করোনা; দারিদ্র্যসীমার উপরে থাকা ৪০% পরিবার নতুন করে দরিদ্র হতে পারে

করোনা; দারিদ্র্যসীমার উপরে থাকা ৪০% পরিবার নতুন করে দরিদ্র হতে পারে

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : করোনাভাইরাসের দরুন বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিতে বিশাল ধ্বস নেমেছে। এ সময়ে দেশে ভাইরাস সংক্রমণের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে থাকা ৪০ শতাংশ পরিবার নতুন করে দারিদ্র্যের শিকার হতে পারে। আয় ও খাদ্যগ্রহণ কমে যাওয়ার কারণে এমন অবস্থায় পড়তে পারে পরিবারগুলো।

এরই মধ্যে অতিদরিদ্র, মাঝারি দরিদ্র কিংবা দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। অন্যদিকে ভোগ কমেছে ৪০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের। আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে শহরের ৭১ শতাংশ ও গ্রামের ৫৫ শতাংশ দরিদ্র পরিবারের। শহুরে বস্তিবাসীর ৮২ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলে ৭৯ শতাংশ বস্তিবাসী এখন কর্মহীন।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) যৌথভাবে পরিচালিত ‘পিপিআরসি-বিআইজিডির‍্যাপিড রেসপন্স সার্ভে পভার্টি ইমপ্যাক্ট অব কভিড-১৯’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। টেলিফোনের মাধ্যমে ৪ থেকে ১২ এপ্রিল জরিপটির তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৫ হাজার ৪৭১ জন দরিদ্র মানুষের মধ্যে এ জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। এর মধ্যে শহর থেকে নেয়া হয়েছে ৫১ ও গ্রাম থেকে ৪৯ শতাংশ মানুষ। ভার্চুয়াল প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে এ জরিপের ফলাফল গতকাল প্রকাশ করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ও বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, কভিড-১৯-এর প্রভাবে কর্মহীন ও আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া দরিদ্র মানুষকে নগদ টাকা দেয়া জরুরি। পরিবারপ্রতি এ মুহূর্তে ৫ হাজার ৫৯৪ টাকা প্রয়োজন। এ মুহূর্তে প্রতি মাসে জনপ্রতি সব ধরনের গ্রামের দরিদ্রদের জন্য ১ হাজার ৩৬৮ ও শহরের দরিদ্রদের জন্য ১ হাজার ৭০২ টাকা প্রয়োজন। এছাড়া দরিদ্র নয় কিন্তু ঝুঁকিতে আছে এমন গ্রামের পরিবারের জনপ্রতি মানুষের প্রয়োজন ১ হাজার ৮৪৫ ও শহরের প্রয়োজন ২ হাজার ২১৪ টাকা। দেশে এখন দরিদ্র মানুষের মধ্যে গ্রামে ২ কোটি ৬৯ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩০ ও শহরে দরিদ্র ১ কোটি ১১ লাখ ৯২ হাজার ১৩৯ জন।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, শহরের বস্তিবাসীর আয় ৮২ ও গ্রামের বস্তিবাসীর আয় ৭৯ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে অতিদরিদ্রদের আয় ৭৮ শতাংশ কমেছে, সেখানে দরিদ্র মানুষের আয় কমেছে ৭৯ শতাংশ। অন্যদিকে দরিদ্র নয় কিন্তু ঝুঁকির মধ্যে আছে এমন পরিবারের আয় ৭১ শতাংশ কমেছে। আয় কমার প্রভাব পড়েছে খাদ্য গ্রহণের ওপর। শহরের বস্তিবাসীর খাদ্য গ্রহণ কমেছে ৩২ শতাংশ, আর গ্রামের ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে অতিদরিদ্রদের খাদ্য গ্রহণ ২৯, দরিদ্রদের ২৯ ও দরিদ্র নয় কিন্তু ঝুঁকিতে আছে এমন পরিবারের খাদ্য গ্রহণ ৩৬ শতাংশ কমেছে।

জরিপের তথ্যমতে, বর্তমানে কাজ নেই ৫৫ শতাংশ দক্ষ শ্রমিকের। আবার ৬১ শতাংশ দিনমজুরের এখন কোনো কাজ নেই। কাজ নেই এমন তালিকায় রয়েছে ৬০ শতাংশ ভাঙ্গারি শ্রমিক, ৫৯ শতাংশ রান্না ও রেস্টুরেন্ট শ্রমিক, ৫৭ শতাংশ গৃহপরিচারিকা, ৫৫ শতাংশ পরিবহন শ্রমিক, ৫৩ শতাংশ নির্মাণ শ্রমিক, ৪৭ শতাংশ রিকশাচালক ও ৫৪ শতাংশ কৃষি শ্রমিক। আবার রেস্টুরেন্টের একজন শ্রমিক আগে যে টাকা আয় করতেন, করোনা প্রভাবে তা ৯৩ শতাংশ কমে গেছে। একইভাবে গৃহপরিচারিকার মজুরি ৭৬ শতাংশ, রিকশাচালকের ৭৩ শতাংশ, দক্ষ শ্রমিকের ৬৮ শতাংশ, নির্মাণ শ্রমিকের ৬৩ শতাংশ, দিনমজুরের ৬১ শতাংশ ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি ৫৪ শতাংশ কমে গেছে।

তবে গ্রাম ও শহরের প্রতিটি পরিবার বলেছে, তাদের আয় দ্বারা সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত খাদ্যব্যয় চালিয়ে নিতে পারবেন। এর মধ্যে শহরের বস্তিবাসী ৮ দিন, গ্রামের ১৩ দিন, অতিদরিদ্ররা ৮ দিন, দরিদ্ররা ৯ দিন এবং দরিদ্র নয় কিন্তু ঝুঁকিতে আছে এমন পরিবার ১৪ দিন পর্যন্ত খাদ্য খরচ মেটাতে পারবে। তবে করোনা মোকাবেলার জন্য কী জরুরি এমন প্রশ্নে সবাই বলেছে, নগদ টাকা ও খাদ্য সহযোগিতা দুটোই জরুরি। বিভিন্ন মহল থেকে সহযোগিতা পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত এনজিওগুলো অত্যন্ত নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় রয়েছে বলে জরিপে উঠে এসেছে।

কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে নিজেদের খাদ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বেশির ভাগ মানুষ জানিয়েছে, এক্ষেত্রে তারা নিজেদের সঞ্চয় ভাঙছে। আর এর পাশাপাশি ধারদেনা করে বা প্রতিবেশী বন্ধু ও আত্মীয়দের সহযোগিতা নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। আর খাবার কমিয়েও এ পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধ করছে মানুষ। মাত্র ১৪ শতাংশের মতো মানুষ বলেছে, তারা সরকারি সহায়তা পেয়েছে। আর ৫ শতাংশ পেয়েছে এনজিওর সহায়তা। পরিস্থিতি এমন যে এ মাসের শেষের দিক থেকে বিপুলসংখ্যক নিম্ন আয়ের মানুষ বড় ধরনের খাদ্য সংকটে পড়বে।

বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে কভিড-১৯-এর ফলে অর্থনৈতিক ধাক্কা ও তা মোকাবেলার উপায় খোঁজা হলো এ গবেষণার মূল উদ্দেশ্য। জরিপে অংশ নেয়াদের মধ্যে ব্যবসায়ী ১৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ, দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে শ্রমজীবী ২৯ দশমিক ২৩ শতাংশ, ক্যাজুয়াল শ্রমিক ৪০ দশমিক ৩২ শতাংশ, কৃষি ও মৎস্য খাতের শ্রমিক ৯ দশমিক ১৪ শতাংশ, সহকারী বা সহযোগী হিসেবে শ্রমজীবী ৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *