২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ইং , ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১২ই রজব, ১৪৪২ হিজরী

চট্টগ্রামে বাড়ছে পাহাড় দখলের প্রবণতা

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : পাহাড় দখলের প্রবণতা বাড়ছে পার্বত্য এলাকা চট্টগ্রামে। কেটে ও আগুন লাগিয়ে কিছু অসাধু চক্র পাহাড় দখলের এই অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

গত ৩১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট-বায়েজিদ লিংক রোড সংলগ্ন পাহাড়ে হঠাৎ করেই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। এতে আগুনে পুড়ে যায় পাহাড়টির বেশকিছু অংশ। স্থানীয়রা বলছেন, ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ছিল অস্বাভাবিক। পাহাড় দখলের জন্যই দুর্বৃত্তরা ওই আগুন লাগিয়েছিল বলে সন্দেহ তাদের।

পরিবেশকর্মীরাও বলছেন, চট্টগ্রামে এখন আগুন লাগিয়ে পাহাড় দখলের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আগুনে পাহাড়ের গাছ বা গুল্ম পুড়ে মাটি আলগা হয়ে যায়। এতে পাহাড় ধসেরও সুযোগ তৈরি হয়। ফলে আর পাহাড় কাটার প্রয়োজন পড়ে না। এভাবে দখলকারীদের জন্য পাহাড় দখলের কাজটিও সহজ হয়ে যায়। পরে এসব আগুনে পোড়া পাহাড় নামে-বেনামে এমনকি খতিয়ান পরিবর্তন করেও দখল করেছে দখলদাররা।

এ বিষয়ে পরিবেশবিদ মো. ইদ্রিস আলী বলেন, পাহাড়ের গাছে আগুন দেয়া এখন দখলের নতুন পদ্ধতি। যেহেতু দিনের বেলায় পাহাড় কাটায় ঝুঁকি আছে, সেজন্য দখলদাররা এখন আগুনকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আগুনে পাহাড়ের টিকে থাকার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। বৃষ্টি এলেই আগুন লাগানো এসব পাহাড় এমনিতেই ধসে পড়ে। তখন এ পাহাড় ধসের সুযোগ নেয় দখলদাররা। প্রশাসনের সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয় এবং পরিবেশ আইনের সংশোধন না করা গেলে চট্টগ্রামে পাহাড় রক্ষা করা যাবে না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চট্টগ্রামে পাহাড়ে অগ্নিকাণ্ডের এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯ সালে জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটির আশপাশের বেশ কয়েকটি পাহাড় কয়েক দফায় আগুন লেগে পুড়ে যায়। কোনো কোনো জায়গায় অগ্নিকাণ্ডের পর সেখানে পেট্রলের উপস্থিতি শনাক্ত করেছিলেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সে সময় তারা জানান, দখলের জন্যই পাহাড়ে আগুন দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। এমনকি এ এলাকার পাহাড়ে চাষাবাদের নামে গাছের শিকড় তুলে ফেলাও হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

একই এলাকায় নীলাচল হাউজিংয়ের পাশের পাহাড়ে গত কয়েক বছরে আগুন লাগার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। একই ঘটনা ঘটেছে জঙ্গল ছলিমপুর এলাকায়ও। তবে গহিন ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি প্রশাসন।

প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, মহানগরের বাইরে জেলা পর্যায়ে চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়িসহ প্রতিটি উপজেলায়ই পাহাড়ে আগুন ধরিয়ে মাটি কেটে নেয়া, দখলসহ নানা অপরাধ ঘটানো হচ্ছে। এছাড়া এসব জায়গায় ইটভাটার মাটি সংগ্রহের জন্যও বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে আগুন দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য হলো, পরিবেশ আইনে পাহাড় রক্ষণাবেক্ষণ, দখলদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা বা পাহাড় কাটা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে হয়। আইনে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না প্রশাসন। এজন্য বিদ্যমান পরিবেশ আইন সংশোধন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবেশ আইনের বাইরে কার্যত তাদের পক্ষে কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব নয়। পরিবেশ আইনে পাহাড় সংরক্ষণের বিষয়ে পর্যাপ্ত স্পষ্টতা নেই। এতে পাহাড় কাটার আগে যেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায় না, তেমনি কাটার পর সেখানে জরিমানা ছাড়া বড় কোনো সাজা দেয়াও সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে পাহাড় দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজ নয়। এ দায়িত্ব মূলত স্থানীয় প্রশাসনের। অথচ পাহাড় দখলকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়া হলে পরিবেশ অধিদপ্তরকেই দায়ী করা হয়। যদিও পরিবেশ আইনের বাইরে গিয়ে অধিদপ্তরের কিছুই করার নেই।

পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (মহানগর) মিয়া মাহমুদুল হক বলেন, পাহাড়ে আগুন লাগা পাহাড় দখলের নতুন সংস্কৃতি। গাছপালা বা গুল্ম পুড়িয়ে দিলে পাহাড় মাটি ধরে রাখার ক্ষমতা হারায়। এতে মাটি ঝুরঝুরে হয়ে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। তবে পরিবেশ আইনে তেমন বিশদ কোনো বিধি না থাকায় আমরা পাহাড় দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছি না।

চট্টগ্রামের বায়েজিদ লিংক রোডে পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণের পর পরই সেখানে কাটা পাহাড়ের ওপর অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে শত শত স্থাপনা। সর্বশেষ লকডাউনের সময় ২৪ জুন সেখানে প্রায় ৩৫০টি স্থাপনা উচ্ছেদ করে জেলা প্রশাসন। সেদিন পাহাড় দখলমুক্ত করতে গিয়ে অভিযানকারী দলকে বাধা ও হামলার মুখে পড়তে হয়। এ সময় প্রায় ১৬টি পাহাড়ে ব্যক্তিগত জমি, সরকারি খাস জমি ও রেলওয়ের জমি দখল করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা গড়ে তোলার প্রমাণ পায় অভিযানকারী দলটি।

সরেজমিনে দেখা গিয়েছে, বর্তমানে এ এলাকার বিভিন্ন পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে শত শত অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। দখলদাররা পাহাড় দখল করে সেখানে আবাসনের ব্যবসাও করছে। টাঙানো হয়েছে দখলদারদের বিভিন্ন সাইনবোর্ড। স্থানীয়রা জানান, নতুন করে পাহাড় দখলের পর সেখানকার মালিকানা দাবি করে এসব সাইনবোর্ড দেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড এলাকার বাসিন্দা মো. আরাফাত বলেন, বায়েজিদ লিংক রোডের দুই পাশের পাহাড় এখন দখলকারীদের হাতে। স্থানীয় দখলদাররা বিভিন্ন ছিন্নমূল সংগঠনের নাম দিয়ে এসব পাহাড় দখল করছে। কয়েকদিন আগেও তারা পাহাড়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। দখলের উদ্দেশ্যেই এটি করা হয়েছিল। এমনকি আমি যেখানে বসবাস করছি, সেটাও দখল করা পাহাড়। সেখানে মাসিক ভিত্তিতে ভাড়া দিয়ে আমাদের থাকতে হয়।

/এএ

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি
Design & Developed BY ThemesBazar.Com