১৭ই জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৩ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

আকাবিরে দেওবন্দের নবীপ্রেম

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

নবীপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি নিখাদ ভালবাসা ছাড়া পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়া যায় না। পেয়ারা নবীর সাথে প্রেম-ভালবাসা তাঁর আনুগত্যের মাঝে রয়েছে মহান রবের পরিচয়। আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য এবং তাঁর দয়া-কৃপা পাওয়ার জন্যই শর্ত নবীপ্রেম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ-অনুকরণ। কোন ব্যক্তি নবীপ্রেম,নবীর প্রতি মহব্বত-ভালবাসা ছাড়া পরিপূর্ণ মুসলমান তথা আল্লাহর পেয়ারা বান্দা হতে পারে না।

আকাবিরে দেওবন্দ আঠারশ শতাব্দী, উনবিংশ শতাব্দী এবং এই একাবিংশ শতাব্দীর মধ্যমণি। তাঁদের খ্যাতি জগৎজোড়া। বিশ্বপরিমন্ডলে তাঁরা দ্যুতি ছড়িয়েছেন সব জায়গাতে। বিশেষ করে আঠারশ শতাব্দী থেকে নিয়ে এপর্যন্ত উলামায়ে দেওবন্দের যে খ্যাতি, তাঁদের যে ঐতিহ্য-অবদান দেখা যায়, সেটা কল্পনাতীত। বিশ্ব জগতে এরকম এক সুলাহায়ে উম্মত কম দেখা যায়। এর সিলসিলা এবং ধারাবাহিকতা ইস্পাত-পাথরের ন্যায় মজবুত। তাদের সুত্র পরম্পরা পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মিলিত। আবার এর শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে আছে বিশ্বমময়। তবে দেওবন্দী আলেমদের কেন এত সৌরভ-সুঘ্রাণ? কেন তাদের এত খ্যাতি? কেন বিশ্বব্যাপি তাঁদের প্রসিদ্ধি? কেনই বা সর্ব লাইনে সেরা? শত শত বছরধরে কীভাবে তাঁরা ঐতিহ্য ধরে আছে। কিসের কারণে তাঁরা পৃথিবী জুড়ে মানুষের কাছে সন্মানিত।

বিশ্বে শত শত কোটি মুসলিম বাস করে। কিন্তু দেওবন্দী আলেমদের মত এমন ঐতিহ্যমন্ডিত এবং মহা সন্মানিত ব্যক্তি বিগত কয়েক শতাব্দীতে খুব কম গোজরান হয়েছে। তাঁদের মত খ্যাতিমান ব্যক্তির আভির্ভাব কম ঘটেছে। তাঁরা যেন বেমেছাল অতুলনীয় ব্যক্তি হিসাবে এই বিশ্বে পরিচয় লাভ করেছিলেন। তাঁদের সমকক্ষ যেন আর ছিল না।

উলামায়ে দেওবন্দের এত খ্যাতি, তাদের ঐতিহ্য-অবদানের মুল চাবিকাঠি বোঝা যায় পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত তথা আদর্শ অনুকরণ। উলামায়ে দেওবন্দের মাঝে যেন সেই সাহাবা আজমাঈনদের বৈশিষ্ট বিদ্যমান। যেমন সাহাবাদের সিফাত ছিল ‘রুহবানান ফিল লাইল ওয়া ফুরাসান ফিন্নাহারি’ অর্থাৎ রাত্রিতে সন্ন্যাসি বৈরাগী ও দিনে অস্বারোহী মুজাহিদ। গভীর রাতে মহান রবের সাথে কানাকানিতে লিপ্ত আর দিনে বাতিলের মোকাবেলায় সিংহের মত গর্জে উঠতেন। পুরোপুরি সাহাবাদের নকশে কদমে পা রেখে চলেছেন। পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বেশী ভালবাসতেন তাঁর সাহাবাগণ। সাহাবীদের মত এমন প্রেম-ভালবাসা কারো ছিল না। জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত পেয়ারা হাবীবের প্রতি অগাধ ভালবাসা ছিল। নিজের জীবন থেকে আল্লাহর রাসুলকে বেশী ভালবাসতেন। রাসুলের প্রতিটি কথাকে তাঁরা ফলো করতেন।

তবুও শেষ জামানায় উলামায়ে দেওবন্দ যেভাবে পেয়ারা হাবীবের প্রতি ভালবাসা স্থাপন করেছেন, তাঁর আদর্শ আঁকড়ে ধরেছেন, সেটা অকল্পনীয়।

উলামায়ে দেওবন্দ সেই সব সাহাবাদের অনুসারী। আল্লাহর হাবীবকে ওই রকম ভালবাসার চেষ্টা করেছেন। রাসুলের প্রতি প্রেম-ভালবাসা, তাঁর সুন্নত বা আদর্শকে সাহাবাগণ যেভাবে আঁকড়ে ধরার প্রচেষ্টা ছিল, উলামায়ে দেওবন্দ সেই তরিকায় চলেছেন। তাঁরা যেন পুরপুরি সাহাবাদের অনুসারি। কোন খাদ ছিলনা ভালবাসায়। ছিল না কোন কপটতা। যেমন নাকি সাহাবাদের প্রেম ভালবাসায় বিন্দু পরিমাণ ভেজাল নেই। তেমন সেই মহান জামাতের যোগ্য উত্তরসূরী ওলামায়ে দেওবন্দ।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি কী প্রেম, কী ভালবাসা, সেটা তো সোনালী যুগের মানুষের সাথে কোন তুলনা হয় না। তাদের কর্মের সাথে উপমা হয় না। তবুও শেষ জামানায় উলামায়ে দেওবন্দ যেভাবে পেয়ারা হাবীবের প্রতি ভালবাসা স্থাপন করেছেন, তাঁর আদর্শ আঁকড়ে ধরেছেন, সেটা অকল্পনীয়। বিশ্ব পরিক্রমার সংকটময় মুহুর্ত, জাতির ক্রান্তিকালে পেয়ারা নবীর প্রেম-ভালবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সেটা নজীরবিহীন।

বিশ্বে শত শত কোটি মুসলিম। লক্ষ লক্ষ আলেম-উলামা। তবে উলামায়ে দেওবন্দ যেন ভিন্ন এক গোষ্ঠি। যারা রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রেম ভালবাসায় অনন্য। যাদের সাথে কোন তুলনা নেই। পেয়ারা হাবীবের প্রতিটি সুন্নাহ এবং তাঁর আদর্শের পুরোপুরি অনুসরণ-অনুকরণে যেন তাঁরা সবার সেরা। দৈনন্দিন জীবন থেকে নিয়ে, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন, রাজনৈতিক জীবন, কাজে-কর্মে তাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রেম-ভালবাসার উপখ্যান রচনা করেছেন।

প্রতিটি সময়, প্রতিটি ক্ষণ তারা সুন্নাতের পাবন্দী থাকার চেষ্টা করেছেন এবং সমাজের মাঝে রাসুলের সুন্নাত জিন্দা করার কোশেশ করেছেন।

আকাবিরের দেওবন্দের প্রতিটি মনীষী এর পেয়ারা নবীর সাথে গভীর প্রেম। এমন কোন মনীষী বাদ নেই যিনি রাসুলের খাঁটি আশেক ছিলেন না। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, বিশ্বের বড় বড় জামেয়াতে ইলমে হাদীসের চর্চা এখন নামে মাত্র। সেই ঐতিহ্যবাহী বুখারা-সমরকন্দ এবং মুসলিম ঐতিহ্যের দেশ সমুহে হাদীসে নববীর সেই ধারা বিদায়ের পথে। বিশ্ব বিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ গুলোতে ইলমে হাদীসের চর্চা আগের মত নেই। নামে মাত্র দরস-তাদরীস বাকি আছে। বহু জায়গাতে কাঁটছাঁট করে হাদীসের দরস দেওয়া হয়। কিন্তু আকাবিরে দেওবন্দ এর সেই নবী প্রেম, সেই পেয়ারা হাবীবের প্রতি সীমাহীন ভালবাসা অবিচ্ছিন্ন ভাবে রয়েছে। আজও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসগুলো অত্যন্ত আদব-ইহতেরামের সাথে পড়ানো হয়। সিহাহ সিত্তার হাদীস পুঙ্খানুপুঙ্খ রুপে তালীম দেওয়া হয়। দুনিয়ার আর কোন জামেয়াতে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়না, যত গুরুত্ব দিয়ে থাকেন ওলামায়ে দেওবন্দ। এটা নিঃসন্দেহে নবী প্রেমের বহিঃপ্রকাশ।

দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে এ পর্যন্ত যত মহান ব্যক্তির আগমন ঘটেছে। সকলেই পেয়ারা হাবীবের সুন্নাতের পরিপূর্ণ অনুসারী। তাঁরা জ্ঞান থাকতে কখনো সাধারণ ছোট খাটো সুন্নাতকে তরক করতে চাননি। বরং প্রতিটি সময়, প্রতিটি ক্ষণ তারা সুন্নাতের পাবন্দী থাকার চেষ্টা করেছেন এবং সমাজের মাঝে রাসুলের সুন্নাত জিন্দা করার কোশেশ করেছেন। তাঁদের সত্যিকারের নবীপ্রেম ছিল সেটা তাঁদের জীবনীর দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা যায়।

হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতবী (রহ.) থেকে নিয়ে দেওবন্দের প্রতিটি মনীষীর জীবনীতে পাওয়া যায় নবী প্রেমের অসংখ্য ঘটনাবলী। যেগুলো জাতির সামনে আজো জ্বল জ্বল করছে। তাদের সেই নবী প্রেমের ঘটনা জাতির জন্য বড় শিক্ষনীয়। সেসব ওয়াকিয়াত থেকে অনেক কিছু শেখার রয়েছে।

শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.) এর নবী প্রেম, পেয়ারা হাবীবের প্রতি কত ভালবাসা ছিল, সেটা তো এখন ইতিহাস। হযরত মাদানী দারুল উলুম থেকে ফারেগ হওয়ার পর প্রেমের টানে নবীর দেশে হিজরত করেন। তাঁর পরিবারের সকল সদস্য সেই হিজরতে ছিলেন। মক্কা মোকাররমাতে হজব্রত পালন শেষে মদীনার দিকে রওনা হন। মদীনায় সফরকালে শুরু হয় আশেক-মাশুকের প্রীতি। পেয়ারা হাবীবের সাথে কত নিগুঢ় ভালবাসা ছিল সেটা প্রমাণ হতে থাকে। তৎকালিন সময় ছিল উটের পিঠের সফর। মদীনা যেতে দীর্ঘ সময় লাগত। ঘাটে ঘাটে বিশ্রাম নিতে হত। সেই বিশ্রামকালিন সময়ে স্বপ্ন যোগে বারবার পেয়ারা হাবীবের সাথে সাক্ষাত হতে থাকে।

সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল। মদীনায় পৌছানোর পরে রওজার সাথে এমন প্রেম ভালবাসা তৈরী হয়,যেটা নজীরবিহীন। হযরত মাদানী রওজায় যখন সালাম পেশ করেছেন, সাথে সাথে রওজার থেকে উত্তর চলে আসে ‘ওয়ালাইকুচ্ছালাম ইয়া ওয়ালাদী’। আশে-পাশে উপস্থিত সকলেই সেটা শ্রবণ করেছিল। এক হৃদয় ছোঁয়া ঘটনা। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনাবলী কমই ঘটেছে। উলামায়ে দেওবন্দের নবীপ্রেম, আল্লাহর হাবীবের প্রতি নিখাদ ভালবাসার কোন দৃষ্টান্ত হয় না।

কোন শরীয়ত গর্হিত উপায়ে নবীপ্রেম নয়। কোন খামখেয়ালীপনা নয়। ভালবসাটাও ছিল শরীয়ত সিদ্ধ। শরীয়াতের গন্ডির মধ্যে থেকেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি প্রেম ছিল। পেয়ারা নবীর জীবন, আদর্শ, সুন্নাহ মোতাবেক জীবন যাপনের মাধ্যমেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালবাসা অর্জন করেছেন। আর তাঁরাই ছিল খাঁটি আশেকে রাসুল। আল্লাহ তায়ালা আকাবির আছলাফদের কবুল করুন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

আরও পড়ুন: তাঁর বয়ানে প্রশমিত হয় হৃদয়ের যাতনা

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com