২৫শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৯ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

ঠকবাজি ও প্রতারণা করা মারাত্নক গুনাহ : আল্লামা মাসঊদ

  • মানুষকে ঠকানো ও প্রতারণা করা এটা মারাত্নক অপরাধ ও গুনাহ। আল্লাহ তাআলা প্রতারককে পছন্দ করেন না।
  • একজন সত্যিকারের মুত্তাকি মুমিন কখনো আল্লাহ তাআলার আজাবের ব্যাপারে গাফেল থাকতে পারে না। আর যারা দুনিয়াতে ও আখিতের অসফল ও ব্যার্থ, তারাই কেবল আল্লাহ তাআলার আজাবের ব্যাপারের গাফেল ও উদাসিন হয়।
  • ইসলামিক ব্যাংকগুলো ইসলামের লোভ দেখিয়ে সরল মুসলমানদেরকে সুদের সাথে জড়িয়ে ফেলছে। অধিক মুনাফার প্রতিশ্রুতির আড়ালে সুদের কারবার করছে।

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : মানুষের সাথে ঠকবাজি ও প্রতারণা করা মারাত্নক অপরাধ ও গুনাহ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান, ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের গ্র্যান্ড ইমাম, সাইয়্যিদ মাওলানা আসআদ মাদানী (রহ.) এর খলীফা, শাইখুল ইসলাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ।

তিনি বলেন, মানুষকে ঠকানো, ওজনে কম দেয়া, প্রতারণা করা ও ধোঁকা দেয়া এগুলো মারাত্নক অপরাধ ও গুনাহ। আল্লাহ তাআলা প্রতারককে পছন্দ করেন না। এই প্রতারণা, এউ ঠকবাজির জন্য আল্লাহ তাআলা কওমে শোয়াইবকে তিনটি আজাবের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন।

শুক্রবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ইকরা বাংলাদেশ ঝিল মসজিদ কমপ্লেক্সে জুমার বয়ানে এসব কথা বলেন তিনি।

আল্লাহ তাআলা মানুষের শিক্ষার জন্য কুরআনুল কারীমে বহু জাতির কথা তুলে ধরেছেন উল্লেখ করে শাইখুল ইসলাম আল্লমা মাসঊদ বলেন, আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে বহু জাতির ইতিহাসকে উল্লেখ করেছেন, এবং তারা তাদের আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামের সাথে কী ব্যাবহার করেছিলো, কী আচরণ করেছিলো, এই সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন এবং তাদের কী পরিনাম হয়েছিলো, তাও আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন। যে সমস্ত জাতির কথা আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন তাদের মধ্যে আছে হযরত নূহ (আঃ) এর জাতির কাহিনী, কওমে আ’দের কাহিনী, কওমে ছামুদের কাহিনী, কওমে লূতের কাহিনী ইত্যাদি। এদের সাথে ‘মাদয়ানবাসী’ একটা জাতির কথাও আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন।

মাদয়ানবাসী কারা, তাদের অপরাধ কী এবং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে কী শাস্তি দিয়েছেন তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে আল্লামা মাসঊদ বলেন, এই মাদয়ান এলাকার লোকেরা আল্লাহ তাআলার অত্যন্ত অবাধ্য হয়ে গিয়েছিলো। তাদের সবচেয়ে বড় গুনাহ ছিলো মানুষকে ঠকানো। এদের প্রকৃতিই ছিলো মানুষকে ঠকানো। তারা মানুষকে ঠকাতো, মাপে ও ওজনে কম দিতো। কুরআনুল কারীমে আছে, তারা রাস্তায় রাস্তায় ওঁৎ পেতে বসে থাকতো, ব্যবসায়ী কাফেলায় লুণ্ঠন এবং ডাকাতি করে তাদের মালামাল ছিনতাই করতো। আল্লাহ তাআলা তাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন হযরত শুয়াইব (আঃ) কে।

হযরত শুয়াইব (আঃ) তাদেরকে কঠোরভাবে নিষেধ করে বলেছিলেন, মানুষকে ঠকিও না, মানুষকে লুণ্ঠন করো না। তখন তারা বললো, আমরা যদি এরকম না করি তাহলে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবো, তোমার কথা আমরা মানতে পারি না। শেষে তারা যখন উগ্র হয়ে গেলো, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর আজাব দেওয়ার ফায়সালা করলেন।

