আন নাযারাত || পর্ব-৬

আন নাযারাত || পর্ব-৬

ভূমিকা

  • মুফতি আব্দুস সালাম ইবন হাশিম

গত পর্বের পর

আমার ‘আন-নাযারাত’-এর পাতায় পাতায়, এখানে-সেখানে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা কথাগুলো আমার হৃদয়ের গভীরে অনুভূত সত্যেরই স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। হৃদয়ের নিভৃত কোণে যে অনুভূতিগুলো নীরবে জন্ম নিয়েছে, যে ভাবনাগুলো মনের গভীরে শিকড় গেড়েছে, আমার কলমের নিব বেয়ে সেগুলোই একদিন ঝরে পড়েছে অজান্তে, অবলীলায়। সেখানে নেই মানুষের কাছে নিজেকে আড়াল করার কোনো প্রয়াস, নেই নিজের সত্যকে নিজের কাছেই অস্বীকার করার কোনো প্রবণতা। আমি মানুষের কাছে যেমন সত্য, নিজের কাছেও তেমনি সত্য থাকতে চেয়েছি।

আমি যদি মানুষকে সন্তুষ্ট করাকেই আমার লেখার উদ্দেশ্য করে নিতাম, তবে এমন কথাই লিখতাম, যা তাদের হৃদয়ে আনন্দ জাগায়, তাদের প্রবৃত্তিকে তৃপ্ত করে, তাদের মনকে প্রশান্ত করে। কিন্তু আমি জানি, মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য সত্যকে বিসর্জন না দিয়ে, তাদের অপছন্দের কথাগুলোও নির্ভয়ে প্রকাশ করার মধ্য দিয়েই হয়তো তাদের হৃদয়ে অর্জন করতে পারতাম এমন এক চিরস্থায়ী আসন, যা কালের প্রবাহেও মুছে যেত না, বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যেত না।

আমি যদি তা-ই চাইতাম, তবে সমাজের বিশেষ শ্রেণির মানুষের হৃদয় জয় করার জন্য—যদি সেই বিশেষ শ্রেণিই হতো আমার অভীষ্ট—তিনটি কথাই যথেষ্ট ছিল: ধর্মকে বিদ্রূপ করা, প্রাচ্যের ইতিহাসকে তুচ্ছজ্ঞান করা এবং নারীর বেপর্দা চলাফেরা ও অনাবৃত বিচরণকে সমর্থন করা। আর যদি আমার লক্ষ্য হতো সাধারণ মানুষ, তবে তাদের মন জয় করার জন্যও ছিল আরও তিনটি সহজ উপায়: কাফিরদের গালমন্দ করা, মাজার-সমাধির প্রতি উপাসনামূলক আচরণ করা এবং অতীতের প্রতিটি প্রথাকে অন্ধভাবে আঁকড়ে থাকা।

কিন্তু আমি সে পথ বেছে নিইনি। মানুষের প্রশংসা কুড়ানোর লোভে নিজের বিবেককে বিকিয়ে দিতে চাইনি; তাদের ভালোবাসা পাওয়ার আশায় নিজের অন্তরের সত্যকে নির্বাক করে রাখিনি। কারণ আমার কাছে মানুষের সাময়িক সন্তুষ্টির চেয়ে নিজের আত্মার কাছে সৎ থাকা অনেক বেশি মূল্যবান।

আমার বিবেচনায়, যে লেখকের নিজের বলার মতো কিছু নেই, যিনি কেবল মানুষের মুখ থেকে নিঃসৃত কথাগুলোই লিপিবদ্ধ করেন, তিনি প্রকৃত লেখক নন—তিনি নিছক কারিগর। তিনি নিজের হৃদয়ের ভাষা উচ্চারণ করেন না; অন্যের কণ্ঠস্বরই কেবল প্রতিধ্বনিত করেন। তিনি স্রষ্টা নন, অনুবাদক; তাঁর কলমে নিজের আত্মার কোনো পরিচয় মেলে না, মেলে কেবল অন্যের ভাবনার অনুলিপি।

স্বর্ণকার ও মুক্তা ছিদ্রকারী কারিগরের সঙ্গে তাঁর মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। উভয়েই এমন বস্তুকে সুশোভিত করেন, যার মালিক তাঁরা নন; এমন উপাদান নিয়ে কারুকাজ করেন, যার সত্তা কিংবা স্বত্বের সঙ্গে তাঁদের নিজস্ব কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁদের হাতের নিপুণতায় বস্তু সুন্দর হয়ে ওঠে, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মধ্যে তাঁদের নিজস্ব আত্মার কতটুকু পরিচয় থাকে?

অথচ একজন সাহিত্যিক তাঁর সাহিত্যসাধনা থেকে যে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ অর্জন করতে পারেন, তা হলো—এই নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সময় এমন একটি পৃষ্ঠা রেখে যাওয়া, যেখানে পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ—তাঁর সন্তান-সন্ততি, অনুরাগী ও স্বজনেরা—তাঁর জীবন-ইতিহাস পাঠ করতে গিয়ে খুঁজে পাবে তাঁর আত্মার প্রতিচ্ছবি, তাঁর আশা-আকাঙ্ক্ষার উত্থান-পতন, তাঁর হৃদয়ের গোপন বেদনা এবং তাঁর স্বপ্নের বিচরণভূমি। তাঁর রচনার পাতায় পাতায় তারা যেন দেখতে পায় একজন জীবন্ত মানুষকে—যিনি হেসেছেন, কেঁদেছেন, ভালোবেসেছেন, বেদনাহত হয়েছেন; যাঁর হৃদয়ে কখনো আশার প্রদীপ জ্বলেছে, কখনো হতাশার অন্ধকার নেমে এসেছে; যিনি জীবনের কাছে কখনো পরাজিত হয়েছেন, আবার কখনো নিজের বিশ্বাসের শক্তিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন।

কিন্তু জীবনের সমস্ত সাধনা যদি এই হয় যে, তিনি কেবল একটি দর্পণ হয়ে থাকবেন, যার বুকে প্রতিনিয়ত নানা রূপের প্রতিবিম্ব এসে পড়ে; কিংবা এমন একটি পৃষ্ঠায় পরিণত হবেন, যার গায়ে কলমের নিবগুলো কেবল নিজেদের কালি মুছে নেয়, তবে তাঁর এই ক্ষতি হবে অপরিমেয়। কারণ তখন তাঁর লেখায় থাকবে অনেক মানুষের মুখচ্ছবি, কিন্তু থাকবে না তাঁর নিজের মুখ; থাকবে বহু মানুষের কণ্ঠস্বর, কিন্তু শোনা যাবে না তাঁর আত্মার কোনো উচ্চারণ। তিনি লিখে যাবেন, অথচ তাঁর লেখার মধ্যে তিনি নিজেই অনুপস্থিত থাকবেন।

মানুষ ধন-সম্পদ অর্জন করে, সম্মান-প্রতিপত্তি সঞ্চয় করে, নিজের নামকে মানুষের মুখে মুখে ফিরিয়ে বেড়াতে দেখে আনন্দিত হয়। কিন্তু এসবের কোনোটিই সেই শূন্যতার ক্ষতিপূরণ করতে পারে না, যা একজন মানুষ নিজের আত্মাকে বিসর্জন দিয়ে অর্জন করে। বাহ্যিক প্রাপ্তির পাহাড়ও অন্তরের সেই শূন্যতাকে পূর্ণ করতে পারে না।

ইতিহাস এতটা উদার নয় যে, প্রত্যেক সাহিত্যিকের গৌরবকে সে তার বক্ষের গভীরে স্থান দেবে। তার পাতায় পাতায় কেবল সেইসব সাহিত্যিকের মহিমাই সংরক্ষিত থাকে, যাঁরা নিজেদের আত্মাকে তাঁদের গ্রন্থের পাতায় অর্পণ করে যান; যাঁরা তাঁদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ, চিন্তার দীপ্তি, অনুভূতির কোমলতা ও বিশ্বাসের দৃঢ়তাকে শব্দের শরীরে ধারণ করিয়ে যান। তারপর তাঁরা একদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নেন; কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া পাতাগুলো রয়ে যায়—শুভ্র, নির্মল ও জীবন্ত। তাঁদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যায়, কিন্তু তাঁদের রচনা কথা বলে; তাঁদের চোখের আলো নিভে যায়, কিন্তু তাঁদের চিন্তার দীপ্তি পরবর্তী প্রজন্মের হৃদয়কে আলোকিত করে।

লেখকের জীবন বেঁচে থাকে তাঁর লেখার মধ্যে; আর তাঁর লেখার জীবন নির্ভর করে পাঠকের হৃদয়ে তার অস্তিত্বের ওপর। যে লেখা পাঠকের হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারে, যে লেখা তার অন্তরের সুপ্ত অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে পারে, যে লেখা তাকে নিজের জীবনের দিকে নতুন করে তাকাতে শেখায়—সেই লেখাই মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে।

কিন্তু যে লেখক সম্পর্কে অচিরেই মানুষ জানতে পারবে যে, তিনি নিজের সম্বন্ধে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেন, এমনকি নিজের কাছেও নিজের সত্যকে গোপন করেন; তিনি এমন এক কপট, চঞ্চল ও দোদুল্যমান চরিত্রের অধিকারী, যিনি আজ মানুষকে যে কাজের নির্দেশ দেন, আগামীকাল সে কাজ থেকেই তাদের নিষেধ করেন; এক মুহূর্তে যা বিশ্বাস করেন, অন্য মুহূর্তে তা-ই অস্বীকার করেন; নিজে অশ্রুহীন থেকেও অন্যের চোখে অশ্রু ঝরান, নিজের হৃদয়ে করুণার স্পর্শ না পেয়েও অন্যের কাছে করুণা ভিক্ষা করেন; নিজে নিশ্চল থেকেও মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তোলেন, নিজে নিরাপদে থেকেও অন্যের মনে উত্তেজনার দাবানল জ্বালিয়ে দেন—তাঁর লেখার জীবন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

এমন লেখকের প্রতি মানুষের মনে ধীরে ধীরে সন্দেহের ছায়া ঘনিয়ে আসে। একসময় যে কথাগুলো তাদের হৃদয়কে আলোড়িত করত, সেগুলোর প্রতিই তারা আস্থা হারাতে শুরু করে। তারা ভাবতে থাকে, এই মানুষটি আসলে কে? তাঁর কথার আড়ালে কী লুকিয়ে আছে? তাঁর অনুভূতি কি সত্যিই তাঁর নিজের, নাকি পাঠকের হৃদয় জয় করার জন্য সাজানো কোনো অভিনয়মাত্র? তাঁর চিন্তার উৎস কোথায়, তাঁর বক্তব্যের গন্তব্য কোন দিকে—কিছুই তারা আর নির্ভরযোগ্য বলে মনে করতে পারে না।

এভাবে সন্দেহের পর্দা ধীরে ধীরে লেখক ও পাঠকের মাঝখানে নেমে আসে। যে হৃদয় একদিন তাঁর লেখার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল, সেই হৃদয়ই একদিন তাঁর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অবশেষে তারা তাঁর চরিত্রের দুই সম্ভাব্য রূপের মধ্যে নিকৃষ্টতর রূপটিকেই সত্য বলে ধরে নেয়। তারপর একদিন লেখক ও পাঠকের মধ্যকার শেষ বন্ধনটুকুও ছিন্ন হয়ে যায়। যে সম্পর্ক একদিন অনুভূতির বন্ধনে গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে পড়ে অবিশ্বাসের আঘাতে।

সাহিত্যিক অভিব্যক্তি কোনো পণ্য নয়, যা নিয়ে ব্যবসায়ীরা এক বাজার থেকে অন্য বাজারে, এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরে বেড়ায়। তা মানুষের আত্মার এক স্বাভাবিক আন্দোলন; হৃদয়ের গভীরে অনুভূতির যে ঢেউ ওঠে, তারই অনিবার্য বহিঃপ্রকাশ। কোনো কৃত্রিম আয়োজন, অনাবশ্যক শ্রম কিংবা আরোপিত প্রয়াস ছাড়াই তা উৎসারিত হয়—যেমন সূর্য থেকে বিচ্ছুরিত হয় আলো, শব্দ থেকে জন্ম নেয় প্রতিধ্বনি, আর ফুলের বুক চিরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সৌরভ।

ফুল কি কখনো সুবাস ছড়ানোর জন্য আলাদা করে কোনো আয়োজন করে? সূর্য কি আলো দেওয়ার আগে নিজের আলোকচ্ছটার হিসাব কষে? হৃদয়ের গভীরে যে সত্য অনুভূতি জেগে ওঠে, তারও প্রকাশ এমনই স্বতঃস্ফূর্ত। সে নিজেকে প্রকাশ করার জন্য ব্যাকুল হয়; আর কলম হয়ে ওঠে তার প্রকাশের মাধ্যম।

সাহিত্যিকের অন্তরে তা এমন এক দীপ্তিমান আলোকরশ্মি হয়ে জ্বলে ওঠে, যেমন প্রদীপের আলো তার কাচের আবরণে উদ্ভাসিত হয়। তা এমন এক অফুরন্ত প্রস্রবণ, যা তাঁর বক্ষের গভীরে উৎসারিত হয়ে উচ্ছ্বসিত ধারায় প্রবাহিত হয় তাঁর কলমের নিব বেয়ে। কখনো তা আনন্দের ভাষা হয়ে বেরিয়ে আসে, কখনো বেদনার দীর্ঘশ্বাস হয়ে; কখনো তা প্রতিবাদের আগুন জ্বালায়, কখনো মমতার কোমল পরশে হৃদয়কে সিক্ত করে। কিন্তু তার প্রতিটি প্রকাশের মূলে থাকে মানুষের অন্তরাত্মার এক গভীর স্পন্দন।

এই শক্তি কেবল জ্ঞান, ভাষা, মুখস্থবিদ্যা, পঠনপাঠন, ব্যাকরণের নিয়ম কিংবা অলংকারশাস্ত্রের বিধিবিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এসবের প্রয়োজন আছে, মূল্যও আছে; কিন্তু এগুলোই সাহিত্যের প্রাণ নয়। এগুলো লেখকের উপকরণ হতে পারে, তাঁর প্রতিভার সহায়ক হতে পারে; কিন্তু যে প্রাণের স্পর্শে শব্দ জীবন্ত হয়ে ওঠে, যে অনুভূতির শক্তিতে বাক্য পাঠকের হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে, তার উৎস আরও গভীরে—মানুষের আত্মার নিভৃততম প্রদেশে।

যদি সাহিত্যিক প্রতিভার উৎস কেবল এসবের মধ্যেই নিহিত থাকত, তবে সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক হতেন সেই ব্যক্তি, যাঁর জ্ঞানের ভাণ্ডার সবচেয়ে সমৃদ্ধ; শ্রেষ্ঠ কবি হতেন সেই ব্যক্তি, যিনি ভাষার নিয়মকানুনে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী, ভাষার যাবতীয় উপাদান সর্বাধিক সংগ্রহ করেছেন কিংবা বিশুদ্ধ ও উৎকৃষ্ট বাণীর বিপুল ভাণ্ডার নিজের স্মৃতিতে ধারণ করেছেন।

কিন্তু বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। জ্ঞানের প্রাচুর্য সবসময় হৃদয়ের গভীরতা এনে দেয় না; ভাষার ওপর অসাধারণ দখল থাকলেই অনুভূতির জগতে অসাধারণত্ব অর্জিত হয় না। শব্দের অর্থ জানা আর শব্দের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করা এক কথা নয়; ব্যাকরণের নিয়ম আয়ত্ত করা আর মানুষের হৃদয়ের গোপন ভাষা বুঝতে পারা এক বিষয় নয়।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথাই ধরা যাক। শরিয়ত, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা এবং অন্যান্য শাস্ত্রের যেসব সুবিশাল গ্রন্থ আজও আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে, সেগুলোর অধিকাংশ রচয়িতাই ছিলেন প্রাজ্ঞ পণ্ডিত। তাঁদের জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য নিয়ে কারও সংশয়ের অবকাশ নেই। যুগের পর যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে, শতাব্দীর পর শতাব্দী অতীতের গর্ভে বিলীন হয়েছে; তবু তাঁদের রচিত গ্রন্থরাজি আজও আমাদের সামনে বিদ্যমান। অথচ তাঁদের অনেক রচনার মর্ম অনুধাবন করার সামর্থ্য আজও আমাদের অধিকাংশের নেই।

তাঁরা জ্ঞানের বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ করে গেছেন; তাঁদের চিন্তার গভীরতা ও গবেষণার ব্যাপ্তি আজও আমাদের বিস্মিত করে। কিন্তু জ্ঞানের সেই বিপুল ঐশ্বর্যই যে সাহিত্যিক প্রতিভার নিশ্চয়তা নয়, তা তাঁদের রচনার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। কারণ জ্ঞান মানুষের বুদ্ধিকে সমৃদ্ধ করে, আর সাহিত্যিক প্রতিভা সেই জ্ঞান ও অনুভূতিকে এমন এক ভাষা দেয়, যা হৃদয় থেকে হৃদয়ে পৌঁছে যায়।

এবার মুখস্থবিদ্যার দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। কুরআনুল কারিমের বিপুলতম অংশ যাঁদের স্মৃতিতে সংরক্ষিত, তাঁরা হলেন ক্বারিগণ; হাদিসের বিশাল ভাণ্ডার যাঁদের স্মৃতির গভীরে সঞ্চিত, তাঁরা হলেন মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ। অথচ তাঁদের তুলনায় সাহিত্যের সঙ্গে তাঁদের অনেকের পরিচয় সীমিত; সাহিত্যিক অভিব্যক্তির জগতে তাঁদের অবস্থানও অনেক সময় দূরবর্তী।

স্মৃতির বিশালতা নিঃসন্দেহে এক মহৎ সম্পদ; কিন্তু স্মৃতিতে অগণিত শব্দ ধারণ করা আর সেই শব্দগুলোকে নিজের অনুভূতির আলোয় নতুন প্রাণ দান করা এক নয়। জ্ঞানকে মনে ধারণ করা যায়, কিন্তু সাহিত্যের প্রাণকে জাগিয়ে তুলতে হয় হৃদয়ের গভীর অনুভূতি দিয়ে।

ভাষার কথাই বা কী বলব?

প্রাচীন ও আধুনিক যুগের ভাষাবিদ, ভাষার বর্ণনাকারী ও সংরক্ষক, ভাষার সংকলন ও গবেষণায় নিবেদিতপ্রাণ পণ্ডিত এবং ব্যাকরণ ও ভাষাশাস্ত্রের নিয়মাবলি অধ্যয়নে যাঁরা জীবন অতিবাহিত করেছেন—তাঁদের মধ্যে এমন কতজনের নাম আমরা জানি, যাঁরা প্রবন্ধ রচনায় অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন, কবিতা রচনায় অনন্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন কিংবা নিজেদের বিশেষ অধ্যয়নক্ষেত্রের বাইরেও কলমের শক্তিমত্তায় স্বাতন্ত্র্য অর্জন করেছেন?

ভাষাশাস্ত্রের এই দুই অঙ্গ—কবিতা রচনা ও গদ্যসাহিত্য—কোনোটিতেই তাঁদের অধিকাংশের উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের কথা আমাদের জানা নেই।

ইমাম খলিল ইবনে আহমদকে যখন কবিতা রচনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হতো, তখন তিনি বলতেন, “উৎকৃষ্ট কবিতা যেন আমার কাছে আসতে অস্বীকার করে, আর নিকৃষ্ট কবিতাকে আমিই প্রত্যাখ্যান করি।”

কথাটির মধ্যে যেন এক গভীর সত্যের আভাস রয়েছে। ভাষার নিয়ম জানা যায়, শব্দের ভাণ্ডার আয়ত্ত করা যায়, ছন্দের হিসাব শেখা যায়; কিন্তু কবিতার সেই অনির্বচনীয় সৌন্দর্য, যা মানুষের হৃদয়কে এক মুহূর্তে আলোড়িত করে, তা কেবল নিয়মের অনুশীলনে অর্জন করা যায় না।

আসওয়াঈ আরবি ভাষার এক-তৃতীয়াংশ মুখস্থ রেখেছিলেন; আবু যায়দ আল-আনসারি মুখস্থ রেখেছিলেন তার অর্ধেক; আর আবু মালিক আল-আরাবি আয়ত্ত করেছিলেন ভাষার সমগ্র ভাণ্ডার। একই অবস্থা ছিল নাদর ইবনে শুমাইল, আবু উবাইদা, ইবনে দুরাইদ, আল-আযহারি, আস-সাগানি, ইবনে ফারিস, আন-নিহায়া গ্রন্থের প্রণেতা ইবনে আল-আসির, আল-জাওহারি, আল-ফিরুজাবাদি এবং তাঁদের মতো অন্যান্য ভাষাবিদ ও ব্যাকরণবিদের।

তাঁরা ছিলেন ভাষার অতন্দ্র প্রহরী, শব্দের ভাণ্ডার-অনুসন্ধানী, ব্যাকরণের নিয়ম ও ভাষার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রহস্যের নিবিষ্ট সাধক। অথচ তাঁদের মধ্যে কতজনের নাম আমরা জানি, যাঁরা কবিতা কিংবা গদ্যসাহিত্যের অঙ্গনে অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন? তাঁদের ভাষাগত পাণ্ডিত্য ছিল অপরিসীম; কিন্তু সেই পাণ্ডিত্য যে স্বতঃস্ফূর্ত সাহিত্যিক প্রতিভার নিশ্চয়তা দেয় না, তাঁদের জীবন ও সাধনাই যেন তার প্রমাণ।

আবুল আব্বাস আল-মুবাররাদ তাঁর কোনো এক আলোচনায় বলেছিলেন—

“নিজের পরিচয় দিতে আমার প্রয়োজন হয় না। কারণ মানুষ আমাকে এমনভাবে চেনে যে, পৃথিবীর দুই প্রান্তের কোনো মানুষের মনে কোনো জটিল সমস্যা উদয় হলে, সে তা নিয়ে আমার কাছে আসে এবং আমাকে তার সমাধানের যোগ্য মনে করে।

আমি একই সঙ্গে জ্ঞানী, শিক্ষার্থী, মুখস্থকারী ও অধ্যয়নশীল। কবিতা, ব্যাকরণ, গদ্যভাষণ, বক্তৃতা কিংবা পত্রসাহিত্যের এমন কোনো জটিল বিষয় নেই, যা আমার অজানা।

কিন্তু কখনো কখনো এমনও হয় যে, কোনো ভুলের জন্য আমাকে ক্ষমা চাইতে হয় কিংবা কারও কাছে কোনো প্রয়োজনের কথা পেশ করতে হয়। তখন যে কথাটি প্রকাশ করতে চাই, সেটিকেই মনের সামনে স্থির করে রাখি; অথচ বিস্ময়ের বিষয়, হাত কিংবা জিহ্বা—কোনোটির মাধ্যমেই তা যথাযথভাবে প্রকাশ করার পথ খুঁজে পাই না।

একবার আমার কাছে সংবাদ পৌঁছাল যে, উবায়দুল্লাহ ইবনে সুলাইমান আমার প্রশংসা করেছেন। তখন আমি তাঁকে একটি পত্র লিখতে চাইলাম, যাতে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি এবং নিজের কিছু প্রয়োজনের কথাও জানাতে পারি।

কিন্তু একটি দিন সম্পূর্ণ চেষ্টা করেও এমন কোনো পত্র রচনা করতে পারলাম না, যা আমার নিজের কাছেই সন্তোষজনক বলে মনে হয়।

আমি যখনই মনের কথাগুলো স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে চাইতাম, তখনই আমার জিহ্বা যেন অন্য কোনো দিকে মোড় নিত; যে কথা বলতে চাই, তা আর বলা হয়ে উঠত না।”

একটু ভেবে দেখুন, কী বিস্ময়কর এই মানবমনের রহস্য! যিনি জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডারের অধিকারী, যাঁর সামনে কবিতা, ব্যাকরণ, গদ্য, বক্তৃতা ও পত্রসাহিত্যের কোনো জটিলতাই অজানা নয়, তিনিই নিজের হৃদয়ের একটি সামান্য অনুভূতিকে যথাযথ ভাষায় প্রকাশ করতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। যে মানুষ অন্যের জটিল সমস্যার সমাধান দিতে পারেন, নিজের মনের সহজ কথাটুকু প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁরই কলম থমকে যায়।

তিনি কৃতজ্ঞতা জানাতে চান, কিন্তু কৃতজ্ঞতার ভাষা খুঁজে পান না। তিনি নিজের প্রয়োজনের কথা জানাতে চান, কিন্তু শব্দগুলো যেন তাঁর মনের দরজায় এসে পথ হারিয়ে ফেলে। হৃদয়ের গভীরে যে অনুভূতি স্পষ্ট, ভাষার জগতে এসে তা-ই অস্পষ্ট হয়ে যায়। মনের মধ্যে যে কথাটি জীবন্ত, কলমের অগ্রভাগে এসে তা যেন প্রাণহীন হয়ে পড়ে।

এখানেই জ্ঞান ও সাহিত্যিক প্রতিভার পার্থক্য; এখানেই শব্দের অধিকারী হওয়া আর শব্দকে নিজের অনুভূতির বাহন করে তোলার মধ্যে ব্যবধান। মানুষের হৃদয়ে কত কথা জমে থাকে, কত অনুভূতি নীরবে আলোড়িত হয়, কত আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে—অথচ তাদের সবাইকে ভাষা দেওয়া যায় না। কখনো কখনো হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিই ভাষার কাছে সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়ে।

সাহিত্যের প্রকৃত শক্তি সম্ভবত এখানেই—যেখানে মানুষ তার অব্যক্ত অনুভূতির ভাষা খুঁজে পায়; যেখানে হৃদয়ের নীরব কান্না শব্দ হয়ে ওঠে, মনের গোপন আকাঙ্ক্ষা বাক্যে রূপ নেয়, আর মানুষের অন্তরের একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি অন্য মানুষের হৃদয়েও নিজের জন্য একটি আশ্রয় খুঁজে পায়।

 

চলবে

 

অনুবাদক – মুদির, মাদরাসাতু ইকরা

Related Articles