৭ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২রা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

অপচয় এখন আভিজাত্যের প্রতীক

  • মাওলানা আবু আইমান

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে এই উম্মতকে মধ্যমপন্থী উম্মত হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘এমনিভাবে আমি তোমাদের মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি।’ (সুরা: বাকারা, আয়াত : ১৪৩)

এই উম্মত জীবনের সর্বক্ষেত্রে মধ্যমপন্থী। আমরা ভুলে গিয়েছি মধ্যমপন্থা কী। ফলে অপচয় এখন আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যমপন্থা হলো ইসলামী শরিয়তের একটি অন্যতম পরিভাষা। এটি হলো ইসলামের দৃষ্টিতে সৎ ভারসাম্যপূর্ণ‌ জীবন পদ্ধতি, যা চরমপন্থাকে এড়িয়ে চলে ও বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যমপন্থী অভিজ্ঞতা অর্জ‌নে সহায়তা করে। জীবনের সকল ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন মানুষকে গতিশীল করে, কাজকে সহজ করে, সমাজকে উন্নত করে, ব্যক্তি জীবন ও পারিবারিক জীবন সর্বক্ষেত্রে একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে‌। মধ্যমপন্থার বহুদিক ও ক্ষেত্রবিশেষে আলাদা আলাদা নামও রয়েছে। যেমন আয়-ব্যয়ের মধ্যমপন্থাকে বলা হয় ‘মিতব্যয়িতা।’

মিতব্যয়িতায় উৎসাহিত করতে বিশ্বজুড়ে ৩১ অক্টোবর পালন করা হয় বিশ্ব মিতব্যয়িতা দিবস। আজ আমরা এই প্রবন্ধে আয় এবং ব্যয়ের মধ্যমপন্থা অর্থাৎ মিতব্যয়িতা নিয়ে আলোচনা করব। পবিত্র কুরআনে সুরা ফুরকানের ৬৭ নাম্বার আয়াতে মিতব্যয়িতার উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তারা যখন ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না। বরং মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।’

মিতব্যয়ীতা নিয়ে কুরআন একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান প্রকাশ করেছে। ছাত্র জীবনে আমরা অনেক ভাব-সম্প্রসারণ লিখেছি। এসব ভাব-সম্প্রসারণ এর মধ্যে একটি ভাব-সম্প্রসারণ কমন ছিল – ‘যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি, আশু গৃহে তার জ্বলিবে না আর নিশীথে প্রদীপ বাতি’ – এর মানে হলো, কোন ব্যক্তি যদি সুসময়ে অর্থের অপচয় করে, তবে তাকে পস্তাতে হয়। তার জীবনে অভাব-অনটন নেমে আসে। চলার সাধারণ ছন্দ হারিয়ে সে ভয়ঙ্কর দরিদ্রতার শিকার হয়। জীবনে যখন তার দুর্গতি নেমে আসবে, তখন হয়তাে সে তার কৃতকর্মের জন্য অনুশােচনা করবে। কিন্তু এতে তার কোন লাভ হবে না। অপচয় এমনই এক ভয়াবহ ব্যাধি।

একজন মানুষের জীবনে অপচয়ের বহুমুখী প্রভাব কতটা ভয়াবহ যদি আমরা সুসময়ে তা বুঝতাম, তাহলে অপচয় কখনো ফ্যাশনে পরিনত হত না। অপচয় কে আমরা আভিজাত্য ভাবতাম না। আসুন দেখি আমাদের জীবনে এই তথাকথিত আভিজাত্য কত ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।

১.
অপচয়কারী আল্লাহ তায়ালার ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হতে হয়, পবিত্র কুরআনে এ ব্যপারে উল্লেখ রয়েছে সুরা আন আমের ১৪১ নং আয়াতে, ‘নিশ্চয়ই তিনি অপব্যয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ অপচয় এমন কাজ যা আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন না। যারা অপচয় করে আল্লাহ তায়ালার ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হয় যায়। অথচ আমাদের ইহকাল ও পরকালীন জীবনে আল্লাহ তায়ালার ভালবাসা অত্যাবশ্যক।

