১৩ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ২৯শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১৪ই মহর্‌রম, ১৪৪৪ হিজরি

ঈদের আভাস নেই বন্যাদুর্গত এলাকায়

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : সুনামগঞ্জে নদ-নদীর পানি কমতে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ঈদুল আজহার কোনো উচ্ছ্বাস নেই। ঘরবাড়ি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় হতদরিদ্র মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এদিকে সিলেটের বেশির ভাগ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

রাজবাড়ীতে পদ্মার পানি বাড়তে থাকায় নদীভাঙনে ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও গ্রামীণ সড়ক এখনো পানিতে ডুবে আছে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় জেলার ১১টি উপজেলার ৪৫ হাজার ২৮৮টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চার হাজার ৭৪৭টি ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪০ হাজার ৫৪১টি বাড়ি। যাদের ঘরবাড়ি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও গ্রামভিত্তিক তালিকা করা হচ্ছে।

বন্যায় ভেঙে যাওয়া ঘর নির্মাণ নিয়ে বেশ চিন্তিত সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গোয়াছুরা গ্রামের বাসিন্দা দিলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ, আউরো (হাওর) জাল পাতাইয়া মাছ ধইরা সংসার চালাই। গেছে বৈশাগে ধান কাটা গিয়া ১০-১৫ মণ ধান পাইছলাম। ই হুকনা (শুকনা) ধান বইন্যার পাইন্যে নষ্ট কইরা গিছে। হুকাইবার জাগা নাই। অনে আশরে (হাঁস) খাওয়ায়রাম। অনে তিন বাচ্চা ও বউ নিয়ে কিলা সংসার চালাইমু, ই চিন্তায় ঘুম আসে না।’

একই গ্রামের জসিম উদ্দিন বলেন, ‘গ্রামের ১৬০টি ঘরের মইধ্যে ৬০-৭০টি ঘর দেখার আউরের ঢেউ ও ঝড় ভাইঙ্গা নিছে। এখন থাকার উপযোগী না। ই ঘরগুলো আর উঠাইতাম পারতাম না আমরা। ইবার ঈদ নাই আমরার ঘরো, পরবার জামা, ঘুমাইবার বিছনা-বালিশ কুন্তা নাই।’

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের হাজেরা বেগমের স্বামী দিনমজুর। বসতভিটা নেই। তাই বাবার বাড়িতে মাটির ঘর করে থাকতেন। কিন্তু বন্যায় ধসে পড়েছে সেই ঘর। এখন প্রতিবেশীর বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছেন হাজেরা বেগম। তিনি বলেন, ‘ঘর-দুয়ারের হঙ্গে বিছানাপত্র, কাঁথা-বালিশ সব নষ্ট অই গিছে। অনে ভাঙ্গা ঘরো আইয়াও লাভ নাই। মাইনসের বারান্দাত দিন-রাত কাটায়রাম। আবার ঘর বানাইমু ই খেমতা (ক্ষমতা) নাই। বইন্যায় ঈদের কথা ভুলাইলিছে হকলরে (সবাইকে)। ঈদোর আনন্দ ভুইল্যা মানুষ কিলা বাঁচতো হেই টেনশন করের।’

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মঈনুল হক বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামের বেশ কিছু পরিবারের ঘরবাড়ি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের তালিকা করা হচ্ছে।’

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ঘরবাড়ির সংখ্যা চিহ্নিত করেছি। যাদের ঘরবাড়ি একেবারে ভেঙে গেছে, তাদের তালিকা করে পুনর্বাসনে পাঠানোর কাজ চলছে।’

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘আমরা বন্যাদুর্গতের পুনর্বাসনে মহাপরিকল্পনা নেওয়ার চিন্তা করছি। এখন ত্রাণ ও নির্মাণ দুটিই চলবে। বন্যাদুর্গত কোনো মানুষ না খেয়ে মরবে না।’

এদিকে সিলেটের বেশির ভাগ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কানাইঘাট পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি আগের দিনের তুলনায় ৮ সেন্টিমিটার কমে গতকাল বিপত্সীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং সিলেট পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ৩৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জ

কিগঞ্জের অমলসিদে কুশিয়ারার পানি আগের দিনের তুলনায় কিছুটা বেড়ে বিপত্সীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, বিয়ানীবাজারের শেওলা পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপত্সীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং ফেঞ্চুগঞ্জে ৮ সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ৯৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বিপত্সীমার নিচ দিয়ে চলা সারি নদীর পানি আগের দিনের তুলনায় ৮৯ সেন্টিমিটার কমে গতকাল বিপত্সীমার ২০৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।

এতে সিলেটের গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাটসহ কয়েকটি উপজেলায় বন্যার পানি তিন থেকে চার ইঞ্চির মতো কমলেও সিলেট সদর, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, বিয়ানীবাজার, বিশ্বনাথসহ বেশির ভাগ এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে ফেঞ্চুগঞ্জ ও জকিগঞ্জ উপজেলায় বন্যার পানি আরো চার ইঞ্চির মতো বেড়েছে।

এদিকে ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমারসহ সব কয়টি নদ-নদীর পানি কমতে থাকায় কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়েছে। পানি নামতে শুরু করলেও চর ও নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে এখনো পানি জমে আছে। এরই মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছে। তবে রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় এবং পানি জমে থাকায় যাতায়াত করতে ভোগান্তিতে পড়েছে স্থানীয় লোকজন।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের ছত্রপুর, গারুহারা, শিতাইঝাড়, যাত্রাপুরের ধল্লারপাড়, চাকেন্দারপাড়, মণ্ডলপাড়া, মরাগ্রাম, দোয়ালীপাড়া, ভুসিরভিটা, পাইকের ভিটাসহ কয়েকটি গ্রামের ঘরবাড়ি, সড়ক ও আবাদি জমি এখনো পানিতে নিমজ্জিত। কোথাও কোমরপানি, আবার কোথাও হাঁটুপানি জমে আছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জানান, এসব গ্রামের পাঁচ শতাধিক পরিবার এখনো পানিবন্দি।

যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য রহিম উদ্দিন রিপন জানান, গারুহারা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ না থাকায় তিনটি ওয়ার্ড পানিতে ডুবে আছে। নৌকা না থাকায় যাতায়াত করতে পারছে না মানুষ।

চাকেন্দাপাড়া গ্রামের ছামসুল হক জানান, চলাচলের রাস্তায় এখনো হাঁটুপানি। তাই সাইকেল বা মোটরসাইকেল নিয়ে কোথাও যাওয়া যাচ্ছে না। কোরবানির হাটে গরু-ছাগল নিয়ে যেতে সমস্যা হচ্ছে।

এসব গ্রামের বানভাসিদের অভিযোগ, ব্রহ্মপুত্রের চরে অনেকেই ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মূল ভূখণ্ডের বানভাসিরা এখনো ত্রাণ পাচ্ছে না। চাকেন্দাপাড়ার আম্বিয়া বেগম বলেন, ‘মাল আইসে খালি চর যায়। আমার এত্তি কাইয়ো দেয় না। হামরা খায়া না খায়া দিন কাটাই।’

যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, চর এলাকার তুলনায় মূল ভূখণ্ডে ত্রাণ সহায়তা কম যাচ্ছে। এসব এলাকায় চাহিদামতো বরাদ্দ না পাওয়ায় অনেকেই ত্রাণ সহায়তা পায়নি।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com