মো. আতিকুর রহমান মুফতি : আয়শার জীবনে বিস্তৃত ঘাত-প্রতিঘাত জয় করা তার তৃপ্তির হাসিই বলে দেয় সংকটময় দিনগুলো জয় করার আনন্দ কেমন হয়। তিনি নিজেকে আর দুর্বল ভাবেন না। অবাধ্য সময়ের বাঁকারূপ সহায়, সম্বল, আশ্রয়হীন আয়শাকে আত্মহত্যার কাছে নিয়ে গিয়েছিলো। কথাগুলো ভাবলেই আশা কেমন যেন হয়ে যায় আর চোখের কোণায় দেখা দেয় অশ্রুর ঝিলিক।
২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিতে না দিতেই পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়ে যায় তার। পরিবার বলতে আয়শার ছিলো বাবা আর সৎমা ; তাদের কাছে আয়শা বোঝা ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। স্বামী হিসেবে পেলো সে মাদকাসক্ত এক বেকারকে। অবজ্ঞা, শারীরিক নির্যাতন হলো তার নিত্যসঙ্গী। আয়েশা কন্যা সন্তানের মা হওয়ায় জীবনের অঙ্ক যেন আরও জটিল হয়ে গেল। বিভীষিকাময় এ সময়টাতেও পড়াশোনা চালানোর অদম্য স্পৃহা ছিলো তার। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে খুলনা জেলা প্রশাসন আয়োজিত ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রশিক্ষণ বিষয়ে জানতে পারেন তিনি। প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রথম মাসেই ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করলেন ১৫০ ডলার বা ১২,০০০ টাকা। বদলে গেলো তার জীবন।
বেসিস সফট এক্সপো (২০১৮) অনুষ্ঠানে বেসিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে আউটসোর্সিংয়ের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় যা বর্তমানে দ্বিতীয় স্থানে উন্নীত হয়েছে। দেশে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচ লাখ কাজ করেন মাসিক আয়ের ভিত্তিতে। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ফ্রিল্যান্সারদের নিয়োগের মাধ্যমে বিপণন, ডিজাইন, ব্যবসা পরামর্শক বা প্রোগ্রামিংয়ের জন্য বিশ্ব বাজারে প্রবেশ করে। ফ্রিল্যান্সারদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্থানীয় বাজারের তুলনায় আরও সাশ্রয়ীমূল্যে সেবা পেতে বাইরের বাজারে যেতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো দেশ নির্দিষ্ট বিশেষত্বের ফ্রিল্যান্সিং কাজের জন্য পরিচিত। যেমন যুক্তরাষ্ট্র লেখা এবং অনুবাদ ফ্রিল্যান্সারে সমৃদ্ধ। ভারতে আছে সাশ্রয়ীমূল্যে সফটওয়্যার ডেভেলপার এবং প্রযুক্তিদক্ষ ফ্রিল্যান্সার।
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা সেলস এন্ড মার্কেটিং সাপোর্ট, ক্রিয়েটিভ মাল্টিমিডিয়া, সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট এন্ড প্রযুক্তি দিকগুলোর কাজে আগ্রহ বেশি দেখায়। দুইবছর আগের হিসেবে দেশের ফ্রিল্যান্সারদের গড় মাসিক আয় ৬০ মার্কিন ডলার বা ৫০০০ টাকা। বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাধারণত যারা চাকুরির কঠিন বাজারে প্রবেশ করতে পারে না, তারাই মূলত ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। তবে বাংলাদেশে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি গৃহিণীরাও ফ্রিল্যান্সিং এ বেশ এগিয়ে।
ফ্রিল্যান্সিং এমন এক পেশা যেখানে অন্যকোনো চাকুরির মতো আর দশটা নিয়মকানুন নেই। চাকুরির চেয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিয়ে অনেকেই এখন ঝুঁকছেন ফ্রিল্যান্সিংয়ে। এক্ষেত্রে ডলারে আয় করা এবং পছন্দমতো কাজ বেছে নেয়ার সুযোগ আছে যা সাধারণ চাকুরিতে নেই। এ কাজে চ্যালেঞ্জ আছে। কাজ বাছাই করা ও কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন না করলে এখানে সফল হওয়া যায় না। এখন প্রতিযোগিতার বাজার, নতুনদের জন্য কাজ পাওয়া কঠিন তবে অভিজ্ঞতা আর দক্ষতা বাড়াতে পারলে সফলতা অবশ্যম্ভাবী।
তা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং করা অনুচিত। কাজের দক্ষতা থাকলে চাকুরির পাশাপাশি কিছুটা করতে পারেন। সরকার ও সফটওয়্যার নির্মাতাগুলোর সংগঠন বেসিস চাইছে ফ্রিল্যান্সাররা এখন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠুক। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, আরও নতুন ফ্রিল্যান্সার আসবে। ঢাকাসহ সারাদেশে ফ্রিল্যান্সিংয়ে যত সেমিনার হয় সেখানে তরুণদের অংশগ্রহণ থাকে চোখে পড়ার মতো। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের সুযোগ আছে।
ফ্রিল্যান্সারদের অর্জিত অর্থ সহজে দেশে এনে ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সারদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছে ব্যাংকগুলি। পেওনিয়ারের মাস্টারকার্ড, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, ব্যাংক এশিয়ার স্বাধীন নামের মাস্টারকার্ড ও ইসলামী ব্যাংকের এমক্যাশ সেবা এক্ষেত্রে বেশ জনপ্রিয়।
খুলনার জেলা প্রশাসক খুলনায় কোনো প্রকার সরকারি সহায়তা ছাড়াই তরুণদের জন্য আইসিটি ভিত্তিক ক্যাপাসিটি বিল্ডিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রতিব্যাচে ৫০ জন প্রশিক্ষণার্থী গ্রাফিক ডিজাইনিং, ডিজিটাল মার্কেটিং ও আউটসোর্সিং বিষয়ে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পাচ্ছে, হয়ে ওঠছে সফল ফ্রিল্যান্সার। সরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা হাইটেক পার্ক, আইসিটি ইনকিউবেটর, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব ইত্যাদির মাধ্যমে গড়ে ওঠছে আইসিটি জ্ঞানে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
ছোট্ট শহর খুলনার আউটসোর্সিংয়ের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং আর এন জে ইনফরমেশন এন্ড টেকনোলজিস এর প্রধান নির্বাহী বলেন, দেশে ফ্রিল্যান্সিংয়ের নিরব বিপ্লব চলছে। দেশের অভ্যন্তরীণ কাজের চাইতে বিদেশি কাজে দেশি ফ্রিল্যান্সারদের আগ্রহ বেশি। তাঁর মতে খুলনায় ড্রিমলাইনার আইটি, নেট-টু-সলুশন, আইটেকের মতো কিছু সংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ফ্রিল্যান্সিং প্লাটফর্ম রয়েছে। যারা সময়ের সাথে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে উৎকর্ষতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
তবে এ খাতের মূল সমস্যা ফ্রিল্যান্সারদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস। বিয়ের বাজারে ছেলের পেশা হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং কে এখনও তীর্যকভাবে দেখা হয়। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ সমস্যা কাটতে শুরু করেছে। অনেকেই এ খাতে ভালো করে অন্যদের জন্য উদাহরণ হয়ে ওঠেছেন। দেশের জন্য বয়ে আনছেন বৈদেশিক মুদ্রা। জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠছে আরও শক্ত। ডিজিটাল বাংলাদেশের হাত ধরে এ যেন এক সাফল্যের স্বর্ণদ্বারে প্রবেশের অপেক্ষায় বাংলাদেশ।
১২.০৬.২০১৯
লেখক : কলামিস্ট


