২৮শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ২৬শে শাওয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

আব্বুর প্রতি ভালোবাসা

আব্বুর প্রতি ভালোবাসা

লা বী ব আ ব দু ল্লা হ

তখন পড়ি শেরপুরে। তেরাবাজার মাদরাসা৷ জামিয়া সিদ্দিকীয়া শেরপুর৷ পড়ি চাহারম বা পাঞ্জমে৷ ফার্সি পহেলি৷ থাকি মাদরাসায়৷ আবাসিক৷ টিনের ঘরে৷ ঘরের সাথেই পুকুর৷ ক্লাস হতো দশটা – চারটা৷ যোহরের সময় বিরতি৷ নামায ও খাবারের বিরতি৷ আমার জায়গীর মাদরাসার বাবুল ভাইয়ের বাসায়৷ বড় হুজুর জায়গির করে দিয়েছেন৷ সকালের নাস্তা হোটেলে৷ রুটি ও ডাল৷ বাবুল ভাইয়ের হোটেল৷ দুপুরে ও রাতে বাসায় খাবার৷ কাউকে পড়াতে হয় না৷ বাবুল ভাইয়ের মেয়ে পিচ্চি৷ রেশমা৷ আমাকে ভাবী ডাকতে বলা হয়েছে বাবুল ভাইয়ের বউকে৷ আমি ভাবী ডাকি অস্পষ্ট স্বরে৷ খাবার যত কম খাওয়া যায় সেই চেষ্টা করি৷ লজ্জায়৷ ভাবী আরও বেশি খেতে বলেন৷ বাসায় একটি সাদাকালো টিভি৷ আমি খাওয়ার পর টিভির রুম দিয়ে বের হই৷ চোখেল আড়ালে দৃশ্য দেখি তবে কোনো নাটক সিনেমা দেখি না৷ হুজুর আবার টিভি দেখেন এই ডর কাজ করে আমার ভেতর৷ আমি জায়গির কী খাই না খাই এ নিয়ে আম্মার চিন্তা৷ সপ্তাহে একদিন আব্বা ভালো তরকারি আনেন গ্রাম থেকে৷ বড় মাছ বা দেশি মুরগী৷

আব্বা আমাকে কাছে বসিয়ে খানা খাওয়ান৷ ঘি কিনে দিয়েছেন এক বয়েম৷ শুধু ঘি দিয়ে গরম ভাত আমার পছন্দের৷ আব্বা খাওয়ানোর পর গোয়াল পট্টি নিয়ে বসান মিষ্টির দোকানে৷ ছানার পায়েস আমার পছন্দের৷ আমি যতটুকু খেতে পারি তিনি খেতে বলেন৷ রসগোল্লা খাবো কি না তাও বলেন৷ আমি রসগোল্লাও খাই৷ আব্বা গ্রাম থেকে আসার সময় বড় বোয়াল মাছ বা আইড় মাছ আনেন৷ বাবুল ভাইয়ের বাসায় এবং হুজুরদের বাসায় হাদিয়া দেন৷

মাকসাদ পুলাডারে যেনো আদর করেন হুজুরগণ৷ বাবুল ভাই যেনো আমাকে ছেলের মতো আদর করেন৷ বাবুল ভাইয়ের কোনো ছেলে নেই৷ আমাকে ছেলের মতো আদর করেন৷ আব্বা এতে খুশি৷ আম্মাও খুশি জায়গীর বাড়ির আদর সোহাগে৷ আব্বা গ্রাম থেকে হেঁটে আসতেন৷ দশ বারো কিলোমিটার দূরে শহর থেকে৷ শেরপুর জেলার শেষ সীমানায়৷ জামালপুর জেলায় আমার বাড়ি৷ আব্বা আমাকে বলেন, ” বাবা ভালো করে পড়বে৷ আলেম হতে হবে৷ তোমার কাছে আমার কোনো কিছুর চাওয়া নেই দুনিয়াতে৷”

হুজুরদের বলতেন, “আল্লাহর মাল আল্লাহর রাস্তায় দিছি, আপনারা আমার পোলাডারে দেখবেন৷ দুআ করবেন৷ আর গোশত চাই না হাড্ডি রাখলেই চলবে যদি বেয়াদবি করে ছেড়াটা৷”
আমাকে বলেন, “হুজুরগোচে বেশি বুঝিছ না৷ যা কয় তা মানবি৷”

আমি বিটলামি করি৷ হুজুরগণ খেলতে না করেন আমি বিকেলে ফুটবল মাঠে৷ জি কে স্কুলে বা পার্কে৷ হা ডু ডু খেলি৷

ডাঙ্গুলি খেলে, বল না থাকলে জাম্বুরাকে বল বানাইয়ে লাথি দিই৷ ক্লাসে শরীর থাকলেও মনটা মাঠে৷ দুরন্ত ও দস্যিপনা৷ শেরপুরের অলিগলি হাঁটি৷ সাইকেল ভাড়া করে গ্রামে যাই৷ হারিয়ে যাই৷

আব্বা সারা সপ্তাহ চিন্তায় থাকেন ছ্যাড়াটা কী করে? কই যায়?

আমি কই যাবো আত্মীয়দের বাসায় গেলে সর্বোচ্চ এক দুই দিন৷ তোর বাপে কথা কইবে বলে বাড়ি থেকে যেতে বলে৷

এই দেশী মুরগীর গোশত, ঘি, রসগোল্লা, ছানার পায়েস চলে নাহবেমীর জামাত পর্যন্ত৷ আব্বা এক বৃহস্পতিবার মাদরাসায় আসেন না৷৷ আমি আস্থির হয়ে অপেক্ষা করি৷ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকি৷ আব্বু আসেন না৷ আমি চিন্তা করি৷ এক বৃহস্পতিবার একটি সাইকেল ভাড়া করে গ্রামে আসি মেঠো পথে৷ তখন ফোন নেই৷ মোবাইল নেই৷ বাড়িতে এসে দেখি আব্বু অসুস্থ৷ আব্বুর চিকিৎসা চলে৷ আমি তো কিছুই করতে পারে না৷

আব্বা তাকাদা দেন বাড়িতে থাকা যাবে না৷ মাদরাসায় যা৷ মাদরাসায় আসি কিন্তু মন বাড়িতে থাকে৷ আব্বু আমাকে নাহবেমীরের বছর একটি নতুন ঘড়ি কিনে দিয়েছিলেন৷ বলেছিলেন তোমাকে সাইকেল কিনে দেবো যদি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করো এবং হুজুরদের কথা মাইন্যা ভালো করে পড়াশোনা করো৷ আমি সেই সাইকেলের আশায় থাকি৷ পরীক্ষায় তো কখনও তৃতীয় হইনি নাহবেমীরের পর৷

রেজাল্টও ভালো করেছি৷ কিন্তু আব্বু নাহবেমীরের বছরই ওপারে চলে যান এক বিকেলে৷ সন্ধ্যায় আমি অন্ধকার দেখি জীবনে৷ আমাকে কেউ আর দোকানে বসিয়ে বলবে না খা পেট ভরে ছানার লায়েস খা, রসগোল্লা খা৷

সেই তখন থেকে আমাকে আর কেউ বলে নাই খা পেট ভরে খা, রসগোল্লা খা, ছানার পায়েস খা৷
আমি শেরপুরে সেই দেকানগুলোতে যাই৷ তখন আব্বুর কথা মনে হয়৷ কত স্মৃতি ওড়াউড়ি করে আমার সামনে৷

আমার চার সন্তানের জন্ম শেরপুরে৷ এক ছেলে মারা গেছে শেরপুরে৷ কবরও শেরপুরে৷ আমার সেইসব স্মৃতির কথা মনে হলে ভাবি যাদের পিতা নেই কত কষ্ট তাদের৷ কত শূন্যতা তাদের জীবনে৷

আমরা চার বোন ও দুই ভাই৷ পরের জীবনটা আরও সংগ্রামের৷ সবাইকে পড়ালেখার খরচ জোগাতে হয়েছে৷ কেউ ঢাকায় পড়েছে কেউ ময়মনসিংহে৷ আম্মুর দুআ এবং অবিচলতায় এই আজকের আমরা৷

ছোট ভাই সৌদীতে৷ আমি ময়মনসিংহে৷ সব বোন দাওরায়ে হাদীস পড়েছে৷ আমরা আছি সবাই ময়মনসিংহে৷ সেই গ্রামের পথ যে পথে আমি হাঁটতাম৷ পালাতাম৷ সেই গ্রামের মাঠ যাতে খেলতাম৷ সেই শেরপুরের দোকান পাট সব আছে৷ নেই শুধু আব্বু৷ এই তো জীবন৷ আমাকে যেদিন পাগড়ি দেওয়া হয় সেই১৯৯২ সালে৷ মাওলানার পাগড়ি৷ সেদিন আমার বাড়ি থেকে কেউ আসেন নি৷ যিনি আসতেন এবং খুশি হতেন তিনি আমার আব্বু৷

আব্বু জন্য ভালোবাসা৷

লেখক : কথাসাহিত্যিক, ডেরা, ময়মনসিংহ

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com