গরমে চাই শিশুর বাড়তি ও সঠিক যত্ন

গরমে চাই শিশুর বাড়তি ও সঠিক যত্ন

গরমে চাই শিশুর বাড়তি ও সঠিক যত্ন

সাদেকুর রহমান ● রাজধানীর রামপুরা এলাকার নার্সারীর ছাত্র আহমেদ শাবীবের কদিন ধরে পাতলা পায়খানা। উদ্বিগ্ন মা-বাবা তাকে নিয়ে গেলেন শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বললেন, গরম থেকে এ সমস্যা। ওরস্যালাইন খাওয়ান। গা মুছে রাখবেন আর ঘাম যাতে শরীরে বসে না যায় খেয়াল রাখবেন। শরীরের ঘাম মুছতে সুতি রুমাল ব্যবহারের পরামর্শ দিলেন চিকিৎসক। আর পানি ও পানি জাতীয় খাবারে বাড়তি সতর্কতারও পরামর্শ দেওয়া হয় শাবীবের অভিভাবকদের।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় ছয় বছরের ছেলে রাহীদের কদিন ধরে জ্বর ও পাতলা পায়খানা। অভিভাবকরা তাকে নিয়ে গেলেন স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে, শিশু চিকিৎসকের কাছে। তীব্র গরম থেকেই রাহীদের এমনটা হয়েছে বলে জানান চিকিৎসক। সে মোতাবেক তার চিকিৎসাও চলে।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য মতে, ঢাকাসহ দেশে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মৃদু তাপপ্রবাহ চলছে। পরিবেশ দূষণ, যানবাহনের আধিক্য, স্থাপনায় কাঁচের ব্যবহার বৃদ্ধিসহ নানা কারণে মৃদু তাপপ্রবাহেও তীব্র দহন অনুভূত হচ্ছে। মনে হচ্ছে ‘তীব্র তাপপ্রবাহ’।

‘কলেরা হাসপাতাল’ নামে পরিচিত রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) বলছে, গত বছরের চেয়ে এবার ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। যার মধ্যে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ আবার তীব্র ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। আর ডায়রিয়া আক্রান্তদের প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু। ডায়রিয়া রোগীর আধিক্যে আইসিডিডিআরবি’র বাইরে তাঁবু খাটিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

আইসিডিডিআরবি হাসপাতালের চীফ কনসালটেন্ট অধ্যাপক ডা: আজহারুল ইসলাম খান বলেন, দেশে বর্তমানে ডায়রিয়ার পিক মওসুম (বছরে দু’বার মার্চ-এপ্রিল এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বরকে ডায়রিয়ার পিক সিজন ধরা হয়) চলছে। গত দু’-তিন বছরের ডায়রিয়ায় রোগীর সংখ্যানুপাতে কয়েক দিন আগ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গরমে প্রতিটি শিশুরই চাই বাড়তি ও সঠিক যত্ন। বিশেষ করে, শিশুর খাবার-দাবার ও পোশাকের ব্যাপারে অবশ্যই অভিভাবকদের সজাগ থাকতে হবে। নইলে যেকোনো সময় আপনার আদরের সোনামণি অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। ছয় মাসের বেশি বয়সী ডায়ারিয়া আক্রান্ত শিশুদের মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি ওরস্যালাইন, রাইস স্যালাইন, দেশীয় মাছ, কাঁচকলা ভর্তা, থানকুনি পাতার রস, ডাবের পানি খাওয়ানোর পরমার্শ দিচ্ছেন তারা। প্রয়োজন ছাড়া গরমে শিশুদের বাইরে বের না করা এবং বাইরের খাবার না খাওয়ার পরামর্শ তাদের।

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, গরমে শিশুর খাদ্য তালিকায় হালকা, পুষ্টিকর, টাটকা এবং সহজপাচ্য খাবার রাখতে হবে। সেটা হতে পারে নরম খিচুড়ি বা সবজির স্যুপ। মাছ-মাংস দিতে দিতে হবে পরিমিত মাত্রায়। শিশুকে ঘরে তৈরি খাবার দিতে হবে। বাইরের কেনা খাবার দেয়া যাবে না। এই সময়ে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেশ দেখা যায়। ঘরে তৈরি টাটকা খাবার শিশুকে এই ধরনের ঝুঁকির হাত থেকে অনেকাংশে রক্ষা করতে পারে।

