কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: শিশুদের হুমকির আরেক নাম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: শিশুদের হুমকির আরেক নাম

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থাৎ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কাছে বিপুল পরিমাণ তথ্য ভাণ্ডার আছে। তবে এর অপব্যবহার এখন উদ্বেগের অন্যতম কারণ।

অভিভাবকরা অনেক সময় সন্তানের ছবি, ভিডিও সামজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন। অনলাইনে ছবি আপলোডের সময় বেশিরভাগ মানুষই সাত-পাঁচ ভাবেন না। তবে একটি ছবিই কাল হয়ে উঠতে পারে শিশুর জীবনে। কারণ আজকাল ছবি ব্যবহার করে আজকাল “অসম্ভবকে সম্ভব” করছে দুষ্টচক্র। আর এটি সম্ভব হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে।

শঙ্কার বিষয় হলো এআই-এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত না শিশুরাও।

আজকাল অতিপরিচিত একটি শব্দ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। মানবজীবনের কাজকর্মকে সহজতর করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জুড়ি নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিজ্ঞান, তত্ত্ব এবং কৌশলের (গাণিতিক যুক্তি, পরিসংখ্যান, সম্ভাব্যতা, নিউরোবায়োলজি, কম্পিউটার বিজ্ঞান) একটি সমন্বয়। যার লক্ষ্য মানুষের জ্ঞানীয় ক্ষমতা অনুকরণ।

শঙ্কা কোথায়?

এআই নিয়ে গবেষণা হয়ে আসছে অনেক দিন আগে থেকেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এ প্রযুক্তিতে মানুষের নির্ভরশীলতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষি, শিক্ষা, ব্যবসা ইত্যাদি খাতে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার দখল এখন একচেটিয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থাৎ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কাছে বিপুল পরিমাণ তথ্য ভাণ্ডার আছে।

তবে এর অপব্যবহার এখন উদ্বেগের অন্যতম কারণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খুব সূক্ষ্মভাবে ভুয়া তথ্য প্রচারে সক্ষম। সহজ ভাষায় বলতে গেলে আজকাল মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে বানোয়াট ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইনে।

সম্প্রতি দেশে এক নারীর একটি আপত্তিকর ভিডিও সামজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এআই-এর সহায়তায় ৯ সেকেন্ডের সেই ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছিল ভুক্তভোগীর ছবি ব্যবহার করে। এতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার ব্যক্তিজীবন।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার মাসুক হেলাল অনিক বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্তমানে অন্যতম উন্নত একটি প্রযুক্তি। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ যুগে আমরা অনেক ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করে থাকি। ফলে তথ্য এখন অনেক সহজলভ্য। তাই যে কেউই এ তথ্য পেতে পারেন। যার ব্যবহার ও অপব্যবহার উভয়ই আছে। শিশুদের ছবি বা ভিডিও অপব্যবহার বিষয়টিও বেশ চিন্তার। এখনও বাংলাদেশে এর অপব্যবহার তেমন একটা প্রচলিত নয়। তবে এর আশঙ্কাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”

তিনি আরও বলেন, “সাইবার ক্রাইম নিয়ে সচেতনতা মূল বিষয়। নিজে সচেতন থাকলে অনেকটা নিরাপদ থাকা যায়। এ ধরনের অপরাধ আসলে কমানো সম্ভব, তবে শেষ করাটা কঠিন। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে নিজেদের খাপ খাওয়ানো খুব প্রয়োজন। অন্তত নিজেদের শিশুদের প্রতি সচেতন ও যত্নবান হওয়াটা বাঞ্ছনীয়।”

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল আশিক বলেন, “দেশে বর্তমানে যেকোনো ধরনের সাইবার অপরাধের জন্য আইন রয়েছে। সেই আইন নাগরিকদের সব ধরনের ডিজিটাল নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে মামলা করা যায়।”

তিনি আরও বলেন,“অতীতে দেখা যেত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বেশিরভাগ ব্যবহারকারীর বয়স ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। কিন্তু বর্তমানে আমরা দেখতে পাই শিশুরাও সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব চ্যানেল ইত্যাদি ব্যবহারে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। এছাড়াও আমরা অনেক সময় দেখতে পাই বাবা-মায়েরা তাদের শিশুর দৈনন্দিন অ্যাক্টিভিটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করছেন। সেগুলো ভাইরাল হচ্ছে, অনলাইনে বিনোদনের খোরাক জোগাচ্ছে। এতে শিশুদেরও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এআইয়ের অপব্যবহার ভবিষ্যতে এসব শিশুর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।”

আইনজীবী আবদুল্লাহ আল আশিক মনে করেন, “প্রযুক্তি ব্যবহারে অবশ্যই আমাদের সচেতন হতে হবে। যেকোনো ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অপরিচিত কাউকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধু বানানো যাবে না।”

“এছাড়া সরকারিভাবে পদক্ষেপ নিয়েও এমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। যেমন, বিগত দিনগুলোতে আমরা দেখেছি তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এর উদ্যোগে সব ধরনের পর্ন ওয়েবসাইটের অ্যাকসেস দেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভিপিএন প্রযুক্তিও ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে। এআই প্রযুক্তি ব্যবহারে আরও বেশি যত্নশীল হলে এবং এর নেতিবাচক দিকগুলো কঠোরহস্তে দমন করা গেলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।”

অভিভাবকদের সচেতনতা

বিষয়টি নিয়ে বেশিরভাগ অভিভাবকের জ্ঞান প্রায় শুন্যের কোটায়। তবে কেউ কেউ আজকাল সচেতন হচ্ছেন। অপেক্ষাকৃত কমবয়সী অভিভাবকরা বিষয়টিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন।

আয়েশা (ছদ্মনাম) নামে অভিভাবক জানান, “ফেসবুক যেকোনো সময় হ্যাক হতে পারে, সেজন্য ‘টু স্টেপ ভেরিফিকেশন’ অন করা প্রয়োজন। আর অপব্যবহার রোধে ব্যক্তিগত পোস্টগুলো ‘অনলি ফ্রেন্ডস’ দেই আমি। ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে ফেসবুকে একদম অপরিচিত কাউকে রাখি না। আর এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে সহজে একজনের ছবিতে অন্যজনের মুখ বসিয়ে দেওয়া যাচ্ছে।”

“এমন অবস্থায় পড়লে আমি পুলিশের সহায়তা নেব।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক অভিভাবক জানান, “আমরা বিভিন্ন সময় আমাদের সন্তানদের ছবি কিংবা ভিডিও শেয়ার করে থাকি। তবে আমি সবসময় ফেসবুকে আমার ছবিতে প্রাইভেসি দিয়ে রাখি। যাতে কোনোভাবে আমার ছবি আমার বন্ধুরা ছাড়া কেউ দেখতে না পারে। তবে বর্তমানে শিশুদের ছবি এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সে বড়দের পাশাপাশি শিশুদের এমন হয়রানির বিষয়টি বেশ উদ্বেগজনক। এতে শিশুদের জীবনব্যাপী একটি ক্ষতির সম্ভাবনা থেকে যায়। এ বিষয়ে আমাদের সচেতনতাও অনেক কম, যা বাড়ানো দরকার।”

তবে অনেক অভিভাবকই বেশ সচেতন এ বিষয়ে।

আয়েশা (ছদ্মনাম) নামে আরেকজন অভিভাবক বলেন, “বাচ্চার ছবি ফেসবুকে দিলেও তা কখনও ‘পাবলিক’ করি না। পাবলিক কোনো গ্রুপে পোস্ট করি না। খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে যে কেউই এগুলো ব্যবহার করতে পারে।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজকাল শিশুদের ছবি ব্যবহার করে সাহায্য চান অনেকে। এসব ছবি বা সাহায্যের আবেদনের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই অভিভাবক বলেন, “এসব পোস্ট দেখে সাহায্য করতে চাইলে আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার। আর এখন অপরাধ বেড়ে যাওয়ার কারণে আগের তুলনায় বাচ্চার ছবি অনেক কম দেই, দিলেও কোথাকার ছবি তা বলি না। যাতে বাচ্চা কখন, কোথায় আসা-যাওয়া করে তা কেউ বুঝতে না পারে। এমন কোনো ইনফরমেশন বা ছবি দেই না, যাতে বড় হয়ে তাকে কোনো অসুবিধা বা বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়।”

কোভিড মহামারির কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল স্কুলগুলো। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল শিশুদের পড়াশোনার অন্যতম মাধ্যম। ফলে শিশুরা একরকম বাধ্য হয়েই এই জগতে আসে তখন।

১৪ বছর বয়সী মাইশা (ছদ্মনাম) কোভিড মহামারির সময় থেকেই লেখাপড়ার জন্য ব্যবহার করে আসছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ক্লাস সংক্রান্ত সব তথ্যই সে পেত তার মায়ের অ্যাকাউন্ট থেকে।

মাইশার কথায়, “আম্মুর ফেসবুক দিয়ে আমি কোভিডের সময় লেখাপড়ার কাজ করেছি। শিক্ষকরা মেসেঞ্জারের মাধ্যমে আমাদের ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি দৈনিক সব কাজ করতেন। আমার আম্মু সবসময়ই বলতেন ফেসবুক প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার না করতে এবং আম্মু প্রোফাইল সবসময় লক করে রাখে। অপ্রয়োজনীয় কাউকে বন্ধু হিসেবে রাখেন না তিনি।”

সর্বোপরি বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ এবং আইনের সঠিক প্রয়োগই পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেতিবাচক প্রভাব থেকে শিশুদের বাঁচাতে।

সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *