২২শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৬ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৪ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

উগ্রবাদ নয়, সৌহার্দের কথা বলে ইসলাম

  • মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান

জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ বর্তমান বিশ্বের একটি মৌলিক সমস্যা। বিশেষত মুসলমানদের জন্য এ সমস্যা নিজেদের অস্তিত্ত্ব সংকট সৃষ্টি করছে। ইসলাম ও মুসলমানদের বদনাম করা হচ্ছে উগ্রবাদের কৃত্রিম প্রসার ঘটিয়ে। ইসলামের মূলে কোনো স্থান নেই কট্টরপন্থা ও অস্বাভাবিক উগ্র মানসিকতার। শাশ্বত শান্তি সম্প্রীতি ও সৌহার্দের কথা বলে ইসলাম। সমাজের বিশৃংখলা বা অরাজকতা সৃষ্টির সব পথ রোধ করে দিয়েছে আল কুরআন ও সুন্নাতুররাসূল। নবীজী (সা.) এর পবিত্র সিরাত ও সাহাবায়ে কেরামের মহান জীবনাদর্শ এর উজ্জল নমুনা। তাদের সোনালী জীবনে দেখা যায় কিভাবে সমাজের শান্তি শৃংখলার জন্য তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন সব পরিস্থিতিতে।

একটি হচ্ছে জিহাদ আরেকটি হচ্ছে সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ। দুইয়ের মাঝে আসমান জমিন পার্থক্য। জিহাদ একটি পবিত্র শব্দ। এর অর্থ চেষ্টা। শান্তির জন্য প্রচেষ্টা। সন্ত্রাস ও বিশৃংখলা নির্মুল করার নিমিত্তে এবং সার্বিক সামাজিক কল্যাণের উদ্দেশ্যে নিঃস্বার্থভাবে যে প্রয়াস গ্রহণ করা হয় তাকে বলা হয় জিহাদ। একমাত্র আল্লাহকে রাজি খুশি করাই হয় তার উদ্দেশ্য। পক্ষান্তরে সন্ত্রাস হচ্ছে সমাজের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করা। অনেক সময় ধর্মের নাম দিয়ে এমন অরাজকতা করা হয়। কিন্তু বিসমিল্লাহ বলে কোনো অপকর্ম করলে যেমন তা সাওয়াবের হয় না। ধর্মের নাম ব্যবহার করে কোনো সন্ত্রাস ঘটালে তাও কখনও ধর্মীয় আমল হতে পারে না।

জিহাদের একটা অংশ হচ্ছে কিতাল। কিতাল অর্থ যুদ্ধ। যুদ্ধ একক কোনো বিশৃংখল হামলার নাম নয়। এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তির সাথে মারামারি করলে তাকে যুদ্ধ বলে না। যুদ্ধ একটি রাষ্ট্রিয় বিষয়। যেখানে কোনো রাষ্ট্রের আনুকূল্য থাকে না বরং রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে রাষ্ট্রের সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে নিজের স্বজাতির রাষ্ট্রিয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সুসংবদ্ধ কোনো প্রয়াস নেওয়া হয় তা কখনও যুদ্ধ বা কিতাল হতে পারে না। এ ধরনের কর্মতৎপরতা স্পষ্টই সন্ত্রাস। ইসলামে এ ধরনের হাঙ্গামা ও মারামারির কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

সিরিয়া ইরাক ও লেবাননে আই এসএর অনুসারীরা ইসলামি এস্টেট কায়েমের নামে এ ধরনের আক্রমণ পরিচালনা করেছে। পাকিস্তানে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে আল-কায়েদা, পাকিস্তানি তালেবান, হরকাতুল জিহাদসহ বিভিন্ন সংগঠন। মিসরে ও আফ্রিকার কিছু দেশে ইতোপূর্বে হয়েছে ধর্মের নামে নানা অরাজকতা। সম্প্রতি আমাদের বাংলাদেশেও এ চিন্তা চেতনার প্রসার ঘটানোর চেষ্টা চলছে। তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপ্তির এ সময়ে উগ্র চিন্তা চেতনা দ্বারা বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষই প্রভাবিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রয়োজন বিশেষভাবে সচেতন থাকা।

বিশ্বে আজ দুর্বলদের উপর সবলরা বাড়িয়ে দিয়েছে অত্যাচার নিপীড়নের হাত। আর্থসামাজিক বাস্তবতায় বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের দুর্বলতার কারণেই নিপীড়িত হতে হচ্ছে নিদারুণভাবে। এধরনের পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী? তা ভাবার বিষয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে করণীয় নির্ধারণ করতে হলে নবীজীর সিরাত আমাদের দেখতে হবে।

প্রথম কথা হচ্ছে ইসলাম কেবল মুসলমানদের কষ্টে সমব্যথী হবার শিক্ষা দেয় না। যে কোনো ধর্ম বর্ণের নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা নবীজী আমাদের দিয়েছেন। মাজলুম যে কোনো ধর্মেরই হোক না কেন তার প্রতি সহমর্মী হতে হবে। জালিমকে সাধ্যমত নিবৃত করতে হবে জুলুম থেকে। এটাই নবীজীর শিক্ষা।

মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতি খেয়াল করুন। মক্কা মুকাররমা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নবীজী (সা.) কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে নিয়েছিলেন? ইতিহাসে তাকালে আমরা দেখতে পাই, বানু খুজাআকে রক্ষা করতে নবীজী মক্কা আক্রমণ করেছিলেন। বানু খুজাআ তখনও ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়নি। খুজাআ মুসলমানদের মিত্র ছিল সত্য কিন্তু তারা মুসলমান ছিল না, তারা ছিল মুশরিক । এই মুশরিকরা জুলুমের শিকার হলে নবীজী মক্কার কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন।

আন্তর্জাতিক বিষয়ে কোনো নবীন বা কাঁচা বয়সের কারো অদূরদর্শী চিন্তা গ্রহণ করা নিতান্ত নির্বুদ্ধিতার শামিল।

মক্কা বিজয়ের ঘটনা ঘটে অষ্টম হিজরি সনে। এর মাত্র দু’বছর আগে হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়ের দিকে খেয়াল করুন। হযরত আবু জান্দাল (রা.) পায়ে শেকল নিয়ে মুসলমানদের কাছে আসলেন। মুসলমানদের কাছে তিনি আশ্রয় প্রার্থনা করেন। তা সত্ত্বেও নবীজী (সা.) তাকে মক্কাবাসীদের হাতে ছেড়ে দিলেন। মক্কায় তখন অনেক মুসলিম নারী পুরুষ হযরত আবু জান্দালের মতই নির্যাতিত হচ্ছিল। নবীজী তাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে মুক্ত করার চিন্তা করলেন না। বরং কাফেরদের হাতে রেখে দিলেন। নবী (সা.) তার এ কাজের দ্বারা মূলত আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক আমাদেরকে স্থিরভাবে ভাবতে হবে। এমন কোনো কর্মপরিকল্পনা করা যাবে না যার দ্বারা ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি হয়।

অশান্তভাবে কোনো তড়িৎ সিদ্ধান্তের দ্বারা আমরা কি ইসলামের বা মুসলমানদের কোনো উপকার করতে পারব? অসহনশীল হলেই যদি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত তাহলে আর স্থির সুবুদ্ধির প্রয়োজন হতো না। জাতীয় বা আন্তর্জাতিক বিষয়ে কোনো নবীন বা কাঁচা বয়সের কারো অদূরদর্শী চিন্তা গ্রহণ করা নিতান্ত নির্বুদ্ধিতার শামিল। রাসূল (সা.) এদের বলেছেন, সুফাহাউল আহলাম, হুদাসাউল আসনান। বয়স কম, বুদ্ধি কাচা। উগ্রচিন্তায় আক্রান্ত অধিকাংশের ক্ষেত্রেই নবীজীর এ কথা প্রযোজ্য। তাদের সম্পর্কে যে কথা বলা হয়েছে তার কয়েকটি বর্ণনা এখানে তুলে ধরা হলো-

ياتي في اخر الزمان قوم حدثاء الاسنان سفهاء الاحلام يقولون من خير قول البرية يمرقون من الاسلام كما يمرق السهم من الرمية لا يجاوز ايمانهم حناجرهم- اخرجه البخاري عن علي

