২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ইং , ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১২ই রজব, ১৪৪২ হিজরী

তাড়াইল ইসলাহী ইজতিমা; পুণ্যবানদের অনুপম সমাবেশ

তাড়াইল ইসলাহী ইজতিমা

পুণ্যবানদের অনুপম সমাবেশ

ইয়াছিন নিজামী ইয়ামিন

শীতের রাত। ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়ে আছে চারদিক। চায়ের কাপের ধোঁয়াটা কুণ্ডলী পাকিয়ে মিশে যাচ্ছে কুয়াশার আবরণে৷ দুর্বাঘাসে বিন্দু বিন্দু শিশির জমছে মাদ্রাসার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। ইলেকট্রিক বাতিতে আলোকিত করা হয়েছে পুরো জায়গাটুকু৷ সবুজের শামিয়ানার উপর কাপড়ের চাদোয়ার বিশাল বিস্তৃতি। সেটাও সিক্ত হয়েছে কুয়াশার আদ্রতায়। তার নিচে মোটা গ্লাসের চশমা পরিহিত এক বয়োবৃদ্ধ তালিমের কিতাব পড়ে যাচ্ছে অনর্গল। তার সামনে বসা বিভিন্ন বয়সের মানুষ, সবার গায়ে শীতের ভারী পোশাক জড়ানো। উৎসুক দৃষ্টি নিবদ্ধ পাঠরত বৃদ্ধের পানে। এমন মজলিস গোটা প্রাঙ্গণজুড়ে বেশ কয়েকটা প্রতীয়মান হচ্ছে। অর্ধপূর্ণ জামিয়া ইসলাহ আল-মাদানিয়ার এই মাঠ। এটা এমন এক মজলিসের প্রারম্ভের পূর্বদিনের দৃশ্য, যেখানে আল্লাহর তা’য়ালার আনুগত্য আর রাসূলে কারীম (সাঃ) এর প্রেমে উজ্জীবিত হয় শত-সহস্র হৃদয়। নিজেদের শুদ্ধ করতে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুটে আসে এখানে অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ। কেননা আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেছেন : “সেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না। সেদিন উপকৃত হবে কেবল সেই, যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে”। (সূরা শূ’আরা; ৮৯-৯০.)।

এই সুর বারবার বিমন্ত্রিত হয় আত্মবিশ্বাসীদের হৃদয়ে।

শুদ্ধতার পবিত্র সমীরণ ছড়িয়ে যে পুণ্যবিভায় আলোকিত হবে পুরো অঞ্চল, সেই ইসলাহী ইজতেমার আয়োজনই এটা। এই ইসলাহী ইজতেমা শুরু হওয়ার বেশ কিছুদিন পূর্ব থেকে চলে প্রস্তুতিমূলক বিরাট কর্মযজ্ঞ। পুণ্যময় এই মজলিসের আগমনী বার্তায় উজ্জীবিত হয়ে উঠে শত-সহস্র প্রাণ। আশা-আকাঙ্ক্ষায় উম্মুখ হয়ে থাকে সকলেই।

দিন যতই অতিবাহিত হচ্ছে, মানুষের জীবনে ততই প্রকট হচ্ছে অশান্তির কালোমেঘ। জীবনের অশান্তির এই নিকষ কালো অন্ধকারে সুখের চেয়ে মানুষ আজ স্বস্তির ব্যাকুল অনুসন্ধানী। সেজন্যই এই আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে মানুষ আত্মার স্বস্তি ও রুহের খোরাক আস্বাদনের জন্য মরিয়া হয়ে ছুটছে দিক-বেদিক। এর প্রয়োজনই আয়োজন করা হয়েছে এই মাহফিলের। যেখানে নিহিত আত্মা ও রুহের সেই কাঙ্ক্ষিত অনাবিল শান্তি আর স্বস্তির উপকরণ! এই আয়োজন জীবনকে করে তোলে বর্ণময়, আর হৃদয়কে অপার্থিব বৈচিত্র্যময় রঙে রাঙিয়ে দেয়। এখানে শুদ্ধ হওয়ার সমীরণের যেমন কোন কৃত্রিমতা নেই, তেমনি নেই এর অপ্রতুলতা। এখানকার প্রভাত-সায়াহ্নের জিকির পাষণ্ডচিত্তকেও বিগলিত করে খোদার রহমে সিক্ত করে।

