২৬শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ২৫শে জিলকদ, ১৪৪৩ হিজরি

আহত পাখি গায় ইশকের গান

কবি হাসান মাহমুদ

  • হাসান মাহমুদ

ইচ্ছে ডানায় ভর করে কল্পলোকে দেহের ইন্দ্রজালে আর প্রেমের মোহন কুহকে; আমি বিষাদ ছুঁই ডাহুকের পালক ভাঙার আওয়াজে। আমি বিষাদের প্রান্তর ছুঁয়েছি স্বজনের মুখোশ উন্মোচনে। চৈতন্যের ধূম্রজালে আট কুঠুরি নয় দরজার সম্মোহনে এক অচেনাকে চেনা হয়ে যায় ছায়াভাবনায়। অতঃপর একটা সুফি-মনের আমিই হয়ে উঠি উত্তম দীপক। আমি প্রেমের চিরায়ত ক্ষুধিত বিষাদ ছুঁয়ে চিত্রস্তনিত বোধ জাগিয়ে তুলি ভোরের সমীরণ গায়ে মেখে।

গোধূলির নৃত্য দেখে সূর্যাস্তের মতো আঁধারে গুমোট বেঁধে আবারও সূর্যের উদয়নে জ্বলে উঠি স্বপ্নালু সত্যের উদ্ভাসে। ছায়া সুনিবিড় আপেল বাগানে ভাবনার অথই সমুদ্দুরে ভেসে ওঠে তারকা আপেলের পাতা দু’রঙা কেন? তবে কী নারীপুরুষ একে ওপরের এপিঠ ওপিঠ! মানুষ কেন এত রহস্যময়! এসব ভাবনা কাটিয়ে পরমের চরণে অবনত মস্তকে স্বর্গের উপস্থিতি অবগাহন করি কল্পলোকে। আর আমার ইচ্ছে ডানা রঙিন হয়ে ওঠে যেন আকাশের নানান রঙ—রঙধনু সময়ে সময়ে রঙের বৈচিত্র্য মেখে নেয় আকাশে।

প্রেমের একটা ইন্দ্রজালিক সুর হৃদয়ে বেজে উঠে বিষাদ ছুঁয়ে। বিষাদের ছাপ চোখেমুখে লেগে থাকে যেন ঝলসানো চাঁদের মতো। আমি প্রেম সাঁতারে ডুবুরি হই দেহের প্রেমময় ব্যঞ্জনায়। এ দেহ মুক্তি দেয় না কখনো বা বিষাদ থেকে! বিষাদে পুড়ে ফালসাফার দুর্বোধ্য পাঠ হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয় মননের সঞ্জিবনী সজীব উদ্ভাবনী ভাবনায়। তখন প্রেমের বিষাদ খসে খসে পড়ে যায় পলেস্তরার মতো।

হৃদয়ের রহস্য ঘনঘোর ভাবনার হয়ে ওঠে অথই প্রেমের নাদ। সে নিনাদ বিষাদের প্রান্তর ছুঁয়ে যায় হেরার নুরে। সে নুরে ছুঁয়ে যাই গোলাপ। কাঁটায় ঘেরা গোলাপের সৌন্দর্য সবাই দেখে। কেউ তার বিষাদ ছুঁয়ে দেখে না! মানুষও তাই। প্রেমের সৌন্দর্য দেখে তবু প্রেমিকের ভাষা ভুলে যাওয়া কখনো পরখ করে দেখে না। গোলাপ যেমন কাঁটাবুকে লুকিয়ে রাখে ফুলের সৌন্দর্য; এমন করেই মনে বিষাদ লুকিয়ে রাখি আমি প্রত্যহ।

মনে হয় বিষাদ সুন্দর প্রেমের ভাষা বুঝতে পারায়। আমার প্রেমের ভাষা যেনবা হয়ে যায় দুর্বোধ্য মিশরের প্রত্নতত্ত্বের প্রাচীন ভাষা। মানুষের অর্ধেক যেন বিষাদে ভরপুর। জান্নাত থেকে পয়লা না পাওয়ার বেদনা পৃথিবীতে নিয়ে আসেন আদি পিতা আদম (আ.)। এ বিষাদ জিনগতভাবে আমরা বয়ে নিচ্ছি বিষাদ তৃপ্তিতে মহাকালের দিকে; মহাকাল এগিয়ে আসছে আমার জন্য প্রেমের তৃষ্ণা কিবা বিতৃষ্ণা নিয়ে।

মাঝেমাঝে মনে হয় জীবন ভেঙেচুরে যাচ্ছে প্রেমের অথই ঘোরে; দেনাপাওনার বেহিসাবিভার ক্লিষ্ট করে দিচ্ছে একটা জীবন। জীবন মানে থেমে থেমে দৌড়! হেরে যাওয়ার যন্ত্রণায় বিষাদে কাতর থাকা। জীবন ফিনিক্স পাখি নয়। এ জীবন যেন শিকারীর তূণীর থেকে ছুটে যাওয়া তীর।

জীবন বারবার ভেঙে যাওয়া বিভাজিত বন্ধন। বিভাজনের মাঝে সুখদুখমাখা স্মৃতির মেলবন্ধনে প্রেমালাপ। প্রেম নৈসর্গিক। প্রেম ঐশ্বরিকও তাই। এই জীবনসৃজনে প্রেম-বিরহের খেলা চলছে পৃথিবী সৃষ্টির আগ থেকেই! তুমি আমাকে বিষাদ ছুঁবে কী করে? তুমিও কী বিষাদ নও? বিষাদ তোমায় গ্রাস করে না! বিষাদ ছুঁয়েই জন্মেছি আমরা পৃথিবীতে। বিষাদ ছুঁয়েছে যারে একবার; তার কাছে প্রেম আর বিষাদ স্বর্গের আলিঙ্গন নয় কী!

আমরা আলোর কোরাস তুলেছি কণ্ঠে স্বর্গীয় আনন্দে। সে আলো দ্যূতি ছড়ায়। দূর করে অজ্ঞতার ঘনঘোর অন্ধকার। প্রেমের মিছিলে আলোর সঙ্গীত আমাদের প্রাত্যহিক আরাধনা। প্রেমের আরাধনায় ঔদ্ধত্যের ঢিল ছুঁড়তে চায়, যার ভেতরে ইশক ভাঙার আগুন। আমি বলছি সেই দুষ্টের কথা; যে সারাক্ষণ বনি আদমকে প্ররোচনায় রাখে।

প্রেমের ভাষা দুর্বোধ্যপ্রাচীরও ভেঙে দেয়। আমাদের ভেতরে জিইয়ে রাখি আলাসতু বিরব্বিকুমের পাঠ—আর ক্বালু বালার প্রেমময় জলসা। সে জলসায় সুফিদের ইশকের প্রেমের সন্তরণ দেখি। দেখি প্রেমময় মানুষের বুক ঝাঁঝরা করা ইশকের জিকিরও। জিকির প্রেমিকদের জন্য অমৃত। মৃগনাভি থেকে যে কস্তুরির ঘ্রাণ সুবাস ছড়ায়—তারচেয়েও বেশি সুবাস ছড়ায় প্রেমের জিকির। আমি বহুবার ভেবে ভেবে চৈতন্যের অচেতন ঘোরে নিজেকে। আবিষ্কার করেছি—আমরা প্রেমের জিকিরে উৎস থেকে নির্বাসিত হয়েছি। পৃথিবী আমাদের নির্বাসন। এই নির্বাসন শেষে মাবুদের সাথে যে প্রেমের মোলাকাত হবে—সেটা নির্বাসনের প্রাপ্তি।

সে প্রাপ্তি কারও জন্য সুখের। কারও জন্য দুঃখের হবে। পৃথিবীতে সুখদুঃখের কত বর্ণিল আখ্যান-উপাখ্যান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রতিটি মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে। জীবনে বহুমাত্রিক সুখ আসে। বিপরীতে দুঃখও আসে তারও বেশি। দুঃখের ভাষা ও দুঃখীর ভাষা একই ভাবে তৈরি হয় বেদনা থেকে। যার বেদনা যত বেশি—সে তত পৃথিবীটাকে উপলব্ধি করেছে বেদনাকে উপজীব্য করে। সুখদুঃখেরও নানাবিধ স্তর আছে।

