কওমীতে আবার অদৃশ্য শক্তির নগ্ন থাবা
আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: কওমী অঙ্গনে আবার অশুভ – অদৃশ্য শক্তির নগ্ন থাবা এসে আঘাত করেছে। এটা নতুন কোন বিষয় নয়। চিরা-চরিত নিয়ম। যখনই ওলামায়ে দেওবন্দ শৌর্য- বীর্যে এগিয়ে চলে। সকলকে এক প্লাট- ফরমে নিয়ে চলতে থাকে, তখনই সেই অদৃশ্য শক্তির উত্থান শুরু হয়ে যায়।
যুগ যুগ ধরে দেখে আসছি আমরা। ওলামায়ে দেওবন্দকে ঘায়েল করার জন্য মুনাফেক- গাদ্দার চক্র ভিতরে ভিতরে কাজ করে। ওরা আলেম- উলামার বেশ ধরে বিভিন্ন সময় আলেমদেরই ফাঁদে ফেলে দেয় তারা। ওরা লেবাসে দেওবন্দী কিন্তু কাজে কর্মে সব আলেম বিদ্বেষী। ওরা বাতিলের সাথে সখ্যতা গড়ে ওলামায়ে কেরামের ঐক্যকে বিনষ্ট করে। যখনই আলেমদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি দেখে,তখনই শুরু হয় ওদের গাত্রদাহ। শেষমেষ নেফাকী করে তারা। আলেমদের জামাতে ধ্বস নামিয়ে দেয়।
হযরত হাফেজ্জী হুজু্রের সময় এই অদৃশ্য – অশুভ শক্তি আমরা দেখেছিলাম। যখন হযরত হাফেজ্জীর আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছিল। ঠিক তখনই ঐ মুনাফেকচক্র তছনছ করে দিয়েছিল সব।
হাফেজ্জীর পরে ইসলামী ঐক্য জোট, খেলাফত মজলিস, জমিয়ত, এসব সকল সংগঠনে পয়োজন ঢুকিয়েছে ঐ সব মুনাফেকচক্র। খন্ড খন্ড করে দিয়েছে ইসলামী দলগুলোর ঐক্য। আলেমগণ সাধারণত নিরীহ- সরল প্রাণ। টাউটগিরী বোঝেন না। কিন্তু ঐ তৃতীয় শক্তি আলেমদের জামাতে সংগোপনে প্রবেশ করে নাস্তানাবুদ করে দেয় বার বার।
আজ ইসলামী ঐক্যজোট কতবার কত খন্ড হল। খেলাফত মজলিস, জমিয়ত, সবই খন্ড- বিখন্ড হয়েছে। ঐ যে মুনাফেকচক্রের অনুপ্রবেশে সব কিছু উল্টা – পাল্টা হয়েছে।
সর্বশেষ হেফাজত এর আন্দোলন নিয়ে একটু ভাবুন। কিভাবে দেশব্যাপি চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সর্বত্র হেফাজত ইসলামের যে গণ জোয়ার দেখা গিয়েছিল, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন অরাজনৈতিক দলের এরকম অবস্হার সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু সে গণ জোয়ার কোথায় গেল? ঐ অদৃশ্য শক্তি, ঐ মুনাফেক চক্রের কারসাজিতে সব শেষ হয়ে গেল।
আমরা দু চারজন মৌলভীকে দায়ী করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাই। কিন্তু আসল ঘুঁটি কোন জায়গা থেকে চালা হচ্ছে সেটা কেউ খতিয়ে দেখি না। টঙ্গীতে যে ঘটনা ঘটেছিল এক দেড় বছর আগে।দেখবেন, ওখানেও তৃতীয় কোন শক্তির ইন্ধন রয়েছে। যার কারণে আমাদের দেওবন্দী হালকার মধ্যে ডিভাইডেড করতে সক্ষম হয়েছে।
সম্প্রতি হাটহাজারী মাদ্রাসা নিয়ে কওমী অঙ্গন কিছুটা উত্তপ্ত। কালকে তো আমি খুব টেনশনে ছিলাম, আবার কি হয়ে যায়। মুনাফেকচক্র গুলো ইন্ধন দিয়ে আমাদের বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ প্রতিষ্ঠানকে আবার কোন দিকে নিয়ে যায়।
একবার কিন্তু হামলা করেছিল হাটহাজারী মাদ্রাসার উপর। গতকালের পাল্টা- পাল্টি বক্তব্যে আমার সেই কথা স্মরণ হচ্ছিল খুব। সেই চক্রের হোতারা কি আবার কিছু করছে না তো? একদম উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একটা পরিচালনা কমিটি আছে নিশ্চয়ই হাটহাজারী। তাদের উপেক্ষা করে ঘোষণা দেওয়া হল বাবুনগরী সাহেব মোহতামিম। আবার রাতে অসুস্থ আল্লামা শফিকে অনলাইনে বিবৃতি দেওয়া হল।
খুবই চিন্তার বিষয়। তৃতীয় শক্তি আবার কিন্তু ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। ওরা আমাদের বৃহত্তর দ্বীনি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করে যাচ্ছে। আচ্ছা, আল্লামা আহমাদ শফি সাহেব তো এখনো জীবিত। তিনি যতদিন জীবিত আছেন, ততদিন কেন এসব বিষয় নিয়ে কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি হবে?
একজন মুহতামিম জীবিত থাকতে আরেকজনকে ভারপ্রাপ্ত বানানো কতটুকু যুক্তিসংগত। বিষয়টা ভাবার বিষয়। এখন কিন্তু মাদ্রাসা বন্ধ। দু মাস ধরে ক্লাস চলে না। বন্ধকালিন সময়ে মোহতামিম নিয়ে এধরনের তালবাহানা ভাল কাজ নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, হাটহাজারী মাদ্রাসার তো একটা শুরা কমিটি রয়েছে। তাদের উপেক্ষা করে একজনকে ভারপ্রাপ্ত মোহতামিম ঘোষনা দেওয়া নিশ্চয়ই এখানে কোন অশুভ শক্তির কারসাজি। সব মিলিয়ে বর্তমান হাটহাজারীর এই সমস্যা কোন অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। যুগে যুগে যেভাবে আলেম- উলামার ঐক্যকে বিনষ্ট করার জন্য অশুভ শক্তি কাজ করেছিল, এখনো সেই শক্তি আবার কাজ শুরু করে দিয়েছে।
আলেম- উলামাগণের সচেতন হওয়া চাই।চৌকান্ন হওয়া দরকার। একেকজন এসে বোঝাবে। ইন্ধন যোগাবে। হুজুর আপনি মোহতামিমের যোগ্য। আপনাকে বাদ দিয়ে কেন সাহেবজাদার মাতব্বরী হবে? আবার ওদিকে সাহেবজাদাকে বোঝাবে, আপনার বাবা তো ইন্তেকাল করেন নি। তিনি এখনো জীবিত। সুতরাং তাঁকে পাশ কাটিয়ে কোন কাজ হতে পারেনা।
আবার সাহেবজাদা হিসেবে আপনি তো অযোগ্য নয়। আপনার বাবা তো আপনার মত বয়সেই মোহতামিম হয়েছেন। দেওবন্দের ক্বারী তৈয়্যব সাহেব তো অল্প বয়সে মোহতামিম ছিলেন। সুতরাং আপনি মোহতামিম হলে অসুবিধা কোথায়?
বহু উদাহারণ ওরা দিতে পারে। আর এগুলো তো হয়ে আসছে। জামেয়া রাহমানিয়া, ঢাকা। সেখানে তো শায়েখের ছেলেরাই এখন সবকিছু। মহারথীদের বিদায়ে তারা এখন ক্ষমতায়। বসুন্ধরায়, মুফতী আব্দুর রহমান সাহেবের ছেলে এখন মোহতামিম। মিজান সাহেব ইজ্জত নিয়ে আগেই চলে গেছেন। গওহরডাঙ্গা শামসুল হক ফরিদপুরীর ছেলে হাল ধরে আছেন। মুফতী আমিনী সাহেবের ছেলে দলের চেয়্যারম্যান।
সাহেবজাদা হিসেবে পাওয়ার কারো কম নয়। নানাবিধ মানুষ নানান বুঝ দিতে আসবে। দু গ্রুপের কাছেই ওদের শক্তি কাজ করবে। আলেমদের একটু সতর্ক হওয়া দরকার। শুরার সিদ্ধান্ত, কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়া কোন কাজ নিজেদের মত করা সমিচীন নয়। সেই সাথে অশুভ- অদৃশ্য শক্তি গুলোকে চিহ্নিত করার এখনই সময়। দুরে থাকতে হবে। ওদের আক্রমণ কে প্রতিহত করে সামনে চলা এখন সময়ের দাবী। আল্লাহ তায়ালা আমাদের হেফাজত করুন। আমিন।
লেখক : আলেম গবেষক


