কান্ডারী হুঁশিয়ার

কান্ডারী হুঁশিয়ার

  • আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ

মানব শ্রেষ্ঠ সেই মহান সত্তার ওয়ারিছ হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মতের রাহবার আপনারা। আপনাদের লক্ষ্য করেই ঘোষিত হয়েছিল নববীকণ্ঠ: উলামাউ উম্মাতী কা আম্বিয়ায়ে বানী ইসরাঈল-বানু ইসরাঈল গোত্রের নবীগণের মর্যাদায় অভিসিক্ত আমার উম্মতের আলিমগণ। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন শেষ নবী ও রাসূল। তারপর কিয়ামত পর্যন্ত নয়া কোনো রাসূলের আগমন ঘটবে না বা নয়া কোনো নবীও আসবেন না। কিন্তু নবুওয়াতের মহা দায়িত্ব পালন করবেন এ উম্মতের আলিমগণ।  ঈমান, ইলম ও আমলের সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ রূপ রয়েছে হকপন্থী ও আলিমগণের কাছেই। সুতরাং উম্মতের বিপদ সময়ে পাঞ্জেরী তো আপনারাই। শয়তান ও শয়তানিয়্যাতের মুকাবেলায় এ ‘উম্মতের সহায় তো আপনারাই। সুসময়ের বন্ধু তো অনেকেই কিন্তু বিপদে উম্মত সব সময়ই তাকিয়ে থেকেছে আপনাদের দিকেই। হে হক ও হাক্কানিয়াতের পাসবান! ন্যায় ও সত্য, হক ও হাক্কানিয়াত তো সব সময়ই পল্লবিত হয়েছে আপনাদের ইলমকে ঘিরেই। ইলমে ওয়াহীই হলো হক ও হাক্কানিয়াতের মাপকাঠি।

আপনারা হলেন সেই নববী ইলমের অধিকারী। আপনাদের সুমহান পূর্বসূরীগণ নির্যাতন-নিপীড়ন সয়েছেন হাসিমুখে, কিন্তু হক ও হাক্কানিয়াতকে হাত থেকে ছুটতে দেননি। দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন, জেল ও কারাবরণ করেছেন, অবমাননা ও লাঞ্ছনা সয়েছেন, ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন শেষতক জানকেও বিলিয়ে দিয়েছেন হক্কানিয়াতের রাহে অকাতরে, দৃঢ় হস্তে ধারণ করেছেন হক্কানিয়াতের সুদৃঢ় রজ্জু। আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া আর কোনো বিনিময়ের আশা করেননি কোনোদিন।

পবিত্র এই মহাবাণীতে উল্লেখিত সেই জামাত তো আপনারা, এই হকপন্থী আলিমরাই

হে বাতিল ও শয়তানিয়াতের মুকাবেলায় অকুতোভয় মুজাহিদীন! মিথ্যা স্পর্শও করতে পারেনি যে কণ্ঠকে, সেই নবীজী আমার বলে গেছেন বহু আগেই, কিয়ামত তক সবসময়ই আমার উম্মত আল্লাহর নুসরতপ্রাপ্ত ন্যায়-নিষ্ঠ এক জামাআত বহন করবে এই দ্বীন পূর্ববর্তী অনুরূপ এক জামাআত থেকে। তারা বাতিলপন্থীদের অনুপ্রবেশ, বাড়াবাড়ি প্রিয়দের বিকৃতি সাধন এবং অজ্ঞ মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে রক্ষা করবে এই দ্বীনকে। পবিত্র এই মহাবাণীতে উল্লেখিত সেই জামাত তো আপনারা। এই হকপন্থী আলিমরাই। সকল প্রকার বাড়াবাড়ি, বাতিল ও মিথ্যার অনুপ্রবেশ এবং মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে দ্বীনকে রক্ষা করার মহা দায়িত্ব তো যুগ যুগ ধরে বহন করে এসেছেন আপনারাই। 

ইতিহাস তো আজো ভুলে যায়নি ইয়াযীদের উদ্ধত অহংকার যখন স্বৈরাচারী থাবা বাড়িয়ে এলো তখন নববী রক্তের উত্তরাধিকার শহীদে কারবালা হযরত হুসাইন রা.-এর শহীদী রক্তে আপ্লুত হতে কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। সামন্ততান্ত্রিক উমাইয়া বৈভব যখন উদ্যত হলো বিকৃত করতে এই দীনে হানিফাকে তখন তাদের থেকে আবির্ভূত হলেন হকের সিপাহসালার দ্বিতীয় উমর। আব্বাসীয় রাজতান্ত্রিক ইচ্ছার বিরুদ্ধে অকম্পিত হৃদয়ে মাথা তুললেন হযরত ইমাম আবু হানিফা। রাজতন্ত্রের সামনে মাথানত করার চেয়ে কারা প্রকোষ্টের আঁধারের মৃত্যু তাঁর কাছে ছিল অনেক শ্রেয়। রাজশক্তির ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতায় খালকে কুরআনের ফিৎনা যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল তখন সেই ঋজু দেহ কঠিন প্রাণ  মুজাহিদ আহমদ ইবন হাম্বলের পবিত্র এই মহাবাণীতে উল্লেখিত নন্দিত কুরবানীতে থেতলে গিয়েছিল বাতিলপন্থীদের সব আস্ফালন। তাতারীদের অপ্রতিরোধ্য স্রোতের সামনে ইস্পাত প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন হযরত শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া। মোঘলদের সব অহংকার চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানীর দুর্বার দৃঢ়তায়। মনে পড়ে আজো আরো কত উজ্জ্বল নাম। হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভী, শাহ আবদুল আযীয দেহলভী, শহীদ সায়্যিদ আহমদ, শাহ ইসমাঈল শহীদ, হাজী ইমাদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী, হযরত কাসেম নানুতাবী, হযরত রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী, শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান, শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী, হযরত থানভী রহ. সহ আরো কত মহাপ্রাণ।

হে সুমহান আকাবিরের উত্তরসূরী জামাত! মনে কি পড়ে কোন সে মহান মিছিলের শরীক যাত্রী আপনারা? সেই মিছিলের পুরোভাগে আছেন সাইয়্যিদুল কাওনাইন ‘ফিদাহু আবী ও উম্মী’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। রাজসুখ আর অন্ধকার কারাভোগ একই মর্যাদায় ভূষিত ছিল যাদের কাছে এই মহা পথে।  অত্যাচারকারীর  অত্যাচার, তিরস্কারকারীর তিরষ্কার, কারো মালামত, ষড়যন্ত্রকারীদের খল-চক্রান্ত কোনো কিছুই হতোদ্যম করতে পারেনি সেই মহা প্রাণদের।  বিচ্যুত করতে পারেনি উম্মতের কল্যাণকামিতার হেরার রাজতোরণ থেকে। একনিষ্ঠ ব্রত নিয়েই চলেছে সেই মিছিল। 

হে সুমহান আকাবিরের উত্তরসূরী জামাত! মনে কি পড়ে কোন সে মহান মিছিলের শরীক যাত্রী আপনারা? সেই মিছিলের পুরোভাগে আছেন সাইয়্যিদুল কাওনাইন ‘ফিদাহু আবী ও উম্মী’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। 

হে যুগের নকীব দল।  চিরদিনের চেনা আজকে জরাগ্রস্ত এই পৃথিবী এক যুগসন্ধিক্ষণে আজ।  মানবতা বিধ্বংসী পুঁজিবাদের খপ্পর থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় একদিন যে পৃথিবী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আরেক নাস্তিকতাবাদী আন্দোলন মার্কসিজমের গ্রাসে। তা চূর্ণ-বিচূর্ণ, মৃত্যুর প্রহর গুনছে আপন পিতৃভূমিতে।  নির্যাতিত নিপীড়িত অসহায় দূর্বল শোষিত মানুষ আতঙ্কিত পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিকতার নব মুখব্যাদানে। অথচ ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শোষণহীন ইনসাফনির্ভর জোড়ালো নব উত্থান কই? হক ও হাক্কানিয়্যাত তো আপনাদের কাছেই। যক্ষের মতো সেই মহা দৌলত আগলে আছেন আজকের উলামায়ে কেরাম। অসহায় এই পৃথিবী তীব্র আকাঙ্ক্ষায় চেয়ে আছে আপনাদের দিকেই।  

এক দিকে সাহাবায়ে কেরামের আদালতকে আক্রান্ত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইজাযে তারবিয়্যাতকে আহত গ্রামের ইয়াহুদী চক্রান্তের পুরনো খেলা তৎপর এখনো সমানতালে। ইসলামের স্বকপোল-কল্পিত তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা ব্যাখ্যা দিয়ে ইসলামের নামে বাতিলকে  প্রতিষ্ঠার প্রয়াস লক্ষণীয়। এর সাথে সাম্রাজ্যবাদীদের পদলেহনে সৃষ্ট একদল বেদআতী দীনের নামে নানা আকারের আচ্ছন্ন করছে মিল্লাতে বায়যাকে। ইসলামের বিরুদ্ধে যেমন আল-কুফরু মিল্লাতান ওয়াহিদা’-সব কাফিররা এক, তেমনি হকপন্থী আলিমগণের মুকাবেলায় আল- ফিসক মিল্লাতান ওয়াহিদা’ সব বাতিল ও ফিসকপন্থীরা এক জোট। নিজেদের পস্পরের যত মতবিরোধই থাকুক হকপন্থীদের বেলায় সব শেয়ালেরই এক রা! অথচ এত সব কিছু সত্ত্বেও হকপন্থীরা বিভক্ত বিশৃংখল, পরস্পর সন্দেহ ও কাদা লেপনে মত্ত বিভ্রান্ত।  আর সাধারণ মানুষ চেয়ে আছে তাঁদের দিকেই।

হে বু বাকরী চেতনাবাহী আলোর সৈনিকগণ! জাতি পথ পেতে চায়, হক অনুসারী হয়ে চলতে চায়, শুনতে চায় সে বু-বাকরীয় অবিস্মরণীয় ঋজুময় কণ্ঠ- আ ইয়ানকুসুদ্‌ দীন ওয়া আনা হাই’ এই দীনের পরিপূর্ণতায় কোনো ত্রুটি আসবে আর আমি জিন্দা থাকবো? হতে পারে না তা। এই প্রত্যাশাই আজ সকলের। এই উম্মতের আজ কোথায় সে কন্ঠ? কোথায় সেই জামাআত? আশা নিয়ে আছি আমরা এই উম্মত জন। অপেক্ষা করছি আর অপেক্ষা করবই। দূর নহে আর হেরার রাজ তোরণ।   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *