ফিরে দেখা । ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ
আবু তালেবের নবীপ্রেম
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নেতৃত্ব, ক্ষমতা, অর্থ, নারীসহ যাবতীয় লোভ দেখিয়েও কুরাইশরা তাকে ইসলামের দাওয়াত থেকে বিরত করতে পারলো না। কুরাইশ কায়েমী স্বার্থবাদিরা জাগতিক দৃষ্টিতে দেখতে চাচ্ছিলো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের বিষয়টিকে। সাধারণত মানুষ ক্ষমত ও নেতৃত্ব এবং যশ আকাক্সক্ষা বা অর্থ সম্পদের লোভ বা রমণীর মোহে কাজ করে থাকে। এই ধরনের চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠার মতো জ্ঞান ও দানেশমন্দী এই কায়েমী স্বার্থবাদীদের ছিলো না। তাই ইসলামের প্রচার রুখতে এই সব বিষয়ের অবতারণা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে হাজির করেছিল। কিন্তু তিনিতো ছিলেন অন্য বাহুতে গড়া, নবুওয়াতের উচ্চ মার্গে ছিলো তার অবস্থান।
কুরাইশ নেতৃত্ব তা বুঝতে ছিল অক্ষম। শেষে তারা ভাবলো তার মুরুব্বী ও অভিভাবক চাচা আবু তালেবের মাধ্যমে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ফেরানো যায়কি না। আবু তালেবের মর্যাদা ও সম্মান সবার কাছে ছিল স্বীকৃত। তাই তারা সবাই মিলে একদিন খাজা আবু তালিবের দরবারে হাজির হলো। বললো, হে আবু তালিব! আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র আমাদের দেবদেবীদের মন্দ বলছে, আমাদের ধর্মের দোষারূপ করছে, আমাদের জ্ঞানী গুণীদের উপহাস করছে, বেকুব ঠাওরাচ্ছে। বাপদাদাদেরকে ভ্রষ্ট বলছে। হয়তো আপনি তাকে বিরত করুন নয়তো আপনি আমাদের হাতে ছেড়ে দিন। আপনিও তো তার কথাবার্তাকে আমাদের মতোই পছন্দ করেন না। আমরাই তার বিষয়ে যথেষ্ট।
আবু তালিব তাদেরকে নরমভাবে বুঝিয়ে শুনিয়ে বিদায় দিলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিনি কিছু বললেন না। এইভাবে কিছু দিন গেলো। কুরাইশ সর্দাররা দেখলো, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অক্লান্তভাবে আপনি কাজ করে যাচ্ছেন। তারা বুঝলো আবু তালিব তাকে বারণ করেননি। ফলে পুনরায় তারা আবু তালিবের কাছে একত্র হলো। এবার তারা আবেদন জানালো, বললো, আবু তালিব আপনি আমাদের মাঝে একজন বয়স্ক ব্যক্তি। আপনার মর্যাদা ও অবস্থান অনেক ঊর্ধ্বে। আমরা আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে নিষেধ করে দিতে আপনাকে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু এখনো তা হয়নি। আমাদের বাপদাদাদের গালিগালাজ করা হবে, জ্ঞানীগুণীদের বেকুব ঠাওরানো হবে, উপহাস করা হবে, দেবদেবীদের দোষারূপ করা হবেÑ আল্লাহর কসম আমরা আর সহ্য করতে পারি না। আমাদের ধৈর্য আর মানছে না। আপনি তাকে বিরত করুন। নইলে তাকে ও আপনাকে একই স্থানে আমরা মনে করবো। শেষ পর্যন্ত দুই দলের এক দল ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে।
আবু তালিব নিজের কওমের এই দুশমনি এবং পক্ষত্যাগের কথা ভেবে খুবই মর্মাহত হলেন। এদিকে নিজের অতি আদরের ¯েœহের ভ্রাতুষ্পুত্রকে তাদের হাতে তুলে দেবেনÑ তিনি লাঞ্ছিত-অপমানিত হবেন। সে বিষয়েও তার মন সায় দিচ্ছিল না। বিষয়টি তার কাছে খুবই উদ্বিগ্নতার হয়ে উঠলো। তাই বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিলেন তিনি।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ডেকে আনতে লোক পাঠালেন। তিনি উপস্থিত হলে বললেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র! তোমার সম্প্রদায় আমার কাছে এসেছিল। আমাকে তারা এমন এমন কথা বলে শাসিয়ে গেছেÑ আমার উপরও দয়া কর, তোমার নিজের উপরও কিছু রহম কর। এমন বিষয়ে বোঝা আমার উপর চাপিয়ে দিও না, যা বহন করার শক্তি বা সামর্থ আমার নেই।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে হলো চাচাজানের মত বুঝি অন্যরকমের হয়ে যাচ্ছে। তিনি হয়তো তাঁকে তাদের হাতেই সমর্পণ করবেন। তিনি তাঁকে সাহায্য করার বিষয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তার সঙ্গে হয়তো আর থাকবেন না। শান্তভাবে চিন্তা করলেন নবীজী। নিজের বিশ্বাস ও প্রত্যয়ে দৃঢ়তা অবলম্বন করে আবেগভরা কণ্ঠে বললেন তিনি, হে চাচা আমার! আল্লাহর কসম, ওয়াল্লাহ! এরা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে রাখে চন্দ্র, আর বলে আমাকে এই কাজ ছেড়ে দিতে- কখনও তা সম্ভব নয়। আল্লাহ আমাকে বিজয় দান করবেন। আর না হয় এই কাজ নিয়েই আমি হালাক হয়ে যাবো।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চোখে পানি নেমে এলো। তিনি কেঁদে দিলেন। এরপর উঠে দাঁড়ালেন। তিনি যখন ফিরে যাচ্ছিলেনÑ আবু তালিব তাকে ডাক দিলেন। বললেন, যাও হে ভ্রাতুষ্পুত্র, এদিকে আসো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে এলেন। আবু তালিব বললেন, যাও হে ভ্রাতুষ্পুত্র, তুমি যা পছন্দ কর বলতে থাকো। ওয়াল্লাহ, আমার কসম! কোনো কিছুর জন্য তোমাকে আমি কখনও কারও কাছে সমর্পণ করবো না। (সীরাতে ইবনে হিসাম : ২৬৬ )
অন্য এক বর্ণনায় আছে, আবু তালিব পুত্র আকীল বলেন, কুরাইশ সর্দাররা আবু তালিবের কাছে হাজির হলো। আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র আমাদেরকে সভাসংসদে কষ্ট দিচ্ছে, আমাদের উপাসনালয়ে যেয়ে আমাদের দুঃখ দিচ্ছে। তাকে আপনি বিরত করুন।
আবু তালিব আমাকে ডেকে বললেন, আকীল, যাও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার কাছে নিয়ে আসো। আকীল বলেন, আমি তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে একটা ছোট কুটিরে যেয়ে পেলাম। তিনি আমার সঙ্গে এলেন। দুপুরের প্রচ- গরমে তখন সবকিছু তপ্তছিল। আবু তালেব বললেন, তোমার এই জ্ঞাতিগোষ্ঠী চাচাত ভাইয়েরা অভিযোগ করছে, তুমি নাকি এদেরকে তাদের সভাম-পে, তাদের উপাসনালয়ে কষ্ট দিচ্ছো। তাদের কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাশের দিকে চোখ তুলে বললেন, এই সূর্যটা তোমরা দেখেছো?
উপস্থিত কুরাইশ সর্দাররা বললো, হ্যাঁ, দেখেছি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই সূর্যের একটা দেদিপ্যমান শিখাও যদি আমাকে তোমরা পেরে এনে দাও তবুও এ কাজ ছাড়ার সামর্থ আমার নেই।
আবু তালেব বললেন, আমার ভ্রাতুষ্পুত্র মিথ্যা বলেনি। এরপর কুরাইশ সর্দাররা উঠে চলে গেলেন। (বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩ : ৪৬-৪৭)
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন ধ্যানে, আপন কর্মে অটল রইলেন। একান্ত নির্ভার হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন। দিন দিন ইসলামের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেড়েই চলছিল। কুরাইশ নেতারা মহা ফ্যাসাদে পড়ে গেলো।
এরাতো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তো বিরত রাখতে পারছিলই না আবার আবু তালেবকে হাত করতে সক্ষম হচ্ছিল না। তারা এবার এক উদ্ভট চিন্তা করলো। সর্দার ওয়ালিদ ইবনুল মুগীরার এক ছেলে ছিল উমারা। দেখতে সুন্দর সুঠাম দেহী নও যুবক। তাকে নিয়ে উপস্থিত হলো আবু তালেবের কাছে। বললো, হে আবু তালেব, এ ছেলেটি হলো মুগীরা ইবন শুবার ছেলে উমারা। কুরাইশদের মাঝে সবচেয়ে সুন্দর ও সুঠামদেহী উচ্চবংশজাত। একে আপনি পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করুন। এর বিনিময়ে আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে আমাদের কাছে অর্পণ করুন। আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র তো আপনার ধর্মের বিরোধিতা করে। আপনার বাপদাদাদের ধর্মের বিরুদ্ধাচারণ করে, আপনার সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভক্তি ও অনৈক্যের সৃষ্টি করছে, তাদের জ্ঞানীগুণীদের বোকা ঠাওরাচ্ছে। আমাদের হাতে দিন, আমরা তাকে হত্যা করবো। একজনের বদলায় একজন পেয়ে গেলেন আপনি।
আবু তালিব শুনেই নাকচ করে দিলেন এহেন উদ্ভট প্রস্তাব। বললেন, ওয়াল্লাহ, আল্লাহর কসম। কী উদ্ভট কথা। কত খারাপ এক বিনিময় প্রস্তাব নিয়ে এলে তোমরা। তোমাদের পুত্রকে আমাকে দেবে? আমি আমার ছেলেকে দিয়ে দেবো হত্যা করার জন্য? আল্লাহর কসম, কখনও তা হওয়ার নয়।
উপস্থিত আরেক সর্দার মুতইম ইবন আদী বললো, আল্লাহর কসম, হে আবু তালিব, তোমার সম্প্রদায় তোমার সঙ্গে ইনসাফের কথাই তো বলছে, যে বিষয়টি তোমাদের জন্য তোমরা সবাই অপছন্দ করছো তা থেকে বাঁচার একটা উপায় বের করতে তারা চেষ্টা করছে। তোমাকে দেখছি কিছুই গ্রহণ করতে চাচ্ছো না।
আবু তালেব মুতইমকে লক্ষ্য করে বললেন, আল্লাহর কসম, কখনও এরা আমার সঙ্গে ইনসাফের ব্যবহার করেনি। তুমি নিজেও এমন আমাকে অপমান করতে তাদের সাথে ঐকবদ্ধ হয়ে গেছো। আমার বিরুদ্ধে শক্তিপ্রদর্শনে একমত হচ্ছো। যাও, যা ইচ্ছা করতে পারো।
এতে পরস্পরে দোষারূপ ও মারামারি লাগার উপক্রম হলো। (ইবনে হিসাম আস সীরা ১ : ২৬৬-২৬৭)
-আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ রচিত নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামÑ সীরাতগ্রন্থ থেকে নেয়া
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা ও শোলাকিয়া ঈদ ময়দানের গ্র্যান্ড ইমাম