আমরা আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি _শীতের মৌসুমে গ্রামে গ্রামে সভা-মাহফিলের ব্যাপকতা ছিল। গভীর রাত পর্যন্ত চলত এগুলোর কার্যক্রম। তবে এই ইজতিমা প্রচলিত কোন ধারার সভা—মাহফিল নয়, বরং এখানে সকলের মাঝে মনুষ্যবোধকে জাগ্রত করা এবং মানবতার পরম হিতৈষী বন্ধু রাসূলে আরাবী (সাঃ) এর অনুপম আদর্শ অনুশীলন ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে প্রত্যেককে গড়ে তোলার প্রয়াস নেয়া হয়। বৈচিত্রে নির্মিত সরলপথ এখানে চমৎকার ভাবে ফুটে উঠে। এই মাহফিলের মধ্য দিয়ে সকলের সামনে শরয়ী মাস’আলা-মাসায়েল ইসলামের রুচিবোধ সামাজিক বন্ধন ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় ইসলামের অবদান গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়। তাকওয়া ও আল্লাহভীতির চর্চা এবং তার শীলনের এক দীপিকা পাঠশালা হয়ে উঠে এটি।

এই ইজতেমার তত্ত্বাবধায়ক বিখ্যাত আলেমেদ্বীন, মনস্বী, ধীমান গবেষক ও বুযুর্গ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দাঃ বাঃ) এর আহ্বানে অনেক খ্যাতিমান আলিম বুযুর্গদের পদধুলিতে ধন্য হয় এই ভাটি-অঞ্চলের মাটি। মুখরিত হয় হাজারো মানুষের পদচারণায়। গেল বছর-ই দুই আওলাদে রাসূল (সাঃ) এর আগমন ঘটে এখানে। তাদের একজন হযরত মাওলানা আফফান মনসুরপুরী (দাঃ বাঃ) এর জুমার খুতবা ও নামাজের মধ্য দিয়েই সূচনা হয় এই ইসলাহী ইজতিমার যাত্রা। দিনভর ইলম—আমলে ব্যস্ত থাকা, সময়ে সময়ে কুরআন তেলাওয়াত আর তাহাজ্জুদের সম্মিলিত যিকির তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের প্রশান্তির সুধা হয়ে বয়ে যায় সকলের অন্তরে অন্তরে। ফজর ও মাগরিবের ছ’তাসবিহের ধ্বনি—প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে পুলকিত এক স্বর্গীয় আবহের। রহমতের বারিধারা সিঞ্চিত করে এখানকার মাটি ও মানুষকে। এই তিনদিন অবস্থানরত সকলের কাছে হয়ে ওঠে ইবাদতের পুষ্পাগমকাল। আসরের পর এই পুষ্পপল্লীর-ই সূর্যসন্তান, আলেমকুলের শিরোমণি, পীরে কামেল, মুফতিয়ে আ’ম, উস্তাযুল আসাতিজা, শাইখুল হাদীস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দাঃ বাঃ) সবাইকে নিয়ে মুনাজাত করেন পরম করুণাময়ের দরবারে।

খোদার রাহে উৎসর্গীত হয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে যে প্রার্থনা করা হয়, তাতে হৃদয়ে জমে থাকা দুঃখ—কষ্ট, নিরাশা—হতাশা ও কদর্যতাকে হনন করে মুহূর্তেই জায়গা করে নেয় অনাবিল প্রশান্তি, স্রষ্টার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস আর অগাধ ভালোবাসা। চোখ বেয়ে নেমে আসে সমর্পণের উষ্ণ ঝরণা। রহমতের এই জোয়ারে এসে খোদার প্রাপ্তিতে যেভাবে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে বোধ–উপলব্ধি, তা প্রকাশ করা যায় কীভাবে!

একবিংশ শতাব্দীকে তাক লাগিয়ে দেয়া এই কিংবদন্তি মনীষার অপরাজেয় কৃতিত্ব এখানেই যে খোদার করুণা আর নিজ প্রচেষ্টায় সমগ্র বিশ্বে তিনি তার স্থানকে যে উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাতে নানাবিধ কর্তব্যের চাপে নিজেকেই ভুলে যান সময়-অসময়ে। কিন্তু তারপরও আজন্ম শৈশব কৈশোর কাটিয়ে যাওয়া গ্রাম ও গ্রামের মানুষকে বিস্মৃত হননি এতটুকুও। তাদের কথা চিন্তা করে আধ্যাত্মিক খোরাক থেকে আত্মিক বিভিন্ন চাহিদার ক্ষেত্রেও ব্যাপক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। তাঁর একেকটা কর্ম হয়ে উঠছে একেকটা উপমা। সবসময়, সবার জন্য। এগুলো পামর শ্রেণীর লোকদের গায়ের কাটা হলেও তিনি অপচিকীর্ষুদের অপচ্ছায়া দলিত করে তিনি তার গতিতে ছন্দময়; দৃঢ়জ।

ইজতেমাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে কতজন যে কতভাবে মেধা—শ্রম ব্যয় করেন, তার কোন ইয়ত্তা নেই! বিশেষভাবে বলতে গেলে বলতেই হয় আমার পিতা জামিয়াতুল ইসলাহ আল-মাদানিয়া মাদরাসার মুহতামিম হযরত মাওলানা সাঈদ নিজামী সাহেব (দাঃ বাঃ)এর কথা। ইজতিমা শুরু হলে এ নিয়ে তাঁর পেরেশানি আর চিন্তার অন্ত থাকে না। চোখ থেকে নিদ্রা উবে যায়। কাছ থেকে দেখেছি ইজতেমাকে কেন্দ্র করে কত রাত তার নির্ঘুমে কেটেছে। নিজেকে উজাড় করে দিয়ে কাজ করে যান দিনরাত তিনি। আবার ময়মনসিংহের মুফতী তাজুল ইসলাম সাহেব ( দাঃ বাঃ) এর কথাও বিশেষভাবে মনে পড়ছে। স্টেজ পরিচালনা ও শিডিউল ঠিক রাখা এই আয়োজনের একটি মৌলিক কাজ। তিনি এই তিনদিন নিরলসভাবে শ্রম দিয়ে যান স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আর জামিয়া ইসলাহ আল-মাদানিয়া ইছাপশর মাদ্রাসার_উস্তাদদের মেহমানদের প্রতি আন্তরিক খেদমত আর তাদের হাড়ভাঙা খাটুনি প্রবাদতুল্য। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই আয়োজনটি হয়ে ওঠে মনোভীষ্ট; মনোহর।

স্বর্গীয় পবিত্রতায় আবিষ্ট দিনগুলো যেন অতিদ্রুতই অতিবাহিত হতে থাকে। পুণ্যের বর্ণাঢ্য আয়োজন আস্তে আস্তে যেতে থাকে সমাপ্তির অন্তে। যেদিন আখেরি মুনাজাতের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসে, তখন এই পুণ্যের মেলা ভঙ্গ হওয়ার বেদনায় আমাদের হৃদয়গুলো কুঁকড়ে যায়। সেদিন জামিয়া ইসলাহের উন্মুক্ত অঙ্গন জনসমুদ্রে পরিণত হয়। পাশের হাট-ঘাট-রাস্তা আর আশেপাশের বাড়ির উঠোনগুলো হয়ে ওঠে লোকে-লোকারণ্য। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। একসময় সকলের মধ্যমণি হযরতুল আল্লাম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দাঃ বাঃ) দৃঢ় পদক্ষেপে ঋজ্যু ভঙ্গিতে মঞ্চে আগমন করেন। সবার উদ্দেশ্যে আখেরি বয়ান এরপর সবাইকে নিয়ে করেন আখেরি মুনাজাত। সে মুনাজাতে কী-যে মায়া! সে-কী আবেগ!! আর নিঃষ্কলুষতা!!! যারা সেখানে উপস্থিত থাকে, তারাই উপলব্ধি করতে পারেন খোদা আর বান্দার নিগূঢ় আবেদন-নিবেদন। সব ব্যর্থতা—কদর্যতা যেন আছড়ে পড়ে তরঙ্গায়িত অনলসমুদ্রে। পাষণ্ডচিত্তও সিক্ত হয় অশ্রুজলে। প্রভুর দরবারে তার বান্দাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস, নির্মল হয়ে ওঠে এই অঞ্চলের সমীরণ। শুদ্ধির পরশ অনুভূত হয় গায়ে—গতরে! সবার মাঝে এই অপার্থিব শুদ্ধতার দ্যূতি ছড়িয়ে পড়ে। মুনাজান্তে সকলেই যার যার বাড়ির পথ ধরে। ফাঁকা হতে থাকে রহমতে সিঞ্চিত এই প্রাঙ্গণ। আমাদের বুকটা চৈত্রের তাপদাহে চৌচির হয়ে যাওয়া মাঠের মতো হয়ে যায়! এরপর আবার আশায় বুক বাঁধতে থাকি, কবে একত্র হবে আলোকিত পুণ্যময়ীদের এই কাফেলা…

বি.দ্রঃ— সুখের কথা হল, এই পূণ্যের মেলা আবারো বসবে আগামী ১২,১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি ′২১ ইছাপশর গ্রামের তাড়াইল থানা কিশোরগঞ্জে। আমরা অধিক আগ্রহে অপেক্ষমাণ। এই পূণ্যের মেলায় সকলেই সবান্ধব আমন্ত্রিত।

১১৫৮/এ, ইস্পাহান গার্ডেন, চৌধুরীপাড়া, খিলগাঁও, ঢাকা
২৮ জানুয়ারি ২০২১

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি
Design & Developed BY ThemesBazar.Com