পাথেয় রিপোর্ট : আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রতিভাদৃপ্ত শীর্ষ কবি শামসুর রাহমান। তার অসামন্য সৃষ্টি বাংলা কবিতাকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। কবিতায় তার যে ভাঙচুর তাই আধুনিক কবিতায় ভিন্ন একটি ধারা সৃষ্টি করেছে। কাব্য রচনায় সৃষ্টিশীলতা ও মননের দ্যুতিময় উপস্থাপনা তাকে দিয়েছে কবিতার বরপুত্রের উপাধি। ছন্দোময় ও শিল্পিত শব্দের প্রক্ষেপণে কবিতার চরণে চরণে বলেছেন দেশ, মাটি ও মানুষের কথা। তিনি বাঙালীকে উদ্ধুদ্ধ করেছেন তার কবিতায়। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে আহবান জানিয়েছেন কবিতায় কবিতায়। আজ ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান এই কবির ৯০তম জন্মদিন ও ৮৯তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্ম নেন এই বরেণ্য কবি।
কবির ৯০তম জন্মদিন আজ বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের মধ্যদিয়ে পালিত হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে আজ বিকেলে কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে আলোচনা সভা ও কবির কবিতা আবৃত্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জন্মদিনে শ্রদ্ধা-ভালবাসায় স্মরণ করা হবে কবি শামসুর রাহমানকে।
তিলোত্তমা শহর ঢাকার মাহুতটুলিতে ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর জন্মেছিলেন এই কবি। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে বেঁচে ছিলেন ৭৭ বছর। এই দীর্ঘ বর্ণময় জীবনের বড় অংশজুড়েই নিমগ্ন থেকেছেন কবিতা সৃজনের মোহ ও অনুরাগে। কবিতাকে ভালোবেসেই ভেতর বোধের সমস্ত উজাড় করে দিয়েছিলেন এই শক্তিমান কবি। ষাটেরে দশকের গোড়ার থেকেই তার কাব্য প্রতিভার বিচ্ছুরণে মাত করতে থাকেন বাংলা সাহিত্যকে। অপূর্ব ছন্দোবান ও শিল্পিত শব্দের যথার্থ প্রয়োগে কবিতাকে করে তুলেছিলেন সুপেয় এবং যুদ্ধের জয়গান। কবিতার চরণে চরণে বলেছেন দেশ, মাটি ও মানুষের কথা। নাগরিক এই কবি আমৃত্যু স্বদেশ ও শেকড়ের প্রতি ছিলেন দায়বদ্ধ। পুরান ঢাকায় বেড়ে ওঠায় নাগিরক জীবনের বাস্তবতা, প্রকরণ আর নিগূঢ়তা ফুটে ওঠেছে তার কবিতায়। জীবনের সত্য প্রবাহকে তিনি খামচে ধরেছেন তার কবিতার ছন্দে ছন্দে। প্রকাশ করেছেন অনুল্লেখিত সত্যের কথা। মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীনতার আকাঙ্খায় উজ্জীবিত মানুষকে প্রেরণা দিয়েছেন কবিতার সৃষ্টিশীলতায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর লিখিত তার দুটি বিখ্যাত কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ একই সঙ্গে অনুপ্রেরণাদায়ী ও ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
কবির জন্মদিন উপলক্ষে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কবির জীবন ও কর্ম নিয়ে একক বক্তৃতা করেন শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রফিকউল্লাহ খান। তিনি বলেন, শামসুর রাহমানের কবিতা ধারণ করেছে আমাদের সমাজসত্তার সামগ্রিক বিবর্তন। তিনি আমাদের চেতনার কাব্যিক রূপকার। ভাষা আন্দোলন পূর্ববাংলার কবিতাকে যেভাবে বদলে দিয়েছে শামসুর রাহমানের কবিতাকেও সে প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হবে।
তিনি বলেন, নিভৃত কাব্যলোক থেকে কবি সমকালের রক্তক্ষতে আলোড়িত হয়েছেন, জাতীয় জীবনের মূল কেন্দ্রস্বরকে তাঁর জীবনচেতনায় ভাস্বর করে তুলেছেন। তিনি বলেন, নির্জনতা ও নিঃসঙ্গতা থেকে শামসুর রাহমান যেভাবে জনতার স্বাধীনতাকামী ময়দানে কবিতাকে নিয়ে এসেছেন তা বাংলা কবিতার জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির ফেলো কবি আসাদ চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। শুরুতে কবি শামসুর রাহমানের ‘ তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা ’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন শিল্পী শিমুল মুস্তাফা।
সভাপতির বক্তব্যে কবি আসাদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের সমাজমানসের বিবর্তনের সঙ্গে শামসুর রাহমানের কবিতাকে মিলিয়ে পাঠ করলে আমরা দেখব তিনি এ অঞ্চলের সমস্ত সংগ্রামী, সদর্থক ও শুভবাদী আকাঙ্খার সঙ্গে যোগাযোগ অনুভব করেছেন। কবিতাকে জনপ্রিয় করেছেন। শিল্পমান অক্ষুন্ন রেখেও কবিতাকে যে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসা যায় সে সত্য তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। উদ্ভট উটের পিঠে স্বদেশকে চলতে দেখেও তিনিই সেই কবি যিনি বলতে পারেন ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে।’
স্বাগত ভাষণে মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, যতদিন বাংলা ভাষা ও কবিতা বহমান থাকবে ততদিন উচ্চারিত হবে কবি শামসুর রাহমানের অমর নাম। তিনি দীর্ঘকাল সাহিত্য চর্চার পাশপাশি সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। আমাদের ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর কবি রচনা করেন অসংখ্য কবিতা। যে সব কবিতা আজও মানুষকে আন্দোলিত করছে।


