সাদালাপ।ফয়জুল্লাহ আমান
আলেমে আলেমে ঘৃণার দুয়ার বন্ধ হোক
আশ্চর্য এক মনোভঙ্গি দেখতে পাচ্ছি আমাদের ভেতর। কাদা ছোড়াছুড়ির শিল্পচর্চা করছি আমরা নিপুণভাবে। খুটিয়ে খুটিয়ে দোষ বের করছি শত্রুর। নিজেদের লোকদের শত্রু বানিয়ে নিচ্ছি খুব সহজে। কিন্তু আর কত নীচতার পরিচয় দিব? কতটা নিচে নামলে আমাদের পরিতৃপ্তি হবে?
সম্প্রতি দেখতে পাচ্ছি বিভিন্নভাবে আমরা একে অপরকে আক্রমণ করছি। কেউ সুযোগ পেলে কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। নিজেদের সারা জীবনের সমস্ত প্রতিভা কাজে লাগাচ্ছি অন্যের সম্মান নষ্ট করার পেছনে। অনেকে নসীহত করছি কিন্তু কেবল অন্যের জন্য। নিজেকে ধোয়া তুলসি মনে করছি। সব ত্রুটির ঊর্ধ্বে ভাবছি নিজেকে।
আমরা সবাই সম্মানের কাঙাল। আর সেই কাঙালপনা দূর করছি অন্যকে ছোট করে। অন্যের দোষচর্চায় পা-িত্য প্রদর্শনপূর্বক। কাউকে ছোট করে যে বড় হওয়া যায় না সে কথা একটি বারের জন্য আমাদের মাথায় আসছে না। আলেম সমাজকে হেয় করার হেন পন্থা নাই যা আমরা অবলম্বন করছি না। সাধারণ মানুষকে আমরা কী শিক্ষা দিচ্ছি? ছোটদের সামনে কী আদর্শ রেখে যাচ্ছি? আমাদের আগামী প্রজন্মকে কি আমরা চরম বেয়াদব বানাচ্ছি না?
নিজেকে জ্ঞানী ভাবছি অথচ কাজ করছি চরম মূর্খের মত। মনে রাখবেন, জ্ঞানীরা অন্যের ছিদ্রান্বেষণ করে বেড়ায় না। শুকরের মত কেবল মন্দটাই তাদের চোখে পড়ে না। সমাজ গঠনমূলক অনেক কাজ পড়ে আছে। সমাজ বাদ দিলাম নিজেকে গড়ারও অনেক কাজ রয়েছে।
অহংকার পতনের মূল। অন্যের দোষ খোঁজা অহংকারের আলামত। নিজেকে পবিত্র ভেবে সাধারণত অন্যের দোষ খোঁজা হয়। প্রত্যেকে নিজের শুরু ও শেষ ভাবলে এ অহংকার থেকে আমরা বাঁচতে পারি। তুচ্ছ অপবিত্র শুক্রবিন্দু থেকে আমাদের জন্ম আর মৃত্যুর পর কবরের কিড়া মাকড়ের খাদ্য। জন্ম মৃত্যুর মাঝের সময়টায় বয়ে বেড়াচ্ছি সার্বক্ষণিক মলমূত্র।
শুধু যে দোষচর্চা ও সমালোচনা তা নয়; এই অপকর্মের সপক্ষে হাদিস কুরআন উপস্থাপনেরও নষ্ট চেষ্টা করছি। আমরা পুরো আলেম সমাজ ইদানীং এই দোষে দুষ্ট। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের পতনের জন্য খুব বেশি অপেক্ষা করতে হবে না।
অন্যের গলা কাটছি না নিজেদের গলা কাটছি- ছুরি চালানোর সময় সেটি ভাল করে দেখে নেওয়া উচিত। কেউ ইট ছুড়লে আমরা তাকে পাটকেল ছোড়া বৈধ মনে করছি। গালির জবাবে গালি দেওয়া ফরজ জ্ঞান করছি। গালির জবাবে গালি দেওয়া খুবই সহজ কর্ম। এতে আমাদের আলেমানা শান ফুটে ওঠে না। আমাদের বৈদগ্ধ বা গুণপনা ফোটে না। চরম অভদ্র আচরণ দ্বারা আমরা আমাদের ভেতরের অসভ্যতারই পরিচয় দিচ্ছি। ইদফা বিল্লাতি হিয়া আহসান- আয়াত কাদের জন্য নাযিল হয়েছে? সদাচারের হাদিসগুলি কাদের জন্য উঠিয়ে রেখেছি?
অন্যায়ের প্রতিবিধানে আমিও অন্যায় করলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে কে? আমাদের হীন মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া কি আমরা সভ্য সুন্দর সমাজ গড়তে পারব? স্বপ্ন দেখতে পারব উজ্জ্বল এক ভবিষ্যতের?
দিনে দিনে চরম প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠছি আমরা। কারও ভুল প্রতিক্রিয়ার উত্তর দিতে গিয়ে নিজেরাও প্রতিক্রিয়াশীলতার পরিচয় দিচ্ছি। এভাবে প্রতিক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া যে কোনো সুফল বয়ে আনবে না তা আমরা একদম বুঝতে পারছি না। অন্যকে অসম্মান করে যে নিজে সম্মানিত হওয়া যায় না সে বিষয়টি একবারের জন্যও ভাবছি না। প্রতিক্রিয়া নয় প্রয়োজন গঠনমূলক ক্রিয়ার। ইতিবাচক মনোভাবের বড় বেশি প্রয়োজন আজ। ভালোবাসার বড় অভাব। ঘৃণার প্রসার যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। এভাবে অন্ধকারে আচ্ছন্ন হতে দেওয়া যায় না ইলমী অঙ্গনগুলো। কোথায় গেল আমাদের নীতি নৈতিকতা বোধ? কোথায় হারালো আধ্যাত্মিকতা ও রূহানিয়াত?
আসুন সবাই অন্যকে ইযযত দেই। অন্য আলেমের কোনো কাজ আমার চোখে মন্দ হলে আমি তা পরিহার করে চলি। ইতিবাচক কাজে মনোযোগী হই। সম্প্রীতির সমাজ গড়ায় মনোনিবেশ করি। অপরাধ ক্ষমা করতে শিখি। হৃদয় সংকীর্ণ প্রকোষ্ঠ না বানিয়ে উদার আকাশ বানাই। ঔদার্য হোক আমাদের সবার চর্চার বিষয়। মা জাআলা আলাইকুম ফিদদীনি মিন হারাজ। আল্লাহ তোমাদের ধর্মে কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি। ঈমানদার বা আদর্শবান হবার অর্থ কখনওই গোড়া প্রতিক্রিয়াশীল বা সংকীর্ণ হীন মানসকিতার অধিকারী হওয়া নয়। আমরা যে পথে চলছি তা সাফল্যের পথ নয়। যেটাকে আমরা পা-িত্য মনে করছি তা কোনো পা-িত্য নয়। বেয়াদবী কখনও আদব হয় না, অহংকার কখনও বিনয় হয় না। রাতের তমসা কখনও ভোরের উজ্জ্বলতার রূপ পায় না। ভেতরের অভদ্রতা ঢাকতে চাইলেও ঢাকতে পারব না বাহ্যিক বিনয় দ্বারা।
যদি মস্তিষ্কের বিকার হয়ে থাকে মন্দকেই ভালো মনে করতে থাকি তাহলে কিছুই বলার নেই। সংকীর্ণতাকেই যদি ঈমান ও ইলমের দাবি মনে করি তা হলে কথা না বাড়ানোই ভালো। পশুকে কিছু বলা অর্থহীন। বোবা বধির অন্ধ হয়ে আছি তাহলে আমরা। আমাদের হেদায়েত দিতে পারবে না কোনো নবী বা রাসূলও। ভেতরের অন্ধত্ব ও বধিরতা যদি দূর না করতে পারি তাহলে কোনো কোরআন কিতাব আমাদের পথ দেখাতে পারবে না।
জানি আমার এ লেখাটিকেও অনেকে খোঁচা সাহিত্যের অংশ মনে করবেন। দরদিয়া মন আসলেই আমাদের মাঝে নেই। অন্যের প্রশংসা করলেও সেখানে খোঁচা থাকে। আরবিতে বলা হয় যাম বা সুরতে মাদাহ। নির্মোহ বিশ্লেষণেও থাকে স্বার্থ। নসীহতের আড়ালে থাকে অন্য উদ্দেশ্য। স্বার্থপরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের সবাইকে। এই খোঁচাখুচির ইতি টানতে হবে। পরস্পরে মতবিনিময়ের ধারা চালু করতে হবে। চরম বিরুদ্ধাভাবাপন্ন মানুষের সাথেও বসে কথা বলতে হবে। অন্যকে অবজ্ঞা করা বন্ধ করতে হবে এখন থেকেই। বড় হতে হলে ছোট হতে হয়। সম্মান পেতে চাইলে সম্মান দেওয়া শিখতে হয়।
আসুন মানবিক হই। পরমতসহিষ্ণু হই। দরদী হই। দাঈ হই। মতবিনিময় করি। নবী সা ও সাহাবীদের অনুসরণ করি। আকাবির আসলাফের শিক্ষা ধারণ করি অন্তরে। শত্রুকে আঘাত না করে বুকে টেনে নেওয়ার সংস্কৃতি চালু হোক বাঙালি আলিম সমাজে।
উম্মত হয়ে থাকুন; সম্প্রদায় হয়ে নয়। দুই জন তিনজন করে একেকটা ফেরকা বানিয়ে নিয়েছি আমরা। এই দুজন তিনজনের দল নয়; পুরো মানবসমাজের অংশ হয়ে থাকতে চেষ্টা করুন। এভাবে ঘৃণার বাণিজ্য করে যারা আমাদের ভ্রাতৃত্ব ও মনুষ্যত্ব নষ্ট করতে চাচ্ছে তাদের আজই হতাশ করুন। ক্ষমা উদারতা ভালোবাসা ও উম্মতপনার গুণে নিজেদের গুণান্বিত করুন। পরিশেষে মরহুম আকবর ইলাহাবাদির একটি কবিতা দিয়ে শেষ করব ক্ষুদ্র নিবেদন-
ও হাম সারি কিতাবে/ কাবিলে জবতি/ সমঝতে হ্যাঁয়
কি জিনকো পড়হকে/ বেটে বাপ কো/ খাবতি সমঝতে হ্যাঁয়
লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ, ঢাকা


