৩০শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৯শে জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

করোনা; প্রথম যে আবিষ্কার করেছিলেন এ ভাইরাস

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : বর্তমান সারাবিশ্ব যে ভাইরাসটির আতঙ্কে হাত পা গুটিয়ে বসে আছে, সেটি সর্ব প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালের গবেষণাগারে।

মানব শরীরে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব প্রথমবার যিনি আবিষ্কার করেছিলেন, তিনি ছিলেন স্কটল্যান্ডের একজন বাসচালকের কন্যা, যিনি ১৬ বছর বয়সে স্কুল ছেড়েছিলেন। তার নাম জুন আলমেইডা।

জুন আলমেইডা ভাইরাস ইমেজিংয়ের একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন, যার কাজ এখন আবার এই ভাইরাস মহামারির সময় কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

কোভিড-১৯ একটি নতুন ধরণের ভাইরাস, তবে সেটি করোনাভাইরাসের একটি প্রজাতি। ১৯৬৪ সালে লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালের গবেষণাগারে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত করেছিলেন ড. আলমেইডা।

১৯৩০ সালে জুন হার্টে জন্মগ্রহণ করেন এই ভাইরোলজিস্ট এবং গ্লাসগোর আলেজান্দ্রা পার্কের কাছাকাছি টেনেমেন্ট এলাকায় বড় হয়ে ওঠেন। আনুষ্ঠানিক বিদ্যার ক্ষেত্রে তিনি সামান্য পড়াশোনা করেই স্কুল ছাড়েন। তবে গ্লাসগো রয়্যাল ইনফার্মারিতে হিস্টোপ্যাথলজিতে গবেষণাগার কর্মী হিসাবে তিনি কাজ শুরু করেন।

পরবর্তীতে তিনি পেশা জীবনের উন্নতি করার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান। ১৯৫৪ সালে তিনি এনরিক আলমেইডাকে বিয়ে করেন, যিনি ছিলেন একজন ভেনেজুয়েলান শিল্পী।

চিকিৎসা বিষয়ক লেখক জর্জ উইন্টারের তথ্য অনুযায়ী, এই দম্পতি ও তাদের মেয়ে কানাডার টরেন্টোতে পাড়ি জমান। সেখানে অন্টারিও ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে ড. আলমেইডা একটি ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপ নিয়ে তার অসামান্য দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটান। তিনি এমন একটি পদ্ধতির সূচনা করেছিলেন যা অ্যান্টিবডি সংহত করার মাধ্যমে ভাইরাসগুলি আরও পরিষ্কারভাবে দেখা সম্ভব হয়।

মি. উইন্টার বিবিসি রেডিও স্কটল্যান্ডকে বলেছেন, তার এই প্রতিভার বিষয়টি যুক্তরাজ্যের মনোযোগ কাড়ে।

১৯৬৪ সালে তাকে লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতাল মেডিকেল কলেজে কাজ করার জন্য প্রলুব্ধ করে যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে আনা হয়। কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার পর এই হাসপাতালেই প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল। ফিরে আসার পর তিনি ডক্টর ডেভিড টাইরেলের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন, যিনি উল্টশ্যায়ারের সালসবিউরিতে সাধারণ ঠাণ্ডা নিয়ে গবেষণা করছিলেন।

মি. উইন্টার বলছেন, ডক্টর টাইরেল স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে অনুনাসিক ধোয়ার ওপর গবেষণা করছিলেন। তাদের দল দেখতে পায় যে, তারা বেশ কয়েকটি সাধারণ সর্দি-কাশির ভাইরাস বৃদ্ধি করতে পারছিলেন, কিন্তু সবগুলো নয়। তার মধ্যে একটি বিশেষভাবে নজরে আসে। সেটির নাম দেয়া হয়েছিল বি-৮১৪, যা এসেছিল ১৯৬০ সালে সারের একটি বোর্ডিং স্কুলের একজন ছাত্রের কাজ থেকে।

তারা দেখতে পান, তারা সাধারণ সর্দি-কাশির কয়েকটি লক্ষণ স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে তৈরি করতে পারলেও, সেগুলো তাদের নিয়মিত কোষের ভেতরে আর বেড়ে উঠতে পারে না।

তবে স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে প্রত্যঙ্গের মধ্যে কিছু বৃদ্ধি দেখিয়েছিল। সেটা দেখে অবাক হয়ে ড. টাইরেল ভাবলেন, এটা কোন বৈদ্যুতিক মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা উচিত।

তারা সেসব নমুনা জুন আলমেইডাকে পাঠান, যিনি নমুনার মধ্যে ভাইরাস কণা দেখতে পান। সেগুলো সম্পর্কে তিনি বলেন, এগুলো ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মতো দেখতে হলেও পুরোপুরি তা নয়।

সেইদিন তিনি যা শনাক্ত করেছিলেন, সেটি বিশ্বে করোনাভাইরাস হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

মি. উইন্টার বলছেন, ড. আলমেইডা ইঁদুরের মধ্যে হেপাটাইটিস এবং মুরগির সংক্রামক ব্রঙ্কাইটিস তদন্ত করার সময় এর আগে এ ধরণের কণাগুলি দেখেছিলেন।

তা সত্ত্বেও, পিয়ার-রিভিউড জার্নালে পাঠানো তার নথিটি বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। কারণ ”রেফারিরা বলেছিলেন, তিনি যেসব ছবি দিয়েছেন, সেগুলো ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস কণার বাজে ধরণের চিত্র। ”

বি-৮১৪ আবিষ্কারের বিষয়ে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয়। তিনি করোনাভাইরাসের প্রথম যে চিত্র দেখেছিলেন, সেটি প্রকাশিত হয় দুই বছর পরে জেনারেল ভাইরোলজি জার্নালে।

মি. উইন্টারের তথ্য অনুসারে, ড. টাইরেল ও ড. আলমেইডার পাশাপাশি অধ্যাপক টনি ওয়াটারসন, যিনি সেন্ট থমাসের দায়িত্বে ছিলেন, তারা ওই ভাইরাসের নামকরণ করেন করোনাভাইরাস, কারণ ভাইরাসের চারপাশ জুড়ে অনেকটা মুকুটের মতো সাদৃশ্য ছিল।

ড. আলমেইডা পরবর্তীতে লন্ডনের পোস্টগ্রাজুয়েট মেডিকেল স্কুলে কাজ করেন, যেখানে তিনি ডক্টরেট সম্মানে ভূষিত হন। ওয়েলকাম ইন্সটিটিউটে তিনি তার পেশাজীবন শেষ করেন যেখানে বেশ ভাইরাস ইমেজিংয়ের এর ক্ষেত্রে তার নামে বেশ কয়েকটি স্বত্বাধিকার হয়।

ওয়েলকাম ছেড়ে দেয়ার পর ড. আলমেইডা একজন ইয়োগা প্রশিক্ষক হন। তবে পরবর্তীতে ১৯৮০ এর দশকে তিনি এইচআইভি ভাইরাসের ইমেজিং এর ক্ষেত্রে একজন পরামর্শক হিসাবে কাজ করেন।

২০০৭ সালে ৭৭ বছর বয়সে জুন আলমেইডা মৃত্যুবরণ করেন।

মৃত্যুর তের বছর পরে তিনি তার সেই পথিকৃৎ কাজের জন্য অবশেষে স্বীকৃতি পাচ্ছেন, যা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি সম্পর্কে বুঝতে সহায়তা করছে।

সূত্র : বিবিসি

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com