আমার দুঃখের ভাষা ও বেদনার ভাষা দৈহিক ও মানসিক। দেহের বেদনায় মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিপর্যয় আসে। আমি নিজেকে প্রতিদিন ভেঙে যেতে দেখেছি। আবার গড়তেও দেখেছি। এই ভাঙাগড়া আমার ভেতর প্রতিদিন খেলা করে চলছে। এই ভাঙাগড়ার খেলা আরও বহু মানুষের মাঝে দেখেছি। তবে প্রতিটি মানুষের বেদনার রূপ ভিন্নরকম। রকমারি দুঃখ প্রতিটি মানুষকে গ্রাস করে। কেউ তা টের পায় আপাদমস্তক দুঃখ ঝাঁকিয়ে দিলে। কেউ বা সামান্য সুখকে অনন্ত সুখ মনে করে তা আঁচ করতেও পারে না।

সুখদুঃখ ও দেনাপাওনার এই পৃথিবীকে কেউ করে তুলে সুখের প্রাসাদ। আবার কেউ বিষিয়ে তুলে বিষের বাঁশি। সে বাঁশি কখনো মনে সুর তোলে। আবার কখনো বিষাদ বাজায়। বোধিঋদ্ধ মানুষ শুধু প্রেমের সুর ধরতে পারে এমনটি নয়। তাঁরা ধরতে পারে গভীরতর ও ঊর্ধ্বতর বোধির আত্মার ঝলক। প্রেমের ভাষা যে দ্যোতনা সৃষ্টি করে প্রেমিক—সে প্রেমের উচ্ছ্বাস শুধু বুঝতে পারে সুফি মন। আমি একুশশতকে এসেও বহু সুফির সান্নিধ্য পেয়েছি! এ আমার পরম সৌভাগ্য।

তাঁদের স্পর্শ আমায় নিয়ে গেছে বাগদাদের সুফিদের জ্ঞান সাধনায়। কখনোবা প্রতিকীরূপে কোনো সুফি দাঁড়িয়ে ছিলেন আমার সামনে। আমি যেন কল্পলোকে ছুঁয়েছি ইবনে আরাবির যুগ। পেয়েছি রুমির মসনবির কোমল স্পর্শ। রুমি যেন আবার বিরহের সুর তুলছেন তাঁর হৃদয়ের গহিন থেকে সামসে তাবরিজির খোঁজে। একটা গোলকধাঁধা বেঁধে যাচ্ছে ইদানীং ইশকের স্পর্শে। যে ইশকের জন্ম হয় কলুষিত হৃদয়ে—সে হৃদয় নুরে ভরপুর হয়ে যায় যেভাবে বৃষ্টির পানি খানাখন্দকে পানি দিয়ে ভরপুর করে দেয়।

আজকাল যেন আমায় সারল্য বেশিই ভর করে! শাস্ত্রজাত অর্থময়তা মনে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠছে ক্রমশ। বহির্জগত ও অন্তর্জগতের ঘনঘোর রহস্য উন্মোচন হচ্ছে প্রেমের মোড়ক ছিঁড়ে কখনো বা মনে হয় রূহপাখি মানুষের এত অধরা কেন? কেন মানুষ তাঁর খাঁচায় তাকে বশ করতে পারে না! তবে কী রূহপাখি তাঁর প্রেমিক মাবুদের কাছে ছটফট করে ছুটতে চায়। আবার পাঠ নিতে চায় রবের স্বীকারোক্তির! বহুধা বিভক্ত ধর্মও ছিল না যেখানে—সবাই তাঁর রবকে স্বীকার করেছিল? এসব প্রশ্ন আজকাল বড়ই চিন্তায় ফেলে দেয় আমাকে। আবার মনে হয় রব তাঁর প্রেমকে মানুষের মাঝে আবারও বিলাতে চান মানুষ সৃষ্টির শুরুর মতো।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com