২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৪ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

কিশোর গ্যাং: সমাজের ভয়াবহ এক ব্যাধি

  • মুহাম্মাদ জুবায়ের মালেক

তখনও সন্ধ্যা নামেনি। অনবরত কলিংবেল বেজে চলছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে স্ক্রিনে রিমনের কয়েকটি মিসডকল দেখলো অপু। দরজা খুলে দেখে রিমন দাঁড়িয়ে আছে। কিছু বলার আগেই রিমন বলে উঠলো, বন্ধু! আজ গ্যাঞ্জাম আছে; বড় ভাই সবাইকে থাকতে বলছে, তাড়াতাড়ি চল। একদৌড়ে শার্টটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো অপু।

অপু ক্লাস নাইনে পড়ে। ক্লাস সিক্স থেকেই মারামারিতে বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছে। কখনো কখনো অনেক মারও খেতে হয়েছে। তবে মারামারির নেশা দিন দিন বেড়েই চলেছে তার। এখন সে সফল, কারণ এলাকার বড় ভাইয়ের প্রিয় মানুষের তালিকায় সে আছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় তার যথেষ্ট নাম-ডাক। এক নামে সবাই চেনে তাকে, অপু ভাই।

মোড়ের দোকান থেকে সিগারেট ধরিয়ে অপু জিজ্ঞেস করলো, রিমন, আজ কিসের গ্যাঞ্জাম? রিমন বললো, পাশের এলাকার সিফাতকে চিনিস? সে বড় ভাইয়ের সামনে জোরে বাইক চালাইছে, আর সে অনেক বেয়াদব। এদিকে আসতেছে, বড় ভাই আজ ওকে মারতে বলেছে। অপু বললো, বন্ধু ওর সাথে তো আমারও ঝামেলা আছে, সেদিন দিন ও আমার গার্লফ্রেন্ডের দিকে তাকিয়ে ছিল।

দু’জনে তড়ি‌ৎ গতিতে চলতে লাগলো। স্কুলের পাশের চার রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকলো। দূর থেকে প্রচন্ড গতিতে চারটা বাইক আসছে, অনবরত হর্ণ বাজিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। একসময় তাদের সামনে এসে হাইড্রোলিক ব্রেক করলো। সবাই মিলে স্কুলের দিকে চলতে লাগলো।

সিফাত নামের ছেলেটা এখানে আসবে। তাদের সাথে সিফাতের এক বন্ধু ছিল, সে কল দিয়ে সিফাতকে নিয়ে এলো। যখন সিফাত আসলো, ওদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছেলেটা, যে ক্লাস সিক্সে পড়ে, সে হঠাৎ করে সিফাতকে বললো, কিরে তুই আমাকে গালি দিয়েছিলি কেন?

সিফাত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। সে কখনো তাকে গালি দিয়েছে কিনা তার মনে পড়ছে না। এমন সময় ছেলেটা সিফাতকে চড় মারলো। ছোট একটা ছেলের হাতে চড় খেয়ে সিফাতের আত্মাভিমান তাকে জাগ্রত করলো এবং সেও ছেলেটাকে পাল্টা চড় মারলো। তখন সবাই মিলে সিফাতকে ধরলো, কিরে তুই ওর গায়ে হাত তুললি কেন? এই বলে সবাই একসাথে তাকে মারতে শুরু করলো, সে প্রস্তুত‌ও ছিল না।

যারা আজ তাকে মারছে সবাইকে সে চিনে। কোন একটা সময় হয়তো তারা বন্ধু ছিল। কিন্তু কালের দুর্বিপাকে তারা শত্রু হয়ে গেছে। অনেকক্ষণ মারার পর তাদের মাঝে একজন ‘এই যাহ’ বলে সরিয়ে দিল সবাইকে। সিফাত সেখান থেকে চলে গেল‌। তবে ক্রোধে সে কাঁপছিল।

সিফাতের এলাকার বড় ভাই, যিনি একটা রাজনৈতিক দলের ছোট পদে আছেন, তার কাছে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল সিফাত। বড় ভাই বললেন, ঠিক আছে বিষয়টা দেখতেছি, তোরা পোলাপান খবর দে। ওদেরকে মারবো, তোরা এখানে অপেক্ষা কর। অপু যখন স্কুলে যাবে তখন সবাই ওকে মারবি।

অতঃপর অপু যখন তাদের এলাকা দিয়ে স্কুলে যাচ্ছিলো, তখন সকলে মিলে তাকে আচ্ছা করে মার দেয়। যার কারণে তার বাম হাতের আঙুল ভেঙে যায়। মাথায়ও প্রচন্ড আঘাত পায়। কয়েকজন ধরাধরি করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। বেশ কিছুদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে সুস্থ হয় অপু, তবে প্রতিশোধ নিতে উঠেপড়ে লেগে যায়। তখন তার এলাকার বড় ভাই যিনি ছাত্র রাজনীতির ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয়, তিনি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন যে‌, কীভাবে পাশের এলাকার ওদেরকে মারা যায়। বেশ কিছুক্ষণ ভেবে বলেন, আমরা সবাই একসাথে ওদের এলাকায় যাবো এবং যাকে পাবো ইচ্ছে মতো মারবো।

আমাদের সমাজের যারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় আছেন, তারাই এই দলগুলোর কলকাঠি নাড়ছেন।

এরপর দুই এলাকার মাঝে অনেক বড় ধরনের মারামারি হয়, কারো কারো হাত-পা ভেঙ্গে যায়। অবশেষে যখন বিষয়টা অনেক বড় পর্যায়ে চলে যায়, তখন বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিকট দুই এলাকার বড় ভাইরা (যারা তাদের থেকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিচে রয়েছে) তাদের কাছে বিষয়টির সমাধান চায়। অথচ এই দুই এলাকার বড় ভাইদের একে অপরের সাথে কোন ঝগড়াঝাটি হয়নি। কারণ, তারা ছেলেদের দিয়ে মারামারি করিয়েও নিজেরা এখানে আত্মপ্রকাশ করেনি। বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা দুই দলের মাঝে চড়থাপ্পর দিয়ে মিলমিশ করে দেন। কিন্তু যাদের অঙ্গহানি হয়েছে তারা কী ফিরে পেয়েছে তাদের হারানো হাত-পা?

সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে এই বিষয়টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, বর্তমানে কিশোর গ্যাং পরিচয়ে কিছু উঠতি বয়সের তরুণ আমাদের সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করছে। এই ‘কিশোর গ্যাং’ সমাজের ভয়াবহ এক ব্যাধি। যারা খুন, ছিনতাই-চাঁদাবাজি, শ্লীলতাহানি, ইভটিজিং ও মাদক ব্যবসার মতো অপরাধে বেশি জড়িয়ে পড়ছে। কাউকে গালি দিলে, যথাযথ সম্মান না দেখালে, এমনকি বাঁকা চোখে তাকানোর কারণেও মারামারির ঘটনা ঘটেছে। মেয়েঘটিত বিষয় ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব থেকেও অসংখ্য মারামারি হয়ে যাচ্ছে। এমনকি তাদের পিতা-মাতাও তাদেরকে আগলে রাখতে পারছেন না।

স্কুলে পড়তে গিয়ে কিংবা এলাকায় আড্ডা দিতে গিয়ে শুরুতে মজার ছলে এসব গ্রুপ তৈরি হলেও পরে একসময় মাদক, অস্ত্র, এমনকি খুনোখুনিতেও জড়িয়ে পড়ছে কিশোর-তরুণরা। আমাদের সমাজের যারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় আছেন, তারাই এই দলগুলোর কলকাঠি নাড়ছেন। এইসব ছেলেদের দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করছেন।

আমাদের সন্তানরা দুটি কারণে এধরনের ‘গ্যাং সংস্কৃতিতে’ ঢুকে পড়ছে। প্রথমতঃ সামগ্রিকভাবেই মাদক, অস্ত্রের দাপটসহ বিভিন্ন ধরণের অপরাধ বাড়ছে।

দ্বিতীয়তঃ এখনকার শিশু-কিশোররা পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথেষ্ট মনোযোগ পাচ্ছে না। ফলে কিশোরদের কেউ যখন বন্ধুদের মাধ্যমে এই গ্যাংগুলোতে ঢুকছে এবং মাদক ও অস্ত্রের যোগান সহজেই পেয়ে যাচ্ছে, তখন তার প্রলুব্ধ হওয়া এবং অপরাধপ্রবণ হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

বর্তমানে প্রায়‌ই পত্রিকায় তাদের নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। তবুও দিন দিন তারা আধিপত্য বিস্তার করেই চলেছে। যদিও বিষয়টা প্রশাসনের দৃষ্টি এড়ায়নি। গত কয়েক মাসে কিশোর গ্যাং কেন্দ্রীক বেশ কয়েকটি অপরাধ এবং খুনের ঘটনার পর থেকেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে।

গাজীপুরে এক কিশোর হত্যার ঘটনায় ‘ভাই-ব্রাদার’ নামে একটি কিশোর গ্যাংয়ের ৮ জনকে গ্রেফতারের কথা জানায় র‍্যাব। অন্যদিকে ঢাকায় শুরু হয় কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযান। একদিনেই অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় শতাধিক কিশোরকে। এর মধ্যে শুধু হাতিরঝিল থানাতেই আটক করা হয় ৮৮ জনকে। যদিও পরে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় ৮০ জনকেই ছেড়ে দেয়া হয় বলে নিশ্চিত করেছে থানা কর্তৃপক্ষ। আবার কয়েকজন মামলা খেলেও রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সহায়তায় মামলা খারিজ হয়ে যাচ্ছে, যার কারণে তাদের দুঃসাহস ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

পরিবারের নজরদারি ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষার মাধ্যমে এই কিশোর অপরাধ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব।

যদি আমরা আমাদের বাচ্চাদের বাঁচাতে চাই, তাহলে আমাদের রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজে অপরাধী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। পরিবারে কিশোরদের একাকী বা বিচ্ছিন্ন না রেখে যথেষ্ট সময় দিতে হবে। নিম্নবিত্ত পরিবারে যেমন বাবা-মা দুইজনই কাজে বেরিয়ে যান, তেমনি মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবারেও বাবা-মা সন্তানকে সময় দেন না৷ তারা নানা ধরণের গেম খেলে, সিনেমা দেখে, একাকিত্বের কারণে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে৷ সমাজ ও রাষ্ট্রে অপরাধ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারও তাদের অপরাধে প্রলুব্ধ করে৷

রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার শিশুদের জন্য শিশুবান্ধব পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে৷ তাদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি করতে পারছে না৷ যার পরিণতি আমরা এখন দেখছি। তবে পরিবারের নজরদারি ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষার মাধ্যমে এই কিশোর অপরাধ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। অন্যথায় তাদের থেকে তাদের মা-বাবাও অনিরাপদ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন, আমীন।

লেখক: কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থী

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com