অ্যান কারসন: সাহিত্যে নোবেলজয়ী এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর

অ্যান কারসন: সাহিত্যে নোবেলজয়ী এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : আজ, ৮ অক্টোবর ২০২৬—সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন (Anne Carson)। সুইডিশ একাডেমি তাঁকে পুরস্কার দিয়েছে তাঁর “সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের” জন্য—যেখানে ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মধ্য দিয়ে তিনি সমকালীন সাহিত্যের জন্য নির্মাণ করেছেন নতুন নতুন রূপ।

১৯৫০ সালে টরন্টোতে জন্ম নেওয়া অ্যান কারসন মূলত কবি হলেও তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় কোনো একক ঘরানায় আবদ্ধ নয়। কবিতা, গদ্য, প্রবন্ধ, অনুবাদ, পুরাণ, দর্শন ও ধ্রুপদি গ্রিক সাহিত্যের বিচিত্র উপাদান তাঁর সৃষ্টিতে এমনভাবে মিলিত হয়েছে যে তাঁর রচনাকে প্রচলিত সাহিত্যিক শ্রেণিবিভাগে সহজে স্থাপন করা কঠিন। প্রাচীন গ্রিক ভাষা ও সাহিত্যের পণ্ডিত হিসেবে তাঁর দীর্ঘ সাধনা তাঁর কবিসত্তার সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে শব্দের ব্যুৎপত্তি, পুরাণের ক্ষুদ্র কোনো চরিত্র কিংবা বহু শতাব্দী আগের কোনো কবিতার খণ্ডাংশও তাঁর হাতে সমকালীন মানুষের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, শোক ও অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়।

কারসনের উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে Eros the Bittersweet, Autobiography of Red, Men in the Off Hours, Decreation, Nox এবং Glass, Irony and God। তাঁর বহুল আলোচিত The Glass Essay—যা Glass, Irony and God গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত—ব্যক্তিগত প্রেম-বিরহ ও আত্মঅনুসন্ধানের সঙ্গে এমিলি ব্রন্টের জীবন, কবিতা এবং Wuthering Heights-এর এক গভীর অন্তঃসংলাপ নির্মাণ করে।

কারসনের সাহিত্য পাঠ করলে বোঝা যায়, তাঁর কাছে কবিতা কেবল অনুভূতির অলংকৃত প্রকাশ নয়; বরং তা চিন্তারও একটি পদ্ধতি। প্রেম তাঁকে নিয়ে যায় আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতির কাছে, বিচ্ছেদ পৌঁছে দেয় স্মৃতি ও সময়ের রহস্যে, আর নিঃসঙ্গতা খুলে দেয় আত্মপরিচয় ও বিশ্বাসের গভীর প্রশ্ন। এই কারণেই তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কখনো নিছক ব্যক্তিগত থাকে না—তা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে মানুষের সার্বজনীন অভিজ্ঞতার ভাষা।

এই নোবেলজয়ী কবিরই দীর্ঘ কবিতা The Glass Essay এবার পাথেয়২৪-এর পাঠকদের জন্য বাংলায় তুলে ধরা হলো। প্রেম, বিচ্ছেদ, স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, ক্রোধ ও আত্মার অনুসন্ধানে নির্মিত এই দীর্ঘ কাব্যিক যাত্রায় অ্যান কারসন একই সঙ্গে ফিরে তাকিয়েছেন নিজের ভেতরে এবং এমিলি ব্রন্টের সাহিত্যিক জগতে।

পাঠকের জন্য রইল অ্যান কারসনের The Glass Essay

The Glass Essay এর অনুবাদঃ

কাচের প্রবন্ধ

  • অ্যান কারসন
  • ভাষান্তরঃ আব্দুর  রহমান রাশেদ

স্বপ্নের ভেতর শুনি—
টুকটুক,
কী যেন ছোট ছোট শব্দ।

রাত তার রুপালি কল খুলে
ধীরে ধীরে ঝরিয়ে দেয়
আমার পিঠের ওপর।

ভোর চারটায় ঘুম ভেঙে যায়।
ভাবি—

সেই মানুষটির কথা,
যে সেপ্টেম্বরেই চলে গিয়েছিল।

তার নাম—ল।

বাথরুমের আয়নায়
আমার মুখের ওপর সাদা সাদা রেখা।

মুখ ধুয়ে নিই,
ফিরে আসি বিছানায়।

আগামীকাল
মায়ের কাছে যাব।

সে

উত্তরের এক মুরভূমিতে তার বাস।

একা।

সেখানে বসন্ত
ছুরির ফলার মতো
ধীরে ধীরে খুলে যায়।

সারাদিন ট্রেনে চড়ে
আমি মায়ের কাছে যাই।

সঙ্গে অনেক বই—

কিছু মায়ের জন্য,
কিছু আমার জন্য।

তার মধ্যে আছে
এমিলি ব্রন্টের সমগ্র রচনা।

এই লেখিকাই আমার সবচেয়ে প্রিয়।

আবার—
আমার সবচেয়ে বড় ভয়ও।

সেই ভয়টির মুখোমুখি হতেই
আমি তাকে সঙ্গে করে নিয়ে চলেছি।

মায়ের কাছে এলেই আমার মনে হয়,
আমি যেন ধীরে ধীরে
এমিলি ব্রন্টে হয়ে উঠছি—

আমার চারদিকে
নিঃসঙ্গ জীবন
একটি মুরভূমির মতো বিস্তৃত,

আমার বেখাপ্পা শরীর
কাদামাখা সমতল পেরিয়ে
ভারী পায়ে এগিয়ে যায়,

মুখে রূপান্তরের
এক অদ্ভুত আভা—

কিন্তু রান্নাঘরের দরজা পেরোলেই
সে আভা নিভে যায়।

এমিলি,
বলো তো—

আমাদের কী মাংস চাই?

তিন

রান্নাঘরের টেবিলে
তিনজন নীরব নারী।

মায়ের রান্নাঘর অন্ধকার, ছোট।

কিন্তু জানালার ওপারে
মুরভূমি পড়ে আছে—

বরফে জমে,
স্থির,
প্রায় নিঃশ্বাসহীন।

চোখ যতদূর যায়
সমতল সাদা বিস্তার,
শেষে গিয়ে মিশেছে
একটি কঠিন, আলোহীন আকাশে।

মা আর আমি
সাবধানে লেটুস চিবোই।

দেয়ালের ঘড়ি
একটানা কর্কশ গুঞ্জন তোলে—

প্রতি মিনিটে
বারোটার ওপর দিয়ে
একবার হোঁচট খায়।

চিনির পাত্রের পাশে
এমিলির বই খুলে রেখেছি
২১৬ নম্বর পৃষ্ঠায়।

কিন্তু বই পড়ছি না।

চোখের আড়ালে
মাকে দেখছি।

ভেতর থেকে
হাজার প্রশ্ন এসে
আমার চোখে ধাক্কা খায়।

মা তার লেটুসের দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি ফিরে যাই
২১৭ নম্বর পৃষ্ঠায়।

“রান্নাঘর পেরিয়ে পালাতে গিয়ে
হারেটনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছিলাম—

দরজার পাশে একটি চেয়ারের পিঠে
সে একঝাঁক কুকুরছানা
ঝুলিয়ে রেখেছিল…”

মনে হয়
আমাদের সবাইকে
কোনো এক স্বচ্ছ কাচের বায়ুমণ্ডলে
নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মাঝে মাঝে
কোনো একটি কথা
কাচ ভেদ করে
আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়—

পেছনের জমির কর।

এবারের বাঙ্গি ভালো নয়।

বাঙ্গিরও এখনও সময় হয়নি।

শহরের হেয়ারড্রেসার
ঈশ্বরকে খুঁজে পেয়েছে।

প্রতি মঙ্গলবার
দোকান বন্ধ রাখে।

আবার ইঁদুর ঢুকেছে
চায়ের কাপড়ের ড্রয়ারে।

ছোট ছোট দানা।

ন্যাপকিনের কোণগুলোও যদি
কামড়ে খেত তারা,
তাহলে বুঝত—
আজকাল কাগজের ন্যাপকিনের দাম কত!

আজ রাতে বৃষ্টি।

কালও বৃষ্টি।

ফিলিপাইনের সেই আগ্নেয়গিরিটা
আবার শুরু করেছে।

নামটা কী যেন?

অ্যান্ডারসন মারা গেছে—

না, শার্লি নয়,

ওই অপেরা-গায়িকা।

ক্যান্সার।

তোমার খাবারের পাশে রাখা জিনিসটা
খাচ্ছ না কেন?

পিমেন্টো পছন্দ নয়?

জানালার বাইরে
মরা পাতাগুলো
সমতল জমির ওপর
টিকটিক করে ছুটে যায়।

পাইনগাছের ময়লায়
দাগ কাটা বরফ
শেষ আলোটুকু ধরে পড়ে আছে।

মুরভূমির মাঝখানে
মাটি হঠাৎ নিচু হয়ে গেছে—

একটি অবনতির ভেতর
বরফ আলগা হতে শুরু করেছে।

কালো জল
ধীরে ধীরে উঠে আসছে—

রাগের মতো
ফেনিয়ে, পাক খেয়ে।

হঠাৎ মা বলে ওঠে—

“ওই সাইকোথেরাপি
তোমার খুব একটা উপকার করছে না, তাই না?”

“তুমি এখনও ওকে ভুলতে পারোনি।”

আমার মা
সবকিছুকে একটি বাক্যে
শেষ করে দিতে জানে।

ল-কে সে কখনো পছন্দ করেনি।

তবে আমার জীবনে
একজন পুরুষ থাকুক—

আমি যেন তার সঙ্গে
জীবনটা এগিয়ে নিয়ে যাই—

এই ধারণাটি
তার ভালো লাগত।

ল-কে দেখার পর
সে শুধু বলেছিল—

**“সে নেয়,
আর তুমি দাও।

আশা করি
এভাবেই তোমাদের চলবে।”**

তখন
‘দেওয়া’ আর ‘নেওয়া’
আমার কাছে ছিল
শুধু দুটি শব্দ।

এর আগে
আমি কখনো প্রেমে পড়িনি।

প্রেম যেন—

ঢালু পথে
নিজের ভারেই গড়িয়ে চলা
একটি চাকা।

কিন্তু আজ ভোরে,

মা যখন ঘুমিয়ে,

আমি নিচে বসে পড়ছিলাম
Wuthering Heights—

সেই অংশ,

যেখানে ঝড়ের রাতে
হিথক্লিফ জানালার শিক আঁকড়ে
তার মৃত প্রিয়জনের ভূতকে
কাঁদতে কাঁদতে বলে—

“এসো!
এসো!”

আমি তখন
কার্পেটের ওপর হাঁটু গেড়ে
কাঁদছিলাম।

এমিলি—

কুকুরছানা ঝোলাতে
তুমি জানো।

“এটা অ্যাসপিরিন খাওয়ার মতো নয়,”
আমি দুর্বল গলায় বলি।

“ড. হ বলেছে,
শোক একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া।”

মা ভ্রু কুঁচকে তাকায়।

“অতীত ঘেঁটে
কী লাভ?”

আমি দুহাত মেলে ধরি—

“ওহ—

আমি জয়ী হই!”

তার চোখের দিকে তাকাই।

সে হেসে ওঠে।

“হ্যাঁ,
তুমি জয়ী হও।”

Related Articles