১৯শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ৫ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৫ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

আমার জীবনের মূল্যবান উপহার

  • আব্দুর রহমান রাশেদ

আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। নিম্ন মধ্যবিত্ত বললেও ভুল হবে না। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জীবনের শুরুতে কোনো চাওয়াই পূরণ হয় না। ছোটবেলা থেকে এ পর্যন্ত আমারও কোনো ইচ্ছা পূরণ হয়নি। আমার বড় তিন ভাই এক বোনকে বাবা-মা অনেক বলে কয়েও যখন হাফেজ বানাতে পারলেন না, তখন সেই গুরু দায়িত্ব এসে পড়ল আমার কাঁধে।

হ্যাঁ, আমি হাফেজ হতে রাজি হয়েছিলাম। তবে কিছুদিন পরেই বুঝেছিলাম আমার দ্বারা হাফেজ হওয়া সম্ভব না। শুরুতে আমি কিছুই মনে রাখতে পারতাম না। হিফজ জীবনের শুরুর একটা ঘটনা বলি। আমি হেফজ শুরু করেছিলাম ‘সূরা ইয়াসিন’ দিয়ে। এ সূরাটা শেষ করতে আমার এক সপ্তাহরও বেশি সময় লেগেছিলো। সেটাও কোনো ঘটনা না। আসল ঘটনা ঘটে, যখন শুনেছি পুরা ‘ইয়াসিন সূরা’ আমাকে সবিনা শুনাতে হবে। অনেক কষ্ট করে পুরা সূরাটা ভালোভাবে শিখলাম। আমাকে পাঠানো হয় হাফেজ ছাত্রের কাছে। সেই হাফেজ ছাত্রটি ‘সূরা ইয়াসিন’ এ আমার ৪০টারও বেশি ভুল ধরলো। অবশ্য ভুলগুলো স্বাভাবিক ছিল না। কিছু জায়গায় আমি ভুল করেছি ঠিক। কিন্তু সে আমাকে বিভিন্ন স্থানে সন্দেহে ফেলে ভুলের সংখ্যা বাড়িয়েছিলো।

আমার পরিস্কার মনে আছে, সেদিন দুই পৃষ্ঠা পড়ার পর আমি অনেক কান্না করেছিলাম। দুঃখ-কষ্টে আমার বুকটা ফেঁটে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। আমি তখন তার কাছে হাত জোড় করে আবেদন করেছিলাম আমার সাথে এমনটা না করতে। কিন্তু সে আমার উপর বিন্দুমাত্র দয়া করেনি। আজও আমি সেই ঘটনা ভুলতে পারি না।

আমি নতুন বলে সেদিন উস্তায আমাকে কিছু বলেননি। কিন্তু আমি অনেক কান্না করেছিলাম। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি হাফেজ হবো না। কিন্তু বাসায়া জানানোর সাহস হয়নি। হিফজ বিভাগে কিছু ছাত্র এমন থাকে, তারা দাবি আদায়ের জন্য মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে যায়। দাবি আদায় হলে তারা মাদ্রাসায় ফিরে আসে। আমি সেরকমও ছিলাম না। কোনো অলি-গলি আমার জানা ছিল না। ফলে পালানোও হলো না, আমার দাবি মানাও হলো না। আমাকে হাফেজ হতে হলো।

আমাকে হাফেজ বানানোর পেছনে যাদের অনেক অবদান, তাদের মধ্যে আছেন আমার বড় ভাই আবু বরক সিদ্দিক রহ.। যিনি করোনায় গত ছয় মাস আগে ইন্তেকাল করেছেন। আমার ছোট মামাও এই তালিকায় আছেন। কেন তারা এই তালিকায় আছেন কারণটা ব্যাখা করছি। ছোটোবেলা থেকেই তারা আমাকে বিভিন্ন পুরস্কার দিতেন। যেমন আমার ২০ পাড়া শেষ উপলক্ষে ভাইয়া আমাকে একটা নতুন জামা উপহার হিসেবে দিয়েছিলো। আর আমার মামা আমার জন্য একটা ভাতা চালু করেছিলেন। প্রতি ঈদে আম্মার কাছে আমার জন্য এক হাজার টাকা করে দিতেন। এছাড়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কিছু আমাকে দিতেন। নানীর জন্য কুরআন খতম করার কারণে অনেক হাদিয়া দিয়েছেন আমাকে। তাদের সেই পুরস্কারের জন্য আমি হিফজ শেষ করতে পেরেছি। আলহামদুলিল্লাহ। উস্তাযদের কথা বললাম না, তারা তো তুলনার উর্ধ্বে।

শুরুর দিকে আমার আম্মা আমাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, হিফজ শেষ করলে আমাকে সাইকেল কিনে দেবেন। আমি দীর্ঘ ৪ বছর অপেক্ষা করেছি, কবে হিফজ শেষ হবে, আর কবে আম্মা আমাকে সাইকেল কিনে দেবেন। কিন্তু আম্মা আমাকে সাইকেল কিনে দিতে পারেননি, হয়তো তাঁর সাধ্যেই ছিলো না। আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।

বাবার সাথে আমার একটা স্মৃতি আছে, আমি সেটা কখনও ভুলবো না, ভুলতে চাইও না। বছর দুয়েক আগে দাওরা হাদীসের পরিক্ষার প্রস্তুতির জন্য আমি কিতাবাদি নিয়ে বাসায় গিয়েছি। টার্গেট নিভিড়ভাবে পরিক্ষার প্রস্তুতি নেয়া। এর আগে আমি কখনও বাসায় পড়িনি। বাবাও কখনও কাছ থেকে আমাকে পড়তে দেখেননি। সেবার দিন-রাত আমার পড়া দেখে বাবা নিদারুণ খুশি হলেন। আমি সেই খুশির রেখা তার চোখে মুখে দেখেছি। ইতোপুর্বে কখনও বাবা আমার কারণে এতটা খুশি হননি। নিজেকে গর্বিত অনুভব করলাম। বাবা একটু পর পর আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন, কী খাবে বাবা? একটু সরবত বানিয়ে দেবো? প্রায় সময় বিভিন্ন নাস্তার ব্যাবস্থা করতেন আমার জন্য। নিজ হাতে সেসব করতেন। একজন সন্তানের জন্য হয়তো এরচেয়ে আনন্দের কিছু নেই।

পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হলাম। বাবাকে জানালাম। বললাম, আপনার দোয়ার জন্যই আমি কৃতকার্য হয়েছি। বাবা কিছু একটা বলতে যেয়েও বললেন না। শুধু মৃদু হাসলেন। কিন্তু সেই হাসির আড়ালেও কী একটা দুঃখবোধ যেন তাকে পোড়াচ্ছিলো। আমি কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলাম। হয়তো আমাকে পুরস্কার হিসেবে কিছু না দিতে পারার দুঃখ ছিল সেটা। যদিও আমি কিছুই আশা করিনি। বাবার দোয়াই আমার প্রাপ্তি।

এর কয়েক মাস পর শীতকালে একবার বাসায় গেলাম। শীত মোটামুটি শুরু হয়েছে। বাবার সাথে ফজরের নামাজে গেলাম। কনকনে শীতের কারণে আমার হাল্কা কষ্ট হচ্ছিলো। ছিল না মোজা, ছিল না ভালো এক জোড়া জুতা। পরদিন বাবা নিজ থেকেই বললেন, চলো বাবা, তোমাকে এক জোড়া জুতা কিনে দেই। আমি ভাবলাম, মনে হয় বাবা দু-তিনশ টাকার মধ্য আমাকে জুতা কিনে দেবেন। আমি দোকানে গিয়ে কম মূল্যের জুতার সারির দিকে পছন্দ করছিলাম। বাবা আমাকে দু হাজার-পনের শ মূল্যের জুতা পছন্দ করতে বললেন। আমি না করলে বাবা রাগ হয়ে গেলেন। আমি বুঝলাম হয়ত বাবার অনেক দিনের শখ ছেলেকে এক জোড়া দামি জুতা দেবেন। এখন আমি সেটা না নিলেই তিনি বেশি কষ্ট পাবেন। পছন্দ মতো জুতা কিনলাম। খুব আনন্দ পেলাম সেই জুতা পায়ে দিয়ে। বাবার ভালোবাসা বলে কথা। সেই স্মৃতি আজও ভুলিনি, ভুলবো না।

ছোটবেলার ধারণাটাকে এখন ভুল মনে হয়। ছোটবেলায় ভাবতাম আমাকে আল্লাহ কিছুই দেননি। কিন্তু ইদানিং অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলোকে দেখতে চেষ্টা করি। দেখি, আল্লাহ তাআলা আমার পাশে আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উপহারগুলো রেখে দিয়েছেন। আমার বাবা-মাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। কিন্তু আমি অন্ধের মতো কিছুই দেখছিলাম না। কেবল দুনিয়ার সার্বিক সুখটাকে ছুঁয়ে দেখতে চাচ্ছিলাম।

হে আল্লাহ, এতো তাড়াতাড়ি আমার কাছ থেকে আমার সেরা উপহারগুলোকে নিয়ে নিয়ো না।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com