প্রথমে আল্লাহ তাআলা গরমের আজাব দিলেন, এতো গরম যে, লোকেরা ঘরে বসতে পারে না, গাছের নিচে বসতে পারে না, বাগানেও বসতে পারে না। যেখানেই যায় সেখানেই গরম। এভাবে কয়েক দিন ব্যাপী আল্লাহ তাআলা প্রচন্ড গরমের আজাব দিলেন এই এলাকায়। ওই সময় আল্লাহ তাআলা এক টুকরো মেঘ পাঠালেন এই মেঘের নীচে কেবল শীতল বাতাস বইতে ছিলো, মেঘের টুকরোটি একটা বনের উপর স্থির হলো, তারা যখন দেখলো মেঘের নিচে দাঁড়ালে ঠান্ডা লাগে, মেঘের বাহিরে দাঁড়ালে ঠান্ডা লাগে না, সবাই মিলে ঐ মেঘের নিচে দাঁড়ালো। তারা বুঝতে পারলো না যে, এই মেঘ শীতলতার মেঘ নয়, এই মেঘ হলো আজাবের মেঘ। শেষে তাদের ওপর ভীষণ আজাব আসলো। এই মেঘ থেকে বৃষ্টি পড়বে তো দূরের কথা, আগুনের বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। সবাই একত্রিত হয়েছিলো মেঘের ছায়াতলে আর আগুনের বৃষ্টিতে তারা ভস্ম হয়ে গেলো। এর সাথে আল্লাহ তাআলা বিরাট চিৎকারের আজাব দিলেন, এতো বিকট চিৎকার যে, তাদের নাক কান ফেটে গেলো।

এরপরও আল্লাহর আজাব শেষ হলো না, এরপর আল্লাহ তাআলা ভূমিকম্প শুরু করলেন, ভূমিকম্পে তাদের ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো, এমন হয়ে গেল যে এই এলাকায় কোন লোক বসবাস করতো এমন কোনো চিহ্নও আর রইলো না।

আরও পড়ুন : কেবল বিপ্লব করে ইকামতে দীন সম্ভব নয় : আল্লামা মাসঊদ

সমাজে সুদের ভয়াবহ অবস্থার কথা তুলে ধরে আল্লামা মাসঊদ বলেন, আজকে ওলামায়ে কেরাম সুদের বিরুদ্ধে ওয়াজ করলে যারা ব্যাংকার আছেন, যারা ব্যবসায়ী আছেন তারা সোজা বলে দেন যে, হুজুর, সুদ ছাড়া এবং ঘুষ ছাড়া তো কোনো ব্যবসা চলবে না, সুতরাং আমরা আপনার কথা কিভাবে শুনি ? আমরা সুদও খাবো, নামাজও পড়বো, সুদও খাবো, রোজাও রাখবো, হজও করবো৷ আজকে আমরা হারামকে হারাম মনে করি না, নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করি। যেখানে হালাল বললে সুবিধা হয় সেখানে হালাল বলি, যেখানে হারাম বললে সুবিধা হয় সেখানে হারাম বলি। আল্লাহ তাআলা কোনটাকে হালাল করেছেন এবং কোনটাকে আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন, এই দিকে আমাদের নজর নেই।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছো? তোমাদের কি ভয় করে না? তোমরা কি একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছো? আল্লাহর শাস্তি আসবে রাতের গভীরে, যখন তোমরা নিদ্রামগ্ন থাকবে, আর এই অবস্থায় তওবা করার সুযোগ পাবে না?

ঠকানো ও প্রতারনা করার ভয়াবহতার ব্যাপারে সতর্ক করে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান বলেন, মানুষকে ঠকানো ও প্রতারণা করা এটা মারাত্নক অপরাধ ও গুনাহ। আল্লাহ তাআলা প্রতারকদের পছন্দ করেন না। যে প্রতারণার জন্য আল্লাহ তাআলা কওমে শোয়াইবকে তিনটি আজাবের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে দিলেন, সেই প্রতারণার মতো মারাত্নক গুনাহে আমরা আজ জড়িয়ে গিয়েছি। আজকাল আমাদের মাঝে ঠকানো ও প্রতারণা বেড়ে গেছে। ই-কমার্সের নামে ইভ্যালি ই-অরেঞ্জের মত প্রতারণাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের সাথে প্রতারণা করছে, মানুষকে ঠকাচ্ছে। এমএলএমের মতো সুদের কারবারের সাথে মানুষ পয়সার লোভে জড়িয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্যের কথা হলো যেই হুজুররা মানুষদেরকে ঠকানোর বিরুদ্ধে ওয়াজ করবেন, তারা তাদের বিরুদ্ধে ওয়াজ করেনই না বরং একজন হুজুরও এই এমএলএম ব্যবসার মুবাল্লিগ ও প্রচারক হয়ে যাচ্ছেন। শেষে হুজুরদেরকেও এই পয়সার লোভ আক্রমণ করলো এবং তারা ওই ধোকার মধ্যে শরিক হয়ে গেল।

দেশে ইসলামিক ব্যাংকগুলো ইসলামের নামে, সওয়াবের নামে মুসলমানদেরকে সুদের সাথে জড়াচ্ছে উল্লেখ করে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের ইমাম বলেন, আমাদের দেশের ইসলামিক ব্যাংকগুলো ইসলামের লোভ দেখিয়ে সরল মুসলমানদেরকে সুদের সাথে জড়িয়ে ফেলছে। অধিক মুনাফার কথার আড়ালে সুদের কারবারি করে যাচ্ছে। অথচ তাদের শতকরা ৯৫ ভাগ কাজই সুদের ওপরে ভিত্তি করে টিকে থাকে। অন্য একটা ব্যাংকে টাকা রাখলে মানুষের একটা ভয় থাকে যে, আমি সুদ খাচ্ছি আল্লাহ তাআলা মাফ করুন। কিন্তু এই নামসর্বস্ব ইসলামী ব্যাংকগুলো তাদেরকে বলে, ইসলামিক ব্যাংকে টাকা রাখলে গুনাহ তো হবেই না বরং আরও বেশি সওয়াব হয়। আমাদেরকে এই প্রতারণার বিরুদ্ধ সোচ্চার হতে হবে।

মানুষকে আল্লাহর আজাবের ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে এই আধ্যাত্নিক রাহবার বলেন, আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছো? তোমাদের কি ভয় করে না? তোমরা কি একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছো? আল্লাহর শাস্তি আসবে রাতের গভীরে, যখন তোমরা নিদ্রামগ্ন থাকবে, আর এই অবস্থায় তওবা করার সুযোগ পাবে না? সুতরাং আল্লাহর আজাবের ব্যাপারে গাফেল ও অসতর্ক হওয়া যাবে না। একজন সত্যিকারের মুত্তাকি মুমিন কখনো আল্লাহ তাআলার আজাবের ব্যাপারে গাফেল থাকতে পারে না। আর যারা দুনিয়াতে ও আখিতের অসফল ও ব্যার্থ, তারাই কেবল আল্লাহ তাআলার আজাবের ব্যাপারের গাফেল ও উদাসিন হয়। যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে, তারা কখনোই নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করে না, বরং তারা সব সময় আল্লাহর আজাবের ভয় করতে থাকে, আল্লাহকে ভয় পেতে থাকে, ভয় পেয়ে নিজেদেরকে ঠিক রাখে।

প্রতারণা ও ঠকবাজি ছেড়ে দিয়ে ঈমান ও তাকওয়া অবলম্বর করার আহ্বান জানিয়ে আল্লামা মাসঊদ বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমরা ঈমান আনো ও তাকওয়া অবলম্বন করো, তাহলে খোশখবর শুনে নাও, দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য আসমানের বারাকাতকে খুলে দিবেন, জমিনের সব প্রকার বারাকতের দরজা আল্লাহ তাআলা খুলে দিবেন। সুতরাং প্রিয় ভাই, আমরা প্রতারণা ও ঠকবাজি ছেড়ে দেই। ঈমান ও তাকওয়ার পথ অবলম্বন করি। তাহলে আমরা দুনিয়াতে ও আখিরাতে উভয় জাহানে সফল হবো।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com