৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ৩রা রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

কর্মমূল্যায়নে স্বচ্ছতা আসছে না সরকারি চাকুরেদের

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের বার্ষিক মূল্যায়নে কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা আসছে না। বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের (এসিআর) বদলে বার্ষিক কর্মকৃতি মূল্যায়ন প্রতিবেদন (এপিএআর) লেখা ছাড়া স্বচ্ছতার কোনো সূচক তাতে যুক্ত হচ্ছে না। আগের এসিআর পদ্ধতির মতোই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অধস্তনদের কাজের মূল্যায়ন করবেন তাঁদের ইচ্ছামতো।

এমন বিধান রেখে বার্ষিক কর্মকৃতি মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুশাসনমালা-২০২২-এর খসড়া আজ রবিবার প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় অনুমোদনের জন্য চূড়ান্ত হতে পারে। মন্ত্রিপরিষদসচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে এ বৈঠক হওয়ার কথা। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা অনুমোদন করবেন।

এপিএআরের খসড়া তৈরির আগে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এর নীতিগত অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। তখন কর্মকর্তাদের কর্মমূল্যায়নে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে বলা হয়েছিল।

এপিএআর পদ্ধতিতে কর্মকর্তাদের পেশাগত কাজের মূল্যায়নের জন্য থাকছে ৬০ নম্বর এবং ব্যক্তিগত মূল্যায়নে ৪০ নম্বর। বছরের শুরুতে করা পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজের বিষয়ে অধস্তনদের নম্বর দেবেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তবে পেশাগত ৬০ নম্বরের মূল্যায়ন কর্মী দেখতে পারলেও ব্যক্তিগত ৪০ নম্বরের মূল্যায়ন গোপন থাকবে। জানার সুযোগ থাকবে না অধস্তনদের। এ জন্য সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারী আপিলও করতে পারবেন না।

অনুশাসনমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০১৭ সালে। পাঁচ বছর পর আজ অনুশাসন অনুমোদন হলেও বাস্তবায়ন শুরু হতে লাগবে আরো দুই বছর। কারণ অনুশাসন অনুমোদনের পর তার জন্য একটি সফটওয়্যার তৈরি করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে শুরু হবে এর বাস্তবায়ন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুরুতে শুধু প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে এটি ব্যবহার হবে। এরপর প্রথম শ্রেণির সব কর্মকর্তাকে এর আওতায় আনা হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এপিএআরের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, বার্ষিক কর্মকৃতি মূল্যায়ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদায়ন করা হবে। এর জন্য প্রত্যেকের কর্মভিত্তিক প্রফাইল থাকা প্রয়োজন। এটা না থাকায় বর্তমানে শুনে শুনে কর্মকর্তাদের বাছাই করতে হয়। কিন্তু এপিএআর চালু হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রফাইল অনলাইনে দেখা যাবে।

বর্তমান এসিআরের পুরোটাই ব্যক্তিগত ও পেশাগত বৈশিষ্ট্যের মূল্যায়ন হয়। যেমন : ব্যক্তিত্ব, সময়ানুবর্তিতা ও সততার ২৫টি মানদণ্ড আছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মচারী বছরব্যাপী কী কাজ করলেন, করলে ঠিকমতো করেছেন কি না তার মূল্যায়ন নেই। এসিআরের ১০০ নম্বরের পুরোটাই বৈশিষ্ট্যনির্ভর। বর্তমানে এসিআরের সময়কাল জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর। এপিএআরের সময়কাল হবে অর্থবছরকেন্দ্রিক জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত।

এপিএআরের খসড়া অনুশাসনের ওপর মতামত দেওয়ার জন্য তা গত ১৮ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। সেখানে সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীর আপিলের বিধান প্রস্তাব করা ছিল। প্রতিকারসংক্রান্ত পরামর্শ বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে এপিএআরের নম্বরও পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হয়েছিল। কিন্তু চূড়ান্ত খসড়া আপিলসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম বাতিল করা হয়েছে। ৬১ পৃষ্ঠার অনুশাসন এখন ৩৬ পৃষ্ঠায় নেমেছে।

মূল্যায়নের পর আপিল করার সুযোগ না রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও অনলাইন সিস্টেম কমিটির প্রধান আবু শাহীন মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আপিল করার বিধান রাখলে জটিলতা বাড়তে পারে। আপিল আবেদন এবং নিষ্পত্তি করতে অনেক সময় চলে যাবে। এ জন্য আপিলের নিয়মটি বাতিল করা হয়েছে। তবে পেশাগত ৬০ নম্বরের মূল্যায়ন উন্মুক্ত থাকবে। ব্যক্তিগত মূল্যায়নের ৪০ নম্বরে কে কত পেল তা গোপন থাকছে। কারণ অধস্তন কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো প্রকাশ করা হলে বিরোধ বাড়বে।

  • ডাটাবেইস বানাতে ১০ কোটি টাকা

অনুশাসন অনুমোদন হলে এপিএআর পদ্ধতি অনলাইনে চালু করা হবে। এ জন্য একটি সফটওয়্যার তৈরির কাজ চলছে। সফটওয়্যার তৈরির জন্য ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। শুরুতে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত প্রফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পারসোনাল ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (পিএমআইএস) সফটওয়্যার থেকে নেওয়া হবে। এরপর প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তারা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রফাইল সংগ্রহ করে নতুন ওয়েবসাইটে ডাটাযুক্ত করবে।

এই ওয়েবসাইট পরিচালনার জন্য কনসালট্যান্ট নিয়োগের কাজও চলছে। এর জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবকে (সিপি) প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নামের একটি কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে। এ কর্মসূচি পরিচালনার জন্য একটি প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০১২ সালে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এসিআরের পরিবর্তে এপিএআর চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিন্তু দীর্ঘদিনেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখন অনলাইন পদ্ধতি চালু করার জন্য নতুন যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি ইতিবাচক। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে অধস্তন কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের ফল জানার সুযোগ রাখতে হবে।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com