২রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১০ই রজব, ১৪৪৪ হিজরি

অনেককালের একটি মাত্র দিন

  • আশরাফ উদ্দীন রায়হান

বছর পাঁচেক আগে সিলেট শহরে তাবলীগ-জামাতে এক চিল্লার সফর পুরা করার তাওফিক হয়েছিলো আল্লাহর ফজলে। সফরের শেষের দিকে শহরতলীর এক মসজিদে মেহনতের জিম্মাদার সাথী শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবির) একজন অধ্যাপক নুসরত করতে এসেছিলেন আমাদের জামাতে। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ছিলেন এবং তৎকালে মুহম্মদ জাফর ইকবালের সহকর্মী।

তিনি যেহেতু আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অ্যালামনাই ছিলেন, সে কারণে তাঁর কাছাকাছি হতে আমাদের তেমন কোনো ব্যারিয়ার ছিলো না; বরং একদম স্বচ্ছন্দে ও অবলীলায় তাঁর সাথে আমাদের দীর্ঘ সময়ের মুজাকারা হয়।

ঐ তাবলীগওয়ালা অধ্যাপক ‘হুজুরের’ আলোচনা সিংহভাগ আমাদের মেহনতকেন্দ্রীকই ছিলো। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো হয়ে তাঁর মুক্তোঝরা কথাগুলো শুনে যাচ্ছিলাম। আলোচনার শেষ দিকে আমাদেরকে প্রশ্ন করার জন্য তিনি ফ্লোর দিলেন। সবাই যে যার যার মতো করে মেহনতবিষয়ক প্রশ্ন করছিলো এবং তিনি সাবলীলভাবে উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রশ্নোত্তর পর্বের একেবারে শেষ লগ্নে আমি অধ্যাপক মহোদয়ের একান্ত পাশ ঘেঁষে আদব বজায় রেখে বসলাম। তিনিও আমার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তাকালেন।

সন্তর্পণে বললাম, ‘স্যার, আপনি তো জাফর ইকবাল স্যারের কলিগ। ডিপার্টমেন্টে একসাথে থাকেন এবং পড়ান। উনাকে একেবারে কাছ থেকে দেখেন। তো উনার ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে যদি আপনার কাছ থেকে জানতে চাই তাহলে কী বলবেন।’ ব্যস, এই পর্যন্ত জিজ্ঞাসা। আপাদমস্তক শুভ্রবসনে মোড়ানো, নজরকাড়া আমামা পরিহিত মুখভরা মেহেদীরাঙা শ্মশ্রুমণ্ডিত অধ্যাপক মুখ থেকেই লুফে নিলেন আমার সেই কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নখান।

নিতান্ত ধীর সৌম্যসমাহিত মেজাজে বলতে লাগলেন, ‘দেখো, তিনি যে ঈমানের ওপরে আছেন এ ব্যাপারে আমার অন্তত কোনো সন্দেহ নাই। ক্যাম্পাসে একজন মৃত ব্যক্তির জানাযার নামাযে তিনি আমাদের সাথে শরীক হয়েছেন। কেন্দ্রীয় মসজিদে জুমার নামাযও পড়তে দেখি উনাকে। আমি একদিন উনার চেম্বারে উনাকে ইফতারের দাওয়াত দিতে গিয়েছিলাম। সেদিন তিনি বাস্তবিক ব্যস্ততার দরুণ আমাকে বলেছিলেন, আমি তো রোযা; কিন্তু দাওয়াত রক্ষা করতে পারবো না হয়তো।’

প্রিয় পাঠক, আমি এখানে স্রেফ জাফর ইকবাল সম্পর্কে ঈমান ও আমলের মেহনতের ওপর জিম্মাদারিসমেত চলনেওয়ালা সুন্নতের পাবন্দ তাঁরই একজন সহকর্মীর অভিমত তুলে ধরেছি, এর বেশি কিছু না। যদি এর বাইরেও তাঁর সম্পর্কে আরো ভারসাম্যপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য জানার তৃষ্ণা আপনার থাকে, তাহলে আমি আপনাকে সময়ের সেরা দুজন লেখক শাকের হোসাইন শিবলী ওরফে শাহোশী বিরচিত সাড়া জাগানো ‘আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে’ এবং রশীদ জামীল সংকলিত পাঠকনন্দিত ‘পাগলের মাথা খারাপ’ এই দুটি বই পড়ার পরামর্শ দিতে পারি।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মানুষর নাম লেখার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার চেষ্টা করি। ব্যক্তি যেভাবে তার নাম লিখে থাকেন ঠিক সেই বানানে এবং হরফেই লেখার দিকে আমার ঝোঁক থাকে। আর নামের আগে-পরে অভিধা যুক্ত করার দিকে আমার তেমন প্রবণতা নেই। কিন্তু এখানে যেহেতু দুইজন বরিত মানুষকে নিয়েই আমি আলোচনার সূত্রপাত করেছি, তাই নির্মোহ নজরে তাঁদের দুজনের নাম নেওয়ার ক্ষেত্রেই সমতা বিধানের চেষ্টা আমার থাকবেই। লেখাই বাহুল্য যে, উক্ত দুজনের নামের আগে যথাক্রমে ‘আল্লামা’ এবং ‘ড.’ শব্দযুগল তাঁদের যোগ্যতা ও অর্জিত অভিজ্ঞানকে স্বীকৃতি প্রদানেরই নামান্তর। এ শব্দদ্বয় তাঁদের নামের মৌলিক অংশ না হলেও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই পরিণত হয়েছে যেন।

যা হোক, মূলকথায় ফিরে আসি। পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে তাঁর নিজস্ব বলয়ের লোকজনের কাছে যদি ‘তারকা’ হিসেবে ধরে নিই, তাহলে একবিংশ শতাব্দীকে তাক-লাগিয়ে-দেওয়া কিংবদন্তি প্রতিভা আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুমকে জগজ্জোড়া খ্যাতিসম্পন্ন ‘মহাতারকা’ বলাটাই অধিক সঙ্গত।

ঔপন্যাসিক, কথাসাহিত্যিক ও অধ্যাপক প্রভৃতি পরিচয়ের গণ্ডি থেকেও মুহম্মদ জাফর ইকবালকে মূলত আমি কলামিস্ট হিসেবেই চিনি-জানি। জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন এবং সমকাল পত্রিকায় ‘সাদাসিধে কথা’ শিরোনামে তিনি একসময় নিয়মিত কলাম লিখেছেন। আমি ছিলাম তাঁর লেখা সেই কলামগুলোর একনিষ্ঠ পাঠক। সে হিসেবে তাঁর লেখার সাথে আমার পরিচয় কৈশোর থেকেই। এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার্য যে, তিনি আসলেই সাদাসিধে লিখেন, যা পাঠকের জন্য সহজপাচ্য।

একটি অফিসকক্ষে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুম মধ্যমণি হয়ে অবস্থানরত। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁকে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। সহজাত শ্রদ্ধায় আনত নয়নে দুই হাত একত্র করে বিনয়বিধৌত ভঙ্গিমায় নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ নিবদ্ধ করে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুমের হাতে বইটির দিকে তিনি নির্নিমেষ একদৃষ্টে তাকিয়ে। ব্যক্তি মুহম্মদ জাফর ইকবালের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমি প্রত্যাশা রাখতে চাই, মুহম্মদ জাফর ইকবালের এই মনোযোগ যেন হয় শতফুল ফোটার পূর্বাভাস! স্বতঃপ্রবৃত্ত সেলাই করা খোলা চোখের অমোঘ রদবদল ঘটে যাওয়ার অবিস্মরণীয় মাহেন্দ্রক্ষণ! বিস্ময়ের পারদকে ঊর্ধ্বগামী দেখতে পাওয়ার সুবর্ণকাল! ছাইপাঁশ পাশ কাটিয়ে বুযুর্গ-পুণ্যাত্মা পূর্বপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণের দিকে ধাবিত হওয়ার সবুজ সঙ্কেত।

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুম তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি অধুনা প্রকাশিত সীরাতগ্রন্থ ‘আল্লাহর পরে শ্রেষ্ঠ যিনি’ পরম যতনে হাতে নিলেন। ঢাউস আকৃতির বইটির ব্যাক কভারে চোখ রাখলেন এবার। অনন্তর ভরাটকণ্ঠের সানিন্দ্য উচ্চারণে সহজাত পঠনাভ্যাসের দ্যুতি ছড়িয়ে জাফর ইকবালকে শুনিয়ে যেতে লাগলেন ‘আল্লাহর পরে শ্রেষ্ঠ যিনি’ বইটির ব্যাক-কভারের চুম্বকাংশটুকু।

আমি হিসাব করে দেখেছি, আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুম পঠিত সেই প্যারায় সংখ্যার হিসাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্রমাধুরিমার গুণাবলি সংখ্যার হিসাবে সত্তরটির মতো সন্নিবেশিত হয়েছে। আর আমি যেহেতু এই সীরাতগ্রন্থের প্রকাশপূর্ব ধারাবাহিক পর্ব তথা ‘খোদার পরে শ্রেষ্ঠ যিনি’ রচনার পূর্বেকার পাঠক তাই এই বিশেষণসমূহ আমার জ্ঞাত ছিল অবলীলায়। বলাই বাহুল্য যে, আমার ঠোঁটস্থের মতোই ছিল এগুলো।

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুমের রিডিং পড়া শেষ হলো। ঠিক তখনই মুহম্মদ জাফর ইকবাল হয়তো আত্মার ভেতর থেকে উথলে উঠা আগ্রহকে পাত্তা দিতে বাধ্য হলেন বইটি পরম সমাদরে নিজের হাতে নিতে। করলেনও তাই। বইটি তিনি উচ্ছ্বাসভরা আলোকোজ্জ্বল বদনে নিজের হাতে নিলেন। অব্যবহিত পূর্বেই নিজেকে শোনানো আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুমের সেই চয়িত শব্দের বয়িত বুননের চমৎকারিত্বে তিনি বিমোহিত হয়ে বললেন, ‘আমি আপনাকে ক্রেডিট দিই। আপনি যে এই এতগুলা শব্দ একত্র করেছেন, আর এতগুলা বিশেষণ যে এক জায়গায় থাকা সম্ভব, আমি তো সেটাও জানি না।’

লেখাই বাহুল্য যে, এই দৃশ্যপট দেখার জন্য আমার যুগ-যুগান্তরের প্রতীক্ষা ছিলো। মুহম্মদ জাফর যদি না জেনে থাকেন যে, এ দেশের মাদরাসার চৌহদ্দির একজন নিভৃতচারী আলেম কোন মাপের সাহিত্যিকপ্রতিভার অধিকারী, তাহলে এ বইটি তাঁকে সেই অজানা দূরীকরণে সহায়ক হবে নিঃসন্দেহে।

পূর্বাপর মাদরাসাপড়ুয়া একজন মানুষ যিনি নাহবেমীর জামাতে (সপ্তম শ্রেণি) পড়ার সময় সনেট প্রবর্তক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিরচিত মেঘনাদবধ-কাব্য পড়া শেষ করেই ক্ষান্ত হননি; বরং তার চেয়েও দুর্বোধ্য কালিদাসের মেঘদূত সাঙ্গ করে ফেলেছিলেন অনায়াসে। তিনি যে বাংলা সাহিত্যের মধ্যগগনে আপন দ্যুতি ছড়াবেন এ আর আশ্চর্যের কী? জুমুআর নামাযের বয়ানসমগ্রের সংকলন ‘মিম্বার থেকে বলছি’ বইটি তিনি শুরুই করেছেন রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ‘এ কৃপা-কঠোর সঞ্চিত মোর জীবনভরে’ চরণ দিয়ে। আর এটি যে অধ্যাত্মসাধনার কী তুমুল ব্যঞ্জনধর্মী পঙক্তি তা তো কেবল বোদ্ধামহলই জানতে ও বুঝতে সক্ষম।

১ ডিসেম্বর মোতাবেক গত বৃহস্পতিবার থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুম এবং ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের যে ছবি এবং দেড় মিনিটের একটি রেকর্ডেড ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, হেন দৃশ্য আমরা এর আগে দেখিনি। অর্থাৎ বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্বীকৃত-আখ্যায়িত ও উলামায়ে কেরাম থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থানরত মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো মানুষকে কোনো দিন কখনো কোনো আলেমের সান্নিধ্যে এভাবে দেখা যায়নি।

একজন আওয়াম মানুষের জন্য একজন আলেমের সংশ্রব অতীব জরুরি বিধায় আমি সেদিনের এই দৃশ্যকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে চাই; পাছে বলাবলি হবে তা ছিল কাকতালীয়; তবুও মুহম্মদ জাফর ইকবাল তো একজন আলেমের সান্নিধ্যে এসেছেন। আর এর কল্যাণে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুমের মাধ্যমে তাঁর কাছে দাওয়াত তো পৌঁছেছে।

তাবলীগ জামাতের মেহনতে সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে একটি বিষয় দিলের ভেতর বদ্ধমূল হয়েছে। আর তা হলো যে, এই উম্মতের প্রত্যেকটা মানুষই দাওয়াতের কাজের জিম্মাদার।সূরা আলে ইমরানের ১০৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা‘আলার ইরশাদ বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্য থেকে একটি জামাত এমন হওয়া জরুরি; যারা মঙ্গলের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজে আদেশ করবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে তারাই পূর্ণ কামিয়াব হবে।’

  • লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী
    auraihan324@gmail.com

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com