২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৪ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

আমরা যদি না জাগি মা

  • আদিল মাহমুদ

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং অবিভক্ত বাংলার সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি যেমন বিদ্রোহী ছিলেন, তেমনি ছিলেন প্রেমের কবি। সে প্রেম প্রকৃতির জন্য, মানুষের জন্য, দেশের জন্য। মুলত বাঙালিত্বের সবটুকু রঙ নিয়ে তিনি লিখতেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বাংলা সাহিত্যকে যে প্রাচুর্য এবং সমৃদ্ধি দিয়েছেন তা আমাদের অবাক করে।

তিনি শিশুদের কথাও ভাবতেন। শিশুদের জন্যে তিনি ছড়া, কবিতা, গান ও নাটিক রচনা করেছেন। তাঁর শিশু কবিতা জাগিয়ে তুলেছে শিশুদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা সব ইচ্ছা, অনিচ্ছা এবং প্রতিভাকে। শিশুদের জন্য রচনার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন শিশু মনস্তত্ত্ববিদ। লেখার আলাদা ধরনে, শিশুর জগৎ সৃষ্টির ক্ষমতায় তাঁর ছোটদের কবিতাগুলো কত না উজ্জ্বল! সবার জানা আছে যে, তাঁর সমস্ত সৃষ্টির মধ্যেই আছে এক ধরনের প্রাণোচ্ছলতার দীপ্তি। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর সৃষ্টিকর্মও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রাণের উচ্ছ্বাস ছোটদের মনোজগতের এক প্রধান ও মৌলিক অনুষঙ্গ বলেই তিনি সৃষ্টি ছোটদের কাছে প্রিয় হতে পেরেছেন।

নজরুল ইসলামের শিশুদের উপযোগী লেখাগুলোও বড়দের লেখার মতোই বিচিত্র; এতেও আছে বিশিষ্ট ও অনিন্দ্য জগৎ। তিনি কেবল সুন্দরের স্তবগান করেন; জানেন সুন্দরকে স্বীকার করতে হয় সুন্দর দিয়েই। তাঁর ছোটদের লেখায় স্পষ্টভাবে রয়েছে দেশপ্রেম, ধর্মচেতনা, শ্রেয়োচেতনা এবং ভারতবর্ষের হিন্দু-মুসলমানের একাত্ম হওয়ার স্বপ্ন।

তিনি শিশুদের খুব ভালোবাসতেন। শিশুদের সঙ্গে অতি সহজেই মিশে যেতে পারতেন। সর্বপ্রথম শিশুদের মনোরঞ্জক কবিতা লিখেন ‘লিচুচোর’। এই কবিতায় শিশুর দুরন্তপনাকে এমনভাবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা এককথায় বলতে হয় অনন্য। এ কবিতায় কবি বলেন—

‘বাবুদের তাল-পুকুরে
হাবুদের ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাঁড়া।’

তাঁর আরেকটি অনবদ্য গীতকবিতা ’ঘুম পাড়ানী গান’। বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চল নেই, যেখানে এই কবিতাটি আবৃত্তি হয় না। প্রতিটি মা তার সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর সময় কবিতাটি গেয়ে শোনায়। কবিতাটির কি আশ্চর্য ক্ষমতা, শোনার সাথে সাথে শিশুর ঘুম আসবেই। কবি লিখেন—

‘ঘুম-পাড়ানী মাসি পিসি ঘুম দিয়ে যেয়ো
বাটা ভরা পান দেবো গাল ভরে খেয়ো
ঘুম আয় রে, দুষ্ট খোকা ছুঁয়ে যা
চোখের পাতা লজ্জাবতী লতার মতো নুয়ে যা
ঘুম আয়রে, ঘুম আয় ঘুম।’

শিশুকে ঘুম পাড়াবার জন্যে যেমন তিনি লিখেছেন ঘুমপাড়ানী গীতকবিতা, তেমনি ঘুম থেকে জাগাবার জন্যেও লিখেছেন উল্লেখযোগ্য ছড়া ‘প্রভাতী’। প্রভাতী কবিতায় কবি বলেন—

‘ভোর হল দোর খোল
খুকুমণি ওঠরে
ঐ ডাকে জুঁই শাঁখে
ফুলখুকী ছোটরে।’

তিনি গ্রামীণ প্রকৃতিকে ভালোবেসেছেন হৃদয় থেকে। গ্রামের সবুজ বন বনানী, বাড়ির আঙিনার শাকসবজির আকুলতা হৃদয় ভরে অনুভব করেছেন। ছোটদেরকেও কবি সেই অনুভূতির স্বাদ নিতে বলেছেন। ‘ঝিঙেফুল’ কবিতায় সেই উপমা পরিলক্ষিত হয়। একটু হেঁটে আসি কবিতার পেলব জমিন থেকে। কবির ভাষায়—

‘ঝিঙেফুল! ঝিঙেফুল!
সবুজপাতার দেশে
ফিরোজিয়া ফিঙে-ফুল
ঝিঙেফুল।
গুল্ম পর্ণে
লতিকার কর্ণে
ঢল ঢল স্বর্ণে
ঝলমল দোলে দুল-
ঝিঙে ফুল।’

এমনিভাবে হাস্যরস সৃষ্টি নজরুলের সহজাত ক্ষমতাগুলোর একটি। হাসির মজা ছোটদের কাছে খুব আদরের ব্যাপার। শিশুর অনাবিল হাসির সমুদ্রকে চঞ্চল উচ্ছ্বাসে পরিণত করার হাতিয়ার নজরুলের কাছে ছিল। ‘ঠ্যাং চ্যাগাইয়া প্যাঁচা যায়’, ‘নতুন খাবার’ প্রভৃতি কবিতা দিয়ে ছোটদের তিনি হাসিয়ে তুলেছেন।

তিনি শিশুদের চার দেয়ালের ঘরে আবদ্ধ রাখার পক্ষপাতী নন। তিনি চান শিশুরা সারা দুনিয়ায় ঘুরবে। দেশ থেকে দেশান্তরের তেপান্তরে হারিয়ে যাবে। জ্ঞানের আঙিনায় বিশ্ব বিজয়ী বীর হবে তারা। জ্ঞানের সব দুয়ারে ওদের পদচারণা বিকশিত হোক এটাই কবির চাওয়া। তাইতো জগতটাকে নিজের করে সাজাতে বলেছেন শিশুদের। কবির কবিতায় চোখ রাখি—

‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে
দেখবো এবার জগৎটাকে
কেমন করে ঘুরছে মানুষ
যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে।
দেশ হতে দেশ দেশান্তরে
ছুটছে তারা কেমন করে
কেমন করে করছে তারা
বরণ মরণ যন্ত্রণাকে।’

তিনি ছিলেন চঞ্চল! দুরন্ত প্রকৃতির। নীরব নিথর হয়ে চুপচাপ থাকতে পারতেন না। ভীরুতা আর অলসতাকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। তারুণ্যে ভরপুর ছিল তার হৃদয় মঞ্জিল। তাই তিনি চাইতেন শিশুরা হোক চঞ্চল এবং দুরন্ত। ফুটন্ত গোলাপ। হোক অগ্রগামী বীর সেনানী। কবি শিশুদেরকে তাই সামনে এগুতে বলেছেন। আসুন কবির কবিতা থেকেই জেনে নিই—

‘চল্ চল্ চল্।
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,
নিম্নে উতলা ধরণী-তল,
অরুণ প্রাতের তরুণ-দল
চলরে চলরে চল্
চল্ চল্ চল্।’

কিছুদিন আগে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে সুন্দর সুষ্ঠ ভাবে দেশ পরিচালনা করতে হয়। কবি নজরুল জানতে শিশুদের মধ্যে এমন প্রতিভা আছে। শিশুরা জাগলে তারা পারবে সুন্দর একটি দেশ উপহার দিতে। তাই কবি নজরুল শিশুদেরকে নিয়ে লেখা ‘আমি হব সকাল বেলার পাখি’ কবিতায় লিখেন—

‘আমরা যদি না জাগি মা
কেমনে সকাল হবে?
তোমার ছেলে উঠলে মা গো
রাত পোহাবে তবে।’

আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আজ যারা শিশু আগামী দিন তারা জাতির কাণ্ডারী। তাই এ সময় থেকেই তাদের গড়ে ওঠতে হবে। যেতে হবে বহুদূর। এমন এক উজ্জীবনের কবিতার নাম ‘নতুন পথিক’। এ কবিতায় কবি বলেন—

‘নতুন দিনের মানুষ তোরা
আয় শিশুরা আয়!
নতুন চোখে নতুন লোকের
নতুন ভরসায়।
নতুন তারায় বেভুল পথিক
আসলি ধরাতে
ধরার পার আনন্দ-লোক
দেখাস ইশারায়।’

আমাদের সমাজে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য সমাজে নিজেকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। আর এর ফলে শিশুর শৈশব জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে পিতা-মাতার চাপে পড়াশোনা ও বাস্তবতার জ্ঞান লাভের আশায় ছুটতে ছুটতে। কিন্তু শিশুদের সে যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসতে নজরুল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন ‘চলব আমি হালকা চালে’ নামক কবিতায়। তিনি লিখেন—

‘নাই বা হলাম মস্ত ভারি,
নাই হলো ঘর লাখ-দূয়ারী,
বিশটে ঘোড়া দশটা দ্বারী
ভিড় যে দেওয়ান গোমস্তার।’

কবি কাজী নজরুল লিখেছেন অনেক। বড়দের জন্য যেমন লিখেছেন, ছোটদের জন্যও তেমনি লিখেছেন। তাঁর শিশু পাঠ্য হলো, পুতুলের বিয়ে (নাটিকা ও কবিতা), ঝিঙেফুল (কবিতা), সাতভাই চম্পা (কবিতা), সঞ্চায়ন (কবিতা), মক্তব সাহিত্য (পাঠ্যবই), ঝড় (কবিতা ও গদ্যের কিছু সংকলন), পিলে পটকা, ঘুম জাগানো পাখি (কবিতা), ইত্যাদি।

তবে তিনি মধ্যবয়সে এসে পিক্স ডিজিজে আক্রান্ত হন। যার কারণে আমৃত্যু তিনি আর সাহিত্যকর্মে ফিরে আসতে পারেননি। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৭২ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকা আসেন। তখন কবিকে বাংলাদেশের জাতীয়তা প্রদান করা হয়। তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করেন। তিনি ১৮৯৯ সালের ২৪ মে চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন, ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট জগতবাসিকে কাঁদিয়ে ইন্তেকাল করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

আরও পড়ুন: হামদ-নাতে নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন নজরুল

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com