২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ৩০শে সফর, ১৪৪৪ হিজরি

জেরুজালেমের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে

মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় উপহার হিসেবে জেরুজালেমের বাইতুল মুকাদ্দাস হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের সব মুসলমানের প্রাণ সেখানে লেগে থাকে। ফিলিস্তিনের জায়গা দখল করতে করতে এমন একটা পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে ইসরাইলÑ যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই হুমকী। জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়াকে শুধু ব্যাহতই করবে না, ওই অঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতার জন্ম দেবে। এমনটি অনুমান করেই ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক ও সৌদি আরবসহ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্ররাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে বারণ করেছিল। দুর্ভাগ্যজনক, তিনি এ ব্যাপারে কারও কথায় কর্ণপাত না করে খুশি করলেন শুধু ইসরাইলকে, যা প্রকারান্তরে দেশটির আধিপত্যবাদী নীতিকে আরও উৎসাহিত করবে।

জেরুজালেম মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিস্টান তিন ধর্মাবলম্বীর কাছেই অতি পবিত্র একটি নগরী। পবিত্র আল-আকসা মসজিদ ও হারাম আল শরিফ (টেম্পল মাউন্ট) এ নগরীতেই অবস্থিত। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনাধীন ফিলিস্তিনকে তিনটি পৃথক সত্তায় বিভক্তির পরিকল্পনা করে : ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল, আরব রাষ্ট্র ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম। বলা হয়েছিল, জেরুজালেম হবে আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত নগরী। ব্রিটিশ শাসনাবসানের পর ১৯৪৮ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ বাধে। এ যুদ্ধে জেরুজালেমের পশ্চিম অংশ দখল করে নেয় ইসরাইল। শহরটির পূর্ব অংশ থাকে ফিলিস্তিন ও জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে গোটা জেরুজালেম চলে যায় ইসরাইলের দখলে। তখন থেকে নগরীটিকে ইসরাইল তাদের রাজধানী করতে চাচ্ছে এবং ১৯৮০ সালে রাজধানী হিসেবে ঘোষণাও দিয়েছে, যদিও এখন পর্যন্ত কার্যত তেল আবিবই দেশটির রাজধানী। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ায় ‘দুই রাষ্ট্র’ সমাধানের ক্ষেত্রে পশ্চিমতীর ও গাজার সমন্বয়ে যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা, ফিলিস্তিনিরা চায় তার রাজধানী হোক পূর্ব জেরুজালেম। তাদের এ চাওয়া ন্যায়সঙ্গতও বটে। কারণ পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ বাস্তবতায় গোটা জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী করা হলে ফিলিস্তিনিরা যে কোনোভাবেই তা মেনে নেবে না, এটা প্রায় নিশ্চিত। সেক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি সংকট আবারও গভীর হয়ে উঠতে পারে। আবারও শুরু হতে পারে ‘ইনতিফাদা’, যার পরিণতি ইসরাইলি হামলা তথা আবারও রক্তপাত।

ফিলিস্তিনি ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই ইসরাইলকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। তবে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন এ ক্ষেত্রে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে হয়। এটি উদ্বেগের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির পরিবর্তন ছাড়া এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা প্রায় অসম্ভব। দেশটিকে বুঝতে হবে, ফিলিস্তিনিদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

ইসরাইলের অন্যায় কর্মকা-কে সমর্থন দিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আর যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন মধ্যপ্রাচ্যে অধরাই থেকে যাবে শান্তি। ভুলে গেলে চলবে না, আজ যে রাষ্ট্রটি ইসরাইল, একসময় সেটাই ছিল ফিলিস্তিন। ইসরাইলিরা সেই ভূখ- দখল করে নেয়ায় বর্তমানে ফিলিস্তিনিরা কেবল পশ্চিমতীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেমের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের স্বীকৃতি চায়। কিন্তু সেটুকুও, বিশেষ করে পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনিদের হাতে ছেড়ে দিতে ইসরাইল নারাজ। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই পারত এ ব্যাপারে ইসরাইলকে নমনীয় করতে। এর বদলে একতরফাভাবে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় সে আশাও দুরাশায় পরিণত হল। জেরুজালেম নিয়ে মার্কিন ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চীন। এমনকি পোপ ফ্রান্সিসও জাতিসংঘ প্রস্তাবনা অনুসারে জেরুজালেমের মর্যাদা সমুন্নত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে সমর্থন জানিয়েছেন তা থেকে তিনি ফিরে আসবেন বলেই আমরা মনে করি।
-শাহ আবিদ রহমান
রামপুরা, ঢাকা

 

মাসিক পাথেয় ডিসেম্বর ২০১৭

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com