১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১০ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

ঘড়ি: মুসলিমদের ১০০১ আবিষ্কার | পর্ব- ৩

এই প্রবন্ধে সময়কাল অনুযায়ী বিভিন্ন ইসলামি ব্যক্তিদের আবিষ্কারের তালিকা সহজপাঠ্য করে তুলে ধরা হবে। মূলত এটি ‌’১০০১ ইনভেনশনস: মুসলিম হেরিটেজ ইন দ্য ওয়ার্ল্ড‌’ নামক জনপ্রিয় গ্রন্থের ভাবানুবাদ।

মুবাশশির হাসান সাকফি

ঘড়ি

আমরা যাই করি, ভাবি, কামনা করি, স্বপ্ন দেখি কিংবা শংকিত হই, সময় কিন্তু চলেই চলেছে; আমাদেরকে সাথে নিয়ে বা আমাদের সংগ ছেড়ে। হয়ত পরীক্ষার জন্য ছুটছি, জরুরি ইন্টারভিউ কিংবা অন্যকিছু সব জায়গাতেই শুরু বা শেষের একটা সময় নির্ধারিত।

প্রথম সূর্যঘড়ির মাধ্যমে মানুষ সময়কে মাপতে চেয়েছিল। এখন তো আমাদের হাতে নিরব, ডিজিটাল সময়ঘড়ি আবার আধুনিক মোরগের সমতুল্য টিক-টক অ্যালার্ম ঘড়িও আছে। এই ঘড়িগুলোর পূর্বপুরুষ কে জানেন? টপ-টপ জল পড়া জলঘড়ি যার নাম ক্লিপসাইড্রা (Clepsydra)। ক্লিপসাইড্রা হলো একটা সাধারণ ফুলদানি, যার গায়ে বিভিন্ন ভাগ করে করে দাগাঙ্কিত আছে। এই দাগগুলো বলে দেয় যে কতটা পানি টিউব দিয়ে নিচের গামলাতে চলে গেছে। এর ব্যবহার দেখা যায় প্রথম খৃস্টপূর্ব ১৫০০ শতকে মিশরে।

প্রাচীন আরেকটা জলের মাধ্যমে সময় নির্ণায়ক যন্ত্রের হদিস মেলে ভারতে। নাম ঘটিকা যন্ত্র। এতে থাকে একটা অর্ধচন্দ্রাকৃতির গামলা (কাসার তৈরি কিংবা নারকেলের খোল) যার নিচের দিকে একটা ফুটো থাকে। পানি এত বড় পাত্র থেকে আস্তে আস্তে নল বেয়ে নিচে রাখা আরেকটা পাত্রে নামতে থাকে। পানি একদম তলায় এসে গেলে একটা খট করে শব্দ হয়, তখন সময়রক্ষক আবার নতুন করে ওই পাত্রে পানি ঢেলে পরে সময় মাপতে শুরু করে। বিভিন্ন বৌদ্ধ ও হিন্দু মন্দিরে এই পদ্ধতি খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি পরে ভারতের মসজিদগুলোতেও এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়।

আমাদের গল্পটা মূলত শুরু হয় ১৩শ শতকের জলঘড়ি এবং এক অভূতপূর্ব প্রতিভাধর মানুষ আল জাযারির থেকে। আল জাযারির বাড়ি দক্ষিণ পূর্ব তুর্কির দিয়ারবাকির অঞ্চলের। তিনি ছিলেন একজন ধার্মিক এবং উচ্চপর্যায়ের প্রকৌশলী। তিনিই মূলত প্রথম স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র (অটোমেটিক মেশিন) এর ধারণার জন্ম দেন। তিনি গ্রীক এবং ভারতী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের দ্বারা অনুপ্রাণিত হন।

আল জাযারির হয়ত তৎকালের বিখ্যাত আরবি প্রবাদটির দিকে মনযোগ দিয়েছিলেন, ‘সময় হল তলোয়ারের মত, যদি তুমি একে কাটতে না পারো এটাই তোমাকে ফালি ফালি করে দেবে।’

১২০৬ এর দিকে, আল জাযারি দিয়ারবাকিরের উর্তুক রাজাদের কাছে কর্মরতাবস্থায় বিভিন্ন ধরনের আকৃতির ঘড়ি তৈরি করেন। তারপর সুলতান সালাউদ্দিনের পুত্র, নাসির উদ্দিন তাকে বলেন, ‘আপনি অতুলনীয় সব যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন এবং সফলভাবে কাজেও লাগিয়েছেন। আপনার এত সাধনার ফলকে হারিয়ে যেতে দেবেন না। আমার ইচ্ছা আপনি একটা বইতে আপনার সব সৃষ্টিকর্মের ছবিসহ বিবরণ তুলে ধরে তা প্রকাশ করবেন।’

এই রাজকীয় চাপ প্রয়োগের ফলে লিখিত হল অসাধারণ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর একটি বই; যার নাম অসাধারণ মেকানিক্যাল ডিভাইসসমূহের বিজ্ঞান বিষয়ক বই! এই বইটি অনেক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করা মানুষের জন্য অমূল্য সম্পদে পরিণত হলো। যেহেতু এতে ছয়টি শ্রেণির ৫০ টি মেকানিক্যাল যন্ত্রের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। জলঘড়িও তদন্তর্ভুক্ত।

আমরা যেমন আমাদের জীবনকে বিনির্মাণ করতে সময়ের প্রয়োজন অনুভব করি, মুসলিম শত বছর পূর্বে একই প্রয়োজন অনুভব করেছিল। তারা জানতো সময়কে থামানো যাবে না। আমরা সময় হারিয়ে ফেলছি। তাই সময় জানার খুবই প্রয়োজন যাতে আমরা একে ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারি। মুসলিমদের প্রতিদিন ইবাদতের সঠিক সময় জানবারও প্রয়োজন ছিল খুব। মসজিদগুলোতে সঠিক সময়ে আযানের ডাক দেওয়ার প্রয়োজন। বিশেষভাবে রমজানের রোজা রাখার সময়, ঈদ উদযাপনের সময় অথবা মক্কায় হজ করতে যাওয়া ইত্যাদি নিয়ে তাদের মাঝে প্রবল প্রতীক্ষা কাজ করে।

যাই হোক, এই বিরাট পরিসরের অমূল্য যন্ত্রগুলোর বদৌলতেই তৈরি হয় বিখ্যাত হস্তিঘড়ি (Elephant Clock)। এই ঘড়িতে সময় বলার পাশাপাশি এটি ছিল মর্যাদা, রাজকীয়তা এবং সম্পদের প্রতীক। এই ঘড়িতে পৃথিবীর প্রথম রোবোটিক্সের ব্যবহার দেখা যায় যে বিদ্যা খাটিয়ে সময় নির্ণায়ক আজব আজব সব ফিগারকে নড়াচড়া করানো হয়েছিল।

দ্য এলিফেন্ট ক্লক বা হস্তিঘড়ি : প্রায় আটশ বছর আগে আল জাযারি এই ঘড়িটি বানিয়েছিলেন পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির মানষ এবং ইসলামি বিশ্বায়নকে ফুটিয়ে তুলতে। এই সময়ে মুসলিম বিশ্বের ব্যাপ্তি ছিল স্পেন থেকে কেন্দ্রীয় এশিয়াজুড়ে। এই বিষয়টিকে প্রতিফলিত করতেই আল জাযারি গ্রীকদের (আর্কিমিডিসের) উদস্থিতি বা জলের নীতি (Water Principles) ব্যবহার করে ভারতীয় জলঘড়ি (ঘটি), ভারতের একটা হাতি, মিশরেরর একটা ফিনিক্স পাখি, আরবের কিছু নিদর্শন, একটি পারস্যের মাদুর এবং চীন দেশের ড্রাগনের সমন্বয়ে এই ঘড়ি তৈরি করেন।

হাতির পিঠে থাকা প্রাসাদের মধ্যে বসে থাকা মানুষের আকৃতিটি হয়ত সালাউদ্দিন আউয়ুবি; এই মহান শাসকের সম্মানস্বরূপ প্রতীকি নির্মাণ। এই ঘড়িতে ব্যবহার করা প্রতিটা প্রাণীর আলাদা আলাদা রূপকথা আছে যেমন, হাতি রাজকীয়তার প্রতীক, ফিনিক্স পাখি পূণর্জন্ম ও প্রাণের প্রতীক, ড্রাগন হল ক্ষমতা ও দুর্ভেদ্যতার প্রতীক।

বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রস্তাবনার পাশাপাশি, তিনি এই ঘড়িকে পূর্বের সব ঘড়ির তুলনায় যান্ত্রিকভাবে সুক্ষ্ম করে নির্মাণ করেন। ঘড়িটা দেখে চক্ষু চড়কগাছ হওয়াটা স্বাভাবিক। বাইরে বোঝা দায় ভেতরের কারসাজি। এতই নিখুঁত কর্ম যে একটা ছিদ্রযুক্ত গামলাকে একটা পানিভর্তি ট্যাংকে ভাসিয়ে রাখতে সক্ষম ছিল। গামলাটা ছিদ্রাল হয়েও পানিতে খাড়াভাবে তলিয়ে না গিয়ে ধীরে ধীরে দুলতে দুলতে একটু একটু ভরতে থাকে। এটাই ছিল মূল যন্ত্রাংশ।

গামলাটা ছিল হাটির পেটের ভেতরের একটা ট্যাংকে ভাসানো। যখন গামলাটা পুরো ভরে ডুবে যায় তখন এর গায়ে লাগানো তিনটে রশিতে টান পড়ে। এই তিনটা রশির কারিশমায় (Mechanism) ৩০টা বল, ড্রাগনগুলো এবং ঘুর্ণী চাকতি নিয়ন্ত্রিত হয়।

আরও পড়ুন: কফি: মুসলিমদের আবিষ্কার | পর্ব- ২

আল জাযারির হিসাব এত নিখুঁত ছিল যে, দেখা যায় গামলাটা পুরো ভরে ডুবে যেতে একদম আধ ঘন্টা সময় লাগে। তো গামলাটা ডুবে গেলে একটা পাখির ডাকের মত শব্দ হয় এবং ফিনিক্স পাখিটা ঘুরতে শুরু করে। রশির টানে গড়িয়ে পড়া একটা বল সালাউদ্দিনের পেছনের ডায়ালটাকে ঘুরিয়ে দেয় এবং সালাউদ্দিন আইয়ুবি একদিক থেকে আরেক দিকে ঘোরেন; নির্ধারণ করে দেন দুই শকুনির কোনটার মুখ দিয়ে (গর্ত দিয়ে) বলটা পড়বে এবং দুটো ড্রাগনের কার মুখে বলটা গিয়ে পড়বে। তো বলটা ড্রাগনের মুখ দিয়ে গিয়ে মাহুত (হস্তিচালক) এর পেছনে রাখা পাত্রে পড়ে। ফলে মাহুতের হাত নড়ে ওঠে এবং বলের পতনে ঘন্টা বেজে ওঠে। (বলটার ভারে রশিতে টান পড়ে আবার গামলাটা পানি থেকে উঠে যায়। – অনুবাদক)

সালাউদ্দিনের পেছনের চাকতি সাজানো ৩০টা বৃত্তাকার ছিদ্র দেখে সময় বলা যায়। একটা করে বল পড়ে গেল একটা করে ছিদ্র ফাঁকা হয়ে যায়। প্রতিটা ছিদ্র আধঘন্টা নির্দেশ করে। এই কর্মকাণ্ড আধ ঘন্টা পর পর পুনরায় শুরু হয়। ঘরটাকে দিনে দুইবার রিসেট করতে হয়। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়। তিরিশটা বলকে আবার আগের মত রেখে দিতে হয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com