৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৮শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

জনগণ ও গণপরিবহন

সময়ের আলোচনা

ইয়াছিন নিজামী ইয়ামিন

বাংলাদেশ এখন একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। প্রতিবছর জিডিপি আর মাথাপিছু হার বাড়ছে সমানতালে। আবার অনেক দেশের কাছে একটি মডেল হিসেবেও উপস্থাপিত হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য গর্বের। কিন্তু এত উন্নয়ন আর অর্জনের পরও যদি আমাদের নৈতিক বিশ্বাসটা দৃঢ় না হয়, তাহলে এতো উন্নতি আর উন্নয়ন দিয়ে আমাদের লাভটা কী!

উর্ধতনস্থ প্রতিটি মানুষ তার নিম্নস্থ মানুষের ঘাড়ে পা রেখে শোষণ করছে। একে অপরকে ঠকিয়ে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন বুনছে। চিকিৎসা খাত থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র-বাণিজ্য খাত, সরকারি-বেসরকারি সব জায়গায় এই দুর্নীতি আর শোষণের বিষাক্ত আবহ বিরাজ করছে।

এদেশের মানুষ তার প্রতিটি কর্মে অনিশ্চয়তায় ভোগে। বিশেষ করে যাতায়াতের ক্ষেত্রে। তারা জানেনা, জরুরি যে কাজের উদ্দেশ্যে তারা বেরিয়েছে, সেখানে আদৌ সময়মতো পৌঁছাতে পারবে কিনা! এর নিশ্চয়তা কারো কাছে নেই। কাজে বের হয়ে দেখা যায় কেউ সড়ক-মহাসড়ক বন্ধ করে অঘোষিত ধর্মঘট কিংবা অবরোধ করছে, কিংবা পরিবহন-শ্রমিকরা নিজেদের দাবি মেটাতে গিয়ে গাড়ি-ঘোড়া বন্ধ করে রেখেছে। এমন নৈরাজ্যকর ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি আমাদের দেশে প্রতি নিয়ত ঘটে চলছে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় বোধহয় কারো জানা নেই!

সম্প্রতি সেই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিকট মূর্তি ধারণ করেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে গত (০৪.১১.২০২১) বুধবার রাতে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ায় সরকার। হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন-মালিক-শ্রমিকরা ধর্মঘট ডাকে। প্রতিফলন হিসেবে পরদিন থেকে সড়কে কোন গণপরিবহন নেই। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ল আপামর জনসাধারণ। এর পরে যানবাহন চালু হলেও এর সঙ্গী হল এক অরাজকতা। ২৭% ভাড়া বাড়ানোর কথা থাকলেও সেই ভাড়া বেড়েছে দুইগুণ থেকে পাঁচগুণ পর্যন্ত। এখানেও ‘বলির পাঁঠা’ হলো সাধারণ নাগরিকরা।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে শিক্ষার্থীদের ঢাকার সড়ক অবরুদ্ধ করে ফেলার পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ প্রণীতও হয়েছিল। কিন্তু পরিতাপ! এর কোনো ধরনের প্রতিফলনই এদেশের মানুষের কাছে উন্মোচিত হয়নি। বরঞ্চ এখন দেখা যাচ্ছে, সেই ছাত্রদের সাথেই বাসের অতিরিক্ত ভাড়া ও হাফ-পাস নিয়ে তুমুলঝগড়া হচ্ছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গণপরিবহনের অন্যান্য খাতে যতটা না মামলা হয়েছে, তার শতভাগের এক শতাংশও ভাড়া অতিরিক্ত আদায়ে কোনো মামলা নেই। অক্টোবরে মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৬১টি। এখানেও কোনোটিই অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে হয়নি।

একদিকে সরকারের স্বার্থ অপরদিকে গণপরিবহন মালিকদের একচেটিয়া মুনাফা লাভের প্রবণতা। এদুটোর যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এসব দুর্নীতি আর প্রতারণানীতি দেখতে দেখতে এদেশের মানুষ আশ্চর্যরকম সহনশীল হয়ে ওঠেছে। সবকিছু জেনে-বুঝেও কীভাবে যেন চোখ মুখ বুজে বসে থাকার কৌশলটা রপ্ত করে ফেলেছে। কিন্তু এর মধ্যেও বোমা কম ফাটছে না। কথা হচ্ছে, বাকবিতণ্ডা হচ্ছে, গন্ডগোল বাঁধছে।

এতোকিছুর পরও এদেশের মানুষ এগুলোকে মেনে নিতে পারত যদি কষ্টার্জিত পয়সার বিনিময়ে একটু ভালো সেবা পাওয়া যেত। গণপরিবহনগুলো একটু শৃঙ্খলা আর নিয়মনীতি মেনে চলত। কিন্তু কই! এতো ভাড়া বাড়ার পরও তো সেই রংচটা, ফিটনেসবিহীন এবড়ো-খেবড়ো বাসে চলাচল করতে হচ্ছে। ভেতরের সেই ‘সদরঘাট’ অবস্থাটা রয়েই যাচ্ছে। যত্রতত্র যাত্রীদের অবাধ ওঠানামা চলছেই। আর সাথে লাগামহীন ভাড়া তোলার অভিযোগ তো আছেই।

এর চেয়ে ভীষণ অবাক ও ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি হয়, চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর উৎসাহে। বাসে বাসে ধাক্কাধাক্কি হয়, ইচ্ছে করে নিজেরা ঠোকাঠুকি করে, তখন চালকদের চোখে থাকে নিছক শয়তানি কিংবা উন্মুক্ততা। অনেকেই নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে গাড়ি চালায়। মোবাইলে কথা বলে। ভয়াবহ দুর্ঘটনার অধিকাংশ কারণ এগুলোই। এর কারণে প্রতিনিয়ত হতাহতের ঘটনা ঘটছে, এরপরও এ যেন নিত্যদিনের এক রুটিনে পরিণত হয়েছে।

এখন নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা এবং সড়কযাত্রায় অসাধুদের দৌরাত্ম্য কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা মনে করি সুযোগসন্ধানী কিছু অসাধুপায়ী ব্যক্তি সরকারের নমনীয়তার সুযোগ নিয়ে দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চলছে। তাই এর সুষ্ঠু-সমাধানে মনোযোগ দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। বিশ্ববাজারে তেলের আবারও কমতে শুরু করেছে।

সুতরাং এবিষয়গুলো যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এদেশের মানুষ আগের মতো আর অত বোকা নেই। প্রায় সবার মাঝে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। চারপাশের আবহ বুঝতে শিখেছে। এখন আর নয়-ছয় বুঝিয়ে তাদেরকে সামাল দেওয়া যাবে না। দেশের মানুষ চায় না এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের সাথে সংঘাতে জড়াতে।

আরও পড়ুন: সোশ্যাল মিডিয়া; ক্ষয়ে তারুণ্যের ভিত

এজন্য সরকারের কর্তব্য, যারা দেশের উন্নতির পথে এবং সরকার ও জনগণের মাঝে তৃতীয়পক্ষ হবে, তাদের স্বরূপ উন্মোচন করা। এতে দেশের পরিস্থিতি এবং উন্নতি-উন্নয়নের অগ্রযাত্রার পথ হবে সুন্দর ও সুগম।

লেখক: কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থী

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com