আরবের দিনলিপি ।। পর্ব- ২৪

আরবের দিনলিপি ।। পর্ব- ২৪

  • কাউসার মাহমুদ

মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। আজ সকলে মিলে ইফতারি করলাম। এই রোজায় আজই প্রথম। বোধহয় একসঙ্গে আজই শেষ। নইলে রোজ তো সকলেরই তাড়া থাকে। সবাই আপন আপন কাজে ব্যস্ত থাকে। সেসব ঝামেলা এড়িয়ে কীভাবে যেন আজ ইফতারিটা হয়েই গেল। মূলত এরপর থেকেই অস্থিরতা কাজ করছে ভেতরে।

বাবা-মা’র কথা মনে পড়ছে। দেশের আনন্দময় স্মৃতিরা চোখের পাতায় ভাসছে। নতুন মাছের মত খলবল করা সেসব স্মৃতিরা বড় অসহায় করে দিচ্ছে আমায়। ইচ্ছে করছে একটা দিনের জন্য যদি অদৃশ্য হতে পারতাম! কোনো জাদুর ঘোড়ায় চড়ে যদি অন্তত কয়েকটা মুহুর্তের জন্য দেশে চলে যেতে পারতাম!

এজাতীয় অদ্ভুত অবাস্তব শিশুতোষ ভাবনার মাঝেই আবার নির্ধারিত সময়ের দ্বিতীয় ভাগের কাজে আসতে হলো। তুমুল বৃষ্টি হয়েছে বিধায় রাতে কাজের চাপ তুলনামূলক কম। অবসর বসে আছি। একটু আগেই সুদানীয় গল্পকার ও ঔপন্যাসিক তইয়্যব সালেহর বিখ্যাত حفنة تمر (এক মুঠো খেজুর) গল্পটার অনুবাদ শেষ করেছি। ওটারই প্রাথমিক খসরা গুছিয়ে এই দিনলিপি লিখতে বসেছি। কোনোরূপ আভরণহীন এমন স্মুদ গল্প নিকট অতীতে যেকোনো ভাষাতেই হাতেগোনা কয়েকটি পড়েছি বলেই মনে হয়।

অথচ সেই উনিশশো চৌষট্টি সালে লেখা হয়েছে এটি। একটা শিশুর চোখে জীবনের কী নির্মম সত্যি যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এতে, পড়তে গিয়ে বারবার ভাবতে হয়৷ আর ভাবতে ভাবতে এক আশ্চর্য মেদুরতা গ্রাস করে নেয়। যাতে জীবন ও প্রকৃতি একই অববাহিকায় চলে। মানুষ ও বৃক্ষ দুটি বস্তুই হৃদয় ও মগজকে নানাবিধ চিন্তায় আরক্ত করে। গল্পের পরাজিত মানুষটির জন্য যেমন দুঃখ জাগে মনে, তারই অনুরূপ বেদনা আপনাকে দেবে তাঁর মালিকানা হারানো অনেক অনেকগুলো খেজুর গাছে৷

আজ ইফতারিতে খেজুর হাতে নিতেই গল্পের কথাটি মনে পড়ে যায়। যদিও গল্পের সঙ্গে ইফতারি—সম্পূর্ণই অপ্রাসঙ্গিক। তবু সাম্প্রতিক সময়ে পাঠ ও অনুবাদের কারণে তা মনে পড়েছিল বোধহয়।

আজকাল নতুন অভিজ্ঞতা, মানুষ, জায়গা ও জীবনের মুখোমুখি হচ্ছি না তেমন। সেই একই চক্রের কথা, একই জীবনের কথা, একই স্বভাবের কথা আর কত লিখব? তাই বেশ ক’টা দিন ধারাবাহিক অনিয়ম গেল।

সে যা হোক, আজ মনের অবস্থাটির বিবরণ লেখার মত বিশেষ কিছু নেই। কেননা আজকাল নতুন অভিজ্ঞতা, মানুষ, জায়গা ও জীবনের মুখোমুখি হচ্ছি না তেমন। সেই একই চক্রের কথা, একই জীবনের কথা, একই স্বভাবের কথা আর কত লিখব? তাই বেশ ক’টা দিন ধারাবাহিক অনিয়ম গেল।

মাঝে একদিন প্রায় দেড়শো কিলো দূরে নাজরান শহরে গিয়েছিলাম। বন্ধু ঔপন্যাসিক সাইফুদ্দীন রাজীব বহু ক্রোশ অতিক্রম করে আমার এখানে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর অফিসের কাজেই ওখানে যাওয়া। কাজ শেষে দু’জন ভাবলাম শহরটা ঘুরে দেখি। জিপিএসে দর্শনীয় স্থান বলতে কিং ফাহাদ নামে আরবদের পৌরানিক বাড়িঘরের একটা ঠিকানা দিল। প্রায় মিনিট বিশ গাড়ি চালিয়ে ওখানে গিয়ে দেখি দর্শনীয় স্থানটির প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। এতে মনোক্ষুণ্ণ হয়নি যদিও কিন্তু আশাহত হয়েছি ঠিক।

এজাতীয় স্থাপনাগুলো নতুন করে সংস্কার করছে সৌদি সরকার। বাহির থেকে বিশেষত্ব তো কিছু বোঝা যায় না। তবে এর চারপাশে নগরায়নের যে তোড়জোড় তা বড় দৃষ্টি নন্দন। এজাতীয় ঘরবাড়ি তো বহুই দেখেছি। গ্রামের ভেতর গেলে এসবের ভগ্নদশা এখনও দৃশ্যমান। পথ চলতে চলতে বিরান মরুভূমি মাঝেও এসবের ভেঙে পড়া দেয়াল, বিধ্বস্ত ছাদ আর ধ্বসে পড়া অবয়ব দেখে বহু বছর আগে এগুলোর দৃঢ়চিত্ত দাড়িয়ে থাকা আন্দাজ করা যায়।

আমরা কিং ফাহাদ স্থাপনটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে এটাকে ঘিরে যে বাণিজ্যিক বসতি ঘিরে উঠেছে সেগুলোর দিকে নজর দিলাম। এতে প্রধান যে বিষয়টা দৃষ্টিগোচর হলো: তা প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর আদলে আধুনিকায়ন

শুনেছি কেবল শহরতলিতেই নয় বরং যেসব সৌদির মালিকানায় এসব পৌরাণিক ভিটা আছে তারা যেন এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করে—এই মারফত এই সরকার নির্দিষ্ট অর্থসমেত একটা প্রজ্ঞাপনও জারি করেছেন। জানি না এর কয়ভাগ সত্য কয়ভাগ মিথ্যা ও বানোয়াট। তা আমরা কিং ফাহাদ স্থাপনটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে এটাকে ঘিরে যে বাণিজ্যিক বসতি ঘিরে উঠেছে সেগুলোর দিকে নজর দিলাম। এতে প্রধান যে বিষয়টা দৃষ্টিগোচর হলো: তা প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর আদলে আধুনিকায়ন। অর্থাৎ বেশ দীর্ঘ একটা জায়গাজুড়ে রাস্তার দুপাশে বছরের পর বছর ধরে যে দোকান ও বাড়িঘর রয়েছে এগুলোর নবায়ন। প্রয়োজনের অধিক ভাঙচুর পরিত্যাগ করে কেবল সম্মুখভাগেরই অঙ্গসংস্কার।

একতলা বিশিষ্ট সবকটা দোকানের সামনেই চত্বর বর্ধন ও একই রকমের কালো লোহার খুঁটিতে বৈদ্যুতিক লাইট প্রদান। যেগুলো দেখলে সামান্য জানাশোনাওয়ালা লোকদের খুব সহজেই প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সভ্যতার স্থাপত্যের কথা মনে পড়বে।

রাজনৈতিকভাবে হোক কিংবা নির্বুদ্ধিতার কারণেই জেদ্দা, দাম্মাম শহরগুলোতে মিশরীয় প্রকৌশলীরা শহর নির্মাণে সৌদিদের যে ক্ষতিটা করেছে, ধীরেধীরে সৌদি রাজন্যবর্গের কাছে তা পরিস্কার হচ্ছে

তাই প্রসঙ্গক্রমে এ কথা উঠলে রাজীব ভাই বললেন, রাজনৈতিকভাবে হোক কিংবা নির্বুদ্ধিতার কারণেই জেদ্দা, দাম্মাম শহরগুলোতে মিশরীয় প্রকৌশলীরা শহর নির্মাণে সৌদিদের যে ক্ষতিটা করেছে, ধীরেধীরে সৌদি রাজন্যবর্গের কাছে তা পরিস্কার হচ্ছে। নইলে এত লাখ লাখ রিয়াল খরচ করে নগর পরিকল্পনার যা-তা করে রেখেছে ওরা। অতিবৃষ্টিতে এখনও শহরের বিশেষ অংশগুলোয় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ভবনগুলো শ্রীহীন। তাই সৌদি আরবের বহু শহরই এখন নতুন পরিকল্পনার আওতাধীন। যেগুলোর কিছু কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে সেসব শহরগুলোতে গেলে চোখের আনন্দ হয়।

এত সুন্দর করে সাজানো প্রতিটা পথ। প্রতিটা ভবনের কাঠামোশৈলী একরকম এবং বহির্গত রঙ ও ধরণ প্রায় একই হওয়ায় রূচির স্পর্শতা বোঝা যায়। তাই দেশের প্রধান শহরগুলোর পর ধীরেধীরে প্রান্তিক অঞ্চলগুলোর বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোও এখন নবায়নের কার্যক্রম চলছে।

কিন্তু সেই সৌভাগ্য কি আমার আসবে? কে জানে! সারাটা জীবনই তো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে একাই লড়াই করে চলছি। ফলে আর কবে কোথায় কি ঘটবে একমাত্র উপরওয়ালাই জানেন।

এরপর আমাদের প্রত্যাবর্তনের সময় হয়। আমরা যে যার শহরে ফিরে যেতে নাজরান ছেড়ে বেরুই। সমস্ত পথজুড়ে রাজীব ভাইয়ের সঙ্গে নানা বিষয়েই কথাবার্তা বলি। এই দেশে আমার বর্তমান জীবন দেখে উনি অনেকাংশেই দুঃখিত। আপসোস করলেন। নানা কর্মপরিকল্পনা দিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের অভয় দিলেন। কিন্তু সেই সৌভাগ্য কি আমার আসবে? কে জানে! সারাটা জীবনই তো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে একাই লড়াই করে চলছি। ফলে আর কবে কোথায় কি ঘটবে একমাত্র উপরওয়ালাই জানেন। ও নিয়ে শঙ্কার বিপরীতে আপাতত কেবল আশাই করতে পারি।

নাজরান ছেড়ে বেরুনোর সময় নাম না জানা কিছু অপূর্ব বৃক্ষের ঝাড় দেখলাম। পথের পাশে ছাউনির মত এর পাতারা ছড়িয়ে আছে। বড় ভালো লাগল দেখে। কিছু এগুতেই পরিবেষ্টিত ক্ষুদ্র মাজরা (শস্যক্ষেত) । ওখানে পালং শাক, ধনিয়া, মরিচ, জিরজির ও বাঁধাকপি ফলানো হয়েছে বোধহয়। নিশ্চয়ই এর রক্ষণাবেক্ষণকারী কোনো বাঙালি বা ভারতীয়ই হবেন। হতে পারো কোনো আফ্রিকানও।

তা যেই হোক, দেখে বোঝা যায়, বড় যত্ন করে এই সবুজ ফসল ফলানো হয়েছে। সেই সুবজের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে কখন যে পথ অতিক্রম করে পাহাড়ের অনেক উঁচুতে উঠেছি, কেবল আর একটি বৃক্ষের পাতাও দৃষ্টিগোচর না হলে সম্বিত ফিরে পেয়েছিলাম। তখন চোখ খোলা থাকলেও আমার সমূহ ইন্দ্রিয় কেবল ওই পেছনে ফেলা সমূহ দৃশ্য ও প্রত্যাবর্তনের পথেই নিমজ্জিত হয়ে ছিল।

২৪ মার্চ রোববার, ২০২৪

লেখক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

 

আরবের দিনলিপি ।। পর্ব- ২৩

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *