৫ই মার্চ, ২০২১ ইং , ২০শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ২১শে রজব, ১৪৪২ হিজরী

উম্মত পাগল এক ওয়ারিশে নবীর সাথে

মুহাম্মাদ আইয়ুব ❑ বারিধারা থেকে ৩০০ ফিটের প্রায় শেষ পর্যন্ত ধীরস্থিরভাবে এক ধ্যানে দুরুদ শরীফ পাঠে নিমগ্ন থাকলেন। মাসখানেক ধরে মনের ভিতর একটি কথা ঘুরপাক খাচ্ছে কিন্তু প্রশ্ন করার সাহস পাচ্ছি না। সাহস করে প্রশ্নটা করেই ফেললাম। শান্তশিষ্টভাবে উত্তর দিয়ে বললেন, তোমাদের কোন প্রশ্ন থাকলে করতে পার। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর পর্যন্ত ধীরে ধীরে অনেক প্রশ্নই করলাম। তিনি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর শতভাগ দিলেন মনটা একদম প্রশান্তি ও প্রশস্ত হয়ে গেল।

আশ্চর্য এক মানুষ কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ, ফতোয়া, সীরাত, ইতিহাস, তাসাউফ, ভূগোল, বিশ্ব রাজনীতি, ভূ রাজনীতি, বালাগাত, ফালসাফা, বাংলা সাহিত্য, আরবী সাহিত্য, উর্দূ সাহিত্যসহ ইলমের প্রতিটি শাখায় তাঁর নিশ্চিন্ত বিচরণ। হুজুর ছাড়া আমার এ ক্ষুদ্র জীবনে আরো একজন মানুষ শায়খ মুফতি সাঈদ আহমাদ পালনপুরি রহ.কে এমন পেয়েছি।

বলছিলাম বাংলাদেশের প্রথিতযশা আলেম, গবেষক, চিন্তাবিদ শায়খুল হাদীস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা. এর কথা। একদম কাছ থেকে একই গাড়িতে এটা ছিল আমার হযরতের সাথে প্রথম সফর। তাই খুব মনোযোগের সাথে গভীর দৃষ্টি দিয়ে দেখতে চেষ্টা করেছি বড়রা আসলে কিভাবে বড় হলেন?

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মৌলভীবাজারের তিনদিনের ইসলাহী সফরে একদম কাছ থেকে হুজুরকে দেখে তাঁর যে বিষয়গুলো আমার হৃদয়ে রেখাপাত করেছে সেগুলো অনেকটা এমন ছিল-

মানব সম্মান সবার আগে : যেখানেই হুজুর পা রেখেছেন সেখানেই মাানুষের ঢল। ছোট-বড়, বৃদ্ধ-যুবক, ধনী-গরীবসহ সমাজের সব শ্রেণীর মানুষই হুজুরের সাথে সাক্ষাত করতে এসেছে। আবার তারা সময় অসময়ের কোন তোয়াক্কা না করে হুড়মুড় করে হুজুরের কামরায় ঢুকে পড়ত বিশ্রামের সময়ও। এক্ষেত্রে হুজুরের প্রতিক্রিয়া কি ছিল? রাগের? গোস্বার? বিরক্তের? মোটেও না।

এসব ক্ষেত্রে আমি হুজুরের চেহারার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। সুবহানাল্লাহ বিরক্তির কোন লক্ষণই সেখানে ছিল না। সাক্ষাতপ্রার্থীদের সাথে এমনভাবে মুচকি হাসি দিয়ে কথা বলতেন যেন উভয়েই যুগ যুগ ধরে পরিচিত। আমরা ছোটরা অনেক সময় গাড়িতে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করতাম কিন্তু কি আজিব? হুজুর কখনো আমাদের ধমকান না বা কটু কথা বলেন না।

সফর সঙ্গীদের প্রতি পূর্ণ খেয়াল : সফরের ধকল চলছে সে ক্ষেত্রেও হুজুর সফর সঙ্গী প্রত্যেকের নাম ধরে ধরে খোঁজ খবর নেন। সাধারণত ড্রাইভারদের প্রতি মালিকদের আচরণ অসদয়ের হয়। কিন্তু হুজুর হলেন নবীজী (সা.) সুমহান গুণাবলির ধারক বাহক। আমি দেখেছি হুজুর তো সফর সঙ্গী সহ ড্রাইভারের খাওয়া দাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম আরামের প্রতি সবিশেষ খেয়াল রাখেন।

রাগ গোস্বা না করা : আমি বারবার হুজুরের এই গুণ দেখে বিষ্ময়ে থ হয়ে গেছি। বি-বাড়িয়া থেকে মৌলভীবাজার যেতে আমাদের তেমন সময় লাগেনি। যখন মৌলভীবাজার গেলাম তখন দুপুরের খাবার আসতে বেশ বিলম্ব হল। ক্ষুধায় আমাদের অবস্থা কাহিল। দর্শনার্থী ও সাক্ষাতপ্রার্থীদের সে কি ভীড়! তথাপিও লক্ষ্য করলাম হুজুর ধীরস্থিরতা ও শান্তশিষ্টের মূর্ত প্রতীক। কারো সাথে কোন কটূ কথা, বিরক্তি প্রকাশ, রাগ ঝাড়ার কোন ব্যাপার চোখে পড়ল না।

মেজবানের প্রতি পূর্ণ খেয়াল : মেজবানের যেন কোন কষ্ট না হয় সে ব্যাপারে হুজুর পূর্ণ সজাগ। নিজের চাহিদা প্রকাশ বা অতিরিক্ত কোন ফায় ফরমায়েশ করতে দেখিনি। সাঈফী সাহেব কোন একটা খাবারের আগ্রহ প্রকাশ করতে গেলে হুজুর শক্তভাবে বারণ করে দিয়ে বললেন, মেহমানের কোনভাবেই মেজবানকে কষ্ট দেওয়া বা অতিরিক্ত বায়না করা ঠিক নয়।

পরিমিত আহার : হরেক রকমের আইটেম। কুরমা,পোলাও, রেজালা, নানান রকম গোশত, মাছ, দুধ, দই, মিষ্টান্ন, পিঠাপুলি দিয়ে দস্তরখান সাজানো। ফলমূল তো চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। অথচ হুজুরকে দেখলাম খুব অল্পই আহার গ্রহণ করতে। সদ্দে রমক তথা জীবন ধারণ পরিমাণ আহারেই তিনি তুষ্ট। লম্বা লম্বা সফর অথচ এত অল্প আহারে তিনি কিভাবে সবসময় সজিব, সতেজ, প্রাণবন্ত থাকেন তা আমাদের মত ছোটদের মাথায় ধরে না। বড়দের বিষয়, আল্লাহ ওয়ালা আশেকে রাসূলদের কথা সেটা তো ভিন্ন এক জগত।

স্বল্প ঘুম : ঘুমের প্রসঙ্গ এলেও মাথা ঘুরে যায়। আমরা জানি শেষ বয়সে মানুষ একটু নিদ্রা সুখ পেতে চায় আর যদি হয় আলিশান খাট, তুলতুলে নরম বিছানা তাহলে তো মাথাই নষ্ট
অথচ হুজুর এর পুরোপুরি বিপরীত। দিনে রাতে মিলিয়ে খুব অল্প সময়েই হুজুরকে ঘুমোতে দেখেছি। মানুষ সফরে থাকলে বিছানাপত্রের দেখা পেলেই কুপোকাত। অথচ হুজুর হয়ত কোন না কোন আমলে মশগুল কিংবা উম্মতকে নিয়ে বিভোর। দেশ ও জাতিকে নিয়ে যিনি ভাবনার সাগরে ডুবে থাকেন তিনি আবার ভিন্নভাবে ঘুমোনোর কথা ভাববেন কখন? বিছানায় একটু আধটু জিরিয়ে নিতেন আর মাঝে মাঝে গাড়িতে একটু ঝিমোতে দেখেছি মাত্র।

নিরবতা যার অলংকার : হুজুরের নববী আরো একটি দুর্লভ গুন দেখে আমি বিস্ময়াভিভূত হয়েছি। এই জীবনে অনেক বড় মানুষের দেখা ই পেয়েছি কিন্তু সবসময় চুপ থাকেন আর প্রয়োজনে কথা বলেন এমন মানুষের দেখা খুব কমই পেয়েছি হুজুরকে দেখেছি দীর্ঘ সময় যাবত চুপ থাকতে। আর যখন বলেন তখন কল্যানের কথাই তাঁর মুখ থেকে বের হয়। হুজুরের মুখ নিঃসৃত কথার সবটাই উপকারী, শিক্ষনীয়, উম্মত নিয়ে ভাবনার ও দরদের।

নামায, নামায : দীনদার তো অনেক দেখা যায় কিন্তু নামাযের প্রসঙ্গ আসলে নামাযের প্রতি সদা সজাগ, পূর্ণ যত্নবান দীনদার খুব কমই দেখা যায় আজকাল। কিন্তু যার অঙ্গ, মন ও মননে আল্লাহ পাকের জন্য জায়গা বরাদ্দ তিনি কি আর নামাযের সময় হলে সুস্থির থাকতে পারেন? নামাযের সময় হলেই হুজুর আগে খোঁজ নিতেন আশে পাশে কোথায় মসজিদ আছে। আগে নামায পরে বাকি কাজ। সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণ বয়সেও পূর্ণ একাগ্রতায় দাঁড়িয়ে নামায পড়েন। এ ক্ষেত্রে তিনি পূর্ণ জোয়ান হয়ে যান, কোথাও ক্লান্তির বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। প্রকৃত মুজাহিদ ছাড়া আর কোন অভিধায়ে আমি তাঁকে সিক্ত করত পারি?

অব্যক্ত কথা : মাশাআল্লাহ! তিনদিনের এই সফরে সুন্নতের খেলাফ কোন কাজ হুজুর থেকে প্রকাশ পেতে দেখিনি। ভিতর বাহির তাঁর পুরোটাই সমান্তরাল। আমাদের নবীজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শামায়েল মুবারক জীবন দিয়ে, সময় শ্রম, মেধা ব্যয় করে সাধ্যমত নিজের ভিতর পুরেছেন। নবীজীকে দেখার মহা সৌভাগ্য আমার হয়নি কিন্তু তাঁর একজন সাচ্চা আশেককে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। অস্ফুটস্বরে বার বার উচ্চারিত হচ্ছে- ‘তেজস্বী অগ্নি মিশে গেছে সূর্যের সাথে’।

লক্ষ কোটি চামচিকা মিলেও কি তাঁর কিরণময় সত্তাকে আড়াল করতে পারে? না না না কল্পনা করার আগেই তো পাখনাগুলো পুড়ে ছারখার। আর প্রতিরোধ! কন্ঠ স্তব্ধ করা! মিশন থামিয়ে দেয়া! এ তো বহুত দূর কি বাত! বেশ কয়েক দিন আগে দেখলাম হুজুরের ময়মনসিংহের ইসলাহী সফরে এক মাদ্রাসার দায়িত্বশীলগণ হযরতকে দাওয়াত দিয়েছে। আর এ সুযোগে মাদ্রাসার কিছু বখে যাওয়া উস্তাদ ছাত্র হযরতের সাথে বেয়াদবিমূলক আচরণ করেছে এবং ফেসবুকে জামাত শিবির আর তাদের নব্য কওমিয়ান ওয়ারিশরা এদের মত চামচিকাদের হিরো বানিয়েছে। সূর্যের সাথে বিদ্বেষ রেখে একটু হৈচৈ করে চামচিকাদের রাতারাতি হিরো বনে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আজকাল বড্ড হাসি পায়।

যুগ যুগ ধরে হযরত মাদানি (রহ.) কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে আসন গেড়ে রাজত্ব করছেন সামনেও তা সমানভাবে অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। অথচ সাইয়্যেদ মাদানি রহ. কে এই বাংলার কিছু নামধারী মৌলভীরা কাফের, কংগ্রেসের দালাল, বেঈমান বলেছে,মাথার পাগড়ি পর্যন্ত খুলে ফেলেছে! কিন্তু প্রশ্ন আজ সেসব অসভ্য, অথর্ব, বেয়াদব, নির্বংশরা কোথায়? সময়ের সাথে সাথে নিজেরাও চিরকালের জন্য বিলীন হয়ে গেছে।

পৃথিবীটা আবূ জাহল আর লাহাবের জন্য সাময়িক, অতি অল্প কিছু দিনের আর হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সঙ্গীদের জন্য কেয়ামত তক্। শত শত বছর ধরে তাঁরা রাজ করে আসছেন, কেয়ামত পর্যন্ত করবেন আর জান্নাত তো তাঁদের জন্য নিয়মিত নববধূর সাজে সাজছে। নিবৃত্ত হও বলছি পাগলের দল। নইলে নিজে তো ছারখার হবেই সাথে উতবা, শায়বা, উমাইয়ার মত বংশটাও যাবে। সূর্যের রাজ্যে চামচিকার কোন স্থান নেই। অনুগত হও নইতো আলো বঞ্চিত হয়ে অন্ধকারে বসবাসের প্রস্তুতি নাও।

লেখক : খতিব, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com