৩রা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৭শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

চেঙ্গিস খান : মিথ ও মানুষ

মূল: বেটি ব্যাসেট | ভাষান্তর: কাউসার মাহমুদ

চেঙ্গিস খান সেসব মহা বিজেতাদের একজন; পৃথিবীর ইতিহাস যাকে অকুতোভয় সেনানায়ক হিসেবে চিনেছে। আনুমানিক বারো মিলিয়নেরও অধিক মানুষের বসবাস ও আমেরিকার চারগুণ বড় কল্পনাতীত বিস্তৃর্ণ অঞ্চল বিজয় করেছিলেন তিনি। সেই তুলনায় ইতিহাস বিখ্যাত রোমান সাম্রাজ্য মার্কিন ভূখণ্ডের মাত্র আধভাগ জয় করতে পেরেছিল।

তবে কী চেঙ্গিস শুধু এক বর্বর, অসভ্য আর যুদ্ধবাজ সেনাপতি হিসেবেই অভিযুক্ত নাকি এ কিছু রূপকথার মতো অতিকথনও? সত্যিই কী শত্রুদের মাথার খুলি দিয়ে তিনি পিরামিড বানিয়েছিলেন? প্রকৃতই কী তিনি জীবিত মানুষ ফুটন্ত পানিতে নিক্ষেপ করতেন? ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করে, আসলে এসব তার প্রতিপক্ষ শত্রুদের ভীত করার জন্যই লোকমুখে রচনা করা হয়েছিল শুধু।

এদিকে প্রণালী বিজ্ঞান ও মৃত্যুর পদ্ধতি অনুসারে মঙ্গোল আক্রমণে কেবল হতাহতের সংখ্যাই ছিল চার কোটি; যা হিটলার ও স্টালিনের মিলিত হত্যাকাণ্ডের দ্বিগুণ। তাহলে কোনরূপ প্রবোধন বা আশা কোথায়? অথচ মঙ্গোলীয়রা সবসময় তাদের ক্ষমা এবং সম্ভবত সংস্থান ব্যবস্থাপনায় সর্বদাই প্রতিপক্ষ শত্রুদের প্রথমত আত্মসমর্পণের সুযোগ দিত। তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী পদমর্যাদা নির্ধারণ করতো বা হত্যা করতো।

তাছাড়া মঙ্গোল আক্রমণের ফলে পৃথিবী বিরাট এক হতাহতের সাক্ষী হলেও, তদুপরি তাদের থেকে বহু নতুন ধারণা গ্রহণ এবং স্থায়ীভাবে সেসব ধারণা বা পদ্ধতিসমূহ এখনও ব্যবহার করছে আধুনিক বিশ্ব। ইতিহাস অন্বেষণে দেখা যায়, ধর্মীয় স্বাধীনতা, গুণতন্ত্র, আইনের সমতা এবং কোনপ্রকার ট্যাক্স ছাড়াই ব্যবসায়ীদের অগ্রসর হতে সহায়তা করা; ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ ছিল মঙ্গোলীয়দের যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

মঙ্গোল এই অগ্রযাত্রার প্রধান সংগঠনক ছিলেন নিরক্ষর এক মঙ্গোলীয়ান। তিনিই চেঙ্গিস খান। পরবর্তীকালে যিনি দুই মিলিয়ন নিরক্ষর মঙ্গোলীয়র শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সাইবেরিয়ার নিকটবর্তী মঙ্গোলিয়ার এক অংশে বেড়ে ওঠেন চেঙ্গিস। বাবা মায়ের দেয়া নাম ছিল ‘তেমুজিন’। অর্থ: লোহা বা কামার। শৈশবেই অসম্ভব কষ্ট আর খারাপ সময়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। কারণ তখন প্রায়শই তাদের নিকটবর্তী বিভিন্ন গোষ্ঠী একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকতো। জীবন ছিল সেখানে খুব ছোট, হিংস্র আর ভয়ঙ্কর। অবাধে খুন হত মানুষ। অপহরণ ও দাসে পরিণত হওয়া ছিল নিত্য ঘটনা।

খুব ছোট বয়সেই চেঙ্গিস তার বড় ভাইকে খুন করে এবং সেসময় অন্য এক গোষ্ঠী দ্বারা আটক হয়ে দাসে পরিণত হয় সে।

চেঙ্গিস খানের বাবা ‘ইয়াসুগে’। সেও তার স্ত্রী অর্থাৎ চেঙ্গিসের মাকে নিজের নববধূ করতে অপহরণ করে নিয়ে এসেছিল। যদিও তখন সে বিবাহিত ছিল। কিন্তু মঙ্গোলীয় সমাজব্যবস্থার প্রচলিত ঐতিহ্য অনুসারে বিবাহের উদ্দেশ্যে অন্য কোন জাতিগোষ্ঠী থেকে মেয়ে অপহরণ করা গ্রহণযোগ্য ছিল। অপহৃত সেই মেয়েটির নাম ছিল হোলেন। যার গর্ভেই অবশেষে ১১৬২ সনে তেমুজিন তথা চেঙ্গিস খানের জন্ম হয়। চেঙ্গিসের মা জানতেন, কী কঠিন ও টিকে থাকার জন্য জীবন কতোটা অমসৃণ আর ভয়াবহ মঙ্গোল সমাজে। তাই তিনি তার সন্তান তেমুজিনকে মঙ্গোলিয়ার কঠিন, রুক্ষ্ম এই পরিবেশে কীভাবে বেঁচে থাকতে হবে; তার সবই শেখায় ধীরেধীরে। কিন্তু খুব ছোট বয়সেই চেঙ্গিস তার বড় ভাইকে খুন করে এবং সেসময় অন্য এক গোষ্ঠী দ্বারা আটক হয়ে দাসে পরিণত হয় সে। যদিও খুব দ্রুতই ওখান থেকে পালিয়ে যায় চেঙ্গিস। এবং ক্রমবর্ধমান সময়ের আবর্তে একসময় মহান অধিপতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

যা হোক, ধীরে ধীরে মঙ্গোলীয়রা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহে দায়িত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, এই আধুনিক সময়েও সেসব বিষয়গুলো আমরা এভাবে সানন্দে জড়িয়ে রেখেছি যে, সে মতে আমরা আমাদের সরকার ও সমাজ গঠন করেছি। এ দিকে চেঙ্গিস খান তার বিজয়ের মধ্য দিয়ে চীন ও ইউরোপের মাঝে কুটনৈতিক বন্ধন ও বাণিজ্যিক যাত্রাপথ রচনায় সাহায্য করেছেন।

জ্যাক ওয়েদারফোর্ড তার বই ‘চেঙ্গিস খান এন্ড দ্যা মেকিং অব দ্য মডার্ণ ওয়াল্ড’ এ চেঙ্গিস খানের কিছু গুণাবলীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। জ্যাক উল্লেখ করেন, ‘চেঙ্গিস তার শাসনব্যবস্থায় এমনকিছু কার্যকর ও নতুন উদ্যোগ প্রণয়ন করেছিলেন যা তাকে অন্যসব শাসকদের চেয়ে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে। চেঙ্গিস খান প্রণীত উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসনীয় গুণাবলীর মধ্যে ছিল—

  • অভূতপূর্ব পরধর্ম সহিঞ্চুতা
  • গুণতন্ত্র তথা যোগ্যতার সংস্কৃতি
  • আইনে বিশ্বাসের সংস্কৃতি
  • ইউরোপীয় এবং এশিয়ানদের বিজ্ঞাপনী উদ্যোগ
  • কোনপ্রকার ট্যাক্স বা মুনাফা ছাড়াই স্বাধীন বাণিজ্য
  • বিশ্বব্যাপী অক্ষরজ্ঞান প্রচারের সর্বপ্রথম সার্বজনীন অনুশীলন
  • প্রথম আন্তর্জাতিক ডাক যোগাযোগ পদ্ধতি

১. অভূতপূর্ব পরধর্ম সহিঞ্চুতা : চেঙ্গিস বিশ্বাস করতেন, বিজিত অঞ্চলগুলোয় ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন পাশের মাধ্যমে, জনগণের বিদ্রোহী হয়ে ওঠার আশংকা বা সম্ভাবনা কম থাকবে। ফলত মঙ্গোলীয়রা সমস্ত বিজিত অঞ্চলের বৌদ্ধ, ইহুদি, মুসলিম সব অধীবাসীদেরই ধর্মীয় স্বাধীনতা পালনে নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এছাড়াও চেঙ্গিস খান জানতেন, ধর্মের স্বাধীনতা এক ধর্মের লোকদের ভিন্ন ধর্মের প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাব ও দ্বন্দ্ব প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। যে চিন্তা তার সময়ে সবার চেয়ে আলাদা ও অনন্য করে তুলেছিল তাকে।

২. গুণতন্ত্র তথা যোগ্যতার সংস্কৃতি : চেঙ্গিস খানের আগে পুরো এশিয়াজুড়ে সুযোগ সুবিধা ও অধিকারের মানদণ্ড নির্ধারণ হতো; কোন পরিবার বা গুষ্টিতে জন্ম নিয়েছি লোকটি—এর ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু চেঙ্গিস এসব কৌলিন্য প্রথা নির্মুল করে, ব্যক্তির বিশ্বস্ততা ও যুদ্ধের ময়দানে বীরত্বের ওপর ভিত্তি করেই সুযোগ সুবিধা ও পদমর্যাদা নির্ধারণ করতেন। এভাবেই সে তার পুরো সাম্রাজ্যকে ‘গুণতন্ত্র আইনের’ সংস্কৃতিতে তৈরি করেছিলেন।

কীভাবে তিনি এই অভিনব কৃষ্টি স্থাপন করেছিলেন?

প্রথমত, বহুকাল ধরে চলে আসা প্রচলিত ধারার ভিত্তি সরিয়ে শক্তিশালী কাঠামো পরিবর্তন করেছিলেন তিনি। ফলত, সমস্ত সংকটপূর্ণ ও সম্বন্ধীয় অবস্থাগুলো সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সংযুক্ত হয়ে ওঠে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার কারণে তা আর নির্দিষ্ট কিছু অভিজাত পরিবার ও গোষ্ঠীর কাছে ছড়িয়ে যেতে পারেনি। এছাড়াও যুদ্ধের ময়দানে এমন রণকৌশলে চেঙ্গিসের সেনাবাহিনী গঠিত ছিল যে, তার প্রধান শক্তিশালী একটি অংশ ছিল অশ্বারোহী তীরন্দাজ বাহিনী। যারা চলন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে ক্রমাগত তীর ছুড়তে যারপরনাই পারদর্শী ছিল। সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে একহাজার সৈন্যদলের দায়িত্বে চেঙ্গিস তার সেরা সেনাদের নিযুক্ত করেছিলেন। এদের ভেতর যারা আরও তেজস্বী, চৌকস ও বীর তাদের দশ হাজার সেনাদলের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এমনকি বিশ্বস্ত ও অনুগত হলে বিরাট সেনাদলের প্রত্যেক সেনাকেই চেঙ্গিস তার পদমর্যাদা বাড়ানোর সুযোগ দিতেন।

৩. আইনের শাসনে বিশ্বাসের সংস্কৃতি : চেঙ্গিস খানের শাসনামলে আইনানুগভাবে চুরি, ব্যভিচার,জাতিবৈর, মিথ্যা সাক্ষী— ইত্যকার বিষয়গুলো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। যেসব তৎকালে মঙ্গোল সাম্রাজ্যে একেবারে নতুন চালু করা হয়েছিল। মূলত চেঙ্গিস খানের যাযাবর ঐতিহ্য থেকে আহরিত এসব বিধানগুলোর সম্মিলিত একটি প্রভাব ছিল; যা পুরো সাম্রাজ্যকে একই বন্ধনে আবদ্ধ রেখেছিল যেন। ইতিহাসে আইনগুলো ‘দ্য গ্রেট ল ‘ হিসেবে পরিচিত। চেঙ্গিস খান এর উদ্ভাবক এবং যা তার সমস্ত জীবদ্দশায় বারবার পুনঃপাঠ এবং সংশোধন করা হয়েছে। আইনগুলো প্রতিষ্ঠার লক্ষ ছিল বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীদের একত্রিত করা এবং একইসাথে সাংস্কৃতিক উত্তেজনার অপনোদন। বিভিন্ন সময়ে বেসামরিকভাবে যা নাগরিক উত্তেজনা জ্বালিয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।

৪. কোনরূপ ট্যাক্স বা বিনা শুল্কে এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যে বিজ্ঞাপনী উদ্যোগ : কর লাঘবের ক্ষেত্রে, প্রথমেই ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের কর প্রদান ও জনসাধারণের দায়িত্ব থেকে তাদের অব্যাহতি দিয়েছিলেন চেঙ্গিস খান। এছাড়াও চিকিৎসক, পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ এবং আইনজীবীদের করও স্থগিত করেছিলেন তিনি। বাণিজ্যিক সুবিধা সম্প্রসারণে পূর্ব-পশ্চিমের বিজিত শহরগুলোকে ব্যবসার নানা পথসমূহে রূপান্তরিত করেছিলেন। একইসাথে ব্যবসা ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ এবং এর উন্নতি প্রসার ও মঙ্গোল শাসনের সুবিধার্থে বহু রাস্তাও নির্মাণ করেছিলেন তিনি। বিশেষত ‘প্যাক্স মঙ্গোলিকা’ যা ইতিহাসে ‘মঙ্গোল পিস’ নামে বিখ্যাত। তা ছিল শান্তি চুক্তির এক সুখদ কাল। মঙ্গোল বিজয়ের পর যা উপভোগ করা হয়েছিল। কারণ তৎকালে পুরো সিল্ক রুটই ছিল মঙ্গোল সাম্রাজ্যের অধীনে। ফলে বাণিজ্য সমৃদ্ধিকরণ এবং উদ্ভূত সমূহ প্রযুক্তিগুলো পরস্পর আদানপ্রদানের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

৫. বিশ্বব্যাপী অক্ষরজ্ঞান প্রচারের সর্বপ্রথম সার্বজনীন সংস্কৃতি : চেঙ্গিস খান তার আইন প্রনয়ণ ও প্রয়োগের জন্য একটি লিখিত পদ্ধতি তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেটা তেরি করা হলে, পুরো এশিয়া ও মঙ্গোল সাম্রাজ্যের বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে সবচেয়ে বেশী গৃহীত লিখন পদ্ধতি ছিল ওটা। ‘গ্রেট ইয়াসা’ নামক একটি দলিলপত্রে আইনগুলো খসড়া আকারে বর্ণনা করা হয়েছিল এবং তাতে জঘন্য অপরাধের শাস্তি প্রায়ই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।

৬. প্রথম আন্তর্জাতিক ডাক যোগাযোগ পদ্ধতি : চেঙ্গিস খানই প্রথম ডাক যোগাযোগ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন; যা লোকদের বিভিন্ন নতুন নতুন ধারণা ও ধনদৌলত সীমান্ত পেরিয়ে পরস্পর আদানপ্রদান করে নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। ইতিহাস বলে, মূলত জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চেঙ্গিস তার সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন। পরবর্তীতে অবশ্য যখন মহামারি প্লেগ তাদের গ্রাস করে নেয়, তখন তাদের ওইসব উদ্ভাবনী প্রকল্পসমূহ এবং জ্ঞানের আবহটি ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়ায়। কারণ সেখানে এমন কেউই ছিলো না; যোগাযোগ ব্যবস্থাটি যে সচল রাখতে পারে।

যা হোক, ডাক যোগাযোগ বিষয়ে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের এই বহুল জনপ্রিয়তা,উন্নতি ও সম্ভাবনার দিনগুলোতে সেখানে Pony Express courier system (এমন একধরনের পরিষেবা পদ্ধতি; যার ফলে ঘোড়ায় চড়ে চালকরা সংবাদপত্র, ডাক, চিঠিপত্র ইত্যাদি বহন করে প্রাপকের কাছে নিয়ে যেত) চালু ছিল। যেখানে বাহকের জন্য প্রতি বিশ মাইল অন্তর খাবার, ঘোড়া ও আবাসনব্যবস্থা প্রস্তুত ছিল। এর ফলে কোনো একজন অশ্বারোহী অনায়েসে রোজ বিভিন্ন পাহাড় পরিবর্তন করে দুশো মাইল পর্যন্ত ভ্রমন করতে পারতো। মূলত সাম্রাজ্যের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সরকারের চিঠিপত্রাদি প্রেরণ সহজিকরণের লক্ষ্যেই এই postal-station system এবং ডাক যোগাযোগ পদ্ধতির উদ্ভাবন করা হয়েছিল।

প্রকৃত অর্থে,চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি কল্পনা করাও কঠিন। কী ক্ষমতাশালীই না ছিল চেঙ্গিস খান! মূলত তার উদ্ভাবনী নতুন আইনের প্রয়োগ ও সেসব স্থায়ীভাবে বজায় রাখার মধ্য দিয়েই এই অপার ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন তিনি। সেইসাথে আইনের স্থায়ীত্বের ফলে তা বিভিন্ন বিজিত জাতিগোষ্ঠীর মাঝে শান্তি বজায় রাখতেও সহায়তা করেছিল তাকে। সুতরাং বলতে গেলে বহু ক্ষেত্রেই এক অনন্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি।

জনগণ সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কোনো নেতা নিজে কখনোই সন্তষ্ট হতে পারে না।

যা হোক, চেঙ্গিস ও মঙ্গোল সাম্রাজ্যের সংক্ষিপ্তাসারটি শেষ করার জন্য জ্যাক ওয়েদারফোর্ডের বই থেকে কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরা যাক এখানে,—যেগুলো চেঙ্গিস খানের অনন্ত মূল বিশ্বাস এবং মানব ইতিহাসে তার প্রভাবকে আরো উজ্জ্বল করে তু্লে ধরে:

নেতৃত্বের প্রথম ও প্রধান মূলমন্ত্র হলো ‘আত্মসংযম।’ বিশেষত অহম ও দম্ভের কর্তৃত্ব। যা আয়ত্তে রাখা একটু বেশিই কষ্টসাধ্য। চেঙ্গিস তার ব্যখায় বিষয়টি পরিস্কার করে এভাবে বলেন যে, ‘নিজের ক্রোধ বশিভূত করা একরকম বন্য সিংহ বশিভূতর মতোই। যা শ্রেষ্ঠ কোনো কুস্তিগিরকে পরাজিত করার চেয়েও কঠিন। তাই তুমি যদি তোমার দম্ভকে গিলে ফেলতে না পারো, তাহলে তুমি নেতৃত্ব দিতে পারবে না।’

চেঙ্গিস খান তার ছেলেদের সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘একজন নেতার চিন্তা ও মতামত তার কর্মোপদ্ধতি দ্বারা প্রকাশ করা উচিত। আর জনগণ সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কোনো নেতা নিজে কখনোই সন্তষ্ট হতে পারে না।’ মূলত ছেলেদের কাছে তিনি তাদের সুস্পষ্ট আগামীর লক্ষ্য, দূরদৃষ্টি ও পরিকল্পনার গুরুত্বকে জোরদার করেছিলেন। কারণ কোনরূপ লক্ষ্য ছাড়া একজন মানুষ তার নিজের জীবনই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সেখানে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ তো দূর কি বাত। নিয়ম ও আইন নিয়ে যে ভণিতা বা ক্রীড়াকৌতুক করেছে কোনোদিনই তার কাছে বিজয় আসেনি। জয় তার কাছেই এসেছে—যে তা তৈরি করেছে এবং সেগুলো তার শত্রুর ওপর আরোপ করেছে।

সামান্য খাবার ও পানির ওপর, কঠিন থেকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে মঙ্গোলীয়দের দীর্ঘকালীন জীবনযাত্রার ক্ষমতা—চাইনিজদের আশ্চর্য ও একইসাথে উত্যক্ত করে তুলেছিল। এক তথ্য অনুসারে, গোটা মঙ্গোল বাহিনী কখনো কখনো একবিন্দু ধোঁয়া ছাড়াই তাদের শিবির স্থাপন করে ফেলতে পারতো;যেহেতু রান্নার জন্য তাদের কোনো আগুনের প্রয়োজন নেই। জুরচেন (জুরচেন এমন এক পরিভাষা; যা চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী বেশ ক’টি পূর্ব এশীয় টুঙ্গুজনিক ভাষী মানুষকে সম্মিলিতভাবে বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়) সেনাদের তুলনায় মঙ্গোলীয়রা ছিল অধিক স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী।

মঙ্গোলরা সাধারণত, দুধ, মাংস, দই ও অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবারের সাথে নিয়মিত স্বাস্থ্যসম্মত, বলবান খাবার গ্রহণ করতো। বিপরীতে বিভিন্ন শস্য থেকে উৎপাদিত জাউ জাতীয় খাদ্য গ্রহণকারী দুর্বল লোকদের সাথে যুদ্ধ করতো তারা। শস্য উৎপাদিত দুর্বল খাদ্যাদি কৃষিকাজ করা এসব যোদ্ধাদের হাড়কে দুর্বল করে দিত। তাদের দাঁতে ক্ষয়রোগ হত এবং ধীরে ধীরে এসব তাদের কৃষকায় ও রোগপ্রবণ করে তুলতো। অথচ বিপরীতে যে কোনো দরিদ্র মঙ্গোল সেনাও স্বাস্থ্যকর প্রোটিন জাতীয় খাবার খেত; যা তাকে শক্ত হাঁড় ও মজবুত দাঁতের অধিকারী করে তুলতো।

তুমি হয়তো কোনো সেনাদলকে বিশেষ কার্যপদ্ধতি ও লোকবল দিয়ে জয় করতে পারো, কিন্তু কোনো জাতিকে তুমি তখনই জয় করতে পারো; যখন তুমি তাদের হৃদয় জয় করতে পারবে। সম্ভবত বিশ্বের যেকোনো জায়গায় চেঙ্গিস খানই সর্বপ্রথম সবাইকে ধর্মীয় স্বাধীনতার নির্দেশ দিয়েছেন।

আর আক্রমণ সাজানোর ক্ষেত্রে বলা যায়, মূলত একটি ভৌগলিক অবকাঠামোগত দিক অনুসরণ করেই আক্রমণগুলো করা হয়েছিল। এতে সিল্ক রুটের বাণিজ্যিক শহরগুলোর নিকটে বসবাসরত দক্ষিণাঞ্চলীয় উপজাতিদের কাছে সবসময়ই উত্তরে বসবাসরত দূরবর্তী জনগোষ্ঠীর চেয়ে বেশি পণ্যদ্রব্য থাকতো। তদুপরি দক্ষিণীদের কাছে ছিল ওই সময়ের সেরা অশ্রসশ্র ও যুদ্ধের সরঞ্জাম; যা দিয়ে সবসময়ই তারা উত্তরের অধিবাসীদের ওপর বিজয়ী হতো। ফলে তাদের ওপর জয়ী হতে উত্তরাঞ্চলীয় সেনাদের আরও দ্রুত অগ্রসর হতে হয়েছিল এবং ততোধিক চতুরতার সাথে চিন্তা ও কঠোরভাবে লড়াই করতে হয়েছিল। সুতরাং বাণিজ্য ও অভিযানের বিকল্প এই নমুনাটি উত্তরে সরবরাহ হওয়া ধাতব ও টেক্সটাইল পণ্যগুলোর একটি ধীর কিন্তু দৃঢ় অগ্রসরমানতার যোগান দিয়েছিল। যেখানে আবহাওয়া সবসময়ই প্রতিকূল। চারনভূমিগুলো বিজন, ফাঁকা। সেইসাথে সেখানের অধিবাসীরাও আরও বেশি রুক্ষ্ম ও হিংস্র।

যেকোনো প্রতিযোগিতা বা শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়েও মঙ্গোলীয়দের জুরি মেলা ভার। সবধরনের প্রতিযোগিতাই ভালোবাসতো তারা। তাই প্রায়শই বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ধর্মীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করতো মঙ্গোলরা; ঠিক যেভাবে তারা দঙ্গল প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এটা নির্দিষ্ট এক তারিখে বিচারকদের উপস্থিতির মাধ্যমে শুরু হত। এমনই এক ঘটনায় মোংকে খান একবার মুসলিম, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মের তিন বিচারকের সামনে তাদের বিতর্ক আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। অভিনব এই আয়োজন উপভোগের জন্য বিপুল জনসমাগম হয়। সর্বোচ্চ্য গুরুত্ব ও আনুষ্ঠানিকতা এবং কঠোর এক নিয়ম তথা সর্বাধিক মৃতুদণ্ডও হতে পারে, এর মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতাটি আরম্ভ হয়েছিল। ফলে সেখানে কারোই কোনরূপ অহেতুক বাদানুবাদের সাহস থাকেনি।

শুরুতে রুবার্ক ও অন্যান্য খ্রিস্টানরা একজোট হয়ে একপক্ষে মুসলিম পণ্ডিতদের সাথে প্রমাণাদির মাধ্যমে বৌদ্ধদের যুক্তি খণ্ডনের প্রয়াস করে। অবশেষে যখন বহু মানুষের উপস্থিতিতে ধর্মযাজকরা তাদের আলখাল্লা ও রাজপোষাক পরিধান করে মঙ্গোলীয়ার ধূলোধূসর শুষ্ক তাবুর ভেতর একত্রিত হয়; তখন তারা এমন ভিন্ন কিছু করেছিলেন, এর আগে ইতিহাসের কোন বিদ্বান বা ধর্মতত্ববিদরা যা করেন নি। এটা সন্দেহজনক যে, বহু ধরণের খ্রীস্ট ধর্মের প্রতিনিধিরা একটি বিতর্ক সভায় এসেছিলেন, এবং মুসলিম ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিনিধিদের সাথে সমান হিসেবে তারা বিতর্ক করেনি। ধর্মীয় আলেমগণের প্রধাণত তাদের বিশ্বাস ও সুপ্রতিষ্ঠিত ধারণার আলোকেই বিতর্ক শুরু করতে হয়েছিল। অস্ত্র বা তাদের পেছনে কোনো শাসক বা সেনাবাহিনীর কতৃর্ত্ব ব্যবহার করা হয়নি। অপর পক্ষকে বোঝাতে তারা কেবল শুধু তাদের যুক্তি ও উক্তি ব্যবহার করতে পেরেছিল। বিতর্কের প্রথম ভাগ বা সূচনালগ্নে রুব্রার্ক দক্ষীন চীন থেকে আগত এক পণ্ডিতের মুখোমুখি হন। যিনি তাকে কীভাবে এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হয়েছে এবং মৃত্যুর পর আত্মার সঙ্গে কী ঘটে?

মুসলিমদের যেহেতু গানবাজনা নিষিদ্ধ, তাই প্রতি উত্তরে খ্রীষ্টানদের গানের সুরকে ম্লান করে দিতে উচ্চস্বরে কোরআন পাঠ শুরু করে।

এই প্রশ্ন দিয়ে বিতর্ক শুরু করেন। রুবার্ক তখন প্রতিরোধ করে বলেন যে, মূলত বৌদ্ধ গুরু একটি ভুল প্রশ্ন করেছেন। আসলে তার প্রশ্নটি হওয়া উচিত ছিল ঈশ্বর সম্বন্ধে; যে কীভাবে তার থেকে এই সমস্ত জিনিসি বহিয়া গেল? এতে বিচারক তর্কের প্রথম পয়েন্ট রুবার্কের পক্ষে ঘোষণা করেন। এরপর টানটান উত্তেজনায় বিতর্ক এগুতে থাকে এবং তা ভালো-মন্দ, ঈশ্বরের প্রকৃতি, প্রাণীদের আত্মার সাথে কী ঘটে, পুনর্জন্মের অস্তিত্ব, এবং সত্যিই কী ঈশ্বর শয়তান সৃষ্টি করেছেন?—ইত্যকার বিষয়সমূহে এসে পৌঁছে। তাদের বিতর্ক চলাকালীন সময় অন্যান্য পণ্ডিতরাও উক্ত বিষয়ের ওপর বিভিন্ন গ্রুপে নিজেদের মাঝে আলোচনা করেন। মঙ্গোল ঐতিহ্য অনুসারে প্রতি দফা দঙ্গলের পর মঙ্গোল সৈন্যরা ঘোটকীর দুধ পান করতো; তাই সেভাবেই ধর্মীয় আলেমরাও প্রতি দফা বিতর্কের পর পরবর্তী বিতর্কের প্রস্তুতিতে ভালোভাবে পান করতে বিরতি দিয়েছিলেন। এদিকে কোনোপক্ষই অপরপক্ষের যুক্তিতে সন্তুষ্ট বলে মনে হচ্ছিল না।

অবশেষে সুরার প্রভাব যখন বেশ গভীরতর অনুভব হলো, খ্রীষ্টানরা তখন অন্য কাউকে যুক্তির মাধ্যমে প্রতীতি করার প্রচেষ্টা ছেড়ে দিয়ে ভজনগীত গাওয়া শুরু করে। অন্যদিকে মুসলিমদের যেহেতু গানবাজনা নিষিদ্ধ, তাই প্রতি উত্তরে খ্রীষ্টানদের গানের সুরকে ম্লান করে দিতে উচ্চস্বরে কোরআন পাঠ শুরু করে। আর বুদ্ধিষ্টরা তখন নীরব, অচঞ্চল ধ্যানে মগ্ন হয়। শেষতক বিতর্কের শেষে কোনো পক্ষের কাউকেই হত্যা করার প্রয়োজন পড়েনি। তারা সেভাবেই তাদের বিতর্ক শেষ করে, যেভাবে মঙ্গোলরা তাদের সবরকম আয়োজন উৎসব সমাপ্ত করে।

মঙ্গোলরা যুদ্ধে নয় বরং যুদ্ধ জয়েই নিজেদের গৌরব খুঁজে পেত। প্রতিটি অভিযানে বিজয়ই তাদের এক ও অভিন্ন লক্ষ্য থাকতো। যুদ্ধ শেষে এটা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো না যে, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কী ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে বা কাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা হয়েছে এবং কী এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তাই যেকোনো সুচতুর কৌশল অবলম্বনে বিজয় অথবা বর্বরতা ও হিংস্রতার মাধ্যমে বিজয়— মানদণ্ডে তা একই ছিল তাদের কাছে। মোটকথা জয়, জয়ই এবং যুদ্ধের ময়দানে ওই নির্মমতা অবলম্বনে যোদ্ধাদের বীরত্বের ওপর কোনরূপ কালিমাও লেপন করা হতো না। মোটকথা, যুদ্ধ হেরে গেলে মঙ্গোল সেনাদের কাছে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য প্রদর্শনে সামান্য গৌরবের কিছু ছিলো না। যেমন চেঙ্গিস খান বলেছেন, ‘কোনকিছু শেষ না হওয়া পর্যন্ত এর কোনো মূল্য নেই।’

বিপরীতে ইতিহাসের যেকোনো উল্লেখযোগ্য সেনাবাহিনী থেকে কোনোপ্রকার ভ্রমণ সরবরাহ যানবাহন ছাড়াই মঙ্গোল সেনাবাহিনী ছিল ক্ষীপ্র ও অদম্য। বিস্তৃত,জনবিরল উপত্যকা পাড়ি দেয়ার জন্য হাড় কাঁপানো শীতকালের অপেক্ষা ছিল। যাতে সেনা ও তাদের অশ্বপালের সামান্য পানি হলেই চলবে। তাছাড়া এই মৌসুমে শিশির স্নানে কিছু মসৃণ কচি ঘাসের উদ্দীপ্তও তৈরি হয় ; যা ঘোড়া সমূহের চারণভূমি তৈরি করে দিত এবং পুরুষদের শিকারের জন্য উত্তম সময় হিসেবে বয়ে আসতো । যার জন্য অধীর অগ্রহে অপেক্ষা করতো মঙ্গোল পুরুষরা এবং ওই শিকারের মাধ্যমেই নিজেদের জীবন যাপন করতো তারা।

