১৮ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১৯শে মহর্‌রম, ১৪৪৪ হিজরি

তারা কী আর ফিরে আসে ধানসিঁড়ির তীরে

  • আদিল মাহমুদ

শন শন বাতাসের গর্জনে, কুয়াশাচ্ছন এই দীর্ঘ রাতে, শিশির ফোঁটার শব্দে, কেবল তাদের মনে পড়ে, শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের যাদের হারিয়েছি বীভৎস মহামারির এই বছরে, দুই হাজার একুশে। দুর্লঙ্ঘ পাহাড়, সমুদ্রের সীমানা পেরিয়ে হলেও যদি তাদের দেখা পাওয়া সম্ভব হতো, তবে পরিযায়ী বিপ্লবী হয়ে আমি দেখা করতাম তাদের সাথে, আত্মা দহনের সৌন্দর্য উপলব্ধির স্মৃতিসৌধে। কিন্তু না, তাদের সাথে কখনোই, কোনো ভাবেই দেখা করা সম্ভব না। যারা চলে যায়, তারা আর ফিরে আসে না ধানসিঁড়ির তীরে। যদিও জীবনানন্দ লিখেছেন, ‘আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে/জলঙ্গীর ঢেউ এ ভেজা বাংলারি সবুজ করুণ ডাঙ্গায়।’

এ বছর যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক একটি প্রদীপ হয়ে আলো ছড়িয়েছেন যারা, বছর শেষে তাদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি করুণ বিলাপের সুরে, তাদের শৈল্পিক-উৎকর্ষ সম্পর্কে জানি অঞ্জলি ভরা দুঃখে।

  • রাবেয়া খাতুন

অর্ধ শতাধিক উপন্যাসের রচয়িতা রাবেয়া খাতুন। তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক। লেখালেখির পাশাপাশি রাবেয়া খাতুন শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলা একাডেমির কাউন্সিল মেম্বার। জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের গঠনতন্ত্র পরিচালনা পরিষদের সদস্য, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরিবোর্ডের বিচারক, শিশু একাডেমির কাউন্সিল মেম্বার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘নতুন কুঁড়ি’র বিচারক। তাঁর জন্ম ১৯৩৫ সালে ২৭ ডিসেম্বর বিক্রমপুরে। ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি ৮৫ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

  • মুজিবুর রহমান দিলু

মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটকের অভিনেতা মুজিবুর রহমান দিলু। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী হন। ১৯৭৬ সাল থেকে টেলিভিশনে নিয়মিত অভিনয় করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় নাটক ‘তথাপি’, ‘সময়-অসময়’ ও ‘সংশপ্তক’-এ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন। অভিমান করে পরে দীর্ঘ সময় অভিনয় থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। ১৯৫২ সালের ৬ নভেম্বর তিনি জন্ম গ্রহণ করেন এবং ২০২১ সালের ১৯ জানুয়ারি ২০২১ সালে ৬৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

  • এ টি এম শামসুজ্জামান

জনপ্রিয় অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান ছিলেন পরিচালক, কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার ও গল্পকার। অভিনেতা হিসেবে চলচ্চিত্র পর্দায় তাঁর আগমন ১৯৬৫ সালের দিকে। ১৯৭৬ সালে চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ চলচ্চিত্রে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন তিনি। ১৯৮৭ সালে কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘দায়ী কে?’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। রেদওয়ান রনি পরিচালিত ‘চোরাবালি’ ছবিতে অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে পার্শ্বচরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মাননা অর্জন করেন। একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামানের জন্ম ১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে। ২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

  • সৈয়দ আবুল মকসুদ

দেশের প্রথিতযশা গবেষক, সাংবাদিক, কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ। তাঁর রচিত বইয়ের সংখ্যা ৪০টিরও বেশি। ‘জার্নাল অব জার্মানি’ তাঁর লেখা ভ্রমণকাহিনি। এছাড়া বাংলা সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ১৯৯৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান তিনি। তিনি ১৯৪৬ সালের ২৩ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার এলাচিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মারা যান রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে।

  • খালিদ আহসান

গত শতকের সত্তর দশকের তুখোড় কবি ও শিল্পী খালিদ আহসান। যিনি আশির দশকে বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিলেন। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, হুমায়ুন আহমেদ, নির্মলেন্দু গুণ, হুমায়ুন আজাদ, সিকদার আমিনুল হকসহ বহু খ্যাতিমান কবি–সাহিত্যিকের বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। ১৯৫৭ সালের ৬ নভেম্বর তার জন্ম, মৃত্যু ২০২১ সালের ২২ মার্চ। তাঁর সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ‘চোখ’ প্রচ্ছদ ও অলংকরণের জন্য মুক্তধারার সেরা পুরস্কার পেয়েছিলেন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি ছবি আঁকায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

  • ইন্দ্রমোহন রাজবংশী

একুশে পদকপ্রাপ্ত সংগীতশিল্পী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশী। ২৬ জানুয়ারি ১৯৪৬ সালে তিনি ঢাকায় জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশ লোকসংস্কৃতি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৬৭ সালে ‘চেনা অচেনা’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শুরু করেন। ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, জারি, সারি, মুর্শিদি ইত্যাদি গানের পাশাপাশি রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত তিনি। দেশের সংগীতাঙ্গণে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৮ সালে সংগীত বিভাগে একুশে পদক লাভ করেন খ্যাতিমান এই সংগীতশিল্পী। ২০২১ সালের ৭ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

  • সারাহ বেগম কবরী

ঢাকাই সিনেমার ‘মিষ্টি মেয়ে’ খ্যাত নায়িকা ও চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী ১৯ জুলাই ১৯৫০ চট্টগ্রামের জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি মারা গেছেন ২০২১ সালের ১৭ এপ্রিল। ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ সিনেমা দিয়ে অভিনয়ে অভিষেক হয় কবরীর। এরপর ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ’, ‘পরিচয়’, ‘দেবদাস’, ‘অধিকার’, ‘বেঈমান’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘দীপ নেভে নাই’-এর মতো অসংখ্য দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এই কিংবদন্তি। ষাট ও সত্তরের দশকের তুমুল জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা কবরী রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সবশেষ সরকারি অনুদানের ‘এই তুমি সেই তুমি’ চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন ঢাকাই ছবির এ ‘মিষ্টি মেয়ে’।

  • হাবীবুল্লাহ সিরাজী

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। পেশাগত জীবনে প্রকৌশলী হাবীবুল্লাহ সিরাজী লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি একাধারে কবিতা, উপন্যাস ও শিশুসাহিত্য রচনা করেছেন। ২০১৬ সালে একুশে পদক, ২০১০ সালে রূপসী বাংলা পুরস্কার এবং কবিতালাপ সাহিত্য পুরস্কার, ২০০৭ সালে বিষ্ণু দে পুরস্কার, ১৯৯১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮৯ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮৭ সালে যশোর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কারসহ দেশি-বিদেশি নানা পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলায় তাঁর জন্ম। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি ২০২১ সালের ২৫ মে ইন্তেকাল করেন।

  • মহিউদ্দিন আহমেদ

প্রকাশনা জগতের মহীরুহ ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) প্রতিষ্ঠাতা। তাঁকে ২০১৪ সালে ‘ইমেরিটাস প্রকাশক’ সম্মাননা দেয় বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি। ২০১২ সালে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশ করেন। ১৯৬৬-৬৯ সময়কালে কারাগারে বন্দিদশায় বঙ্গবন্ধু দিনলিপি আকারে এই আত্মজীবনী লিখেছিলেন। বাংলা ভাষায় প্রকাশনার পাশাপাশি বইটি একই সঙ্গে ভারত (পেঙ্গুইন) ও পাকিস্তানে (ওইউপি) ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় প্রকাশের ব্যবস্থাও তিনি করেন। তিনি ১৯৪৪ সালে ফেনীর পরশুরামে জন্মগ্রহণ করেন। ২০২১ সালের ২২ জুন মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

  • ফজলে এ খোদা

‘সালাম সালাম হাজার সালাম/সকল শহীদ স্মরণে’সহ অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা ফজল এ খোদা। ১৯৪১ সালের ৯ মার্চ পাবনার বেড়া থানার বনগ্রামে তাঁর জন্ম হয়। ২০২১ সালের ৪ জুলাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে মারা যান। তিনি ‘মিতা ভাই’ নামেও পরিচিত। বাংলাদেশ বেতারের সাবেক পরিচালক ছিলেন। তাঁর অনেকগুলো গান এখনও মানুষকে আন্দোলিত করে। যেমন, ‘সংগ্রাম, সংগ্রাম, সংগ্রাম চলবে, দিন রাত অবিরাম’, ‘যে দেশেতে শাপলা শালুক ঝিলের জলে ভাসে’, ‘ভালোবাসার মূল্য কত আমি কিছু জানি না’, ‘কলসি কাঁধে ঘাটে যায় কোনও রূপসী’, বাসন্তী রং শাড়ি পড়ে কোন রমণী চলে যায়’, আমি প্রদীপের মতো রাত জেগে জেগে’,সহ অজস্র গান। ছড়া দিয়ে তাঁর লেখালেখি শুরু। ছড়াগ্রন্থের সংখ্যা ১০টি, আর কবিতা গ্রন্থ ৫টি। এছাড়াও গান, নাটক, প্রবন্ধ, শিশু সাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে তাঁর সর্বমোট বইয়ের সংখ্যা ৩৩টি। সত্তর দশকে শিশু কিশোরদের মাসিক পত্রিকা ‘শাপলা শালুক’ তাঁর নিপুণ সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো।

