জান্নাতে পিতা-পুত্র একসাথে থাকতে চাই
হযরত খায়সামা ইবন আবী খায়সামা রা. বদর যুদ্ধে শরীক হতে পারেননি। তাঁর হযরত সা’দের কারণে। পিতা-পুত্র একই সঙ্গে বদরে শরীক হতে চেয়েছিলেন, কেউ কাউকে এই ক্ষেত্রে ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। শেষে লটারিতে পুত্রের নাম জরী হয়। পুত্র বদরে শহীদ হন।
উহুদের সময় হযরত খায়সামা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, বদর তো আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। লটারিতে আমার ছেলের নাম আসায় সে তাতে শরীক হয়েছিল এবং আল্লাহর মর্জি, শহীদও হয়। গতরাতে আমি তাকে স্বপ্নে দেখি। খুবই সুন্দর ছিল সে, জান্নাতের ফল-ফলাদির উদ্যানে সে উড়ছিল। বর্ণায় অবারণ বলছিল। আর বলছিল, এসে যান আব্বা, জান্নাতে আমরা একসঙ্গেই থাকি। আল্লাহ পাক যা ওয়াদা করেছেন সবই আমি পেয়েছি। আল্লাহর কসম হে আল্লাহর রাসূল, আমি জান্নাতে প্রিয় পুত্রের সঙ্গ পেতে খুবই আগ্রহী। দুআ করুন, আল্লাহ যেন আমাকে শহীদ করেন এবং জান্নাতে তার সঙ্গ পাই।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করলেন। হযরত খায়সামা ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন। আশা পুরন হল তাঁর।
ফেরেশতারা গোসল দিলেন যাঁকে
উহুদ যুদ্ধের উসকানিদাতা মদীনার ফাসিক আবূ আমিরের পুত্র হযরত হানযালা ছিলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন আনসারী সাহাবী। তিনি ইসলামের দুশমন পিতাকে হত্যার অনুমতি চাইলেন। মহাকান্তির সর্ব উন্নত নৈতিকতি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কঠিনভাবে তাঁকে নিষেধ করলেন।
উহুদ যুদ্ধের আগের রাতে তাঁর স্ত্রী হযরত জামীলা রা. স্বপ্নে দেখেন, আসমানের একটা দরজা খুলে গেছে আর হযরত হানযালা তাতে প্রবেশ করলেন আর তখন সে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। তিনি ভাবলেন তাঁর স্বামী মনে হয় আর বেশিদিন নেই। স্বামীকে আবেগে জড়িয়ে ধরলেন। মিলন হল। তাঁর স্ত্রী এর জন্য চারজন সাক্ষী রাখলেন। এই উটকো কাজে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তাঁর স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে বললেন, আমি বুঝতে পেরেছি আপনি শহীদ হবেন, তাই কোনো সন্তান যদি আমার হয় তাতে যেন বিতর্ক সৃষ্টি না হয়, এ জন্যই সাক্ষী রাখলাম।
খবর এল, উহুদ ময়দানের অবস্থা খুবই কঠিন। ফরয গোসল করার অপেক্ষা না করে তরবারি নিয়ে হযরত হানযালা ছুটলেন উহুদের ময়দানে। সম্মুখে পড়ল অশ্বারোহী কুরাইশ সেনাপতি আবূ সুফিয়ান। এক আঘাতে তার ঘোড়ার পা কেটে ফেললেন। আবূ সুফিয়ান ছিটকে পড়ল। তাকে আবার আঘাত করবেন এর মাঝেই পিছনদিক থেকে এক দুশমনের বর্শার আঘাতে শহীদ হয়ে লুটিয়ে পড়লেন হযরত হানযালা রা.।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লাশ দেখে বললেন, রূপার কোটায় বৃষ্টির পানি রেখে ফেরেশতারা তাকে গোসল দিচ্ছেন। মাথা থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। তার পরিবারে খোঁজ নাও তো দেখি বিষয়টা কী?
তাঁর স্ত্রী তখন বিষয়টি জানালেন এবং বললেন, ‘তাড়াহুড়ো করে ফরয গোসল না করেই তিনি জিহাদে চলে এসেছিলেন।’ এই গল্পেই আবদুল্লাহ নামে তাঁর এক সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তিনি খুবই খ্যাতি লাভ করেছিলেন।
খোঁড়া পা নিয়ে জান্নাতে বিচরণ করতে অভিলাষী
প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আমর ইবনুল জমূহ রা. খোঁড়া ছিলেন। তাঁর ছিল চার ছেলে। সকলেই ছিলেন খ্যাতিমান বীর। উহুদ যুদ্ধের সময় হযরত আমর ইবনুল জমূহ রা. শরীক হতে চাইলে ছেলেরা তাঁর ভাবে বাধা দেয়। তারা বলল, আপনি তো খোঁড়া। আল্লাহ তাআলা আপনাকে মাফ করেছেন, আপনি যুদ্ধে শরীক হয়ে কী করবেন?
হযরত আমর সোজা চলে এলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে। আরজ করলেন, আমার পুত্রেরা আপনার সঙ্গে এই যুদ্ধে যেতে বাঁধার সৃষ্টি করছে। আল্লাহর কসম! আমি তো চাই এই খোঁড়া পা নিয়ে জান্নাতে বিচরণ করব। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার বিষয়ে তো আল্লাহ তাআলাই বলেছেন, খোঁড়াদের যুদ্ধে শরীক হওয়ার দরকার নেই। সুতরাং তোমার জন্য তো জিহাদ জরুরী নয়।
এরপর তাঁর ছেলেদেরকে ডেকে বললেন, একে বাধা দেয়ার দরকার নেই। আল্লাহ পাক হয়তো তাকে শাহাদতের মর্যাদায় অভিষিক্ত করবেন।
শেষ পর্যন্ত হযরত আমর জিহাদের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। ঘরের বাইরে এসে কিবলামুখী হয়ে দুআ করলেন, ‘হে আল্লাহ, আমাকে শাহাদত বঞ্চিত করে বাড়ি ফিরিয়ে আনবেন না।’ তিনি যুদ্ধে শরীক হলেন। খোঁড়া পা নিয়েই লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন।
এই যুদ্ধে তাঁর ছেলে খাল্লাদ, তাঁর একজন আযাদকৃত দাস এবং তাঁর স্ত্রীর ভাই, হযরত জাবিরের পিতা আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারামও শহীদ হন। তাঁর স্ত্রী হিন্দ বিনত আমর যুদ্ধের পর ভাই আবদুল্লাহ এবং তাঁর লাশ একটি উটে করে মদীনার দিকে রওয়ানা দিলেন। পথে হযরত আয়িশা রা. এর সঙ্গে দেখা। তিনি যুদ্ধের খোঁজখবর নেয়ার জন্য আসছিলেন। তিনি বললেন, কী খবর? ময়দানের অবস্থা কী? হিন্দ বিনত আমর বললেন, আল্লাহর শোকর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিরাপদ আছেন। তিনি যখন নিরাপদ আছেন তখন আর যত বড় বিপদই হোক না কেন, সবই ছোট। হ্যাঁ, আল্লাহ পাক মুমিনদের কিছুসংখ্যক মহৎপ্রাণকে শহীদ হিসাবে গ্রহণ করেছেন।
হযরত আয়িশা রা. বললেন, উটের উপর কাদের বয়ে আনছো? তিনি বললেন, আমার ভাই, আমার ছেলে খাল্লাদ এবং স্বামী আমর ইবনুল জমূহ। হযরত আয়িশা রা. বললেন, কোথায় নিয়ে যাচ্ছ এদের? হিন্দ বললেন, মদীনায়, সেখানেই কবর হবে মনে করেছি।
হযরত হিন্দ বিনত আমর উটটিকে সামনের দিকে হাঁকালেন, কিন্তু এটি বসে পড়ল। শত চেষ্টাতেও তিনি উটটিকে আর অগ্রসর করতে পারলেন না। হযরত আয়িশা রা. বললেন, কী হল, বেশি বোঝা হয়ে গেল নাকি?
হিন্দ বললেন, কিছুই তো হয়নি। অনেক সময় দুই উটের বোঝা নিয়েও তো এটি যায়! অন্যকিছু ঘটল নাকি? এরপর তিনি উটটিকে আবার হাঁকালেন কিন্তু সেটি মদীনার দিকে না গিয়ে উহুদের দিকে যেতে শুরু করল।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিষয়টি জানালে তিনি বললেন, উটটি তো আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত। আমর কি কিছু বলেছিল? হিন্দ বললেন, উহুদে আসার সময় তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে দুআ করেছিলেন, হে আল্লাহ, আমাকে আর ঘরে ফিরিয়ে এনো না। আমাকে শাহাদতের তাওফীক দাও।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ জন্যই উটটি মদীনার দিকে যাচ্ছে না। তোমাদের মাঝে হে আনসারীগণ, কেউ কেউ এমন আছে, যারা আল্লাহর কাছে কসম খেয়ে কিছু বললে, আল্লাহ তা অবশ্যই পূরণ করেন। আমর ইবনুল জমূহ হল এদেরই একজন। আমি তো দেখছি তার খোঁড়া পা নিয়েই বেহেশতে সে আনন্দে ছুটাছুটি করছে।
ওহে হিন্দ, তোমার ভাই আবদুল্লাহ ইবন আমরকে শহীদ হওয়ার ক্ষণ থেকে নিয়ে ফেরেশতারা ছায়া দিয়ে রাখছেন। অপেক্ষা করছেন কোথায় তাকে দাফন করা হচ্ছে।
এরপর তিনি তাঁদের সকলকে একই কবরে দাফন করলেন। বললেন, ওহে হিন্দ, এরা সবাই জান্নাতে একই সঙ্গে আছে।
হযরত হিন্দ রা. বললেন, দুআ করুন হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ আমাকেও তাদের সঙ্গী করুন।


