৮ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৩রা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

কবরে শান্তিতে ঘুমাচ্ছো, ঘুমাও

আদিল মাহমুদ ❑ নানাজি, শুনেছি মানুষ মারা গেলে তারা হয়ে যায়, কিন্তু তুমি তারা হয়ে আকাশের কোথায় আছো! আমি দেখতে পাই না যে! তুমি মনে হয় আকাশে তারা হয়ে নেই, যদি তারা হয়ে থাকতে, তবে তোমায় দেখতে পেতাম আকাশে।

নানাজি, ২০২০ সালের আজকের দিনে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে, সকল মায়াজাল ছিন্ন করে, তুমি চলে গেলে আরশে। আচ্ছা, সত্যিই কি তুমি আমাদের ছেড়ে যেতে চেয়েছিলে! এখন তোমার জন্য বুকের গহীনটায় কেমন পুড়ে দিবারাত্রি। তুমি কি তা দেখতে পাও না?

নানাজি, তুমি তো আমেরিকায় মারা গেলে। কতদিন তোমার সাথে দেখে হয়নি। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে কি আমাদের চেহারা ভেসে উঠেছিল কল্পনাতে! যার কারণে আমাদের নাম ধরে ধরে ডাকছিলে শেষ দেখা দেখার জন্য, কিন্তু দুর্বাগ্য, তবুও দেখতে পারলে না! আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, আপনজনদের না দেখে মরার যন্ত্রনা কি খুব বেশি?

নানাজি, আব্বাকে তো আমরা সেই ছেলেবেলা হারিয়েছি। এজন্য আব্বা বলতে আমরা তোমাকে বুঝতাম। তোমার মধ্যে জড়িয়ে ছিল বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবি প্রকাশ। নানাজি নামটা উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হৃদয়ে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার এক অনুভব জাগে। আমাদের জন্য তুমি ছিলে ছায়া শেষ বিকেলের বটগাছের ছায়ার চেয়েও বড়। এখন তোমাকে হারিয়ে বুঝতেছি, তুমি আমাদের জন্য কতটা প্রয়োজন। মাঝিবিহীন নৌকা যেমন চালানো যায় না, তেমনি তুমি ছাড়া আমাদের জীবনকে সামনে এগিয়ে নেয়া অনেক কষ্টকর। তাই তো আশপাশের সবকিছুতেই তোমার অস্তিত্ব খুঁজে বেড়াই।

নানাজি জানো, তুমি মারা যাওয়ার পর যখন ছোটমামা কান্নায় জর্জরিত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে ফোনে আম্মাকে জানালেন, তুমি আর নেই! এই কথা শুনেই আম্মার দাঁড়ানো থেকে মাটিতে পড়ে বেহুশ হয়ে যান। বাবাকে হারানোর শোক কতটা কষ্টের, সেদিন আমি আম্মাকে দেখে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলাম। তোমার মৃত্যুর দিনের কথা মনে পড়লে এখনো দম বন্ধ হয়ে আসে। তোমাকে হারিয়ে আমরা সবাই পাথর হয়ে গিয়েছিলাম।

নানাজি, আমি জানি, সাবার মুখেও শুনি, তোমার হৃদয় ছিল আকাশের মত বিশাল, যে কারো কোন প্রয়োজনের কথা শুনলে তুমি তা পুরণে ব্যাকুল হয়ে থাকতে। এজন্য সবাই মলিন মুখে নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতো তোমার কাছে, আর তুমি তার চাওয়া-পাওয়া পুরণ করে হাসি মুখে ঘরে ফিরাতে। তুমি সদাহাস্যমুখ মিশুক প্রকৃতির মানুষ ছিলে বলে দেশের ও আমেরিকার প্রত্যেকটি পরিচিত মানুষ তোমাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতো।

আরও পড়ুন: শিশিরের ফোঁটায় জিকিরের শব্দ

নানাজি, জানি তুমি আর ফিরে আসবে না। অকারণে তবুও কেন যে তোমায় কাছে ডাকি। তুমি নেই আমাদের মাঝে অনুভব করতেই খুবই কষ্ট লাগে, তাই বারবার কাছে ডাকি। তুমি নেই, তবে আছে তোমার অনেকগুলো স্মৃতি, অনেকগুলো কথা, যা ভুলতে পারি না, কখনো ভুলতেও পারবো ন।

নানাজি, আমি যে আর কিছু লিখতে পারছি না। অজস্র স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছি। মাথার ভেতর তোলপাড় করছে ঘটনা প্রবাহ। কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখব ভেবে পাচ্ছি না। তাই বোধহয় এই লেখাটিতে তোমায় কোন সম্ভাষণ জানাতে পারলাম না। কারণ, তোমাকে কোন সম্ভাষণে সম্ভাষিত করবো আমি বুঝতে পারছি না। যাই করি না কেন, তা তোমার জন্য অতি নগন্য হয়ে যাবে।

নানাজি, আমি যে ভাষা হারিয়ে ফেলছি। তাই আল্লাহ তাআলার কাছে তোমার জন্য দুআ করে শেষ করছি, ‘তিনি যেন তোমাকে ক্ষমা করে দেন। জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান দান করেন। আমিন, আমিন, আমিন।’

নানাজি, তবে আমার বিশ্বাস, নিশ্চয়ই তুমি ভালো আছো, কবরে শান্তিতে ঘুমাচ্ছো, ঘুমাও। ইশাআল্লাহ আমাদের দেখা হবে হাশরের ময়দানে। সেই অপেক্ষায় রইলাম।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com