২৪শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ২২শে শাওয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন আমি বাংলায় বাঁধি সুর

আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন আমি বাংলায় বাঁধি সুর

মা ন জু ম উ মা য়ে র

প্রতিটি দেশপ্রেমিক বাঙালির কাছে অমৃতসম বাংলাভাষা। তাই এই ভাষার অধিকার তথা বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠাকল্পে ১৯৫২ সালে প্রতিবাদী ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়ে, প্রাণ উৎসর্গ করে আমাদের নিরন্তর চলার চেতনার পথ তৈরি করে গেছেন। তাই আজ আমরা আবেগ মথিত হৃদয়ে উচ্চারণ করতে পারি ‘আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন, আমি বাংলায় বাঁধি সুর’। কিন্তু এ স্বপ্ন দেখা ও সুর বাঁধার ক্ষেত্র তৈরি হলো কিভাবে তা নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে।

বৃটিশ আমলে বৃহত্তর বাংলাদেশের তথা পূর্ববঙ্গের গণমানুষ ছিল শিক্ষা-দীক্ষায় সবদিক থেকে পিছিয়ে। আত্মাভিমানী ছিল এ দেশের জনগণ। ভাবতো, তারা নবাব-বাদশাহর প্রজা ছিল। কিন্তু ইংরেজদের ছলনায় তারা তাদের সেই রাজত্ব হারিয়েছে। তাই ছিল ইংরেজি শিক্ষার প্রতি এক ধরনের বিজাতীয় ঘৃণা ও অবজ্ঞা। যার ফলে তারা অনগ্রসর জাতি হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছিল। এ দেশের বেশিরভাগ জনপদ ছিল কৃষিভিত্তিক। কিন্তু জমিদার ও মহাজনের শোষণে ছিল জর্জরিত। তাই পাকিস্তান আন্দোলনের সপক্ষে এই অঞ্চলের কৃষককুল ও নিম্নবিত্তশ্রেণি মানুষরা সবেচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়েছিল। ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্টে পাকিস্তান অভ্যুদয় হওয়ার পর এ অঞ্চলের মানুষ ভেবেছিল তারা শোষণ থেকে মুক্তি পেয়েছে, তারা আর আর্থ-সামাজিক বঞ্চনার শিকার হবে না।

দেশ বিভাগের পর ভারত থেকে আগত উর্দু ভাষাভাষী যে জনগোষ্ঠী মোহাজের হিসেবে পূর্ব বাংলায় আসলো, দেখা গেল তারাই সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্য বিস্তার করছে এবং পাকিস্তান হওয়ার পরে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা পাঞ্জাবিরা হলো এদের দোসর। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেনাবাহিনী সমাজের সব ক্ষেত্রেই তারা কর্তৃত্ব বজায় রাখলো। পাকিস্তানের যে স্বপ্ন নিয়ে বিভোর হয়েছিল, তা অচিরেই ধূলিস্যাৎ হয়ে গেল। তখন যে ভাষায় মার সুরেলা কণ্ঠে ঘুম পাড়ানির গান শুনছে, ক্ষেতে-খামারে, নদী-নালায় কৃষক আর মাঝি-মাল্লাদের সেই দরাজ ভরা গানের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসার উপক্রম হলো। উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পরিকল্পনায় তখন ছাত্রসমাজ ক্ষোভে ফুঁসে উঠলো। বাংলা ভাষা অন্যতম রাষষ্ট্রভাষা হিসেবে ১৯৪৮ সালের মার্চ থেকে শুরু হলো অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে গুলি চালানোর আগ পর্যন্ত এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ নিজেদের মনে করতো যে তারা মুসলমান। কিন্তু গুলি চালানোর পর তাদের হৃদয়ে মুসলমান বোধের সাথে উন্মেষ ঘটলো ‘বাঙালিসত্তা’।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির পর থেকে পরবর্তী বছরগুলোতে এ দিনটি ছিল অঙ্গীকারের দিন, শপথ নেয়ার দিন। এর ভেতরে সুপ্তভাবে থাকা আকাঙ্খা, বঞ্চিত গণ-মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের লড়াইয়ে রূপ নিল। সেই ৫২ থেকে ৭১ পর্যন্ত এ সংগ্রামী মানুষের প্রতিপক্ষ ছিল উর্দু-পাঞ্জাবি ভাষাভাষী শাসকগোষ্ঠী। প্রথমে লড়াইটা ছিল স্বাধিকারের, এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে অনিবার্য হয়ে উঠে স্বাধীনতার দাবি। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি ছিল একটি লক্ষ্যের দিকে অভীষ্ট হওয়ার যেখানে বাঙালি মাথা উঁচু করে বাঁচবে। শোষিত হবে না, বঞ্চনার শিকার হবে না। কিন্তু বাংলাদেশ হওয়ার পর একাত্তর পূর্ব যে চেতনা, সেই অগ্নিশুদ্ধ হওয়ার শপথ ফিকে হয়ে আসলো। পর্যায়ক্রমে একুশে ফেব্রুয়ারি তার স্বর্ণ উজ্জ্বল অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হয়ে ‘যেন পালাপার্বণ উৎসবে রূপান্তরিত’ হতে থাকলো। ২১শে ফেব্রুয়ারি হওয়া উচিত কষ্টিপাথরে নিজেকে যাচাই করার দিন। সেই অগ্নিমন্ত্র হৃদয়ে সমুজ্জ্বল রয়েছে কি না তা পরখ করার দিন। বাঙালি জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত হয়ে যে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের জন্য যারা জীবন আত্মোৎসর্গ করেছেন তাদের কাছে জবাবদিহি করার দিন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পূর্ববর্তী সরকারসমূহ একুশের চেতনা বলতে যা তার আসল চেতনা কখনোই জনগণের সামনে তুলে ধরেনি। এ চেতনাকে সমুন্নত রক্ষার কোনো পরিকল্পনাই করেনি। এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সপক্ষের সরকার ক্ষমতায়। তাই এ সরকারের কাছে দেশের মানুষ আশা করতে পারে একুশের চেতনা দেদীপ্যমান করা লক্ষ্যে সকার বিভিন্ন মহতী উদ্যোগ নিতে পারে। দিল্লির পার্লামেন্টের সম্মুখের সরণির নাম যেমন গান্ধীর মহাপ্রয়াণের দিন ‘৩০শে জানুয়ারি’, তেমনি শহীদ মিনারের বেষ্টনী সড়ক ‘২১শে সরণি’ হলে এখান দিয়ে পথচারীর হৃদয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারি সমুজ্জ্বল থাকতো। সেইসাথে মহান ভাষা আন্দোলনের সকল শহীদের

৭১-এ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনযুদ্ধের পর বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ভেতর দিয়ে রাজনীতিবিদরা মনে করেছিলেন সবকিছু অর্জন হয়ে গেছে। ফলে সেই সময় শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সরকারে যারা জড়িত ছিলেন, তারা সরকারকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হন। আমাদের সমাজে আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে ছেলে-মেয়েদের ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদান। সামাজিক অনুষ্ঠান বিয়ে, জন্মদিন বা অন্যান্য অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রও লেখা হচ্ছে ইংরেজিতে। প্রাথমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, সরকারি দফতর, অফিস-আদালত, এমনকি সর্বস্তরেও বাংলা ভাষার তেমন মর্যাদা নেই। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য আজ অনেকখানি ম্লান। এ বিষয়টি নিয়ে জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতীক দেশরতœ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারকে আরও ভাবতে হবে এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মতোই বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অমাদের সকলের চেতনার পথচলা হোক ‘আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন, আমি বাংলায় বাঁধি সুর’।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com