শিশুকে যথেষ্ট পরিমাণে পানি পান করাতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, পানি যেন অবশ্যই বিশুদ্ধ হয়। খুব ঠান্ডা বা খুব গরম দুটোই শিশুর জন্য ক্ষতিকর। সেক্ষেত্রে শিশুকে পরিমিত ঠান্ডা পানি পান করানো প্রয়োজন। শিশুকে মওসুমি ফল খাওয়াতে হবে। বিভিন্ন ধরনের ফলের রসও দেয়া যায়। তবে তা বাসায় নিজে তৈরি করাই ভালো। বাজারের প্যাকেটজাত ফলের রস শিশুর দাঁতের ক্ষতি করতে পারে। এছাড়া এগুলোতে দেওয়া প্রিজারভেটিভ শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাই বাইরের খাবার, কোমল পানীয় এমনকি ফলের রস ইত্যাদি থেকে শিশুকে দূরে রাখাই শ্রেয়।

প্যাকেটের তরল বা গুঁড়ো দুধ খাওয়ালে খুব বেশিক্ষণ আগে বানিয়ে রাখা ঠিক নয়। এতে খাবারের পুষ্টিগুণ নষ্ট হবার আশংকা থাকে। অন্যান্য খাবার তৈরিতে এই বিষয়টি মাথায় রাখা প্রয়োজন। বেশি আগে বানিয়ে রাখা খাবার শিশুর জন্য ভালো নয়। কেনা খাবার এড়াতে বাইরে যাবার সময় শিশুর খাবার তৈরি করে নিয়ে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে খাবার এবং পানি বহন করার জন্য ভালো মানের ফুড গ্রেড প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।

খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা গরমের সময়ে খুব বেশি থাকে। তাই যেকোনো সময় যেকোনো খাবার দেওয়ার আগে একবার ভালো করে দেখে নিতে হবে যে, খাবারটা আদৌ ঠিক আছে কিনা। শিশুর বয়স যদি ছয় মাসের কম হয় তাহলে তাকে শুধু বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, ছয় মাসের কম বয়সের শিশুকে এই সময়টাতে আর অন্য কোনো খাবার দেওয়ার দরকার হয় না। এমনকি পানিও নয়। শিশুকে বার বার বুকের দুধ খাওয়ানো প্রয়োজন। বুকের দুধের মাধ্যমেই শিশু তার শরীরের সব প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেয়ে যাবে।

শিশুর পোশাকের দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। গরমের দিনগুলোতে অবশ্যই শিশুর সুতির নরম এবং পাতলা পোশাক পরানো প্রয়োজন। ডিসপোজেবল ন্যাপির পরিবর্তে সুতির পাতলা কাপড়ের ন্যাপি পরানো ভালো। ডিসপোজেবল ন্যাপিগুলো ঘাম এবং তাপ শোষণ করতে পারেনা। যার ফলে ঘামাচি, র‌্যাশ প্রভৃতি সমস্যা দেখা দিতে পারে। তীব্র রোদের সময় শিশুকে বাইরে বের না করাই উত্তম। তারপরও যদি বাইরে বের হতেই হয় তবে পাতলা ফুল হাতার জামা পরাতে হবে। যাতে রোদের অতিবেগুনী রশ্মি শিশুর ত্বকের ক্ষতি করতে না পারে।

খেয়াল রাখতে হবে শিশুর ঘরটি যেন প্রচুর আলো-বাতাস যুক্ত হয়। এতে ঘরের আবহাওয়া স্বাস্থ্যকর থাকে। স্যাঁতসেতে ঘরে শিশুকে রাখা ঠিক নয়। অনেকে ঘরে এসি ব্যবহার করে থাকেন। যদি শিশুকে সবসময় এসিতে রাখা হয় তবে অবশ্যই তাকে একটু মোটা কাপড় পরানো উচিত। কারণ শিশুরা খুব দ্রুত ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়। এছাড়া গোসলের পর শরীর এবং মাথার চুল পুরোপুরি না শুকানো পর্যন্ত শিশুকে এসির মধ্যে আনা ঠিক নয়। আবার শিশু যদি অনেক সময় ধরে এসিতে থাকে তবে তাকে এসির বাইরে নেওয়ার আগে ঘরের এসিটি বন্ধ করা উচিত। ঘরের তাপমাত্রা এতে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয় এবং শিশুও ধীরে ধীরে তা সহ্য করে নেয়। ফলে হঠাৎ করে শিশুর গরম লেগে অসুস্থ হওয়ার আশংকা থাকে না।

ফ্যানের নিচে শিশুকে এমন স্থানে রাখতে হবে যাতে শিশুর গায়ে সরাসরি ফ্যানের বাতাস না লাগে। সরাসরি বাতাস অনেক সময় ধরে লাগলে শিশুর ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। কাজেই গরমের সময় শিশুর প্রতি বাড়তি সেবা ও যতœ নেওয়া আবশ্যক।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *