১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৮ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

অনন্য এক মুহতামিম আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ

  • মুহাম্মাদ আইয়ুব

মসজিদের বারান্দা থেকে দৌড়ে এসে রকিবের পিঠে দ্রিম করে এক কিল বসিয়ে দিলাম। অনুমান করলাম, ও আমার পিঠে আরেকটা বসিয়ে দেবে, কিন্তু সুযোগ পেল না একজন মুরব্বি চলে আসার কারণে। নামাজ শেষ করে মুরব্বি আমাদের কিছুই বললেন না।

দিনশেষে জানলাম, এই মুরব্বিই বিশাল এই মাদ্রাসার মুহতামিম, সকলের সুপরিচিত ও একান্ত আপনজন, আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ, আমাদের কাজী সাহেব হুজুর (রহ.)। সেদিন বুঝলাম বড় হুজুর হলেই সবাইকে ধমকায়, মারে বিষয়টি মোটেও ঠিক নয়।

ঘটনাটি যতবার মনে পড়ে ততোবারই শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে আসে। আহ! সত্যিকারের বড়রা বোধহয় ছোটদের দুষ্টুমি বোঝে। মূলত ঐদিন থেকেই কাজী সাহেব হুজুরের প্রতি আমার ভালোলাগা, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় একাকার হওয়া।

আব্বার খেদমতের সুবাদে সেই ২০০২ সালে মালিবাগ জামিয়ায় ভর্তি হওয়া পর থেকে নিয়মিত যাতায়াত। বলা চলে ঢাকায় থাকতে মালিবাগ জামিয়া ছিল আমার সেকেন্ড হোম। বড়দের প্রতিটি আচরণই ছোটদের হৃদয়ে গেঁথে থাকে আজন্ম। কাজী সাহেবের বেলায়ও ঠিক তেমনি ঘটেছে আমার। শামায়েলে যেভাবে নবীজীকে পেয়েছি, মালিবাগে কাজী সাহেবকে তাঁর অনুকরণে দেখেছি। বিশেষ করে তাঁর হাঁটার ভঙ্গিটা আজও চোখে লেগে আছে।

অত বড় একটা মাদ্রাসার মুহতামিম, অথচ কথাবার্তা, আচার-আচরণে কতটা সারল্য মিশে থাকতে পারে তা কাজী সাহেবকে না দেখলে কেউ কোনদিন হয়তো বুঝবে না। নিজ খাদেম থেকে শুরু করে সহকর্মী, অধিনস্থ স্টাফ, এলাকাবাসী সবাই তাঁকে নিজেদের অভিভাবক ও আপনজন মনে করতেন। বিষয়টি তাঁর জীবদ্দশায় ও পরবর্তীতে অনেকের স্মৃতিচারণ ও গল্পে ফুটে উঠেছে।

দেখো, উপর থেকে পৃথিবীটা কেমন দেখায়

খাদেমদের সাথে কেমন আচরণ করতে হয়, আমরা কেমন করি, সে আলোচনা এখানে করি আর না করি, কিন্তু কাজী সাহেব হুজুর (রহ.)-এর আচরণটা উল্লেখ করতেই হয়। জামিআ ইকরা বাংলাদেশে আমাদের উস্তায মুফতি হামিদুর রহমান সাহেব থেকে শুনেছি, কাজী সাহেব (রহ.) কোন ছাত্রকে দিয়ে খেদমত করালে তাকে পারিশ্রমিক দিতেন। কাজে ভুল হলে কখনো ধমকাতেন না।

হুজুরের দীর্ঘদিনের খাদেম জামিআ ইকরা বাংলাদেশের শিক্ষক মাওলানা শফিকুল ইসলাম সাহেব শুনিয়েছেন যে, একবার বিমানে করে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন। কাজী সাহেব হুজুর (রহ.) ছিলেন জানালার পাশে। হঠাৎ খাদেম মাওলানা শফিক সাহেবকে বললেন, “শফিক! তুমি জানালার পাশে বসো, দেখো উপর থেকে পৃথিবীটা কেমন দেখায়।”

শফিক সাহেব ইতস্তত করলে কাজী সাহেব হুজুর বলেন, “আমি ইতোপূর্বে অনেকবার জানালার পাশে বসেছি। তুমি তো নতুন। সুতরাং তুমি বসো, দেখো।” প্রিয় পাঠক! বুঝলেন তো, বড় কীভাবে হতে হয়?

