আরবের দিনলিপি- ১০

আরবের দিনলিপি- ১০

  • কাউসার মাহমুদ

যাযাবরের দৃষ্টিপাতের মত যেদিকে তাকাই, সবকিছুই কেমন দৃশ্যপূর্ণ লাগে। মনে হয়, জগতে যা-কিছু ঘটছে, প্রতিটি জিনিসই দৃশ্যের অন্তর্গত। যা-কিছুই সঞ্চারিত হচ্ছে, তাতে  অস্ফুট একটা গতি খেলা করে। ফলে আমার চোখ, হৃদয় ও মগজ একীভূত হয়ে আজ সমস্ত দিন যা-কিছু গ্রাস করেছে, এই রচনায় তারই দৃশ্য অঙ্কিত করলাম।

প্রথম দৃশ্য

পাঁচদিন পর আকাশে আজ সূর্য উঁকি দিল। গত দুদিন বৃষ্টি হয়নি ঠিক। কিন্তু ভীষণ মেঘলা ভাবটা সসবময়ই বিরাজমান। ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে আবহটা রাতদিন সর্বত্রই প্রচ্ছন্নের প্রতিভূ হয়ে মুখব্যাদান করে ছিল। কখনও ইহুদি চিত্রকর শাগালের ছবির মত বিষন্নতায় মোড়ানোও বটে। ফলে আলোর এই সামান্য দীপ্তি কিছুটা বৈচিত্র্য এনেছে ঠিক। তবে এখনই এর ওপর আস্থা রাখছি না। কেননা বেলা এগারোটা বাজে। তবু তার যে ক্ষীণতা, প্রদীপের টিমটিমে আলোর মত অসহায়তা—তাতে ভরসা করা নিতান্তই বোকামি। তদুপরি এখানকার প্রকৃতির যে চরিত্র, তাতে যেকোনো মুহুর্তেই মেঘেরা এসে হামলে পড়তে পারে। আচমকাই ফর্সা আকাশে কৃঞ্চ পাহাড়ের মত অতিকায় খণ্ডবিখণ্ড মেঘেরা পিণ্ডীভূত হয়ে পুঞ্জীভূত হতে পারে।

এমন আবহাওয়ায় পথেঘাটে মানুষ ও যানের চলাচল অতি অল্প। মুদি দোকানে গুটিকয় খরিদ্দারের আনাগোনা। আফগান রুটিবিক্রেতার অতিকায় চুলা থেকে গনগনে ধোঁয়া আকাশে উড্ডীয়মান। যাদেরকেই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে সকলেই গরম বস্ত্রাবৃত। যেন আলস্য কাবু করে রেখেছে। ঢিমেতালে নিজেদের প্রয়োজনটুকু সেরে কাজ কিংবা আবাস্থলের দিকে হেঁটে চলছে। তবে তুলনামূলক সচঞ্চল রাস্তার ওপারে ‘দেওয়ানিয়াতুল কেইফ’ কফিখানাটি। ওখানে আরবদের ব্যস্ত আসাযাওয়া দৃষ্টিগোচর  হচ্ছে। এই অদ্ভুৎ স্থানটির দিকে যখনই তাকাই, মনে হয় সময়কে হত্যার সবচেয়ে  উপযুক্ত জায়গা। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিস্কর্ম সময় কাটানোর যে খরচা, তা অনারবদের কাছে নিতান্তই অপচয়। অধিকাংশের কাছে অসাধ্যও নিশ্চয়। তাই বেকার আরবদেরই আড্ডাখানা এই কফিশপ। এছাড়া যারা উঞ্চ পানীয়ের লোভে আসে, তারা ঝটপট চা-কফি নিয়ে গাড়িতে উঠে চলে যায়। অন্যথা পাঁচ মিনিট দোকানের বাইরে থাকা টুলে বসে পান শেষে বেরিয়ে আসে। বিপরীতে যারা অভ্যন্তরে গমন করে, তাঁদের বেরুনোর অত তাড়া নেই। যেন তাগিদই নেই। সেখানে কামরার আদলে তৈরি করা ছোটো ছোটো খোপ। আছে টেলিভিশন। দু-চারজন দলবদ্ধ হয়ে একেকটিতে বসে। অধিকাংশই কোমড়ে থাকা ছোরা (আরবিতে জাম্বিয়া) কিংবা পিস্তলটা রেখে আরাম তাকিয়ায় হেলান দিয়ে সেই যে গা ছাড়ে, তা থেকে উঠার নামই নেই। যদিও এই সুবিধা ভোগ করতে খাবারের দাম ব্যতিরেকে ঘণ্টায় পনেরো থেকে পঁচিশ রিয়াল  পরিশোধ করতে হয়। ওতে সামান্যই বাঁধে তাঁদের! বরং খোশগল্পে মত্ত হয়ে সারাটা সময় চা, গাহওয়া পান করে যায়। চুরুট আর হুঁকো ফুঁকে। তাস বাঁটে। মাঝেমাঝে উত্তেজিত শব্দ কিংবা বাকবিতণ্ডারও আলোড়ন শোনা যায়। প্রায় সকলেই কিছু্ক্ষণ পরপর ঠোঁটের নীচে তামাক গুঁজে। যারা অতিমাত্রায় নেশাগ্রস্ত তাঁরা খায় শাম্মা। বোধ আচ্ছন্নকারী ও স্বভাবে বিভ্রান্তী ঘটানো এই বস্তুটি বড় ভয়ানক। তারা কথা বলে একদম ধীরে কিংবা হড়বড় করে। গাল ভরে থুথু ফেলে জামাকাপড়, গাড়ি ও জায়গা নষ্ট করে। নেশাটা এমন যে, বয়সের ভেদাভেদ এড়িয়ে আশি ভাগ গ্রাম্য আরব পুরুষই তা গ্রহণ করে। যারা খায় না, তাঁরা তাঁদের বিরূপ দৃষ্টিতে দেখে।

দ্বিতীয় দৃশ্য

প্রধান সড়কের পাশে নির্মিত ভবনের ছায়াচ্ছন্ন জায়গাটিতে সারিবদ্ধ বসে আছে তাঁরা। কেউ নিমগ্ন চায়ের কাপ হাতে। কেউ অনবরত কথা বলে যাচ্ছে। কেউ অশ্লীল কৌতুক ছুঁড়ে মারলে, সকলেই হে হো করে হেসে উঠছে। তাঁরা মিসরীয়। সকলেই শ্রমিক। তবে স্বাধীন। তাঁরা রঙের কাজ করে। কৃষি জমিতে যায়৷ ফসল কাটে। বহুদিন পরে থাকা মানুষের আবাসহীন অব্যবহৃত ভবন পরিস্কার করে। ঘর নির্মাণ করে। এসব না পেলে নিজেদের আবাসের সামনে ভোরবেলা দলবদ্ধ বসে থাকে। তখন সৌদি কারও যদি শ্রমিকের দরকার হয়, রোজকার চুক্তিতে সঙ্গে নিয়ে যায়। কিন্তু এখন যারা এখানে বসে আছে, অপরাহ্ণের ছায়াময় এই দিনে ভেজা প্রকৃতির আবহ গায়ে মেখে কৌতুক করছে—প্রত্যেকেই বেকার। কাজ নেই হেতু দিনমান রুমে বসেবসে ক্লান্তি ধরে গেছে। তাই রাস্তা ঘেঁষা এই আড্ডার জায়গাটিতে এসে দলবদ্ধ হয়েছে। এখানের কারও সঙ্গে দৈবাৎ কথোপকথন হয়েছে আমার। কিংবা ইশারায় সৌহার্দ্য নিবেদন হয়েছে। তাতে ওদের নিঃশঙ্ক যাপন দেখে ঈর্ষান্বিতই হয়েছি। এমন নির্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিয়ে অশঙ্কিত জীবনরেই অনুশীলন দরকার।

মানুষের চাহিদা যত কম, তাঁর বেঁচে থাকা তত সহজ

বহু ভেবে দেখেছি, মানুষের চাহিদা যত কম, তাঁর বেঁচে থাকা তত সহজ। এই যেমন এরা। এদের পরিধেয় পোষাক থেকে শুরু করে চলনের ধরণটিও এমন সাদামাটা—মনে হয় জাগতিক চিন্তা এদের নিতান্তই আচ্ছন্ন করতে পেরেছে! মহান ত্বহা হুসাইনের ‘আল-আইয়াম’ ( The days) গ্রন্থে اهل الريف ( Rural people) বলে গ্রামীণ যে মিশরীয়দের বর্ণনা পড়েছি, যখনই এদের দেখি, মনে হয় তাঁরাই সেই জনগোষ্ঠী। তাঁরাই সে সরলপ্রাণ গ্রামীণ জনপদের মানুষ। জীবন, জীবিকা, পরিবার, ভবিষ্যৎ, বর্তমান—ইত্যকার কোনো বিষয়েই যাদের অতি দুশ্চিন্তা নেই। দিনের পর দিন তাঁদের এই কর্মহীন নিশ্চল বসে থাকা দেখে যখন কাউকে জিজ্ঞেস করেছি, কীভাবে চলছে? দুশ্চিন্তা করছো না? দেশে পয়সাকড়ি পাঠাচ্ছো তো? কবে কাজে লাগবে? তখন তাদের প্রত্যেকেই নির্ভারচিত্তে সেই একই উত্তর দিয়েছে যে, ‘কুল্লু শাইয়িন মিন ইনদাল্লাহ’ (Everything is from God) অথবা ‘আর রিযকু মাকসুম’ (Livelihood is distributed) কিংবা ‘আল্লাহ ফি’

(Allah exists)। সেসময় তাদের জিহ্বা, চোখ কিংবা ঠোঁটের দিকে গভীরভাবে দৃকপাত করলে বোঝা যায়, কথাগুলো কেবলই মুখ থেকে নির্গত নয়। বরং সেসবের উৎপত্তিস্থল তাঁদের হৃদয়। শান্ত জলধির মত যা তাদের  বুকের ভেতর স্থাপিত। যার শেকড় বিশ্বাসে পূর্ণ।

আবার তাদেরই স্বদেশী আছে অজস্র। যারা এদেশেই মর্যাদাপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত। বিভিন্ন কোম্পানিতে বিবিধ পদের উচ্চপদস্থ কর্মকতা। মূলত সরকারি হসপিটাল, প্রতিষ্ঠানসহ বেসরকারি নামজাদা কোম্পানিগুলোয় মিশরীয়দেরই জয়জয়কার। ভারতের কেরেলা রাজ্যেরও অনেক ডাক্তার, নার্স আছে। এই দুইপ্রকারের লোকজনই আরবি ও ইংরেজিতে দক্ষ হওয়ায় বিশেষ সুবিধার অধিকারী। মোটা অঙ্কের বেতনে তাদের হায়ার করা হয়। ফলে বিভিন্ন প্রয়োজনে তাদের দারস্থ হলে প্রবাসীরা সত্যিই কিছু সুবিধা ভোগ করতে পারে।

তৃতীয় দৃশ্য

ল্যাম্পপোস্টের উজ্জ্বল আলোয় কুয়াশা তিরোহিত। ফলে বস্তুর শরীরেই কেবল মৃদু কুয়াশার ভেজাভাব বোঝা যায়। অথবা স্পর্শের মাধ্যমে অনুভূত হয়। যেহেতু দিবসের সময়টা দীর্ঘ, তাই সন্ধ্যা নামতেই মানুষের চলাচল কমে আসে৷ আটটা নাগাদ যা শুনশান নীরবতায় পরিণত হয়৷ মহাসড়ক থেকে যে পথগুলো গ্রামের ভেতরে চলে গেছে, কিংবা অন্ধকার বিস্তারিত হয়ে আছে, সেখানে আহারের খোঁজে রাসভদের মন্থর বিচরণ পরিলক্ষিত হয়। সমস্ত দিন যারা পাহাড়েই থাকে। সেখানে ঘুরেফিরে কাটায়। গাছের তলায় শুয়ে-বসে থাকে। কেবল রাত পড়তেই নিজেদের মরুবাস ছেড়ে লোকালয়ে হেঁটে আসে। এই প্রাণীটি এমনই ভীতু যে, সামান্য পাতা পতনের শব্দেও চমকে উঠে। অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করে।

এদের মত আরেকটা প্রাণীও যেন নিশাচরী হয়ে ওঠে এসময়। তা উট। দিনে কোথাও যাদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায় না। রাত গভীর হলে সেইসব অতিকায় জন্তুর দেখা মেলে। যেসব উট আরবরা পালন করে, যা সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটি দিনে কেনাবেচার জন্য হাটে উঠে, সেসবের তুলনায় এরা সম্পূর্ণই ভিন্ন। এদের উচ্চতা সাধারণত ওসবের দিগুণ। দীর্ঘদেহী এই উটগুলো যেন জিরাফের মত। রাতভর লোকালয়ের প্রধান রাস্তাগুলোতে ঘুরে বেড়ায়। বিশেষত যেখানে বাবলাগাছ আর পৌরসভা কর্তৃক ভ্রাম্যমান ডাস্টবিন রাখা হয়েছে, সেখানেই এদের দেখা মেলে। মানুষের পদশব্দে সামান্যও বিব্রত না হয়ে একমনে খাদ্যের অন্বেষণ করে যায় তারা। তারপর দীর্ঘ পদক্ষেপে সম্মুখের পথ ধরে। যেদিকে অন্ধকার, যেদিকে পর্বতশৃঙ্গ মাথা উঁচু করে তাকিয়ে আছে—রাতের নিঃসীম নিস্তব্ধতা মাঝে সেদিকেই অভিমুখী হয়। কোনো কোনোদিন অদূরেই তাদের ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকি আমি।

ক্রমশ..

লেখক- কবি, গদ্যকার ও অনুবাদশিল্পী

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *