২রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১০ই রজব, ১৪৪৪ হিজরি

তাবলীগের সংকট নিরসন হোক

ফাইল ছবি

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

তাবলীগের সংকট নিরসন হোক এটাই কাম্য। আর এটা নিয়ে কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি চাই না। কয়েকবছর ধরে ঐগুলো দেখে আসছি। পক্ষ-বিপক্ষের মন্তব্য শুনে আসছি। আর ওসব দেখতে মনে চায় না।

কী আজিব ব্যাপার! তাবলীগ নিয়ে বাবা একদিকে ছেলে আরেক দিক। মানে বাবা হলেন মাওলানা সাদ সাহেবের অনুসারী তথা এতাআতী আর ছেলে আলমীশুরা তথা ওযাহাতি। দুনিয়ার সব কাজ চলছে। এক সঙ্গে ওঠাবসা, খাওয়া-দাওয়া, বাজার-ঘাটে যাওয়া। এক সাথে নামাজ পড়া,হজ করা, জিকির করা, কিন্তু তাবলীগের কাজে তারা দুজন দুই মেরুতে। ছেলে প্রথম ইজতেমাতে গিয়েছে বাবা এখন দ্বিতীয় ইজতেমাতে। মানে এ যেন তামাশাতে পরিণত হয়েছে।

শ্রদ্ধেয় পিতা এক সময় জাহেল ছিল। কিন্তু তাবলীগের নেসবাতে তিনি দ্বীন পেয়েছেন। দ্বীনী বুঝ এসেছে। দ্বীনি জ্ঞান আসার পরে তিনি সন্তানদের মাদ্রাসায় দিলেন। জান কোরবান করে ছেলেকে আলেম বানালেন। এখন তাবলীগে যখন সংকট দেখা দিল তখন বাবা-ছেলের মাঝে তাবলীগ নিয়ে বিরোধ। কোথাও কোথাও বাবা-ছেলের মুখ দেখাদেখি হয় না। মানে ভাবতে খুব কষ্ট হয়। কী এক ফেৎনা শুরু হলো, সব কাজ এক সঙ্গে, বাবার প্রতিষ্টিত মাদ্রাসায় ছেলে চাকুরী করছেন। তাতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না, কিন্তু তাবলীগের কাজে দুজন-দুদিকে।

এই সংকট বেশ ক’বছর হলো, কিন্তু কোনো সমাধান দেখি না। অনেকেই ভিতরে ভিতরে কষ্টে আছেন। আলমীশুরা তথা ওযাহাতি ভায়েরা কষ্টে আছেন আবার সাদ সাহেবের এতাআতিরা ভায়েরাও। অনেকে বুঝেও মুখ খুলতে পারছে না। হয়তো কারো গালমন্দ শুনতে হবে। যেমন ওযাহাতি অনেক ভায়েরা সমাধান চান। এতাআতি অনেক ভায়েরাও সমাধান চান। কিন্তু উপরের লিডারদারদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না। যেমন সাধারণ বহু আলেম তারা সংকট সমাধান চান। কিন্তু যদি মুখ খোলেন তাহলে বয়কট হয়ে যাওয়ার ভয় আছে। হয়তো অন্য আলেমরা এতাআতি ট্যাগ লাগায়ে কোনঠাসা করে ফেলবে। এরকম ভয়ে কেউ কথা বলে না। আবার এতাআতি ভাইদের মধ্যেও অনেকে এমন ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে থাকেন। মানে কোনো কুল-কিনারা হচ্ছে না।

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব, যিনি ফেদায়ে মিল্লাতের খলিফা। তিনি অবশ্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন উভয়ের সংকট নিরসনের জন্য। যে কারণে সে সময়ে অনেকেই অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করেছিল। অনেকে না বুঝে অবান্তর মন্তব্যও করেছিল। তবে তিনি অত্যন্ত সবরমান্দ ব্যক্তিত্ব। কারো কথার প্রতিউত্তর করেননি। সবই আল্লাহর উপরে ছেড়ে দিয়েছেন। তবে আমার যা মনে হয় তিনি এখনো হয়তো সংকট সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছেন।

আল্লামা মাসঊদ সাহেবের ওই রাস্তায় অনেকেই হাঁটতে চান। কিন্তু তারা নানা কারণে সাহস পান না। যেটা বিভিন্ন ভাবে অনুমাণ করা যায়। চট্রগ্রামের আল্লামা ইজহারুল চৌধুরী সাহেব তিনি তো প্রকাশ্যে অনুরাগ ঝেড়েছেন। তাঁর কথায় তো কোনো অস্পষ্টতা নেই। তিনি তো এ সংকট নিরসন করার জন্য মুখিয়ে আছেন।

কয়েক দিন যাবত মাওলানা হাবিবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী সাহেবের একটা বক্তব্য অনলাইনে খুব ভাইরাল হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে তিনিও ফরীদ মাসঊদ সাহেবের অনুগামী। সংকট নিরসন হোক সেটা কামনা করেন। তিনি মরহুম আল্লামা কাসেমী সাহেবের একটা কথা যেভাবে উপস্থাপনন করেছেন, সেটা যদি আমরা ধরে নেই, তাহলে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা অনেকখানি সহজ হবে বলে মনে করি।

আল্লামা কাসেমী রহ. একজন জবরদস্ত আলেম এবং ওলী ছিলেন। তাঁর মতো মুখলিস আলিমের এখন খুব অভাব। সেই মহান ব্যক্তির কথার মধ্যে তাছির আছে। হোক সেটা অনেক আগের। কিন্তু অমন থিউরীর উপরে চলতে পারলে তাবলীগের সংকট অনেকখানি কমে আসবে বলে মনে করি। যেমন তিনি বলেছেন, ‘দাওয়াত ও তাবলীগ আমাদের আকাবিরের এক মকবুল মেহনতের নাম। যত কিছু হোক এখনো এতে খায়ের গালেব। এটাকে হেমায়েত করতে হবে। সাহায্য সহযোগিতা করতে হবে।’

আল্লামা কাসেমীর এমন কথা যদি উভয় গ্রুপ মেনে নেন। যত কিছু হোক তাবলীগের মধ্যে এখনো খায়ের গালেব। তাছাড়া তাবলীগ আমাদের কাজ। এরকম চেতনা নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে নিশ্চয়ই ফায়দা হবে।

দেখুন! দ্বিতীয় ইজতেমাতেও লোক কম হয়নি। সেখানেও লক্ষ লক্ষ মানুষ ছিল। আমরা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে দেখেছি, বর্তমান টঙ্গীর ময়দান বিশাল এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। হয়ত ওযাহাতীদের পর্যায়ে যায়নি। তবুও লোক সংখ্যা কম নয়। তাহলে এই লক্ষ লক্ষ মানুষগুলো কী এভাবেই থেকে যাবে? আর আমরা কী হিংসার অনলে পুড়ে মরবো? এভাবে ফেসবুকে আমরা অবান্তর মন্তব্য করতে থাকবো?

আমাদের অনেক ভাই বলে থাকেন, কাদিয়ানী আর সাদিয়ানী এক। আচ্ছা এটা কোন মুফতীর ফতোয়া? কাদিয়ানী সম্প্রদায় হলো নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শেষ নবী হিসাবে মানে না। এজন্য তারা কাফের। কিন্তু এতাআতি ভায়েরা তো মাওলানা সাদ সাহেবের অনুসারী। তারা তো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের কেতনধারী এক জামাত। তারা তো পাক্কা মুসলমান। সুতরাং তাদেরকে কাদিয়ানীদের সাথে মিশিয়ে দেওয়া বড় অন্যায়। বরং এসব অশালীন মন্তব্যের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহীতা রয়েছে।

এজন্য তাবলীগ নিয়ে বল্গাহীন আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। তবে যে যাই বলেন আমাদের আলমীশুরা তথা ওযাহাতী ভায়েরাই সমালোচনায় এগিয়ে। কেননা এদের ফেসবুকে একচ্ছত্র আধিপত্য। তবুও আমি বলবো এটার কোনো সুরাহা হোক। বাবা আর ছেলের লড়াই দেখতে চাই না। যে কোনো মূল্যেঐক্যবদ্ধ ফ্লাটফরম চাই। বিশেষ করে তাবলীগের সুরাহা তাবলীগের জন্য নিবেদিত মানুষদের নিয়ে হোক। কোনোক্রমে ঘরের ঝগড়া বাইরের মানুষ মেটাতে না আসে।

মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার দায় লেখকের

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com