সহকর্মীদের মনে কখনো বড়ত্বের বীজ বপণ করার হীন চেষ্টা করেননি আমাদের কাজী সাহেব হুজুর (রহ.)। খাদেমের সাথে যদি আচরণ এমন হতে পারে, তাহলে সহকর্মী তো আরো উপরে। হুজুরের সহকর্মীদের স্মৃতিচারণ পড়েছি। জেনেছি কখনো তিনি তাদের স্বাধীনতা হরণ করেননি। ‘হাম চুনি মান ডাঙ্গর নিস্ত’ মনোভাবকে তিনি পা দিয়ে মাড়িয়ে শেষ করে দিয়েছিলেন।

আমার আব্বা ছিলেন মালিবাগ জামিয়ার আবাসিক মক্তবের খাদেম। অথচ তিনিও তাবলীগের বয়ানে, পারিবারিক আলোচনায় বারবার ঘুরে ফিরে যে নামটি সর্বাধিক বেশী গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করতেন, তা হচ্ছে আমাদের ‘কাজী সাহেব’। একজন মহান কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.) যে সমাজের সর্বস্তরের জন্য কত বেশি দামী ও জরুরী, তা বুঝতাম আব্বার কথায় কথায়।

আজকাল দেখছি যারা মুহতামিম হন তাদের জুতা বহন থেকে শুরু করে প্রত্যেক কাজে একজন করে খাদেম থাকে। বড় মাদ্রাসার মুহতামিম হলে তো খাদেমদের বলয় পেরিয়ে হজরতজির সাথে দেখা করাও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আর মাদ্রাসার এ্যাকাউন্ট তো বাইতুল মুহতামিম। কিন্তু আমাদের কাজী সাহেব হুজুর নিজের জুতোটা পর্যন্ত নিজ হাতে নিয়ে চলতেন। মাদ্রাসা থেকে হাদিয়া আর আবাসন ছাড়া এক পয়সাও তিনি অতিরিক্ত নিতেন না বলে ঘনিষ্ঠ সবার কাছ থেকে শুনেছি। এ যমানার অনেক বড় হুজুররাই ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়েন, প্রতি বছর হজ করেন, ঢাকায় অনেকের বাড়ি-গাড়ি, ফ্ল্যাট আছে, কিন্তু কাজী সাহেব (রহ.) এর ছিল না কোন কানাকড়ি। আজ উদ্যক্তা হওয়ার হিড়িক আর কাজী সাহেব উদ্যোক্তা বানানোর ফিকিরে থাকতেন সবসময়।

এবার আসি কাজী সাহেব হুজুরের আরেক শ্রেষ্ঠত্বের জায়গায়। তাঁর পাঠদান ও উপস্থাপনায় ছিল অফুরন্ত মধুরতা, প্রাঞ্জলতা আর আবেগ ও তড়পের অভূতপূর্ব মিশ্রণ। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যে তাঁর ব্যুৎপত্তি ছিল অসাধারণ। জামিয়া ইকরার দরসে ভরাট গলায় শুনেছি ‘ক্বালা ক্বালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’। মনে হত যেন রাবী নিজেই আমাদের হাদীস বর্ণনা করে শুনাচ্ছেন। আহ কোথায় মিলিয়ে গেল সে আবেগ আর ভালোবাসা।

হাদীসের তাওজীহ তাশরীহ ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রে তিনি আকাবির-আসলাফের মতামতের মতো নিজের মতও পেশ করতেন, কিন্তু সেটা হতো অত্যন্ত গরীবানা ভঙ্গিতে, তাওয়াজু মিশ্রিত আলফাজে। কোনো দিন কোনো দরসে অন্য কারও প্রতি টিপ্পনী কেটে বা অন্য কোনোভাবে নিজের কৃতিত্ব ফলানোর ভঙ্গিতে কোন কথা তাঁকে বলতে শুনা যায়নি বলে একাধিকবার উস্তাদে মুহতারাম মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান সাহেব থেকে শুনেছি।

অসাধারণ পরিমিত রসবোধের অধিকারী ছিলেন কাজী সাহেব (রহ.)। এর কিছু নজীর পাঠকদের দিতে চাই স্বয়ং কাজী সাহেব (রহ.) এর জবানিতেই-

আমার বড় বোনের নাম নাহার। মানে শামসুন নাহার। বাবা মা আমার নাম রেখেছেন মুতাসিম বিল্লাহ। বাবা কাজী সাখাওয়াত হোসাইন রহ. ইতিহাসের নিবিড় পাঠক ছিলেন। বাদশাহ হারুনুর রশীদের তৃতীয় ছেলে মুতাসিম বিল্লাহ। তার সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন আমাকেও। কিন্তু দাদী নানীদের সেই পল্লী সাহিত্যের টান। নাহারের সাথে ছন্দ মিলিয়ে আমাকে ডাকেন বাহার। অবশ্য বাহার নামের ভিন্ন একটি প্রসঙ্গও আছে। আমার পরদাদা কাজী আব্দুল মুত্তালিব ও কবি কাজী নজরুল ইসলামের মাঝে সখ্য ছিল। মহান ভাষা আন্দোলনের সৈনিক হাবীবুল্লাহ বাহার এবং তার বোন শামসুন্নাহারকে কবি একটি বই উৎসর্গ করেন এই লিখে, “আমার বইখানি বাহার ও নাহারকে দিলাম/ কে তোমাদের ভালো?/ বাহার আনে গুলশানে গুল/ নাহার আনে আলো/কে তোমাদের ভালো?”

আমার বোন নাহারের জন্মকথা শোনালে কবি ভাষা সৈনিককে উৎসর্গিত ‘সিন্দু-হিন্দোল’ গ্রন্থটি দাদার হাতে তুলে দেন। উচ্চারণ করেন, আমার বইখানি বাহার ও নাহারকে দিলাম/ কে তোমাদের ভালো?/ বাহার আনে গুলশানে গুল/ নাহার আনে আলো/ কে তোমাদের ভালো?

ছন্দময় সেই বাহার নামেই বেড়ে উঠি আমি। এ দিকে আমার নানা শেখ মাকবুলুল হক রহ.। একজন ওলি ও বুযুর্গ। বাহার থেকে আমার নাম দিলেন বাহরুল উলুম। যশোরের লাউড়ি মাদ্রাসায় পড়তে এলে আমার উস্তাদ মাওলানা তাজাম্মুল আলী রহ. আমার নামের মতোক্যে পৌঁছেন। স্থির করেন কাজী মুতাসিম বিল্লাহ বাহার। শিক্ষাজীবন পাড়ি দিয়ে আমি যখন শিক্ষক তখন লেজটিও কেটে দেই। এখন শুধু কাজী মুতাসিম বিল্লাহ।

কাজী সাহেব হুজুর (রহ.)-কে কখনো আমি রাগতে দেখেনি, কিন্তু দেখেছিলাম মালিবাগ জামিয়ার ৩০ সালা দস্তারবন্দীর সময় তৃতীয় দিনে একদল মুজাহিদদের উপর, যারা কুসুম কুসুম নয় সরাসরি গরম গরম বক্তৃতা শুনতে চায়, এজন্য প্রয়োজনে রিতীমত জিহাদ করতে প্রস্তুত। এরা ওলিপুরী সাহেবের বয়ান শেষে আদব কায়দার রীতি ভঙ্গ করে মজলিসের মাঝখানেই অসভ্যের মত ময়দান ছেড়ে যাচ্ছিল, অথচ স্টেজে তখন দেশ বিদেশের অনেক বরেণ্য উলামায়ে কেরাম বসা। রেগে গেলেন আমাদের কাজী সাহেব। শক্তভাবে বললেন, মঞ্চে মেহমান রেখে আপনারা কেন চলে যাচ্ছেন? তাই তো এরা কারা? ব্যক্তি পূজারী নয় তো আবার।

আরও পড়ুনঃ বাংলাভাষা ও সাহিত্যের দিকপাল আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ

আজকাল কওমী মাদ্রাসায় উস্তাযদের সাথে ছাত্রদের বেয়াদবি একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। নাউজুবিল্লাহ। অথচ কাজী সাহেবের কাছে ছিল এটা সবচেয়ে ঘৃণার। বেয়াদবি ছিল তাঁর একদম সহ্যের বাহিরে। মুরুব্বিদের থেকে শোনা, আল্লামা আজিজুল হক সাহেব (রহ.) যখন মালিবাগের মুহতামিম পদ ছেড়ে যান এবং কাজী সাহেব হুজুর (রহ.) মালিবাগে মুহতামিম হিসেবে আসেন, তখন একজন স্যারের সাথে বেয়াদবি করার কারণে ১৩ জন ছাত্রকে মাদ্রাসা থেকে তিনি বহিষ্কার করেন। ছাত্র হয়ে উস্তাযের সাথে বেয়াদবি করবে, এটা ছিল তাঁর কল্পনারও বাইরে। অথচ এরকম এক দঙ্গল গোয়ার তৈরী হয়েছিল পূর্ববর্তী মুহতামিম সাহেবের আমলে। কাজী সাহেব নিজ হাতে সে আগাছা কেটেছেটে পরিষ্কার করে মালিবাগ জামিয়াকে বেয়াদব মুক্ত করেছিলেন। তারপর মসজিদে যেয়ে দিয়েছিলেন ঐতিহাসিক এক ভাষণ। শেষমেশ কিছু আগাছাদের ঠিকানা হয়েছে মোহাম্মদপুর। যাদের সময়মত পরিষ্কার না করায় কওমি নামের পুরো গাছটাকেই ঢেকে ফেলেছে তারা। আল্লাহ পাক রহম করুন সবার উপর।

২০১৩ সনের ১৫ জুলাই মোতাবেক ৫ রমযান রোজ সোমবার সন্ধ্যা ছয়টা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে তাঁর অসংখ্য শিষ্য-শাগরিদ, ভক্ত-অনুরক্ত ও আত্মীয়-স্বজনকে শোকসাগরে ভাসিয়ে আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্যে চলে গেলেন কাজী সাহেব রহ.। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

তারাবীর নামাজের বিশ মিনিট আগে কাকরাইল বসে জানলাম আমাদের কাজী সাহেব হুজুর ইহজগতে আর নেই! কোন রকম তারাবী পড়িয়ে আমি আর হাজী ইমরান ভাই ছুটলাম মালিবাগ মাদ্রাসার দিকে। করুণ আর্তনাদে ভারী মালিবাগের বাতাস। হুজুরকে দেখতে রমজানেও উলামা তোলাবাদের সে কি ভীড়। মাঝে একবার ছয়তলায় গিয়েছিলাম, আব্বাকে দেখলাম বাচ্চাদের মত কাঁদছে। রাতের খাবার না খেয়ে নিচ তলায় চলে এলাম ফ্রিজিং গাড়ির কাছে। আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। পায়চারী করতে করতে রাতটা যেন কীভাবে কেটে গেল! বিশ্বাস করুন, একটুও ঝিমুনি আসেনি!

মানুষ বড় হওয়ার পিছনে তার মেধা ও প্রতিভার পাশাপাশি অনেক সদগুণ ক্রিয়াশীল থাকে। হযরত আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.)-ও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। ব্যাক্তিগত সারল্য ও সততা, দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ, উলামায়ে দেওবন্দের মতাদর্শের উপর ইস্পাত কঠিন অবিচলতা, ইত্তেবায়ে সুন্নতের প্রবল জযবা, অতি সুন্দর নামায আদায়, শায়খুল ইসলাম হযরত মাদানী (রহ.) এর প্রতি আসক্তি পর্যায়ের ভালোবাসায় মোড়ানো সোনার মানুষ ছিলেন তিনি। যার থেকে আমরা বঞ্চিতরা বঞ্চিত হয়েছি আজ আট বছর হয়ে গেল। আমরা তাহলে এভাবেই বঞ্চিত হতে থাকবে অনন্তকাল? নাকি খুঁজে নেবো তাঁর যোগ্য উত্তরসূরিকে?

লেখক: প্রাবন্ধিক ও মুহতামিম

 

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com