  • নুরুল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ইডেন মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান ষাটের দশকের প্রতিভাবান কবি নূরুল হক। যিনি নির্লিপ্ত এবং অগোচরে থেকেছিলেন আমৃত্যু। তিনি ১৯৪৪ সালে নেত্রকোনার মদন উপজেলার বালালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০২১ সালের ২২ জুলাই ৭৭ বছর বয়সে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। তাঁর উল্লেখ্যযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হলো- ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’, ‘একটি গাছের পদপ্রান্তে’, ‘মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প’, ‘শাহবাগ থেকে মালোপাড়া’, ‘এ জীবন খসড়া জীবন’ এবং ‘কবিতাসমগ্র’।

  • ফকির আলমগীর

বাংলা পপ ধারার গানের গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর। বাংলাদেশের সব ঐতিহাসিক আন্দোলনে গানের মাধ্যমে মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন তিনি। তাঁর জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার কালামৃধা গ্রামে। ২০২১ সালের ২৩ জুলাই ৭১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করা ফকির আলমগীর গানের পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখিও করেন। ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বিজয়ের গান’, ‘গণসংগীতের অতীত ও বর্তমান’, ‘আমার কথা’, ‘যাঁরা আছেন হৃদয়পটে’সহ বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। সংগীতের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় ‘একুশে পদক’, ‘শেরেবাংলা পদক’, ‘ভাসানী পদক’, ‘সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অব অনার’, ‘তর্কবাগীশ স্বর্ণপদক’, ‘জসীমউদ্দীন স্বর্ণপদক’, ‘কান্তকবি পদক’, ‘গণনাট্য পুরস্কার’, ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক মহাসম্মাননা’, ‘ত্রিপুরা সংস্কৃতি সমন্বয় পুরস্কার’, ‘ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড যুক্তরাষ্ট্র’, ‘জনসংযোগ সমিতি বিশেষ সম্মাননা’, ‘চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড বিশেষ সম্মাননা’ ও ‘বাংলা একাডেমি সম্মানসূচক ফেলোশিপ’।

  • শেখ আবদুল হাকিম

দেশের রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান লেখক ও অনুবাদক শেখ আবদুল হাকিম। তিনি দেশের পাঠকপ্রিয় গোয়েন্দা কাহিনি ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের লেখক। তিনি ১৯৪৬ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় জন্ম গ্রহণ করলেও দেশভাগের পর ঢাকায় চলে আসেন। ২০২১ সালের ২৮ আগস্ট রাজধানীর মাদারটেকের নান্দিপাড়ায় বড় মেয়ের বাড়িতে ইন্তেকাল করেছেন। ‘কুয়াশা সিরিজ’-এর ৫০টি বই ও ‘মাসুদ রানা সিরিজ’-এর ২৬০ বইয়ের লেখকই ছিলেন তিনি। জনপ্রিয় এই লেখক সেবা প্রকাশনীর মাসিক ‘রহস্য পত্রিকা’র সহকারী সম্পাদক হিসেবেও যুক্ত ছিলেন।

  • বুলবুল চৌধুরী

খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরী জীবনের শুরুতে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘টুকা কাহিনি’ তৎকালীন সাহিত্যাঙ্গনে বেশ আলোড়ন তুলেছিল। বুলবুল চৌধুরীর লেখা উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘পরমানুষ’, ‘মাছের রাত’, ‘চৈতার বউ গো’। উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘অপরূপ বিল ঝিল নদী’, ‘কহকামিনী’, ‘ইতু বৌদির ঘর’, ‘জলটুঙ্গি’ উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক, হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, জসীমউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কারসহ অগণিত পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ২০২১ সালের ২৮ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্ম ১৯৪৮ সালে ১৬ আগস্ট গাজীপুরের দক্ষিণ বাগে।

  • আতাউর রহমান

বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক ও রম্যলেখক আতাউর রহমান ১৯৪২ সালে গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়নের নগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমলা, লেখক, কূটনীতিক ও অসাধারণ বক্তা ছিলেন। ২০২১ সালের ২৮ আগস্ট চলে গেছেন না ফেরার দেশে। জনপ্রিয় এই লেখকের ২৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

  • বশীর আল হেলাল

কথাশিল্পী, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং বাংলা একাডেমির ইতিহাস বইয়ের লেখক, কবি বশীর আল হেলাল। তাঁর আটাশ পৃষ্ঠার ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গবেষণালব্ধ গ্রন্থ। প্রায় চল্লিশটি প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে বাংলাভাষার ওপরেই তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ৬টি। তিনি আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভুষিত হন। তিনি ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। ১৯৩৬ সালের ৬ জানুয়ারি মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামের মীরপাড়ায় তাঁর জন্ম। ১৯৬৮ সালের শুরুর দিকে তিনি চলে আসেন ঢাকায়।

  • ইনামুল হক

একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য অভিনেতা, নির্দেশক, নাট্যকার ইনামুল হক। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ছিলেন। জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৯ মে ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নে। ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর বেইলি রোডের বাসায় তিনি মারা যান। নটর ডেম কলেজে পড়াশোনাকালে তিনি প্রথম মঞ্চে অভিনয় করেন। ফাদার গাঙ্গুলীর নির্দেশনায় তখন তিনি ‘ভাড়াটে চাই’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’–এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। দলটির ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন ইনামুল হক। এ দলের হয়ে প্রথম তিনি মঞ্চে অভিনয় করেন আতাউর রহমানের নির্দেশনায় ‘বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকে। এরপর এ দলের হয়ে ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’, ‘নূরুলদীনের সারাজীবন’সহ আরও বহু নাটকে অভিনয় করেন

  • হাসান আজিজুল হক

স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদকজয়ী প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ৮২ বছর বয়সে গত ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর মারা যান। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি লেখালেখি করে গেছেন। তিনি একাধারে গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। প্রায় অর্ধশতক ধরে হাসান আজিজুল হক লিখেছেন। তাঁর লেখা ছোটগল্প ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ ব্যাপকভাবে পাঠক সমাদৃত। ‘আগুনপাখি’ নামে হাসান আজিজুল হকের একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে। উপন্যাসটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের স্বীকৃতি পায়।

  • রফিকুল ইসলাম

একুশে পদকপ্রাপ্ত নজরুল গবেষক বাংলা একাডেমির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার কলাকান্দা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ফুসফুসের জটিলতায় ভুগে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি ২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর মারা যান। ২০১২ সালে সরকার তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। এছাড়া একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, নজরুল একাডেমি পুরস্কারসহ নানা সম্মানে ভূষিত হন রফিকুল ইসলাম।

  • রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ

একুশে পদকপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন সাংবাদিকতায় গৌরবময় অবদানের জন্য ১৯৯৩ সালে একুশে পদক লাভ করেন। অর্ধ শতকের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি ডেইলি স্টারের উপ-সম্পাদক, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রধান সম্পাদক, ডেইলি টেলিগ্রাফের সম্পাদক ও নিউজ টুডের সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ তিনি ফিন্যান্সিয়াল হেরাল্ড পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের জন্ম ১৯৪৫ সালের ৩০ নভেম্বর নরসিংদীর মনোহরদীর নারান্দী গ্রামে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২০২১ সালের ২৫ ডিসেম্বর এই নন্দিত সাংবাদিকের মৃত্যু হয়।

হেমন্তের ঝরাপাতার মতো এক এক করে ঝরে যাচ্ছেন শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতির দিকপালরা। কিন্তু নতুন দিগন্তে তেমন কেউ তৈরি যাচ্ছে না ত্রিশ দশকের যুগের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মতো শিল্পমণ্ডিত হয়ে। এজন্য যান্ত্রিক আধুনিকতার ছুঁয়ায় নিজেদের বিলীয়ে না দিয়ে, মুক্তবুদ্ধির জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থেকে, প্রথাবিরোধী পথে হেঁটে হেঁটে, শোষণমুক্ত স্বনির্ভর শৈল্পিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে জাগ্রত হয়ে, সৃজনশীল ও মননশীল কাজের মধ্য দিয়ে শুরু করি নতুন বছর। মাথায় রাখি রবী ঠাকুরের বিখ্যাত উক্তি, ‘মানুষের বিশ্বজয়ের এই একটা পালা বস্তুজগতে; ভাবের জগতে তার আছে আর-একটা পালা। ব্যাবহারিক বিজ্ঞানে একদিকে তার জয়স্তম্ভ, আর-একদিকে শিল্পে সাহিত্যে।’

তথ্য সংগ্রহ: প্রথম আলো ও যুগান্তরের নিউজ

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com