এছাড়াও ধীর চলমান ইঞ্জিন ও ভারি অস্ত্রসস্ত্র বহনের পরিবর্তে, তাদের সঙ্গে সবসময় সুদক্ষ একদল প্রকৌশলী নিয়ে নিত তারা। যারা প্রয়োজন অনুসারে সামান্য উপলব্ধ উপকরণের মাধ্যমেই দরকারি যেকোনো জিনিস তড়িৎ তৈরি করে ফেলতে পারতে। এমনকি সীমাহীন বিস্তৃত মরুভূমি পেরিয়ে মঙ্গোলীয়রা যখন কোন বন,উপবন বা গাছগাছালির মাঝেে আসতো, তখন প্রথমেই তারা তাদের প্রয়োজনমত গাছ কেটে, তা দিয়ে স্লেজবাহিত গাড়ির মই বানাতো এবং বাকিগুলো দিয়ে আক্রমণের জন্য অন্যান্য যন্ত্রাদি তৈরি করতো।

মূলত সাম্রাজ্য জয়ের মধ্য দিয়ে মঙ্গোলরা কেবল তাদের যুদ্ধেই বিপ্লব ঘটায়নি। বরং একটি সার্বজনীন সংস্কৃতি ও বিশ্ব ব্যবস্থার নিউক্লিয়াসও তৈরি করেছিল। নতুন এই বৈশ্বিক উন্নতি মঙ্গোল সাম্রাজ্য ধ্বংসের বহু পরে নিয়মিত বিস্তার শুরু করে এবং পরবর্তীতে আগত শতাব্দীগুলোয় ধারাবাহিক বিকাশের মাধ্যমে স্বাধীন বাণিজ্য, উন্মুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, জ্ঞান আদানপ্রদান, ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতি, ধর্মীয় সহাবস্থান, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়ে এটি আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে স্থাপিত হয়।

আরও পড়ুন: ঘুষ : সা’দত হাসান মান্টো

তাদের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার নীতি, বৈশ্বিক একটি সার্বজনীন বর্ণমালার উদ্ভাবন, যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল,ক্রীড়া আয়োজন, বর্ষপঞ্জি, টাকাপয়সা ও জ্যোতির্বিদ্যার মানচিত্র মুদ্রণ— এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহে সর্বোপরি মঙ্গোল সাম্রাজ্যের শাসকরা তাদের শাসনামলে অবিচ্ছিন্ন এক সার্বজনীনতা প্রদর্শন করেছিলেন। কারণ প্রজাদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার মত নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা না থাকায়, সব জায়গা থেকেই গঠনপ্রণালী নিয়ে সেসবের মিশেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক ছিল তারা।

সুতরাং এসব অঞ্চলগুলোয় মঙ্গোলরা তাদের গভীর সাংস্কৃতিক পছন্দগুলো আরোপ করা ব্যতিরেকে আদর্শিক সমাধানের চেয়ে ব্যবহারিক বিষয়াবলী প্রয়োগের মাধ্যমেই তা বাস্তবায়ন করেছিল। তারা সবসময়ই সর্বোৎকৃষ্ট কী ফলপ্রসূ—তারই খোঁজ করেছে। আর যখনই তা পেয়েছে, অন্যান্য দেশ ও শহরগুলোয় তা ছড়িয়ে দিয়েছে। এ নিয়ে কখনোই চিন্তিত ছিলো না যে, তাদের জ্যৌতি:শাস্ত্র সংক্রান্ত উদ্ভাবন বাইবেলের ধর্মানুশাসন ও উপদেশাবলির সঙ্গে অনুমত হবে কি-না? তাদের লেখার মান চীনের মাণ্ডারিনদের শেখানো শাস্ত্রীয় নীতিগুলো অনুসরণ করে কি-না। অথবা মুসলিম ইমামরা তাদের মুদ্রণ ও চিত্রাঙ্কণ কে মনোনীত করছে নাকি বাতিল করছে।

অস্থায়ীভাবে হলেও মঙ্গোলীয়দের নব্য আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি, কৃষি, প্রযুক্তি ও জ্ঞানের নতুন ধারা উদ্ভাবন এবং তা ঠিকঠাক আরোপের যে ক্ষমতা ছিল; তা যেকোনো একটি একক সভ্যতার কুসংস্কার, পুর্বানুমান ও ভবিষ্যতবাণীকে ছাড়িয়ে যায়। এবং এর মাধ্যমে স্থানীয় অভিজাতদের একচেটিয়া চিন্তার মনোভাব ভেঙে গুড়িয়ে দেয়।

তথ্যসূত্র:

১.  Genghis Khan And The Making Of The Modern World Book Summary, by Jack Weatherford

২. Genghis Khan and the Making of the Modern World

৩. Genghis Khan and the Making of the Modern World

৪. The importance of Genghis Khan

৫. ACCOMPLISHMENTS- MARY LOU

৬. 11 Cultural Breakthroughs Genghis Khan Achieved During His Reign

৭. The Mongols’ Mark on Global History

৮. The brutal brilliance of Genghis Khan

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com