৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ , ২৫শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১৬ই রজব, ১৪৪৪ হিজরি

ইমরান খানকে পিটিআই চেয়ারম্যানের পদ ছাড়তে নোটিশ ইসির

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা ইমরান খানকে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফের (পিটিআই) চেয়ারম্যানের পদ ছাড়তে নোটিশ দিয়েছে দেশটির নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মঙ্গলবার এই নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

বিতর্কিত তোশাখানা মামলায় ইমরান খানের পরাজয়ের জেরেই জারি করা হয়েছে এ নোটিশ—উল্লেখ করে পাকিস্তানের জাতীয় দৈনিক ডনের এক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই আদেশের ওপর শুনানি ও ইমরান খানকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট দিনও ধার্য করেছে ইসি। সেই দিনটি হলো ১৩ ডিসেম্বর।

এর আগে গত ২১ অক্টোবর একই ইস্যুতে ইমরানের পার্লামেন্ট সদস্যপদ বাতিলসহ আগামী জাতীয় ও প্রাদেশিক যে কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ইসি। পরে ইসলামাবাদ হাই কোর্টের এক আদেশে সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয়।

ইমরান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ— পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বাইরের বিভিন্ন সরকারপ্রধান ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে যেসব দামি উপহার তিনি পেয়েছিলেন, সেসব সম্পর্কে তোশাখানা কর্তৃপক্ষকে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন তিনি।

এ অভিযোগে ইসিতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল এবং তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হয়ওয়ার পরই এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল কমিশন।

১৯৭৪ পাকিস্তানের সরকারি একটি বিভাগ হিসেবে তোশাখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই বিভাগটি প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, আইনপ্রণেতা, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও অন্যান্য বিশিষ্ট জনদের দেওয়া উপহার জমা রাখে।

পাকিস্তানের আইন অনুযায়ী, দেশটির প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, আইনপ্রণেতা বা সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাদের পাওয়া সব উপহার অবশ্যই এই বিভাগে জমা দিতে হবে। যারা এসব উপহার পেয়েছেন তারা চাইলে পরে সেগুলো কিনে নিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে উপহারের বর্তমান যা বাজারমূল্য, তার ৫০ শতাংশ হ্রাসকৃত মূল্যে তা কেনার সুযোগ আছে তাদের।

গত অগাস্টে পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন জোট সরকারের সবচেয়ে বড় শরিক দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ- নওয়াজের (পিএমএলএন) সদস্য মোহসনি নওয়াজ রানঝা ইমরানের বিরুদ্ধে তোশাখানায় অনিয়মের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৮ সাল থেকে ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বাইরের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন উপহারের বাজারমূল্য সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছেন ইমরান খান, তাতে সেসব মূল্যের দাম অনেক কম দেখানো হয়েছে।

এবং প্রদর্শিত দামের ভিত্তিতে হ্রাসকৃত মূল্যের সুবিধা নিয়ে তোশাখানা থেকে সেসব উপহার ক্রয়ের পর ইমরান খান বেশি দামে সেগুলো বাইরে বিক্রি করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল মামলার অভিযোগপত্রে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ২৮টি উপহারের বাক্স পেয়েছিলেন ইমরান খান। তোশাখানার নথিপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, তার গ্রহণ করা বিভিন্ন উপহারের সম্মিলিত বাজারমূল্য ২ কোটি ১৫ লাখ রুপি।

কিন্তু নির্বাচন কমিশনের তদন্ত শুরুর পর জানা যায়, বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী তোশাখানায় ইমরানের জমা দেওয়া উপহারগুলোর মূল্য কমপক্ষে ১৪ কোটি ২০ লাখ রুপি।

পাকিস্তানের সংবিধানের ৬২ ও ৬৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো দলের শীর্ষ নেতা যদি সরকারপ্রধানের পদে থাকা অবস্থায় তোশাখানায় তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়মের আশ্রয় নেন, সেক্ষেত্রে তাকে দলীয় প্রধানের পদ থেকে সরে যেতে নোটিশ জারির এক্তিয়ার রাখে নির্বাচন কমিশন।

এবং আত্মপক্ষ সমর্থনে যদি জোরালো যুক্তি না থাকে, সেক্ষেত্রে অভিযুক্ত কমিশনের আদেশ মেনে নিতে বাধ্য।

২০১৮ সালে এ বিষয়ক এক পিটিশনের রায়ে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টও বলেছেন, কোনো রাজনীতিক সংবিধানের ৬২ ও ৬৩ নম্বর ধারার অধীনে অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হলে তিনি আর দলের শীর্ষপদে থাকতে পারবেন না।

এর আগে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির বৃহত্তম রাজনৈতিক দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) চেয়ারম্যান নওয়াজ শরিফও ৬২ নম্বর ধারায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় দলের শীর্ষ নেতার পদ হারিয়েছেন।

সফল ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ইমরান খান ২০১৮ সালের নির্বাচনে জিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদতে সরকারপ্রধান হলেও এক বছরের মধ্যেই সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয় তার।

তার জেরে চলতি ২০২২ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টে বিরোধী এমপিদের অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রীর পদ হারান ইমরান খান।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের শুরু ১৯৫৮ সাল থেকে। তার আগে ও পরে দেশটিতে যতজন প্রধানমন্ত্রী এসেছেন, তাদের কেউই নিজেদের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি।

ইমরান খানও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি, তবে পাকিস্তানের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী— যাকে বিরোধীদের অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারাতে হয়েছে।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com