و عن ابي سعيد الخدري: يخرج فيكم قوم تحقرون صلاتكم مع صلاتهم و صيامكم مع صيامهم و اعمالكم مع اعمالهم يقراون القران و لا يجاوز حناجرهم هم شر الخلق و الخليقة يدعون الى كتاب الله و ليسوا منه في شيء

و عن ابن عمر: كلما خرج منهم قرن قطعه الله

و عن سهل بن حنيف: يتيه قوم قبل المشرق محلقة رؤوسهم

و عن ابي امامة: هم كلاب النار

و عن عبدالله بن عمرو: يوشك ان ياتي قوم يتلون كتاب الله و هم اعداؤه

এসব বর্ণনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি উগ্রবাদীদেরকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব বলা হয়েছে। এক বর্ণনায় জাহান্নামের কুকুর বলে অভিহিত করা হয়েছে। উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে তারা। তারা কুরআনের দিকে ডাকবে কিন্তু তারা কুরআনের শত্রু হবে। তারা কুরআন তেলাওয়াত করবে কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালির নিচে নামবে না। তাদের কেউ কেউ অনেক আমল করবে। তারা কুরআন চর্চা করবে। সুন্দর সুন্দর কথা বলবে। কিন্তু তারা মুসলমানদের হত্যা করবে। তাদের কখনও উত্থান হলেও খুব দ্রুতই তারা অবদমিত হবে। কখনওই তারা চূড়ান্ত বিজয়ী হতে পারবে না।

এই উগ্রবাদীদের আরেকটি দল যারা শেষ যুগে আসবে তাদের বিশেষ বিবরণ দেওয়া হয়েছে অন্য বর্ণনায়-

يخرج في اخر الزمان رجال يختلون الدنيا بالدين يلبسون للناس جلود الضان من اللين السنتهم احلى من السكر وقلوبهم قلوب الذياب يقول الله ابي تغترون ام علي تجترؤون فبي حلفت لابعثن على اولئك منهم فتنة تدع الحليم منهم حيرانا- اخرجه الترمذي عن ابي هريرة

শেষ যুগে কিছু মানুষ এমন বের হবে যারা ধর্মের দ্বারা দুনিয়া উপার্জন করবে। তাদের কথা সুন্দর হবে কিন্তু তাদের হৃদয় হবে নেকড়ের মত হিংস্র। আল্লাহ তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন, তোমরা আমার ব্যাপারে প্রবঞ্চিত হচ্ছো, না কি আমার উপর দুঃসাহস দেখাচ্ছ? আমার সত্তার শপথ, তাদের জন্য আমি এমন একটি ফিতনা পাঠাবো যে, তাদের ভেতর যে হবে সর্বাধিক সহনশীল তাকেও সেই ফিতনা অস্থির করে রাখবে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রথম যুগের উগ্রবাদীদের সাথে বর্তমান যুগের জঙ্গিদের একটি মৌলিক পার্থক্য। সাহাবীদের যুগে সাধারণ মানুষের ভেতর যেহেতু আমলের আগ্রহ ছিল, তাই তখন যারা উগ্রবাদে জড়িয়ে ছিল তাদেরকে দেখা যায় খুব আমল করতে। হযরত আলি (রা.) কে হত্যা করেছিল আব্দুর রহমান ইবন মুলজিম নামক জনৈক খারেজি। তাকে জনগণ যখন ধরে নিয়ে যাচ্ছিল সে বলছিল, ‘আমার সব অঙ্গ কেটে ফেল তবু জিভ যেন না কাটো। আমার মন চায় ধড়ে যতক্ষণ প্রাণ থাকে আমি যেন এই জিভ দিয়ে আল্লাহ আল্লাহ যিকির করে যেতে পারি।’ এ থেকেই বোঝা যায় সেযুগে উগ্রবাদীরা কত আমল করত।

ফিতনা ফাসাদ ও সন্ত্রাস ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই তারা আল্লাহর হুকুমতের কথা আওড়াচ্ছে।

আর বর্তমান সময়ের সাধারণ মানুষের ভেতর আমলের প্রেরণা না থাকায় বর্তমানের উগ্রবাদীরা আমলের দিকে অগ্রসর নয়। তাদের দেখা যায় আমলে শত ত্রুটি থাকলেও কেবল ইসলামি স্টেট কায়েমের চিন্তা চেতনার কারণেই তারা নিজেদেরকে পাক্কা ইমানদার মনে করে। মুখে ইসলাম ইসলাম করে কিন্তু তাদের কাছে নিরীহ মানুষকে হত্যা ও রক্তপাতের চেয়ে উৎকৃষ্ট কোনো কাজ নেই। ইসলামের মূল শিক্ষা বানিয়ে দিয়েছে তারা হানাহানি মারামারি ও রক্তপাতকে। সাধারণ মানুষ অনেক সময় তাদের সুন্দর কথার জালে ধরা পড়ে। আমলহীন ইসলামে আকর্ষণ অনুভব করে। কুচক্রিরা এই সরলপ্রাণ মানুষদের ধীরে ধীরে উগ্রবাদে দীক্ষিত করতে থাকে।

৩৮ হিজরি সনে সিফফিন যুদ্ধের পর হারুরায় উগ্র মানসিকতার কিছু লোক আব্দুল্লাহ বিন ওয়াহাব আররাসিবির নেতৃত্ত্বে জমায়েত হয়। কুফায় তাদের কিছু সংখ্যক জুমার নামাজের খুতবার সময় হযরত আলির সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করতে থাকে ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ। হুকুম চলবে একমাত্র আল্লাহর। হযরত আলি তখন তার ঐতিহাসিক উক্তি করেন- ‌‌’কালিমাতু হাক্কিন উরিদা বিহাল বাতিল’। কথা সত্য কিন্তু উদ্দেশ্য ভালো নয়। ফিতনা ফাসাদ ও সন্ত্রাস ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই তারা আল্লাহর হুকুমতের কথা আওড়াচ্ছে। একাধিক যুদ্ধ সংগঠিত হয় তাদের সাথে। বাগদাদের কাছে নাহরাওয়ান নামক স্থানের যুদ্ধে তারা পরাজিত হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে।

হজরত আলির পরে তারা পৃথকভাবে কোথাও সংঘবদ্ধ হতে পারে না। মুআবিয়া (রা.) এর মৃত্যুর পর হযরত ইবন যোবায়েরের সাথে থেকে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। যুদ্ধ শেষে যখন জানতে পারে ইবন যোবায়ের (রা.) হযরত আলিকে কাফের মনে করেন না, হযরত উসমান (রা.) এরও প্রশংসা করেন তখন তাদের একদল বসরা, অপর দল ইয়ামামায় স্থানান্তর হয়। উমাইয়াদের আমলে তারা বহু জনপদ ধ্বংস করে, বহু মুসলমানের রক্ত ঝরায়।

খলীফা হযরত উমর ইবন আব্দুল আযীয (রহ.) এর খেলাফত কালে তাদের কর্মতৎপরতা থেমে যায়। অন্য উমাইয়া শাসকদের সময় তাদের দমানো সম্ভব হয়নি। কোনো যুদ্ধ ছাড়াই উমর ইবন আব্দুল আযিযের সময় খারেজিদের অবদমিত হবার কারণ খুবই স্পষ্ট। তার আমলে তিনি সর্বসাধারণের মাঝে সঠিক ধর্মীয় জ্ঞানের প্রসার ঘটান। এর মাধ্যমেই উগ্রবাদীদের মূলোৎপাটন সহজ হয়ে যায়। তার খেলাফতকাল ছিল খুব সামান্য। ৯৯ হিজরি থেকে ১০১ হিজরি। মাত্র আড়াই বছরের এ সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি জনসাধারণকে জ্ঞান চর্চায় উৎসাহিত করেছেন।

নবীজী (সা.) এর হাদীস সংকলন ও সংরক্ষণে মনোনিবেশ করেছেন। এর সুফল তার সময়ে তিনি পেয়েছেন। খারেজি উগ্র চিন্তা বিলুপ্তপ্রায় হয়ে যায় উমর ইবন আব্দুল আযীযের আমলে। তারপর হাজার বছর ধরে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে আমরা এদের উত্থান দেখেছি। বিশেষত হিজরী পঞ্চম শতকে সলজুকদের আমলে হাশশাশিনরা অভিনব কায়দায় সন্ত্রাসবাদ শুরু করে। হাসান ইবনে সাব্বাহ (মৃ. ৫১৮ হি.) আলামউত দূর্গে জঙ্গীবাদীদের একটি ঘাটি গড়ে তোলে। ইসমাইলি শিয়াদের দিয়ে বিশ হাজার জঙ্গির একটি বাহিনি প্রস্ততু হয়। বহু ফেদায়ি হামলা পরিচালনা করে। প্রায় শত বছর ধরে তাদের অরাজকতা চলেছিল। হালাকু খান ১২৫৬ সালে তেহরান থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরের আলামউত দুর্গটিকে ধ্বংস করে। সলজুকদের সময়ের এ বাতেনি সন্ত্রাসী সংগঠন ধর্মের নামে মুসলিম বিশ্বে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানের মত এমন সর্বাত্মকভাবে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েনি ইতোপূর্বে কখনও।

১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হয়। খোমেনি ও তার অনুসারীরা ইরানের রাজ ক্ষমতায় আসেন। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় সৃষ্টি হয় আলকায়দা। ৯২সালে ইয়ামানে প্রতিষ্ঠিত হয় হুথি। ২০০৭ সালে সোমালিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় আশশাবাব। বাংলাদেশে ২০০১সালে জিএমবি গঠিত হয়। পাঁচ সালে একসাথে ৬৩ জেলায় বোমা বিষ্ফোরণ হয়। হরকতুল জিহাদ, জামাআতুল মুসলিমিন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, তানজিমসহ বহু সংগঠন গড়ে ওঠে শূন্য দশকে বা তারও পূর্বে নব্বইয়ের দশকে। দু হাজার দশ সালের পর গঠিত হয় সিরিয়া ও ইরাকে আইএস। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা হয় ২০১৬ সালে।

একের পর এক জঙ্গি সংগঠন সারা পৃথিবীতেই সৃষ্টি হয়েছে। এশিয়া আফ্রিকা ইউরোপ আমেরিকা সর্বত্রই তাদের বিস্তারের চেষ্টা চলছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তেই প্রভাব সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। বর্তমান সময়ে জঙ্গিবাদ মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বড় পরীক্ষার বিষয়।

আরও পড়ুন: পাকিস্তানের ভিত্তি; একটি নির্মোহ পর্যালোচনা

কাশ্মির, ফিলিস্তিন, উইঘুর, চেসনিয়া বসনিয়া প্রভৃতি স্থানে মুসলমানরা নির্যাতিত। ইরাক, সিরিয়া, আফগানস্তান ও লিবিয়ায় মুসলমান নিগৃহীত। রোহিঙ্গারা মায়ানমার থেকে বিতাড়িত। ভারত, ইউরোপ বা আমেরিকায়ও ভালো নেই মুসলমানরা। এসব স্থানের চিত্র দেখিয়ে মুসলিম জনসাধারণকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করা হয়। কুচক্রি মহল অপক্ক নবীনদেরকে সন্ত্রাসের পথে নামাতে প্ররোচিত করতে থাকে। যাকে যেভাবে পারা যায় তাকে সে পন্থায় উগ্রবাদে দীক্ষিত করার চেষ্টা করতে থাকে। এদেরকে ইসলামের মূল শিক্ষা ও বিশ্ব বাস্তবতা বুঝিয়ে সুস্থ নাগরিক করে গড়ে তোলা সমঝদার প্রত্যেকের কর্তব্য।

দুর্বল নামমাত্র ইসলামী রাষ্ট্র হলেই বিশ্বের সব সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না। আমাদের নিজেদের এবং অন্য দুর্বলদের রক্ষা করতে সবার আগে প্রয়োজন সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি। চরমপন্থার প্রতি আগ্রহী তরুণদেরকে অস্থিরতা থেকে ফিরিয়ে আনতে সঠিক ইসলামী মানসিকতায় তাদের গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা প্রত্যেকেই যার যার স্থান থেকে ভূমিকা রাখতে পারি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।

লেখক: খতিব, গবেষক ও সিনিয়র মুহাদ্দিস জামিআ ইকরা বংলাদেশ

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com