২.
অপচয় মানুষকে হারাম উপার্জনের দিকে ধাবিত করে। কারণ অপচয় এর কারণে মানুষ তার উপার্জনের সাথে সাংসারিক খরচের সামঞ্জস্যতা কোনোভাবেই রক্ষা করতে পারে না। যার ফলে তার উপার্জনের তুলনায় খরচ বেশি হয়ে যায়। অন্যদিকে সাংসারিক অনেক জরুরি প্রয়োজনও অপূরনীয় থেকে যায়। যা সে তার নিয়মিত উপার্জিত আয় থেকে পূরণ করতে পারে না। এই প্রয়োজনগুলো হালাল উপায়ে পূরণ করতে যখন সে আর পেরে উঠে না, তখনই সেই কৃত্রিম ও অতিরিক্ত চাহিদা তাকে হারামের দিকে টেনে নিয়ে যায়। যা অপচয়ের মূলত কারণেই তৈরি হয়েছে।

৩.
খাদ্যে অপরিমিতির চর্চা শরীরকে রোগব্যাধির কেন্দ্র বানিয়ে তোলে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ আমরা জানি যে, অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে দেহ ভারী হয়ে পড়ে। শিশুরা শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বড়দেরও কাজ করার ক্ষমতা কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের ৮০ শতাংশ রোগব্যাধি খাবারের কারণেই হয়ে থাকে। অপরিমিত খাবারই মানুষকে দিন দিন মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। (বিবিসি)

প্রতিদিন একজন মানুষের কতটুকু শক্তি প্রয়োজন তা নির্ভর করে মূলত বয়স, দেহের উচ্চতা ও দেহের ওজনের ওপর। তবে বেশি শারীরিক পরিশ্রম করলে শক্তির জোগানও বেশি প্রয়োজন। এই বিষয়টি হুবুহু সমর্থন করে কুরআনের চমৎকার এমন একটা আয়াত রয়েছে, ‘তোমরা আহার ও পান করো, আর অপচয় করো না।’ (সুরা: আরাফ, আয়াত : ৩২) আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্যসংক্রান্ত মূলনীতি বর্ণনা করে দিয়েছেন। আমাদেরকে ততটুকু খাবার গ্রহণ করতে বলেছেন। যতটুকু গ্রহণ করলে অপচয় হবে না। এই নির্দেশনা মেনে চললে অলসতা আর বেশিরভাগ রোগব্যাধি থেকেও আমরা মুক্ত থাকব।

৪.
অপচয়কারীর জীবনে শয়তান ভাগ বসায়। যেমন জাবির (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেছেন, এক বিছানা পুরুষের জন্য, অপরটি তার স্ত্রীর জন্য এবং তৃতীয় বিছানা মেহমানের জন্য। আর চতুর্থখানা শয়তানের জন্য। (মুসলিম) অর্থাৎ প্রয়োজন ছাড়া বাসায় যদি একটা বাড়তি বিছানা ও থাকে। তাহলে সেখানে শয়তান আরাম করার সুযোগ পায়। আমার ঘরে শয়তানের প্রভাব থেকে যায়। আর আমাদের পরিবারগুলো হয়ে উঠে রহমত ও বরকতমুক্ত। অনেক উপার্জনের পরেও শান্তির দেখা মিলেনা। যা অপচয়ের আরেকটি বাজে প্রভাব।

৫.
অর্থনৈতিক প্রবল সংকট জীবনের ছায়ার মত লেগে থাকে। যখন টাকা থাকে তখন আমরা কোন প্ল্যান ছাড়াই খরচ করি। একটা সময় এমন হয় যে, খুব প্রয়োজনের সময় আমাদের পকেটে টাকা থাকে না। অনেক সময় গাড়ি ভাড়ার জন্য পাঁচটা টাকাও কারো কাছ থেকে চেয়ে নিতে হয়। অথবা বিপদে পড়েছি সামান্য কিছু টাকা প্রয়োজন, সেটাও আরেকজনের কাছ থেকে ধারদেনা করতে হয়।

এর উল্টোটাও হতে পারে, এর ক্ষতিটা দ্বিমুখী। দেখা গেলো, আমার পরিবার আত্মীয়-স্বজন, যারা একসময় আমার প্রচন্ডরকম বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল, আমি তাদের বিপদে এগিয়ে যেতে পারছি না। কারণ আমি তো অপচয় করে সব খরচ করে বসে আছি। যার ফলে সমস্যাটা লেগেই থাকে, যা আমাকে কখনোই ছেড়ে যায় না। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি পরিমিত ব্যয় করে সে নিঃস্ব হয় না।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৭/৩০৩)
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি অর্থব্যয়ে পরিমিতিবোধের চর্চা করবে, অভাব-অনটন তার নাগাল পাবে না।

৬.
অপচয়ের মাধ্যমে মানুষ শয়তানের ভাই হয়ে উঠে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‌‌‌‌‌’যারা অপব্যয় করে, তারা তো শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি অতি অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা: বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৭) শয়তান মানুষকে যত মন্দ কাজ আছে। সেদিকেই উৎসাহিত করে। স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে শয়তান মানুষকে কৃপণতার প্রতি উৎসাহিত করে। যখন মানুষ সেই ডাকে সায় দেয় না। তখনই শয়তান সুযোগ বুঝে কৌশলে অপচয়ের প্রতি উস্কে দেয়। এভাবেই মানুষ শয়তানের প্ল্যান বাস্তবায়নে সহযোগী বা কৃত্রিম ভাই হয়ে যায়।

অপচয় আমাদেরকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি করে। জীবনের এমন একটা পর্যায়ে আসে। যখন আমাদের সেই উপার্জনের বয়স আর সুযোগ থাকে না। শেষ বয়সে এসে পরিবার-পরিজনের জন্য রেখে যাওয়ার মতো কোন কিছুই আমাদের কাছে থাকে না। তাদের জন্য আমরা কিছুই রেখে যেতে পারি না। যার ফলে এর একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের সন্তানেরা বোধ করতে থাকে। অভিভাবক হিসেবে নিজের মাঝে যেমন স্থায়ী গ্লানিবোধ তৈরি হয়। ঠিক তেমনি সন্তানদের মনেও আমাদের প্রতি অভিমান আর অভিযোগের পাহাড় তৈরি হয়। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের মানুষের করুণার মুখাপেক্ষী রেখে যাওয়ার চেয়ে তাদের সচ্ছল রেখে যাওয়া উত্তম।’ (বুখারি : ১/৪৩৫; মুসলিম : ৩/১২৫১) তাই আমাদের এ খরচের হাত খাটো করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী খরচ করে স্বনির্ভর হতে হবে।

অপচয় আমাদেরকে আল্লাহ তায়ালার আদালতের কাঠগড়ায় আসামি হিসেবে দাঁড় করাবেন। আসুন মনযোগ দিয়ে নিচের হাদিসটি পড়ি। হযরত ইবনে মাসউদ রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, (হাশরের দিন) মানুষের পা একবিন্দু নড়তে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার নিকট এই পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা না হবে। এক. নিজের জীবনকাল সে কোন কাজে অতিবাহিত করেছে? দুই. যৌবনেরে শক্তি সামর্থ্য কোথায় ব্যয় করেছে? তিন. ধন সম্পদ কোথা হতে উপার্জন করেছে? চার. অর্জিত ধন সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছে? পাঁচ. এবং (দীনের) যতটুকু ইলম অর্জন করেছে সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে? (জামে তিরমিযী)

প্রশ্নগুলি খেয়াল করে আবার পড়ুন। যৌবন নিয়ে একটা প্রশ্ন হবে। ইলম নিয়েও একটা প্রশ্ন হবে। হায়াত নিয়েও একটা প্রশ্ন হবে। কিন্তু উপার্জন নিয়ে প্রশ্ন হবে দুটো আয় ও ব্যয়। কত ভয়াবহ ব্যাপার। অপচয় আল্লাহর আদালতে এভাবেই আমাকে আসামি করে তুলবে।

মিতব্যয়িতা আর কার্পণ্যতার মাঝে পার্থক্য কী? মিতব্যয়িতা হলো, নিজের প্রয়োজনমতো খরচ করা কিন্তু অপ্রয়োজনে সম্পদ নষ্ট না করা। আর কার্পণ্য হলো, প্রয়োজন সত্বেও খরচ না করা। পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি (কৃপণতাবশে) নিজের হাত ঘাড়ের সঙ্গে বেঁধে রেখে একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না, আবার (অপব্যয়ী হয়ে) একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না, তাহলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।’ (বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৯)

আরও পড়ুন: নিরাপদ সড়ক বিনির্মানে ইসলাম

দুনিয়া ও আখেরাতের প্রতিটি মুহূর্তে সুখ ও সমৃদ্ধি চাইলে মিতব্যয়ী হওয়ার বিকল্প নেই। তাই আসুন বিলাসিতার নামে অপচয় রোধ করে শক্তিশালী অর্থনৈতিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলি। পাশাপাশি হাশরের ময়দানের প্রশ্নপত্রের সঠিক উত্তর দিয়ে জান্নাতকে নিশ্চিত করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন, আমীন।

লেখক: খতীব, আল্লামা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.) জামে মসজিদ, চট্টগ্রাম

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com