১৯শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ৫ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৫ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আমি গর্বিত

ছবি: ১৯৬৪ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে এক সমাবেশে মওলানা আবদুল হামিদ ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

আমি গর্বিত। গর্বে আমার বুক ভরে যায়। বুকে সাহস সঞ্চার হয়। কথা বলতে পারি বুক ফুলিয়ে। সকলের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। দরাজ কণ্ঠে সবাইকে জানাতে পারি আমরা ছোট নই। আমার পূর্বসূরীগণের বীরত্ব সবার সামনে ফুটিয়ে তুলতে কোনো দুর্বলতা নেই। তাঁদের কীর্তিগাঁথা অবলীলায় মানুষের কাছে জানাতে পারি। দেশ ও জাতির পরতে পরতে তাঁদের অবদান। এটা যেন আমার অহংকার।

আমাদের পূর্বসূরী বহু আলেম মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁদের কীর্তিতে এই সোনার দেশ স্বাধীন হয়েছিল। দেশ রক্ষার্থে স্বাধীনতা-সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। বাংলাদেশের মানচিত্র রক্ষার্থে হায়েনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন তাঁরা। স্বাধীন-সার্বভৌম ভূমির প্রতিটি ইঞ্চি ইঞ্চি মাটির সাথে মিশে আছে আমাদের পূর্বসূরী আলেমদের অবদান। আজও যেন তাঁদের রক্তের গন্ধ এ মাটিতে পাওয়া যায়। তাঁদের কর্মগুলো আজও ভেসে বেড়াচ্ছে। এদেশের সব জায়গাতে যেন সেসব বীরদের নাম লেখা রয়েছে।

১৯৭১ সন। স্বাধীনতা-সংগ্রাম। লক্ষ লক্ষ বাঙালী জীবন দিয়েছিল। দেশ বাঁচাতে তাদের ত্যাগ-কুরবানির শেষ নেই। তাদের বীরত্ব, তাদের সাহসিকতা বাঙালী জাতির মনে দাগ কেটে আছে। দেশের জন্য তাদের প্রচেষ্টা আজো স্মরনীয় হয়ে আছে। বাংলাদেশের সর্বত্র ছিল পাক হায়েনাদের নখের থাবা। নির্যাতনের ষ্টীমরোলার চালিয়েছিল তারা। কিন্তু বীর বাঙালীর সাহসিকতায় নাস্তানাবুদ হয়ে যায় তারা।

আজকাল আমাদের সন্তানেরা হীনমন্যতার শিকার। কারো সাথে জোর গলায় কথা বলতে পারে না। অথচ বহু উলামায়ে কেরাম মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। সরাসরি পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু তাদের ইতিহাস আজো আমাদের অজানা। এ প্রজন্মের সন্তানেরা কেউ জানেনা। তাছাড়া আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের কথা কেউ আলোচনা করে না। যে কারণে সকলের কাছে অজানা থেকে যায়।

আলেম সমাজ ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। শুধু তাই নয়, কিছু আলেম সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।

বর্তমানে বহু মানুষ মুক্তিযোদ্ধা দাবী করে। কতজন আছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। তারা সরকার বা বিভিন্ন মহল থেকে সুযোগ সুবিধা আদায় করে। অনেকে গল্প দিয়ে বেড়ায়। সেই সাথে আলেম-উলামাদের হেয় প্রতিপন্ন করে। কোনো মূল্য দিতে চায় না। বরং আলেমদের ঢালাও ভাবে স্বাধীনতা বিরোধী বলে কোনঠাসা করে থাকে। সুযোগ সুবিধা দেওয়া দূরের কথা, আলেমদের নিয়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের কাতারে দাঁড় করায়।

আচ্ছা কোনো আলেম কী স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল? কেউ দেশের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন? খোঁজ নিলে দেখা যাবে কোনো আলেম স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করেননি। বরং আলেম সমাজ ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। শুধু তাই নয়, কিছু আলেম সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। দেশ রক্ষার্থে তাদের অপরিসীম অবদান।

১৯৭১ সনে কিছু বেশধারী কিছু মানুষ স্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করেছিল। যাদের চিন্তা-চেতনা ইসলামী আকিদার পরিপন্থী। হক্কানী উলামায়ে কেরামের সাথে তাদের চিন্তা-চেতনার মিল নেই। ওরা ইসলামী দল নাম দিয়ে ইসলামী লেবাস পরে দেশ ও জাতির অপুরনীয় ক্ষতি করেছিল। আলেম না হয়ে আলেমদের বেশ ধরে ইসলামকে কলুষিত করেছিল। তাদের সেই স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকান্ডগুলো এখনো জাতির কাছে স্পষ্ট। সুতরাং তাদের সেই ভুল সিদ্ধান্তের বলী হতে হয় আলেম সমাজের। তাদের নির্বুদ্ধিতার কারণে দোষ গিয়ে পড়ে আলেম সমাজের উপরে। অথচ আলেমগণ ছিলেন নিরপরাধ। তাঁরা স্বাধীনতার বিপক্ষে নয়। বরং আলেম-উলামা প্রায় সবই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে।

এদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যেভাবে উলামায়ে দেওবন্দ ফুঁসে ওঠে ছিলেন। পরাক্রমশালী ব্রিটিশকে হটিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা। হাজার হাজার আলেম শাহাদাত বরণ করেছিলেন।তবুও ব্রিটিশদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেনি। তেমনি পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে আলেমগণ সংগ্রাম করেছিলেন। তাদের জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। জালেমদের সাথে কোন আপোস করেননি।

এখানে একটা কথা উল্লেখ করা জরুরী মনে করছি। স্বাধীনতা আন্দোলনে বিদেশী বন্ধু হিসাবে যিনি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এবং বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে বিশেষ সন্মানে ভূষিত। তিনি হলেন ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী (রহ.)। যিনি ১৯৭১ সনে ভারতের জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সভাপতি ছিলেন। হযরত আসআদ মাদানী স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ভারতে বসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরী করেন। পুরো ভারত জুড়ে ৩০০ মিটিং করেন। এমনকি আমেরিকা যখন সপ্তম নৌবহর প্রেরণ করেছিল, তখন দিল্লিতে ৫০০০০ পঞ্চাশ হাজারের অধিক মানুষ নিয়ে আমেরিকার দুতাবাস ঘেরাও করেন।

যেহেতু ফেদায়ে মিল্লাত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন প্রাণপুরুষ। তাই এদেশের আলেম সমাজ ফেদায়ে মিল্লাতের পরিপূর্ণ অনুগামী ছিলেন।

ফেদায়ে মিল্লাত ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের সূর্যসন্তান। আবার তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.) এর সাহেবজাদা। হযরত ফেদায়ে মিল্লাতের সাথে বাংলাদেশের আলেম সমাজের সখ্য বা প্রীতি ছিল। এদেশের আলেম সমাজ তাঁকে ছারে তাজ মনে করতেন। যেহেতু ফেদায়ে মিল্লাত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন প্রাণপুরুষ। তাই এদেশের আলেম সমাজ ফেদায়ে মিল্লাতের পরিপূর্ণ অনুগামী ছিলেন।

আলেম সমাজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জয়গান গেয়েছেন। সারাদেশে গোপনে-প্রকাশ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন। বহু দ্বীনি মাদ্রাসাতে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাটি ছিল। আলেমদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাগণ শলা-পরামর্শ করেছেন। তাদের কাছ থেকে দুআ নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছেন। মুক্তিযোদ্ধারা অধিকাংশ ছিল আল্লাহভীরু। যুদ্ধে যাওয়ার সময় আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছেন। দুআ করেছেন। ফরিয়াদ করেছেন তাঁর কাছে। তারপরে যুদ্ধে নেমে গেছেন।

বহু উলামা মাশায়েখ মুক্তিযুদ্ধে গেছেন। ৭১ সনে ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে নেমেছেন। তাঁরা দ্বীনি লাইনে যেমন ছিলেন সেরা। মাদ্রাসার অভ্যন্তরে মেধাবীমুখ। তারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে আলো ছড়িয়েছেন। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর কথা চিন্তা করুন। যিনি দারুল উলুম দেওবন্দের একজন মেধাবী ছাত্র। তিনি দেশে ফিরে রাজনীতি করেছেন। রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সফল। সেই মহান আলেমের মুক্তিযুদ্ধে বিশাল অবদান রয়েছে। এরকম বহু আলেমের কথা উঠে আসবে। যাদের সীমাহীন অবদান।

এজন্য আমাদের গর্ব। আমরা সেই সব আলেমদের নিয়ে গৌরব করতে পারি। মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদানে আমাদের বুকটা ভরে আসে। তারাই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। একদিকে তাঁরা হক্কানী-রব্বানী আলেম। আবার দেশ রক্ষায় তাদের সীমাহীন অবদান। তাই আমাদের উচিত, আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের কথা জাতির সামনে তুলে ধরা। তাদের বীরত্ব, তাদের কীর্তি মানুষকে জানায়ে দেয়া। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com