জলে ডুবে মরা কওমির শিক্ষার্থীরা পাশাকে কলোষিত করলো কীভাবে?

জলে ডুবে মরা কওমির শিক্ষার্থীরা পাশাকে কলোষিত করলো কীভাবে?

সরলকাব্য । সৈয়দ মবনু

জলে ডুবে মরা কওমির শিক্ষার্থীরা পাশাকে কলোষিত করলো কীভাবে?

নেত্রকোনায় যে সকল মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক পিকনিকে বা আনন্দ-ভ্রমণে গিয়ে জলডুবা হয়ে শহিদ হয়েছেন তাদের লাশ দেখে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হই। লাশ যখন জলের পেট থেকে বের করা হচ্ছিলো তখন মনে হচ্ছিলো প্রতিটি লাশই আমার সন্তানের। আমরা স্বামী-স্ত্রী একসাথে চিত্রগুলো দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, ওদের মধ্যে যদি আমার মারহামা, মুজাদ্দিদ, মাইমুনা কেউ থাকতো তবে আমি কি করতাম? আহারে, ওদের মা-বাবা কি করছেন? যারা বয়স্ক ছিলেন তারাও আমার অনেক ছোট হবে। তবু মনে হচ্ছিলো আমি নিজেই লাশ হয়ে আছি ওদের সাথে। আহারে, ওদের স্ত্রী-সন্তানেরা কেমন আছে?

জলে ডুবে মৃত্যুর সংবাদের সাথে সাথে দেখলাম আমার মাদরাসা সিলেটের জামিআ সিদ্দিকিয়ার পরিচালক মুফতি মনসুর আহমদ ফতোয়া দিয়েছেন; মৃতরা শহিদ। আমিও জানি উসূলে ফিকহ অনুযায়ী ওরা শহিদের হুকুমে আসে। তবু আনন্দ-ভ্রমনে গিয়ে জলে ডুবে মরলে কি শহিদ হবে? আমি এই প্রশ্ন করি সে সকল আলেমদেরকে বিষয়গুলো অবগত করতে যারা আমার বন্ধু জগন্নাথপুর-দক্ষিণ সুনামগঞ্জের সাবেক এমপি মাওলানা শাহিনুর পাশা চৌধুরীর মতো ওদের আনন্দভ্রমনে বুজুর্গি হারিয়ে লজ্জায় মৃত্যুবরণ করার উপযুক্ত প্রায়। আমার বন্ধু পাশা লজ্জায় লিখেছেন,

‘বিশ্বব্যাপী আল্লাহর গজবে যখন সবকিছুই লন্ডবন্ড। এমনকি কওমী মাদরাসাগুলোও ক্লাস নিতে পারছেনা। এই সময়ে যারা আনন্দ ভ্রমণে গিয়ে কওমী অঙ্গনকে কলোষিত করলো। তাদের মৃত্যুতে আমি ব্যথিত নই। ব্যথিত ও শোকাহত অপরিণামদর্শী লেবাসদারী এসব মিয়াছাবদের পরিবারের জন্য। জানিনা কতজন নববধু বিধবা হলেন, কতজন শিশু বাবাহারা হলো। কমপক্ষে কুড়িজন বাবা- মা তাদের সন্তান হারিয়ে চোখের পানি ঝড়াচ্ছেন। কওমী অঙ্গনে সাধারণত এরকম আনন্দ ভ্রমণের রেওয়াজ নেই। কওমীর তালাবা শিক্ষকদের মূল- মন্ত্রই রেজায়ে মাওলা। অবসরে তেলাওয়াত ও তাসবিহ নিয়ে বসে থাকা। কিন্তু এগুলো এখন কমে যাচ্ছে সর্বনাশা ফেইসবুকের তান্ডবে। আমিতো মনে করি আনন্দভ্রমণের মূল ফরমূলা যার কাছ থেকে এসেছে — উনি ফেইসবুকে বেশী আসক্ত ছিলেন। কয়েকটি ভালো স্ট্যাটাস এবং সেলফি তোলা যাবে, মাথায় এটা বেশী কাজ করছিলো।’
মাওলানা শাহিনুর পাশার এই স্ট্যাটাস পড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক মাদরাসায় পড়ুয়া বন্ধু ইনবক্সে এসে দুঃখ প্রকাশ করে আমার কাছে জানতে চেয়েছেন মতামত। আমি তাদেরকে জামিআ সিদ্দিকিয়ার পরিচালক মুফতি মনসুর আহমদের মতের কথা জানিয়ে বলি- এটাই আমার মত। তারা প্রশ্ন করেন, সাবেক এমপি সাহেবের বক্তব্য বিষয়ে আমার মত কি? আমি তাদের প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছি তা এখানে সবার সাথে শিয়ার করতে চাই;

সাবেক এমপি মাওলানা শাহিনুর পাশা চৌধুরীর এই বক্তব্য খুবই দুঃখজনক এবং লজ্জাস্কর। তিনি যদিও একটি দলের জাতীয় পর্যায়ের নেতা, সাবেক এমপি, আলেম এবং উকিল; কিন্তু এই বক্তব্য প্রমাণ করেছে তিনি এসবের কিছুরই যোগ্য নয়। বয়সে অনেক ছোট হলেও তাঁর থেকে শতগুণ প্রাজ্ঞ এবং জ্ঞানী আলেম জামিআ সিদ্দিকিয়ার পরিচালক মুফতি মনসুর আহমদ। বন্ধু পাশা রাজনীতি করেন ঠিকই, মানুষের সাথে চলেনও অনেক, কিন্তু এখনও প্রাজ্ঞতা এবং বিজ্ঞতাকে ধারণ করে বিবেক সম্পন্ন হতে পারেননি। বুঝাই যায়, তিনি যে নেতা হয়েছেন সাধনা এবং সহবত ছাড়া।

একজন জানতে চাইলেন, সাবেক এমপি সাহেব যে মৃতদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘যারা আনন্দ ভ্রমণে গিয়ে কওমী অঙ্গনকে কলোষিত করলো তাদের মৃত্যুতে আমি ব্যথিত নই’, এব্যাপারে আমার মত কি? আমি বললাম, এভাবে একটি জাতীয় দলের জাতীয় নেতার বলা উচিৎ হয়নি। তিনি ব্যতিত হননি, তা তাঁর ব্যক্তিগত হৃদয়হীনতার ব্যাপার, কিন্তু যখন তিনি বলবেন, ওরা আনন্দ ভ্রমণে গিয়ে কওমী অঙ্গনকে কলোষিত করেছে, তখন প্রশ্ন হলো, তিনি এখানে কলোষের কি দেখলেন? আমি ওনি কে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, তারা কি সেখানে গিয়ে শরিয়ত বিরোধী কোন কাজ করেছে? শরিয়তের ভেতরে থেকে আনন্দ করা কি জায়েজ নয়? তারা কি আনন্দ ভ্রমণের নামে টাকা উঠিয়ে আত্মসাৎ করেছে সেই সকল আলেম নেতাদের মতো যারা লং মার্চের নামে টাকা উঠিয়ে ধান্ধা করেছিলেন? তারা কি মানুষের কাছ থেকে টাকা কর্জ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার কারণে নির্বাচনের সময় কোর্টে এসে অন্যান্য উকিলের মধ্যস্থতায় টাকা দিয়ে নমিনেশন রক্ষা করেছে যেমন কোন কোন আলেম নেতা অতীতে করেছেন? তারা কি মাসের পর মাস শিক্ষকদের বেতন বাকি রেখে নিজে বিশাল মার্কেটের মালিক হয়েছে যেমন কোন কোন মুহতামীম নেতা হয়েছেন? তারা কি ইসলামী আন্দোলন এবং ইসলামকে জায়গার দালালির কাজে ব্যবহার করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে যেমন অনেক ইসলামী নেতা করে থাকেন? ভদ্রলোক বললেন, না এসবের কিছুই নয়। আমি বললাম, তা হলে তারা কলোষিত করলো কীভাবে?

মাওলানা শাহিনুর পাশা চৌধুরী তাঁর পোস্টে বলেছেন; ‘আমিতো মনে করি আনন্দভ্রমণের মূল ফরমূলা যার কাছ থেকে এসেছে — উনি ফেইসবুকে বেশী আসক্ত ছিলেন। কয়েকটি ভালো স্ট্যাটাস এবং সেলফি তোলা যাবে, মাথায় এটা বেশী কাজ করছিলো।’
আমার প্রশ্ন; একথা আপনি কিসের ভিত্তিতে বলছেন জনাব চৌধুরী সাহেব? আপনি কি গায়েবের খবর রাখেন? নিজের নফসের উপর অন্যকে বিচার করা কি উচিৎ? আপনি বলেছেন, ‘কওমী অঙ্গনে সাধারণত এরকম আনন্দ ভ্রমণের রেওয়াজ নেই।

কওমীর তালাবা শিক্ষকদের মূল- মন্ত্রই রেজায়ে মাওলা। অবসরে তেলাওয়াত ও তাসবিহ নিয়ে বসে থাকা।’

আপনার কাছে প্রথম প্রশ্ন হলো, এই রেওয়াজ কি কোরআন-হাদিসের কোন বিধান? দ্বিতীয়ত আপনার মতো একজন মানুষ কওমি মাদরাসা সম্পর্কে এখনও হালকা চিন্তায় রয়েছেন দেখে খুব আফসুস হয়। বাংলাদেশের কওমির ছাত্ররা বর্তমানে অনেক অগ্রসর তা হয়তো আপনি জানলেও স্বীকার করছেন না নিজ ছাত্রদেরকে হালের বলদ হিসাবে রাখার উদ্দেশ্যে। শিক্ষা সফর, আনন্দ-ভ্রমণ ইত্যাদি কওমি মাদরাসার ছাত্ররা বেশ আগ থেকেই চালু করেছে।

আমাদের সিলেট শহরের বালুচরে প্রতিষ্ঠিত জামিআ সিদ্দিকিয়া ২০০২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই মাদরাসা প্রতি বছর শিক্ষা সফরের আয়োজন করে ছাত্র, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সমন্বয়ে। আরও অনেক মাদরাসায় এই আয়োজন হয়। আশা করি আপনি বিষয়টাকে গায়ের ইসলামী ভাবছেন না? শরিয়ত সম্মত বিনোদন সুন্নাহে রাসুল (স.) রয়েছে। হাদিস খুলে দেখুন, হযরত রাসুল (স.) মদিনার বাচ্চাদেরকে ডেকে মসজিদে নববীর ভেতরে তীর খেলার আয়োজন করে দিতেন। ঈদের দিনে আম্মাজান হযরত আয়েশা (রা.) হযরত রাসুল (স.) এর সামনে নিজ ঘরে সঙ্গীতের আয়োজন করতেন। জনাব এমপি সাহেব আপনি বলেছেন; অবসরে তেলাওয়াত ও তাসবিহ নিয়ে বসে থাকার কথা। এই কথাতে খুব বুজুর্গি ভাব আছে। কিন্তু কথাটা কি শত শত ইঁদুর মেরে বিড়াল হজ্বে যাওয়ার মতো হয়ে যায়নি? দেখুন, আমরা অন্যকে উপদেশ দেওয়ার আগে নিজের অবস্থা কি দেখা উচিত নয়? বুজুর্গি ভালো কিন্তু বুজুর্গি দেখানো ভালো নয়।

সবশেষে আপনার বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাই। বলতে পারেন, তা ফেইসবুকে না বলে ব্যক্তিগতভাবে বললাম না কেন? কারণ আপনি ফেসবুকে লিখে মানুষের মনে আঘাত দিয়েছেন, তাই প্রতিবাদটাও ফেসবুকে করা উচিৎ বলে মনে করি। কষ্ট পেলে বন্ধু হিসাবে দুঃখিত প্রকাশ করছি। সবশেষে বলি বন্ধু, ঐ পোষ্টের জন্য তোমার ক্ষমা চাওয়া উচিত মৃতদের পরিবার এবং বন্ধুদের কাছে যারা কষ্ট পেয়েছে তোমার কথায়।

লেখক : কলামিস্ট

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *