্তির দিকে, স্বাধীনতা অর্জনের দিকে। কিন্তু পাকিস্তানিরা কতটা বর্বর আর রক্তপিপাসু, তা তারা বুঝিয়ে দেয় একাত্তরের ২৫ মার্চে। একদিকে আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে, অন্যদিকে গোপনে বাংলাদেশে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে থাকে। একপর্যায়ে ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাক হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ঘটায় মানব ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ। তবে দমে যাওয়ার জাতি নয় বীর বাঙালি। সেই পৈশাচিকতাকে পেছনে ফেলে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলার অকুতোভয় দামাল সন্তানরা। অবস্থা টের পেয়েই বঙ্গবন্ধু মধ্যরাতে গ্রেফতারের আগেই সুকৌশলে ঘোষণা করেন ‘বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা’। পরবর্তী সময়ে ২৭ মার্চ তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার সেই ঘোষণা পাঠ করেন।
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার সূত্র ধরে সমগ্র জাতি জোটবদ্ধ হয়ে প্রস্তুতি নেয় চূড়ান্ত যুদ্ধের। ঘরে ঘরে শুরু হয় প্রস্তুতি। তরুণদের রক্তে আগুন জ্বলে ওঠে। এর আগে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণেই বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধে করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেন।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মতোই জেলা, থানা, ইউনিয়ন ও পাড়া-মহল্লায় গঠিত হয় সংগ্রাম কমিটি। অস্ত্র সংগ্রহ করা হতে থাকে। চলতে থাকে প্রশিক্ষণ। গড়ে তোলা হয় সর্বত্র প্রতিরোধ ব্যুহ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় প্রবাসী মুজিবনগর সরকার। আর এ প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি অর্জন করে তাদের কাঙ্খিত স্বাধীনতা।


