অভিমত। নিহার রঞ্জন সরকার
আমাদেরই দিতে হবে শিশুদের নিরাপত্তা
শিশুরা নিষ্পাপ। এই নিষ্পাপ, কোমল শিশুরা সমাজিক বাস্তবতায় নানা ধরনের অত্যাচার এবং নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ঘরেও তারা থাকছে অনিরাপদ এমনকি অতি প্রিয়জনদের কাছেও। অত্যাধুনিক এই সমাজব্যবস্থায় শিশুর ওপর নির্যাতন আমাদের মনুষ্যত্বকে আজ প্রশ্নের সম্মুখীন করছে। তবে দেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও বন্ধ করা যাচ্ছে না শিশু নির্যাতনের ঘটনা।
শিশু নির্যাতনের সাথে সাথে শিশু হত্যার ঘটনাসমূহও ইদানিং বেড়ে গেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত পরিবারের সদস্যদের হাতে শিশু হত্যার ঘটনা শিউরে ওঠার মতো। প্রায়ই বাবা কিংবা মায়ের হাতে খুন হচ্ছে অবুঝ শিশুরা। নিজেদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে আদরের সন্তানকে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না কিছু কিছু নিষ্ঠুর বাবা-মা। চলতি বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০ থেকে ১২ জন শিশু বাবা-মায়ের হাতে খুন হয়েছে। আইনের পাশাপাশি মনুষ্যত্বের বিকাশ, নীতি নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করে একটি সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জাগরণই এই শিশু খুন রোধ করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করে।
এখন শিশুরা কোথায় নিরাপদ? সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, উচ্চাকাক্সক্ষা, অনৈতিক জীবনযাপন, ব্যক্তি স্বার্থপরতা, লোভ-লালসা, সামাজিক অস্থিরতা বাবা-মায়ের হাতে শিশু হত্যাকা-ের অন্যতম কারণ। মানুষের সহনশীলতা কমে যাচ্ছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে অস্থিরতা। এসব কারণে পারিবারিক অশান্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অবিশ্বাস, সন্দেহ তছনছ করে দিচ্ছে পারিবারিক বন্ধনকে।
মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের ফলে চিড় ধরছে পারিবারিক বন্ধনে। নষ্ট হচ্ছে সন্তান বাবা-মায়ের পবিত্র সম্পর্ক। স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাসের জায়গা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। সংসারে অশান্তি দেখা দিচ্ছে। বিশ্বাস, ভালোবাসা ও সততার চর্চা না থাকলে দাম্পত্য জীবনে কলহ আসবেই, হত্যার ঘটনাও ঘটতেই থাকবে। এ পরিস্থিতি রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। শিশুদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শিশু হত্যার মতো পৈশাচিকতা শুধু আইন করে কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন অভিভাবক মহলে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নৈতিক শিক্ষার প্রসার।
বাংলাদেশে ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন পাশ করা হয় এবং ২০০৩ সালে কিছু সংশোধনী আনা হয়। এ আইনে বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারী ও শিশু অপহরণ, আটক করে মুক্তিপন আদায় বা দাবী, নারী ও শিশু পাচার, নারী ও শিশু ধর্ষণ বা ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যু ঘটানো, যৌন পীড়ন, যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানো, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদির উদ্দেশ্যে অঙ্গহানি করা, ধর্ষণের ফলে জন্মলাভকারী শিশু সংক্রান্ত বিধান সম্বলিত অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়গুলো এসেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ সংশোধিত ২০১৩ অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ- থেকে মৃত্যুদ-ের বিধান রয়েছে। এছাড়া রয়েছে অর্থদ-ের বিধান।
এই আইনের অপরাধগুলোতে শারীরিক আঘাতের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে, কিন্তু আমরা মানবাধিকার বলতে বুঝি মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার অধিকার, যা শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক বিষয়গুলোকেও সংরক্ষণ করে। কিন্তু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মানসিক এবং আর্থিক বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা হয়নি। তাই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ছাড়াও প্রয়োজন হয় নতুন আইনের। এ প্রেক্ষিতে সরকার নারী ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এবং সমাজব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ প্রণয়ন করে।
অতীতে পারিবারিক সহিংসতা ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবেই গণ্য হতো। ১৯৭০ এবং ৮০’র দশকে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাংলাদেশের সংবিধানেও নারী ও শিশুর অধিকার ও তাদের সুরক্ষার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক কনভেনশন এবং প্রটোকল রয়েছে। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এসব কনভেনশন, প্রটোকল বাস্তবায়নের পাশাপাশি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, যার শিরোনাম ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম’। এ প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম হচ্ছে- ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি), ডিএনএ ল্যাবরেটরি, ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্পলাইন সেন্টার, যার হেল্পলাইন নম্বর ১০৯২১। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ইউনিসেফের সহায়তায় নির্ধারিত জেলা-উপজেলায় রয়েছে নারীবান্ধব হাসপাতাল, বাংলাদেশ পুলিশের উইমেন সাপোর্ট এন্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন, পরিচালনা করছে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার।
এতসব উদ্যোগের পরও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রত্যাশা অনুযায়ী কমেনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারসমূহের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের লক্ষ্যে যুগোপযোগী একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে সরকার। এ কর্মপরিকল্পনা তিন পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এখন দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছর হতে ২০২০-২১ অর্থবছর এবং তৃতীয় পর্যায়ে ২০২১-২০২২ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর মেয়াদে বাস্তবায়ন করা হবে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি, বেসরকারি, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মশালায় প্রাপ্ত বিভিন্ন সুপারিশের আলোকে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার একটি খসড়া তৈরি করা হয়। এ কর্মপরিকল্পনার ভিশন হচ্ছে-২০২৫ সালের মধ্যে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতামুক্ত সমাজ গঠন। মিশন হচ্ছে- নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে নারীর ক্ষমতায়ন, জেন্ডার সমতা নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং ব্যক্তিবর্গকে উদ্বুদ্ধকরণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ। কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে রয়েছে জাতীয় নারী ও শিশু উন্নয়ন পরিষদ, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে এবং যৌতুক বিরোধী জাতীয় কার্যক্রম পরিচালনা সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটি, ন্যাশনাল একশন প্ল্যান সাপোর্ট ইউনিট, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি।
বাবা-মায়ের হাতে শিশু হত্যার ঘটনা অথবা অথবা প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে গিয়েও নিজের শিশুকে খুন যে কোনো ঘটনাই হোক না কেন, তা কোনো অবস্থাতেই মেনে নেয়া যায় না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর শিশুর বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ার নিরন্তর প্রয়াস বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কিছু বিবেকহীন পাষ- মানুষের কারণে। তাই আমাদের পারিবারিক বন্ধন ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। নিজেদের অপরাধ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে শিশু হত্যার মতো বড় ধরনের সঙ্কট দূর করা অসম্ভব। সহনশীলতা ও মানবিক সমাজ গঠনের মাধ্যমেই শিশুদের নিরাপদে রাখা সম্ভব। পাশাপাশি প্রয়োজন আমাদের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং মানবিকতার চর্চা।
লেখক : কলামিস্ট


