১৬ই জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ২রা মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১২ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

চলে গেলে নীরবে

  • আশরাফ উদ্দীন রায়হান

কলেজ জীবন শেষ হওয়ার পর জানতে পারলাম উবায়দুল্লাহ আমার সাথে একই কলেজে ২০১৫-১৬ সেশনে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু টানাপড়েনের সংসারে লেখাপড়াটা আর এগোয়নি। বাধ্য হয়েই কর্মের খোঁজে ঘরছাড়া হতে হয়েছিল। ওর বাড়ি আমাদের উপজেলা তাড়াইলের পুরুড়া এলাকায়, আর নানাবাড়ি আমাদের বেলংকা গ্রামে। পঞ্চগ্রাম হাইস্কুল সংলগ্ন পূর্বদিকের বাড়িটির মরহুম মল্লিক সাহেবের নাতি ছিল সে। ওর এক খালা প্রাইমারি ও হাইস্কুলে আমার সহপাঠিনী ছিল বলে ওকে ‘ভাইগ্না’ বলে সম্বোধন করতাম।

উবায়দুল্লাহ ঢাকায় এসেছিল ২০১৭ সালের দিকে। উত্তর বাড্ডার শাহজাদপুরে ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদের অফিসে কাজ করত তখন। আমি ছিলাম খিলগাঁওয়ের চৌধুরীপাড়ায় ইকরা বাংলাদেশ ক্যাম্পাসে। তবে বিশেষ বিশেষ দিনে ও প্রয়োজনে আমাদের দেখা-সাক্ষাত হতো নিয়মিতই। পরবর্তীতে ওর অফিস যখন স্থানান্তরিত হয়ে চৌধুরীপাড়ার ইকরা বাংলাদেশ কমপ্লেক্সে চলে আসে, ততদিনে আমিও নিয়তির টানে রাজশাহীতে চলে আসি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধের দিনগুলোতে যেহেতু ঢাকা হয়েই কিশোরগঞ্জে গ্রামের বাড়ি যেতাম, তাই অবধারিতভাবেই আমাদের প্রিয় জায়গা ইকরা বাংলাদেশ ক্যাম্পাসে একটা দিন ঘুরে পরের দিন বাড়ি যাওয়া হতো। আর এ দিনটির প্রায় পুরোটা সময়ই থাকতাম উবায়দুল্লাহর কাছে। আমাকে ও প্রচণ্ডরকম ভালোবাসত। খেদমত-সমাদরের কোনো কমতি করত না। সারাক্ষণ আমার সুবিধা-অসুবিধার প্রতি খেয়াল রাখত। বোর্ডিং থেকে দুপুরের খানা তোলার পাশাপাশি ও নিজে কোনো কিছুর ভাজি রান্না করত বা হোটেল থেকে ভালো কোনো তরকারি নিয়ে এসে খুব যত্ন করে আমাকে মেহমানদারি করত।

রাতে এশার নামাযের পর যখন বনশ্রীতে ভাতিজা মুস্তাকিম রাফির কাছে যেতাম তখন ও আমাকে ডিআইটি রোডের অনেকটা পথ এগিয়ে দিয়ে আসতো। পথিমধ্যে নূরে মদিনা আর আল-কাদেরিয়া হোটেলে আমার পছন্দের খাবার নান-গ্রিল খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করত প্রতিবার। আর একটু পরপর ‘মাম, রাতটা থেকে গেলে ভালো হতো না?’ বলতে থাকত। আমি সান্ত্বনার সুরে ওকে নিজের ওজরখাহি পেশ করে কোনোমতে ছুটে যেতাম। আর ও বিষণ্ণ বদনে আমাকে বিদায় জানিয়ে ধীরপদে ফিরে যেত।

আমার বিশ্বাস, উবায়দুল্লাহকে চিনে-জানে এমন একজন মানুষও ওর দুর্নাম করতে পারবে না। কারণ ওর বয়সী ছেলে যে এতটা সহজ-সরল, নির্ভেজাল, নির্মোহ, নির্লিপ্ত ও সংবেদনশীল হতে পারে সেটা তার সাথে যে কেউ মেশামাত্রই বিনাবাক্যে স্বীকার করতে বাধ্য। জগতের হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, যশ-খ্যাতি বা স্বীকৃতির কোনো আকাক্সক্ষা ওর মধ্যে অন্তত আমি দেখিনি। ঢিলেঢালা পাঞ্জাবি-পায়জামা আর টুপি মিলিয়ে আটপৌরে পোশাক পরে থাকত সবসময়। কথা বলত অনুচ্চ আওয়াজে। কস্মিনকালেও উত্তেজিত হতে দেখিনি। ওর পাশের কয়েকজন ওর সারল্যের সুযোগ নিয়ে প্রায়ই টীকা-টিপ্পনি করত; কিন্তু ও ছিল আজন্ম নির্বিকার।

আমি ওকে চিনি-জানি থেকেই শারীরিক অবস্থা অতটা ভালো দেখিনি। উদরাময়ে আক্রান্ত ছিল বহুদিন ধরে। যখনই কথা হয়েছে তখনই সেই একই কথা ‘মামা, পেটের সমস্যাটা তো…’। কৈশোরে ক্লাস টেনে পড়াশোনাকালে আমিও কঠিন উদরাময়ে ভোগার অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলাম। তাই সেই অভিজ্ঞতা থেকে ওকে পরামর্শ দিতাম যেন খাওয়া-খাদ্য নিয়ম মেনে সময়মতো করে। ভাঁজা-পোড়া থেকে সতর্ক থাকে। সর্বশেষ গত পরশুদিন ওকে কল দিয়েছিলাম। ফোনটা রিসিভ করেছিল ওর একটা ছোট বোন। বলেছিল, ‘ভাই তো অসুস্থ, কথা বলতে পারছে না!’ এ কথা শুনে আমি অবাক না হলেও আমার ভেতরে ভেতরে কী যেন একটা দুশ্চিন্তা জমাট বাঁধছিল।

আজ রাত দশটার ঠিক পরপরই ঢাকা থেকে শ্রদ্ধেয় নাসির স্যার ফোন করে উবায়দুল্লাহর মৃত্যুসংবাদ জানালেন! আঁতকা এরকম একটা মর্মান্তিক খবর শুনে আমি বজ্রাহতের মতো হয়ে গেলাম! সাথে সাথে কল দিলাম এলাকার আরেক ছোট ভাই শুয়াইব আহমাদ জুলহাসকে। জুলহাসও একই সংবাদ জানাল। শরীর ও মনটা মুহূর্তেই অসাড় হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। ভাবতেই পারছি না যে, এরকম তাগড়া জোয়ান উঠতি বয়সের একটা তরুণ এভাবে চলে যাবে পরপারে। তা যদি হয় আমার বয়সী ও ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গ মানুষের। তাহলে পুরোটা অস্তিত্ত্বজুড়ে কী যে শোক, যন্ত্রণা আর ভীতির বান বয়ে যাচ্ছে তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কে বুঝবে।

আল্লাহ তাআলার কাছে কায়মনোবাক্যে উবায়দুল্লাহর জন্য মাগফিরাতের দুআ করি। হে আল্লাহ, আপনি উবায়দুল্লাহর সাথে দয়া ও মেহেরবানির আচরণ করুন। ওর যাবতীয় গুনাহ-খাতা মাফ করে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন, আমিন ।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যলয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com