২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ইং , ১৪ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৫ই রজব, ১৪৪২ হিজরী

গণপরিবহণে নারীর যাত্রা নিরাপদ হোক

সচেতনতা । মো: কামাল হোসেন

গণপরিবহণে নারীর যাত্রা নিরাপদ হোক

সড়ক পথে যানবাহনে চলাচল করলে কতৃপক্ষ যে পরিবহণ অনুমতি বা টিকিট দেয় সেখানে প্রায়শই দেখা যায় লেখা থাকে “আপনার ভ্রমণ নিরাপদ হোক”। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে যাত্রীর কল্যাণ কামনায় লেখা। গাড়িটি যাতে দুর্ঘনায় না পড়ে যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে নিরাপদে পৌঁছে দিতে পারে সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এই শুভ কামনা। কিন্তু বাস্তবতার সাথে অনেক সময়ই এ লেখার সাথে যাত্রীর ভ্রমণকালীন অভিজ্ঞতার মিল থাকে না। এর অনেক কারণ আছে, সেগুলোর মধ্যে আছে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালনা, গাড়ির চালক ও সহকারীদের খারাপ আচরণ, গাড়ি চালনার সময় মোবাইলে কথা বলা ধুমপান অন্যতম। বাংলাদেশের অধিকাংশ যাত্রী এ ঘটনার সাথে পরিচিত এবং প্রতিবাদ করেও ফল না পেয়ে অনেকটা মেনে নিয়েছে বলেই প্রতীয়মান। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের গণপরিবহণ ব্যবস্থায় “আপনার ভ্রমণ নিরাপদ হোক” শব্দটি গায়েব হয়ে গেছে বলে ভুক্তভোগীরা মনে করছেন। কেননা যাত্রী হয়রানির পাশাপাশি যে বিষয়টি এখন চিন্তার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে তা হচ্ছে গণপরিবহণে ধর্ষণ। বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের এবং নারী ক্ষমতায়নের জন্য বড়ো প্রতিবন্ধক।

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদে নারীর জন্য জাতীয় সংসদে আসন সংরক্ষণের বিধান রাখা হয় এবং এক্ষেত্রে ৬৫(২) অনুচ্ছেদে প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত ৩০০ আসনে নারীর অংশগ্রহণেও কোনো বাধা রাখা হয়নি। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১৯(৩) অনুচ্ছেদের আলোকে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে মর্মে অঙ্গীকার রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিশ্বকে বিস্মিত করেছে, সেখানেও নারীর অবদান অনস্বীকা‌র্য। সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আনছে যে খাত, সেই পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশ নারী। অন্যান্য উৎপাদন খাত ও সেবা খাতেও নারীর সদম্ভ উপস্থিতি লক্ষণীয়। আমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে নারীর বিরাট অবদান রয়েছে। কিন্তু তা সামাজিকভাবে স্বীকৃত নয়। বরং সমাজজীবনে নারী চরমভাবে অবহেলিত, উপেক্ষিত ও নির্যাতিত।

যে বিষয়ে আজকের লেখার সূত্রপাত সেখানে দৃষ্টি ফেরাতে চাই। আট বছর আগে, ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের দিল্লিতে চলন্ত বাসে নির্ভয়া (ছদ্মনাম) নামের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ক্ষোভের আগুনে জ্বলে উঠেছিল ভারত।

বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বই এ ঘটনায় আন্দোলিত হয়। চলন্ত বাসেও এমন নৃশংস অপরাধ সংঘটিত হতে পারে জেনে মানুষ বিস্মিত হয়।তখন বিশ্বাস করা কঠিন ছিল যে বাংলাদেশেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। বিস্ময় জাগানো ঔ ঘটনার ঠিক এক মাস পর ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে এক নারী পোশাক শ্রমিক ধর্ষণের শিকার হন। সেটাই শেষ নয়, ছিল শুরু মাত্র। এরপর নিয়মিতই চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে এ দেশে। তবে সময়ের ব্যবধানে গণপরিবহণ এখন আর শুধু যৌন হয়রানিতে আটকে নেই। ধর্ষণের চেষ্টা, ধর্ষণ-গণধর্ষণ এমনকি ধর্ষণের পর হত্যা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে যানবাহনে যৌন হয়রানির আতঙ্ক রুখতে বাসে জাতীয় জরুরি পরিসেবা নম্বর ৯৯৯ লিখে রাখা বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ১২ মাসে গণপরিবহণে ২১ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। বাস, প্রাইভেট কার, অটোরিকশা, নৌযানসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে এসব ঘটনা ঘটে। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে গণপরিবহণে যাতায়াতকালে ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো সময় মৌখিক ও শারীরিকসহ নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না হওয়া, বাসে অতিরিক্ত ভিড়, যানবাহনে পর্যাপ্ত আলো না থাকা ও তদারকির অভাব (সিসি ক্যামেরা না থাকা) নারীদের যৌন হয়রানির মূল কারণ হিসেবে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২০২০ সালের (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) বার্ষিক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে দেশে ১৬২৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ৩২৬ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাকেন্ডর শিকার ৫৩ জন এবং ধর্ষণ পরবর্তীতে মানসিক চাপ সামলাতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে ১৪ জন। ১৩টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে সম্প্রতি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে ২০২০ সালের মোট ৩ হাজার ৪৪০ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তন্মধ্যে ১ হাজার ৭৪ জন ধর্ষণ, ২৩৬ জন গণধর্ষণ ও ৩৩ জন ধর্ষণের পর হত্যা ও ৩ জন ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যাসহ মোট ১ হাজার ৩৪৬ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ২০০ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছে ৪৩ জন। ৭৪ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও নারী নির্যাতন ,ধর্ষণ এবং হত্যার মত ঘটনা বেড়েছে তা স্পষ্ট।

ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং নারী নির্যাতনকারীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে তীব্র প্রতিবাদ-আন্দোলন গড়ে ওঠার পটভূমিতে ১৩ অক্টোবর “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০” এর
সংশোধনী এনে বাংলাদেশে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডের বিধান সংক্রান্ত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) শীর্ষক নতুন অধ্যাদেশ সই করেছেন বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ। রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের ফলে সংশোধিত আইনটি কার্যকর হয়েছে। এমনকি এই আইনের আওতায় ইতোমধ্যে আদালতের এক আদালত থেকে পাঁচ ধর্ষকের মৃত্যুদন্ডাদেশও দেওয়া হয়েছে। আইনে ছয় মাসের মধ্যে বিচারসম্পন্ন করার বিধান রাখা হয়েছে। শাস্তি বাড়লে ধর্ষণ প্রবণতা কমবে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। ধর্ষকদের কঠিন শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পক্ষে যেমন মতো আছে, আবার বিপক্ষেও যুক্তি আছে। শুধু আইন অপরাধ কমাতে পারে না। অপরাধ সংঘটনের বিদ্যমান কারণগুলো দূর না করলে অপরাধ অব্যাহত থাকবে বলে কেউ কেউ মনে করেন। নারী নির্যাতন এবং নারীর প্রতি সহিংসতা দেশে একটি বড়ো সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই নারীদের অগ্রসর হতে হচ্ছে, বিজয় ছিনিয়ে আনতে হচ্ছে। পদে পদে বাধা, তারপরও সরকারের কিছু নারীবান্ধব নীতি-পদক্ষেপের কারণে নারীদের অবস্থা ও অবস্থানের যখন দৃশ্যমান অগ্রগতি দেশের বাইরেও অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, প্রশংসিত হচ্ছিল, তখন নারী নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। নারী নির্যাতন ভাইরাসে আক্রান্ত সমাজকে রোগমুক্ত করার জন্য চাই উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ। প্রথমত, করোনার সময় ও এর পরবর্তী সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধের জন্য আইন ছাড়াও আমাদের প্রয়োজন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। সহিংসতা প্রতিরোধে নারীদেরও সোচ্চার হতে হবে। উন্নত অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে জরুরি হটলাইন সেবা প্রদান করা হয়েছে।এ উদ্যোগ নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে এ সেবা সম্পর্কে আরও প্রচার দরকার বলে তাদের অভিমত।

গণপরিবহণে ধর্ষণের দায় বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে নিতে হবে। চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা রোধে পুলিশ, বিআরটিএ, বাস মালিক, শ্রমিক ও প্রশাসনসহ সকলকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। চালক, সুপারভাইজার ও হেলপারের চরিত্র সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ-খবর নিতে হবে। বিআরটিএকেও সতর্ক থাকতে হবে। লাইসেন্স দেওয়ার আগে চালকের ‘ডোপ টেস্ট’ করাতে হবে। মাদকাসক্ত হলে লাইসেন্স দেওয়া যাবে না।

চলন্ত বাসে ধর্ষণ প্রতিরোধে নারীদের বাসে একক যাত্রী হয়ে ভ্রমণ যতটা সম্ভব পরিহার করা, ভ্রমণে সতর্ক থাকা, অপরিচিত কারোর কাছ থেকে খাবার গ্রহণে বিরত থাকা, প্রলোভনের ফাঁদে না পড়া, রাতের বেলায় ভ্রমণে যাতায়াতের পথ, পরিবহণ ও রাস্তার নিরাপত্তা সম্পর্কে জেনে নেওয়া, প্রচলিত আইনে প্রদত্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষার অধিকার যথাযথ প্রয়োগ , আক্রান্ত হলে সাহায্যের জন্য জোরে চিৎকার ও জাতীয় হেল্প সেন্টারে ৯৯৯ অথবা নারী ও শিশু নির্যাতন হেল্পলাইন ১০৯ কল করা, রাতের বেলায় সড়কে পুলিশের নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়ানো, বাসের জানালায় স্বচ্ছ গ্লাস লাগানোর বিধান, অপরাধ সংঘটনকালীন তা প্রতিরোধে জনসাধারণের সক্রিয় ভূমিকা পালন, পরিবহণ কর্মীদের নিয়ে অপরাধ বিষয়ক মাসিক সচেতনমূলক প্রোগ্রাম আয়োজন, অপরাধীর দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা, যাত্রীদের সাথে আচরণের বিষয়ে বাস চালক ও সহকারীদের ওরিয়েন্টেসন কার্যক্রম গ্রহণ করা এবং আরও বেশি সংখ্যায় মহিলা পুলিশ নিয়োগ নিশ্চিত হলে গণপরিবহণে নারীর ভ্রমণ যেমন নিরাপদ হবে তেমনি নারীর অভিযোগ জানানো ও প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রও প্রসারিত হবে বলে ভুক্তভোগীদের মতামত রয়েছে।

একটি দেশের, একটি সমাজের উন্নয়ন হচ্ছে ঐ দেশের ঐ সমাজের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক উন্নয়ন। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নকে নিশ্চিত করতে হলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সকল সূচকে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। সুতরাং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সকল সূচকে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে দেশের বৃহত্তর এই জনগোষ্ঠী নারীকে উন্নয়ন অগ্রগতির সকল কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। নারীকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সুতরাং দেশকে এগিয়ে নিতে, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে অব্যাহতভাবে এগিয়ে নিতে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী নারী সমাজকে উন্নয়নের সকল কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে।

সর্বোপরি নারীকে নারী নয়, মানুষ হিসেবে দেখা শুরু হলেই অনেকাংশে কমে আসবে নির্যাতন। বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরে পদার্পণের অপেক্ষা। ২০২১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করবে বাংলাদেশ। এ মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের প্রত্যাশা গণপরিবহণে নারীর যাত্রা নিরাপদ হোক। পিআইডি নিবন্ধ

লেখক : কলামিস্ট

০৭.০২.২০২১

নিউজটি শেয়ার করুন

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com