আজীবন কি মসজিদ-মাদ্রাসা নির্ভর থাকব?

আজীবন কি মসজিদ-মাদ্রাসা নির্ভর থাকব?

আজীবন কি মসজিদ-মাদ্রাসা নির্ভর থাকব?

আবু আফফান :: ছাত্র জীবনে যে সকল আলেম উলামাদেরকে ব্যবসায় মন দিতে দেখেছি তাঁদের প্রতি এক ধরণের ঘৃণা অনুভব করেছি মনে মনে যে, আলেম হয়ে ব্যবসা করবে কেন?! কুরআন হাদিস শিখে তো অপরকে শিখাবে অথচ উনারা এখন ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত?!

বাংলাদেশে পড়াশোনা শেষ করে যখন পাড়ি জমালাম দেওবন্দে তখন দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করল আমার। শায়খুল হাদীস আল্লামা পালনপুরি রহ. থেকে শুরু করে প্রধান মুফতি শায়খ হাবিবুর রহমান খায়রাবাদী দা.বা. প্রত্যেকেই ইলমে দ্বীন শিখানোর পাশাপাশি ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত সুবহানাল্লাহ?! খায়রাবাদি সাহেব তো প্রত্যেকদিন আসরের পর থেকে রাত পর্যন্ত তাঁর চেম্বারে বসে থাকেন,নিজ হাতে ঔষুধ বিক্রি করেন। আমি কয়েক দফা হুজুরের কাছ থেকে ট্রিটমেন্ট নিয়েছি আলহামদুলিল্লাহ।

দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে আমি শিক্ষা পেয়েছি হুজুর হলেই মসজিদ মাদ্রাসা কেন্দ্রিক খেদমতের উপর নির্ভরশীল না থাকা। দারুল উলূম থেকে শিখেছি মসজিদ মাদ্রাসার খেদমত হবে ফি সাবিলিল্লাহ। মুখে মুখে আমরা দেওবন্দ দেওবন্দ স্লোগানে মুখরিত করি বাংলাদেশ আর দেওবন্দকে মান্য করার ব্যাপারে ঠনঠনাঠনঠন! দেওবন্দ থেকে দেশে ফিরে মুন্সিগন্জের এক মসজিদে খেদমত ঠিক হলো আমার। তবে দেওবন্দ থেকে এসে চেতনার জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে আমার। মনে মনে জিদ ধরেছি মসজিদ নির্ভর থাকব না, পারলে মসজিদে বিনা হাদিয়ায় নামাজ পড়াব। বেশ কিছু দিন পর সেই চিন্তার খোরাক থেকে একটা ইসলামি লাইব্রেরি খুলে বসলাম নিকএবর্তী বাজারের পাশে।

আর যাই কোথায়! বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়- স্বজন, শশুর-শাশুড়ী, বন্ধু-বান্ধব সবাই একেক করে আমাকে তুলোধুনো করতে থাকল কেন দোকান দিলাম! তাদের আক্রমণে চার মাসও ব্যবসায় টিকে থাকতে পারলাম না। আমার সাথে তাদের আচার আচরণে মনে হল আমি হারাম থেকেও বড় পাপ করে ফেলেছি (নাউজুবিল্লাহ)। মনে মনে বলি, জাকাতের টাকার জন্য ভিক্ষুকের মত মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরো এটা সমস্যা নেই কিন্তু হালাল পন্থায় ব্যবসা কর এটা বিরাট সমস্যা। এরই নাম বাঙালি!

করোনার এই সঙ্কটে ফেসবুকে কয়েকটি শব্দ ঘুরেফিরে বারবার আমার নজর কেড়েছে যে, ‘অসহায় আলেম, দুস্থ আলেম, অভাবী আলেম’ আসতাগফিরুল্লাহ! আসতাগফিরুল্লাহ!! আলেম কেন অসহায় হবে, সহায় বলতে তাঁর কেউ নেই?! আলেম কেন দুস্থ হবে,কেন অভাবী বিশেষন তাঁর নামের সাথে জুড়ব?! সিদ্দিকে আকবর রা., উমরে ফারুক রা., উসমান গণী রা., আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রা. উনারা কিন্তু একেকজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী ছিলেন। সাহস থাকলে বলুন তো তাঁরা কুরআন হাদিস জানতেননা! তাঁদের তাকওয়ায় ঘাটতি ছিল!(নাউজুবিল্লাহ)। পারবেন?!! কেয়ামত এসে গেলেও না!

তাহলে কোন তাকওয়ার ভিত্তিতে আপনি ব্যবসাকে অপছন্দ করেন। সরকার অনুদান দিয়ে ভুল করেনি বরং নিষ্ঠার সাথে জনগণের খেদমত করছে কিন্তু আলেম হয়ে আপনি কেন অনুদান নিলেন? সরকারের টাকা পাওয়ার জন্য হাঙরের মত হা করে থাকলেন! মাত্র পাঁচ হাজারের লোভ সামলাতে পারলেন না! আলেম হয়ে এত নীচুতে নেমে আসলেন?! আপনি কি পারেননি স্বাবলম্বী হতে?! মসজিদ মাদ্রাসা নির্ভর না থেকে নিজ পায়ে দাঁড়াতে?!

আমার দুর্দশার কথা কেন ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়বে?! আমি ত্রাণ নেওয়ার পরিবর্তে কেন দিতে পারলাম না?! তাই বলি কি, আমরা কি আমাদের গোয়ার্তমি আর অদূরদর্শীতার কারণে মহাম ধর্ম ইসলামকে জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ করছি না?! প্রশ্ন অনেক কিন্তু এর কোন যথাযথ উত্তর নেই। ইয়া মা’বুদ! তবে আশার কথা হচ্ছে আজকাল অনেক তরুণ আলেম ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন মাশাআল্লাহ। এ সকল ভাইদেরকে আমি সাধুবাদ জানাই আপনারা এগিয়ে যান। মসজিদ মাদ্রাসা নির্ভর না থেকে স্বনির্ভর হোন।

আমি সেদিনের অপেক্ষায় আছি যেদিন ইমাম সাহেব মিম্বরে বসে হক্ব কথা বলতে কাচুমাচু করবেননা! চাকরি চলে যাওয়ার ভয়তে সত্য কথা লুকাবেন না! টাকাওয়ালা কমিটির ভয়তে মাসআলা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলবেননা! সবখানে এক আল্লাহর জয়গান চলবে। আর এ সব সম্ভব সেদিনই হবে যেদিন মসজিদ মাদ্রাসা ছাড়া বিকল্প পথ আমার সামনে থাকবে। সুতরাং আসুন জাগ্রত হই। কমিটির গোলামি না করে এক আল্লাহর গোলামি করি। স্বনির্ভর হই। আল্লাহর জন্যই কুরআন হাদিসের খেদমত করি।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সমাজ বিশ্লেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *