২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৭ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

কবে খুলবে কওমী মাদ্রাসা?

ফাইল ছবি

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

সবার মুখে একই কথা, কবে খুলবে প্রাণের কওমী মাদ্রাসা? কবে প্রাণবন্ত হবে আমাদের দেওবন্দী মাদ্রাসাগুলো? শিক্ষার্থীরা মেতে উঠবে কোরআনুল কারীমের মধুর বাণী পড়তে পড়তে। দারুল হাদীসের দরসগাহতে আবার বেজে উঠবে ‘কলান্নাবি’ আর ‘কলার-রাসূল’ এর ধ্বনি। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে নায়েবে নবীদের পদচারণা ঘটবে। ওয়ারিছে নবীদের কোলাহলে মেতে উঠবে আবার শিক্ষাঙ্গন।

অপেক্ষার পালা যেন শেষ হচ্ছে না। শুধু তাকিয়ে আছি মহান মুরুব্বীদের দিকে। কখন উনারা আমাদের নির্দেশ দিবেন আর আমরা ছুটে যাব উলুমে নববীর আঙিনায়। সব কিছু ত্যাগ করে জমে জমে বসে যাব আমরা। আর এদিক-সেদিক তাকাব না। আর ছুটে যাব না হাদীসের মজলিস থেকে। আর বের হব না জান্নাত সমতুল্য বাগানের পরিবেশ থেকে।

এভাবে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী প্রহর গুনছে। লক্ষ লক্ষ কওমীর শিক্ষক অপেক্ষা করছে। তাদের অপেক্ষার পালা যেন শেষ হচ্ছে না। ‘আল ইনতিজারু আশাদ্দু মিনাল মউত’ অপেক্ষা মৃত্যু যন্ত্রণা থেকে কঠিন। তারপরেও অপেক্ষা করে যাচ্ছে নিরীহ শিক্ষক এবং তালেবুল ইলমগণ।

দেওবন্দী মাদ্রাসাগুলো কোনদিন বন্ধ হয় না। সেই ১৮৬৬ সনে ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্হানে বর্তমানের এই মাদ্রাসাগুলোর গোড়পত্তন হয়। সেই থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত দেড়শত বছর অতিক্রম করে চলল। কিন্তু এই সিলসিলার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বিরামহীন ভাবে চলে আসছে। কোন থামাথামি নেই। বন্ধ হয়নি কোনদিন। পুরো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে এর শাখা-প্রশাখা। কোথাও যেন আর বাকী নেই। সব জায়গাতে সফলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, দেওবন্দী মাদ্রাসাগুলো তাঁর চিন্তাধারা থেকে বিচ্যুত হয়নি। শত ঝড়-ঝঞ্জার পরে সে তার ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। আকাবির-আসলাফগণ যে চিন্তা-ধারার উপরে রেখে গেছেন, ঠিক সেই মাসলাক-মাশরাব এর উপরে চলার চেষ্টা করেছে এ প্রতিষ্ঠানগুলো। নানান সমস্যায় পড়তে হয়েছে এ ধারার প্রতিষ্ঠানগুলোকে। নানান যন্ত্রণার শিকার হয়েছে তাঁরা। তারপরেও তাঁরা মুলধারার উপরে অটল-অবিচল রয়েছে।

বড় আশ্চার্যের বিষয়, দেড়শত বছরধরে এক চিন্তা- চেতনা লালন করে তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইজমকে বক্ষে ধারণ করে চলেছে। পিছপা হয়নি কখনো। সকল ফেরাকে বাতেলার মুখে ছাই দিয়ে নববী আদর্শের উপর উজ্জীবিত ছিল তাঁরা। শির নত করেনি। আপোস রফা হয়নি কখনো বাতিল চিন্তাধারার মানুষের সাথে। আমাদের আকাবিরে দেওবন্দ বহু মুজাহাদা-কোরবানীর বদৌলতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধরে রেখেছেন।

নিজের উপর জুলুম চলেছে শত-সহস্রবার। বাতিলের জিন্দানখানায় কেটেছে বছরের পর বছর। তবুও আঁচড় লাগতে দেয়নি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর। জালিমের জুলুম নিজেরা সহ্য করেছেন। কিন্তু দ্বীনি ইদারা যেন বন্ধ না হয় সেই ফিকির ছিল সবার। কেননা, দেওবন্দী মাদ্রাসাগুলো প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এক বড় তাহরীক বা আন্দোলন সামনে রেখে। যে তাহরীকে তাঁরা সফলতার মুখ দেখে ছিলেন। ১৮৫৭ সনে সিপাহী বিদ্রোহের পর যে খড়গ নেমে এসেছিল আলেম সমাজের উপরে, তা বর্ণনার ভাষাতো নেই। বায়ান্ন হাজার আলেম শুধু ফাঁসিতে ঝুলেছিল। ভারতবর্ষের কোন কোন অঞ্চল এমন হয়েছিল, যেখানে আলেম শুণ্য হয়ে যায়। মানুষকে দ্বীনি তা’লীম দেওয়ার মত কাউকে পাওয়া যেত না। এমনকি কোথাও এমনও হয়েছে, জানাযা ও দাফনের ক্ষেত্রে আলেম সংকট দেখা দিয়েছে।

এমনই জটিল মুহুর্তে আমাদের বজুর্গানেদ্বীন নতুন কর্মসুচি হাতে নেন। সংগ্রামের পদ্ধতি চেঞ্জ করে নতুন এক তাহরীক গড়ে তোলেন। যার শুরুটাই হয় সেই দেওবন্দের ডালিম গাছের তলে। দারুল উলুমের নওদারাতে প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। অনেক কোরবানী আর পাহাড়সম ইখলাস নিয়ে হাটিহাটি পা পা করে চলতে থাকে। কারো মুখাপেক্ষী নয়। কারো লেজুড় ধরা নয়। একমাত্র মহান আল্লাহর উপর শতভাগ আস্থা নিয়ে গোড়পত্তন হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠানের। যেটা সম্প্রসারণ হতে হতে বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। এখন তো এক মহীরুহে অবতীর্ণ হয়েছে। ভারত উপমহাদেশ ছাড়াও ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা, অষ্টেলিয়াসহ বিশ্বের সকল দেশেই। কোন দেশ এখন কওমী মাদ্রাসা থেকে খালি নেই।

আকাবির-আসলাফগণ দ্বীনি শিক্ষাকে টিকিয়ে রাখার মিশন নিয়ে কাজ করেছেন। যেখানে যাই ঘটুক, কিন্তু প্রাণের ইদারাগুলো যেন বন্ধ না হয়। কেননা, দ্বীনি শিক্ষা বন্ধ হলে আরো অন্ধকার ছড়িয়ে পড়বে। মানুষ গোমরাহীর দিকে ধাবিত হবে। সমাজে অশান্তি-অনাচার সৃষ্টি হবে। সেই কারণে এসকল মাদ্রাসা থেকে যেমন দ্বীনি তালিম দেওয়া হয়েছে, তেমনি আত্মশুদ্ধির লাইনে মানুষকে মেহনত করানো হয়েছে। সর্বপরি রিজাল তৈরী করা হয়েছে এসকল দ্বীনি মাদ্রাসায়। শত বছর থেকে ঐতিহ্য ধরে রেখে এগিয়ে চলেছে। কোন বাঁধা নেই। কওমী মাদ্রাসাতো কুরআন-হাদীসের মারকাজ। এটা বন্ধ হলে দ্বীনের বড় ক্ষতি হয়। মানুষের মধ্যে হাহাকার চলে আসে।

২০১৯/২০২০ সনে করোনা ভাইরাসের কারণে সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। শুধু বাংলাদেশ নয়। গোটা পৃথিবীর সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। তবে বড় সুখের বিষয় ছিল, এত কিছুর পরেও আমাদের বাংলাদেশের মহামাণ্য সরকার কওমী মাদ্রাসাগুলো খোলার অনুমতি দেয়। প্রথমে দেশের সকল হেফজ বিভাগ খোলার অনুমতি দিয়েছিল। এরপরেই কওমী অঙ্গনের সকল বিভাগ খোলার পারমিশন দিয়েছিলেন। বড় পাওয়া ছিল আলেমদের জন্য। বিশ্বের কোথাও কোন প্রতিষ্ঠান খুলেনি। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসা খোলার অনুমতি দিয়েছিলেন।

আসলে সরকার কোরআন প্রেমিক। নিঃসন্দেহে আলেম-উলামার প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা-ভালোবাসা ছিল। যার কারণে এটা সম্ভব হয়েছিল। পাশাপাশি আমাদের অনেক ওলামায়ে কেরামের মেহনত-মোজাহাদাকে অস্বীকার করা যাবে না। যারা সরকারের সাথে যোগাযোগ করে সেই সুন্দর পরিবেশ কায়েম করেছিলেন।

এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে, আমরা আকাবির-আসলাফগণের চিন্তা-চেতনা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছি।

২০২১ সনে আবার করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ছোবল শুরু হয়। মাদ্রাসাগুলো ঠিকমত চলছিল। কোথাও কোন সমস্যা ছিল না। কিন্তু আবার হঠাৎ মাদ্রাসা বন্ধ হল। খোলার কোন কায়দা এখনো দেখা যাচ্ছে না। তবে কেন বন্ধ হল কওমী মাদ্রাসা? মাদ্রাসাতো বন্ধ হওয়ার কথা নয়। যে সরকার খুবই মহব্বতের সাথে কোরআনের প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিলেন, সেটা কেন আবার বন্ধ হল? সরকারতো আসলে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে চাননি। তাঁর যদি বন্ধ করার ইচ্ছে থাকত, তাহলে সেই সময়ে কিন্তু খুলে দিতেন না। কি কারণে কওমী মাদ্রাসা বন্ধ হয়েছে সেটা সবার জানা। এটা আর নতুন করে ব্যাখ্যা করতে চাই না। তবে এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে, আমরা আকাবির-আসলাফগণের চিন্তা-চেতনা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছি। দেড়শত বছরের ঐতিহ্য কওমী প্রতিষ্ঠান। আকাবিরগণ এমন ভাবে চলেছেন, কখনো মাদ্রাসার উপরে আঁচড় লাগেনি। কিন্তু এই সময়ে আকাবির-আসলাফের সেই চিন্তা-চেতনা কি আমরা লালন করতে পেরেছি? তাঁরা যেভাবে হক-হক্কানিয়্যাতের উপরে অটল-অবিচল ছিলেন, আমরা কি তা পেরেছি?

আরো বড় সমস্যা আমাদের, দাওয়াতের ক্ষেত্রে হেকমত-মাওয়ায়েজে হাসানা থেকে আজো অনেক দূরে। পুর্বসুরীগণ যে সব কৌশল অবলম্বন করতেন, সেসব কৌশল আমরা গ্রহন করিনি। আমাদের মধ্যে দায়ীর যে সিফাত থাকা দরকার, সেটা কিন্তু আমাদের নেই। আকাবির-আসলাফগণ ছিলেন সাহাবাদের নঁকশে-কদমে। পুরোপুরি তাদের অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমরা সেই পথ থেকে অনেক দূরে। আমরা আজো নিজেদের সংশোধন করতে পারিনি। নিজের ভুল থেকে শিক্ষাও নেই না।

আমরা এখনো বাতিলকে বাতিল বলে স্বীকার করতে চাই না, বরং তাদের সাথে ওঠাবসা। বাতিলের সাথে মিশে গেছে অনেকে। যেটা আমাদের জন্য বড় খতরনাক। এজন্য সব ভুল ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে বাড়তে হবে। আকাবিরদের বাতলানো রাস্তায় চলার চেষ্টা করতে হবে। দাওয়াতের ক্ষেত্রে হেকমত-মাওয়ায়েজে হাসানার বিকল্প নেই।

কওমী মাদ্রাসা খোলার ব্যাপারে সকল উলামায়ে কেরাম ঐক্যবদ্ধ ভাবে সরকারের কাছে আবেদন করা চাই। বিশেষ করে আমাদের সর্বোচ্চ শিক্ষাবোর্ড আল হাইয়াতুল উলইয়ার মাধ্যমে হতে পারলে ভালো। না’হলে হাইয়াতুল উলইয়ার মুরুব্বীগণ অন্য কাউকে দায়িত্ব দিয়ে করাতে পারেন। যাদের সাথে সরকারের সুসম্পর্ক, তাদের মাধ্যমেও সরকারকে অনুরোধ করা যেতে পারে। তারপরেও কওমী মাদ্রাসা খোলে যাক। বন্ধ যেন আর না থাকে। তবে এখন থেকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যাতে অদুর ভবিষ্যতে যেন কওমী মাদ্রাসা বন্ধ না হয়। বিশেষ করে এমন কোন ভুল যেন আমাদের থেকে না হয়, যার আছর পড়ে আমাদের কওমী মাদ্রাসার উপর।

আরও পড়ুন: মাদরাসা খোলার ‘মৌখিক’ অনুমতির গুজব, আলেমদের উস্কানি দিচ্ছে একটি মহল

মনে রাখতে হবে, আপনি একা নন, আর আমি একা নই। এখানে লক্ষ লক্ষ নিরীহ ছাত্র আর শিক্ষকের হক জড়িত আছে। আপনার-আমার কারনে যদি এই লক্ষ লক্ষ মানুষের দ্বীন-দুনিয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, অবুঝ ছাত্রদের লেখাপড়া বন্ধ থাকে, তার জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহী করতে হবে। আল্লাহ সকলকে সহী বুঝ দান করুন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com