- আমিনুল ইসলাম কাসেমী
মুয়াজ্জিনের আজানে সুবহে সাদিকের বিমুল ভোরে শিশুদের ঘুম ভাঙে। হিম-শীতল হাওয়ায় ভোরের শিশির মাড়িয়ে বুকে কোরআন শরীফ, কায়দা বা আমপারা নিয়ে ছুটে চলে সুবাহি মক্তবে। কখনো শীতের সকালে চকচকে সোনালী রোদ পোহাতে পোহাতে গায়ের সেই মক্তবে। কোঁচের মধ্যে মুড়ি, মুড়কি, মোয়া। কখনো খই বা নাড়ু খেতে খেতে পৌঁছে গেছে কোরআন শিক্ষার পাঠশালায়। কী যে এক আনন্দ। কী যে অনুভূতি। কী অপরুপ দৃশ্য। আজো প্রাণ ছুঁয়ে যায়। মনে হয় ফিরে যাই সেই শৈশবে।
মক্তবের শিক্ষার্থীদের মাঝে কত উচ্ছাস। কত প্রেম ভালোবাসা। কত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে। শিশুকালের সেই সময়ে কত প্রীতি গড়ে ওঠেছে ছাত্র/ ছাত্রীদের মাঝে। সেটা তুলনাহীন। কোরআন শিক্ষার সেই আসরগুলোতে এক মজার পরিবেশ জন্ম নিয়েছিল। ভ্রাতৃত্ববন্ধন, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। নিঃস্বার্থ ভালোবাসার যেন মডেল ছিল। বিশেষ করে কোরআনের নেসবাতে যেন মধুর প্রীতি দেখা যেত সবার মাঝে।
‘বড় পরিতাপের বিষয়, বর্তমান যুগে যেন সেই সুবাহি মক্তবগুলো হারিয়ে গেছে। মুয়াজ্জিনের ফজরের আজানে যেন আর শিশুদের ঘুম ভাঙছে না। সুবহে সাদিকের নির্মল হাওয়া থেকে আমাদের শিশুরা বঞ্চিত।’
মক্তবের শিক্ষকগণও ছিল তুলনাহীন। খালেছ আল্লাহওয়ালা। মহান আল্লাহর সাথে তাদের ছিল নিবিড় সস্পর্ক। দ্বীন শেখানোর মাকসাদ নিয়েই তাঁরা মক্তবের শিক্ষালয়ে সময় দিতেন। যৎসামান্য হাদিয়া যেটাই আসত সেটা নিয়েই তাঁরা খুশি। প্রাণ খুলে ছাত্র/ছাত্রীদের পাঠদান করতেন। আহামরি কোন চাহিদা থাকত না। শিশুদের গড়ে তোলাই ছিল তাদের আসল উদ্দেশ্য।
আর এ কারণে সেই সুবাহি মক্তব থেকে বেরিয়ে আসত আদব-আখলাকী সোনার মানুষ। শিশু কালের পাঠদান পাথরে নকশা করার মত। উস্তাদ যেটা পড়াতেন সেটা যেন খোদাই করা হয়ে যেত। শিশুদের হৃদয়ে কোরআন-হাদীসের বাণী যেন অংকিত হত। সেটা আর কোনদিন মুছে যেত না। সবচেয়ে বড় উপকার ছিল, প্রতিটি শিক্ষার্থী আদব-আখলাকের মডেলে রুপান্তরিত হয়েছে। ভবিষ্যতে সে যেখানেই গিয়েছে, যে বিষয় নিয়ে লেখাপড়া করেছে, তাঁর মাঝে সেই শিশুকালের মক্তবে পড়ার আছর বাকি থেকেছে। সেটা হারিয়ে যায়নি। তার কাজকর্ম, কথাবার্তা, সব কিছুতে যেন ব্যাপক পরিবর্তন বোঝা গেছে। তার সাথে অন্য কোন মানুষের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।
বড় পরিতাপের বিষয়, বর্তমান যুগে যেন সেই সুবাহি মক্তবগুলো হারিয়ে গেছে। মুয়াজ্জিনের ফজরের আজানে যেন আর শিশুদের ঘুম ভাঙছে না। সুবহে সাদিকের নির্মল হাওয়া থেকে আমাদের শিশুরা বঞ্চিত। চকচকে সোনালী রোদ ভেদ করে আর মক্তবে যাওয়া হচ্ছে না। সেই ঐতিহ্য এখন হুমকির সম্মুখিন। মক্তবে পাওয়া যাচ্ছে না সেরকম ছাত্র/ছাত্রী। আবার মিলছে না সেই রকম মুখলিছ উস্তাদ। উস্তাদ ও ছাত্র সব কিছুতে সংকট। তবে কেন এমন অবস্থা? কেন আজ মক্তবগুলোর এমর বেহাল দশা। কোমলমতি শিশুদের এমন অবস্থা কেন?
আরও পড়ুন: আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হোক ওয়াজ মাহফিল
আমরা একটু দৃষ্টি দিলে পুরো অবস্থা আমাদের সামনে চলে আসবে। কী কারণে সুবাহি মক্তব চলছে না। আবার মক্তব না চলার কারণে আমাদের সামাজের কী অবক্ষয় দেখা দিয়েছে,তার সব কিছু ফুটে উঠবে।
১। অপসংস্কৃতির ভয়াল কালো থাবা আমাদের সুস্থ সমাজকে বিনাশ করে দিয়েছে। ভিন দেশী কালচার, ভিন দেশী সংস্কৃতি এদেশের নিরীহ মানুষ বলির শিকার। বিশেষ করে বিনোদনের নামে অপসংস্কৃতি গ্রাস করেছে সকলকে। বর্তমান সময়ে মোবাইল , ইউটিউব এবং টিভি চ্যানেলগুলো সর্বনাশ ডেকে আনছে সকলকে। গভীর রাত পর্যন্ত টিভি চ্যানেলগুলো দেখা। রাত জেগে ইউটিউব এর প্রোগ্রাম দেখে শিশু কিশোরদের আর ফজরের নামাজে ঘুম ভাঙছেনা। এমন আসক্তি এখন টিভি চ্যানেল এবং ইউটিউব এর প্রতি, কোন শক্তি তাদের ফেরাতে পারছে না।
২। গার্ডিয়ানদের অবহেলা এখন চরম পর্যায়ে। আগেকার অভিভাবকগণ নিজের সন্তানদের দ্বীনী শিক্ষা দেওয়াকে কামিয়াবী মনে করতেন। মানুষের মত মানুষ বানানোর ফিকির থাকত তাদের। কিন্তু এখন অভিভাবকদের চরম উদাসীনতা। দ্বীনি শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ। দুনিয়ার চাকচিক্যের দিকে ঝুকে ছেলে-মেয়েদের দ্বীন থেকে মাহরুম করছে।
৩। মক্তব পরিচালনা কমিটিরও গাফলতি চরম পর্যায়ে। অধিকাংশ জায়গাতে শিক্ষকদের যথাপোযুক্ত সন্মান দেওয়া হচ্ছে না। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার ব্যাপারে কার্পণ্যতা। যার কারণে বহু জায়গায় সুবাহি মক্তবগুলো বন্ধ হয়ে রয়েছে।
৪। কিন্টারগার্টেন ও স্কুলের সময়ে কিছুটা এলোমেলো। বিভিন্ন স্কুলে প্রভাতি শিফটের কারণে মক্তবে যাওয়ার সময় পাচ্ছেনা শিক্ষার্থীরা। ছাত্র/ছাত্রী সংকটে অটোমেটিক বন্ধ হচ্ছে সুবাহি মক্তব।
দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, এরকম কিছু কারণে আজ আমাদের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা হুমকির মুখে। মক্তবের শিক্ষাই আসল শিক্ষা। একজন শিক্ষার্থীকে শিশুকালে তাদের যেভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়, যে আদব-আখলাক এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়, সেটা থেকে এখন বঞ্চিত।
এই মক্তবের শিক্ষা থেকে বর্তমান প্রজন্মের ছাত্র/ছাত্রীরা বঞ্চিত হওয়ার কারণে সামাজিক অবক্ষয় নেমে এসেছে। আজ আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায় পচন ধরেছে। মন-মগজ এলোমেলো হয়ে আছে। এ প্রজন্মের সন্তানদের থেকে শিষ্টাচার, ভদ্রতা বিদায় নিয়েছে। মুরুব্বীদের মান্যতা, ছোটদের স্নেহ, হৃদ্যতা, ভ্রাতৃত্ববোধে ভাটা পড়েছে। ভিন দেশী সংস্কৃতি এর দাপটে এখন সব দিশেহারা।
এজন্য ভাই বন্ধু, সকলে মিলে আমাদের সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা জরুরী।এ সমাজকে বাঁচাতে, জাতিকে বাঁচাতে সুবাহি মক্তবের বিকল্প নেই। সুস্থ সমাজ ব্যবস্থাপনা এবং সুন্দর পরিবেশ রক্ষায় সুবাহি মক্তব প্রতিষ্টা সময়ের দাবী। আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপর রহম করুন। আমিন।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট


