কওমী মাদরাসার শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের শ্রদ্ধাবোধ দিন দিন কমছে কেনো?

কওমী মাদরাসার শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের শ্রদ্ধাবোধ দিন দিন কমছে কেনো?

  • ইবনু হাশিম

কওমী মাদরাসার শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের শ্রদ্ধা-ভক্তি, আদব ও লেহাজ একসময় প্রবাদ তুল্য ছিলো। সে সময় ছাত্ররা মনপ্রাণ দিয়ে শিক্ষকদের খেদমত করতো। সম্মান ও শ্রদ্ধায় সব সময় বিনীত থাকতো। শিক্ষকদের ক্ষেত-খামারে চাষাবাদ করতে তখন শ্রমিক নিয়োগ করা লাগতো না, ছাত্ররাই ফসল রোপন, পরিচর্যা, কর্তন মাড়াই এমনকি ঘরে তোলা পর্যন্ত সবকাজ নিষ্ঠার সাথে আঞ্জাম দিতো। শিক্ষকদের, বাজার-ঘাট থেকে নিয়ে কাপড় কেচে দেওয়া পর্যন্ত সবকিছু ছাত্ররাই করে দিতো। শিক্ষক কোনো রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে ছাত্র প্রায় অর্ধ মাইল আগ থেকে রাস্তা ছেড়ে পথের এক পাশে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে যেতো। শিক্ষকের সামনে উঁচু গলায় কথা বলবে তা কল্পনাও করা যেতো না।

শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের এই শ্রদ্ধাবোধ এমনি এমনি তৈরী হতো না। এজন্য শিক্ষকদেরকেও নিজেদের সবটুকু ছাত্রদের জন্য উজার করে দিতেন। ছাত্রদের সাথে পিতৃসুলভ আচারণ করতেন। নিজের দুটি সন্তান থাকলে ছাত্রকে তৃতীয় সন্তান হিসেবে দেখতেন। অনেকে তো ছাত্রের সাথে নিজের আদরের দুলালীকেও বিবাহ দিতেন।

উস্তাদ ছাত্রের দ্বীপাক্ষিক এই বুঝাপড়াই তাদের মাঝে শ্রদ্ধা ও স্নেহের এক সুসম্পর্কের জন্ম দিতো।

নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে যখন পাঠ উদ্ভোদনী অনুষ্ঠান হতো তখন একটি ফার্সি কবিতা প্রায়শই শিক্ষকদের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে দেখা যেতো- ‘খিদমাতে উস্তাযে বা-ইয়াদ, হাম সবক খানি মদম— অর্থাৎ, ইলম লাভ করতে হলে তোমাকে কেবল পড়া মুখস্ত করলেই চলবেনা, উস্তাদেরও খেদমত করতে হবে। ছাত্ররাও এই আপ্তবাক্য অক্ষরে অক্ষরে রপ্ত করে নিতো।

তখন প্রতি সপ্তায় তরবীয়তি মজলিসের আয়োজন করে আকাবীরদের গল্প শুনানো হতো। যেখানে মাদানী রহ. মাল্টার কারাগারে তীব্র শীতে কীভাবে নিজের গায়ের উষ্ণতায় শিক্ষক মাহমুদ হাসান দেওবন্দীর জন্য তাহাজ্জুদের অজুর পানি গরম রাখতেন। হাফেজুল কুর’আন না হয়েও কেবল শিক্ষকের খতমে তারাবি পড়ার আকাংখ্যাকে পুরা করতে রমযানের ত্রিশ দিনে ত্রিসজ পারা মুখস্ত করে নামাজ পড়ানোর গল্পও উঠে আসতো সেইসব মজলিসে। এতে করেও ছাত্রদের মনে উস্তাদের প্রতি ভক্তি জন্মাতো।

কওমী মাদরাসা থেকে দিনদিন এই চমৎকার প্রথাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মাদরাসায় এখন আর তরবিয়তী মজলিশ নেই, আছে কয়েক লাইনের বুলি মুখস্ত করে এসে সাপ্তাহিক বক্তৃতা মজলিশে এসে তা উগ্রে দেওয়া। আকাবীরদের গল্প, শিক্ষাগুরুর মর্যাদার কোনো কবিতা পড়ানো হয় না। তাহলে শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের সেই হৃদয় উৎসারিত ভালোবাসা, মন থেকে খেদমত করার মানসিকতা, গুরুভক্তির সেই চমৎকার উদাহরণগুলো সৃষ্টি হবে না সেটাই স্বাভাবিক।

আগে ছাত্ররা শিক্ষকদেরকে শ্রদ্ধা করতো, ভালোবাসতো। সামনাসামনি বেতের ভয় পেলেও আড়ালে গিয়ে কটু মন্তব্য করে। বিকৃত নামে ব্যাঙ্গ করে।

শিক্ষক মহোদয়ও কম যান না। ছাত্রকে তা’লীম তরবিয়ত দেওয়ার চাইতে তাদের উপর কাজ চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা তাদের মাঝে বেশী। সন্তানের মতো স্নেহ করার বদলে তাদের সাথে ভৃত্যের মতো আচরণ করে। ছাত্র হিসেবে তাকে যোগ্য করে গড়ে না তুলে তাকে চাকর হিসেবে পোক্ত করে তোলে। অন্য কোনো শিক্ষকের খাদেম হলে তাকে জনসম্মুখে টিপ্পনী কাটে।

জঘন্যতম বিষয় হলো, এক হুজুর তার খাদেমকে অন্য হুজুরের গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ করে। বিনিময়ে হয়তো তার পরীক্ষার খাতায় দুটো নাম্বার যোগ হয় কিংবা ক্লাসে পড়া শুনানোর মতো ঝামেলা থেকে রেহায় পায় অথবা বোর্ডিংএর স্পেশাল তরকারীর এক পঞ্চমাংশ তার তকদীরে জুটে যায়। কিন্তু দুদিন বাদে যখন এই খাদেম বড় হয় তার চোখ কান খুলে যায়। এই মাখদূম শিক্ষকের প্রতি তার মনে জন্ম নেয় ঘৃণা আর বিদ্বেষের।

একসময় নোয়াখালীর হুজুরদের মুখরোচক গল্প শোনা যেতো যে, ছাত্রকে দিয়ে নানান ফন্দি ফিকির করে তার বাড়ি থেকে খাবার আনিয়ে রসনা বিলাস করতো। ছাত্রদের থেকে যেচেপড়ে খাওয়ার পুরোনো সেই প্রথা আধুনিক রূপে আবার ফিরে এসেছে। এখন নাকি হুজুররা ছাত্রদেরকে বিশেষ কায়দায়  ফাঁদে ফেলে রেস্টুরেন্ট থেকে ‘ভূরি-ভোজ’ আদায় করে। বাড়ি থেকে দেরীতে মাদরাসায় ফেরা, ক্লাসে এক মিনিট পরে প্রবেশ করা, পরীক্ষায় নাম্বার কম পাওয়া, মোবাইল ধরা খেলে উদ্ধার করা সবকিছুর মাশুল গড়ায় আশপাশের রেস্টুরেন্টগুলোর অস্বাস্থ্যকর সুস্বাদু খাবার পর্যন্ত।

এসব কারণেও শিক্ষকদের থেকে ছাত্রদের আদব- লেহাজ ও শ্রদ্ধাবোধ দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে। জন্ম নিচ্ছে ক্ষোভ ও ঘৃণার।

আগের যমানায় শিক্ষক হতে হলে পড়াশোনা শেষ করার পরও দীর্ঘদিন কোনো প্রাজ্ঞ উস্তাদের সংসর্গে থেকে শিক্ষকতার গুণ রপ্ত করতে হতো। আর এখন সবচেয়ে বড়গুণ- মুহতামিমের ‘পছন্দিদাহ’ পাত্র হওয়া।

আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবসে একটাই চাওয়া, কওমী মাদ্রাসার শিক্ষকরা যেনো আদর্শবান শিক্ষকের গুণাগুণবোধ অর্জন করে শিক্ষকতা শুরু করে। ভৃত্য- মনিব কিংবা খাদেম -মাখদূম এর মতো সম্পর্ক না হয়ে ছাত্রদের সাথে তাদের সম্পর্ক যেনো হয় কেবলি গুরু -শিষ্যের, পিতা- পুত্রের। শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের সেই সম্মান ও ভক্তি ফিরে আসবে। এখনকার মতো মেকি শ্রদ্ধা নয়, হৃদয় নিংরানো আদি, আসল ও নির্ভেজাল শ্রদ্ধা।

লেখক ও গবেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *